বইয়ের আলোচনা

ইউরোপের চিঠি

মোঃ জাকির হোসেন | 26 Jan , 2019  


সাব্বির খানের সাথে দেখা হয়নি কখনও। তারপরও তাঁর সাথে কেবল জানা-শোনা নয়, চেনা-শোনাও হয়ে গিয়েছে অনেকদিন ধরে। জনাব খানের লেখার মধ্যে একধরণের সম্মোহনি শক্তি রয়েছে। তাঁর লেখার টানেই বাংলাদেশ থেকে সুইডেনের বন্ধুত্বতার বন্দরে নোঙ্গর করেছি। ছোট বেলায় হরলাল রায়ের ব্যাকরণ বই পড়তাম ‘একের ভিতরে দুই’। আর সাব্বির খান ‘একের ভিতরে অনেক’। তিনি একাধারে কবি, সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, নাট্যজন ও রাজনীতিক এক্টিভিষ্ট। সব ছাপিয়ে আমার কাছে সাব্বির খানের যে পরিচয় বড় হয়ে ধরা দিয়েছে তা হলো, অদেখাকে দেখার অসীম ক্ষমতা! কতবার পাথরচাপা সবুজ ঘাস দেখেছি। জীবনের নিত্য ঘটনার ডামাডোলে আলাদা কিছু খুঁজে পাইনি এর মাঝে। কবি হেলাল হাফিজ ঠিকই দেখতে পেয়েছেন ‘পাথরচাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট’! সাব্বির খানের লেখা পড়ে বুঝতে শিখেছি, সাদা চোখে দেখার বাইরেও রয়েছে অদেখা ‘অতল রহস্য’! তিনি দেখিয়েছেন, ইউরোপ ও বাংলাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির মাঝে যতই ফারাক থাকুক, উগ্রবাদীদের চাষাবাদ পদ্ধতিতে রয়েছে বেজায় মিল। বাংলাদেশী উগ্র-ডানপন্থীদের মতো ইউরোপের উগ্রপন্থীরাও গোপনে এবং অত্যন্ত চাতুর্য্যতার সাথে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে উগ্রবাদের দর্শন- ও মতবাদ প্রচার করে। ইউরোপে ডানপন্থী উগ্রবাদীদের সংখ্যা যেমন বাড়ন্ত দেহ; বাংলাদেশেও এরা ক্রমেই ডাগর হয়ে ওঠছে। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য আমাদের গৌরবের মানুষগুলোও একের পর এক ডানপন্থীদের শিকারে পরিণত হচ্ছে!
বাংলাদেশের অনেক কলাম লেখক নিজের আদর্শকে আড়াল করতে সত্যের ওপর মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষকে একই সমতলে দাঁড় করিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াকে এক কাতারে শামিল করে তথাকথিত নিরপেক্ষতার বটিকা মানুষকে সেবন করাতে চান। সাব্বির খান ঠিক তার বিপরীত! সাব্বির খানের কলামসমগ্র পড়ে পাঠক তার রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং মতাদর্শেরও পরিচয় পাবেন। কারণ লেখক খোলামনে কোনো অস্পষ্টতা না রেখে তার আদর্শিক বিশ্বাসের নির্জলা সত্যকে কোন পোশাক না পরিয়েই উপস্থাপন করেছেন। সত্যের পক্ষে বুক ফুলিয়ে যুক্তি, তত্ত্ব, তথ্য ও উপাত্ত তুলে ধরেছেন। সত্যের পক্ষে রগ ফুলিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বৈারাচারের কোপানলে পড়ে সাব্বির খান দেশান্তরী হয়ে সুইডেনে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক দশক আগে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সৈনিক সাব্বির খান তাঁর কলাম সমগ্রে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকীকরণের গল্প শুনিয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের বিদেশী সুর সৈনিক সাহিত্যে নোবেলজয়ী বব ডিলানের অজানা গল্প, প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের আমানবিক আচরণ, সভ্য ইউরোপে ধর্ষণের আগ্রাসী অসভ্যতা, ইউরোপের স্কুলে উগ্রবাদ মোকাবেলার কৌশল, নোবেল শান্তিপুরস্কারের অন্দরমহলের ঘটনা, বিদেশি মিডিয়ায় দেশবিরোধী চক্রের ভয়ংকর সব ষড়যন্ত্র, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের উঁকিঝুঁকি নানামাত্রিক বিষয় নিয়ে দেশে-বিদেশের পত্রিকায় যেসব নিবন্ধ লিখেছেন সে সবের নির্বাচিত সংকলন ‘ইউরোপের চিঠি’।
দুই
পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত নৃশংসতম গণহত্যাগুলোর অন্যতম একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা! দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের গণহত্যা আজও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে সক্ষম হয়নি। এমনকি ২০১৭ সালের আগে জাতীয় পর্যায়েও গণহত্যা দিবস পালিত হয়নি বাংলাদেশে। লেখকের হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের ফল্গুধারা বহমান। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি চিরায়ত দায়বদ্ধতা থেকে সাব্বির খান বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের জন্য প্রিন্ট- ও অনলাইন মিডিয়ায় নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন দুই যুগেরও অধিককাল ধরে, যা তাঁর কলামে প্রতিফিলিত হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে যুগ যুগ ধরে প্রবাসী বাঙালিদের অনবদ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। দূঃখজনক হলেও সত্য যে, এক শ্রেণীর অসাধু সরকারী কর্মকর্তা যাওয়া-আসার পথে প্রবাসী বাঙালিদের সাথে অসৌজন্যমূলক- ও নির্দয় আচরণ করে থাকেন। প্রবাসী বাঙালিদের ন্যায়বিচারের দাবি গুমরে কাঁদে। লেখক অনবদ্যভাবে প্রবাসীদের ন্যায্য দাবিগুলোকে কয়েকটি ঘটনার আলোকে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন তাঁর এ সংকলনে।

সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা ও মানব সভ্যতার প্রতি মারাত্নক হুমকি হিসেবে ধরা হয় উগ্রবাদের উত্থানকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বের অন্যপ্রান্ত থেকে এগিয়ে থাকা ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে, বিশেষ করে স্কুলগুলোতে উগ্র-ডানপন্থীদের বিস্ময়কর উত্থান ও তাদের ক্রমান্বয় বাড়ন্তের কারণ, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের উগ্রবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠার পাশাপাশি উগ্রবাদ মোকাবেলায় প্রগতিশীল ও মানবিক সমাজ ব্যবস্থার সংস্কৃতি তৈরি করতে ইউরোপীয় শান্তিপূর্ণ সমাধানের কৌশল, যেখানে প্রজন্মের শিশুরা বেড়ে উঠবে সৌহার্দ ও সমঝোতার পথ ধরে, সাব্বির খানের এ সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে তা অবলীলায়!
নেবেল শান্তি পুরস্কারের অন্দর মহলে রয়েছে ‘নোভেল রাজনীতি’। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শান্তিপুরস্কারের নোভেল রাজনীতির রং ও রূপ পাল্টায় বৈ-কি! ফলে শান্তিতে নোবেলপুরস্কার পাওয়া, না-পাওয়ার যুক্তি-তর্কটি ক্রমেই বয়েসী হয়ে উঠছে। একদা মহাত্না গান্ধীকে শান্তিতে নোবেল না দেয়া যদি নোবেল কমিটির গর্হিত ভুল হয়ে থাকে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির সারথী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি শাপমোচন করবে কি-না, সে বিষয়ে চুড়ান্ত প্রশ্ন রেখেছেন তাঁর নোবেল শান্তিপুরস্কার বিষয়ক নিবন্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি মিডিয়ায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিষোদগার ও অপপ্রচার দীর্ঘদিনের পুরোনো কৌশল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসররা বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়েছিল। এরই স্বভাবজাত ধারাবাহিকতায় ‘বিএনপি-জামায়াত’ জোটবদ্ধ হয়ে শেখ হাসিনার সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধে লবিস্ট নিয়োগ থেকে শুরু করে হেন হীন কাজ নেই তারা বিদেশেরে মাটিতে করেনি। বিদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-শক্তির বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও মিথ্যা অপপ্রচার ঠেকাতে সরকারের করণীর কথা অকপটে তুলে ধরেছেন সাব্বির খান।
ধর্ষণ একটি মারাত্নক অপরাধই শুধু নয়; সভ্যতার জঘন্যতম অভিশাপও বটে! শত প্রচেষ্টা সত্বেও ধর্ষণ অপরাধ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতায় অগ্রগামী দেশগুলোতেই ধর্ষণের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি! সাব্বির খান তাঁর লেখায় তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন- কিভাবে সুইডিশ আইনপ্রণেতারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনকে কঠোর না করে বরং ধর্ষণের সংজ্ঞাকে অধিকতর কঠোর এবং এর ব্যপ্তিকে আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে ধর্ষণজনিত অপরাধ সমাজ ও দেশ থেকে কমিয়ে আনা সম্ভব!

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামার ক্ষীণ আওয়াজ মাঝে মধ্যে শোনা গেলেও এ নিয়ে সুরক্ষামূলক জোরালো কোন সিদ্ধান্ত বা নেয়া পদক্ষেপ আমাদের এতদঞ্চলে পরিলিক্ষিত হয়নি কখনো। বাংলাদেশ এ গ্রহেরই অংশ! কখনো যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তা যে বাংলাদেশেকেও প্রভাবিত করবে নানাভাবে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। পশ্চিমা দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের চুড়ান্ত ভয়াবহতা থেকে তাদের জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বটি সেরে রেখেছেন বেশ চুপিসারেই! অথচ বাংলাদেশের সরকার এব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার! বিষয়টি লেখক সাব্বির খানকে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষ করে তাঁর অতল দেশপ্রেম ও ভ্রাতৃপ্রতীম জনগণের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার টানকে গ্রাহ্যে এনে এ ব্যাপারে ভাবতে এবং কার্যকরী হতে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন তাঁর লেখায়।

সাব্বির খানের লেখার সাথে কেউ দ্বি-মত বা ভিন্নমত প্রকাশ করতেই পারেন। মত ও পথের ভিন্নতাই গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার স্বীকৃত সৌন্দর্য! সে সব কিছুকে আমলে নিয়েই সাব্বির খানের কলাম সংকলন ‘ইউরোপের চিঠির’ ব্যাপক প্রচার এবং পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করছি ২০১৯ সালের বইমেলায়! সাব্বির খানের কলাম সংকলন পাঠকসম্প্রদায়ের কাছে বই আকারে পৌঁছে দেয়ার গুরুদায়িত্ব নেয়ায় ‘বর্ষা দুপুর’প্রকাশনীকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ!
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.