সাক্ষাৎকার

হাবীবুল্লাহ্ সিরাজী: বাংলা একাডেমির দরোজা এখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আর ধর্মান্ধদের ছাড়া সবার জন্য খোলা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | 13 Jan , 2019  


২০ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিরেক্টর জেনারেল) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রথমবারের মতো শিক্ষাবিদ নন, এমন কোনো কবি এ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। আগামী তিন বছর এ দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক হিসেবে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর নাম ঘোষণা করে। এরপর থেকে তাকে অভিনন্দন ও সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে ঢাকার লেখক সমাজ। অনেকে বলছেন,একজন কবি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হওয়ায় এবার মৌলিক সাহিত্য, গবেষণা এবং অনুবাদ সাহিত্যে বাংলা একাডেমির কাজ করার পরিধি আরও বাড়বে। এর আগে এই পদে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন আগের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। গত মে মাসে তার মেয়াদ শেষে মহাপরিচালকের পদটি শূন্য ছিল।

বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষার্ধে আবির্ভূত কবি হাবীবুল্লাহ্ সিরাজীর জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে, ফরিদপুরের রসুলপুরে। দাও বৃক্ষ দাও দিন’ থেকে ‘আমি জেনারেল’ পর্যন্ত কাব্যভাষ্যে নিরীক্ষাপ্রবণ এই কাব্যপুরোহিত নিয়ত উত্তরণ-প্রিয়। তাঁর কবিতা সমাজ-ইতিহাস-সমকালের নান্দনিক উৎপ্রেক্ষার সাক্ষী। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে ১৯৭০ সালে স্নাতক। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে চাকুরিজীবন শুরু করে সমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হিশেবে ১৯৮০ সালে। এরপর বেসরকারি চাকুরি। পেশাগত কাজে ১৯৮৫-১৯৮৬ সাল কাটে কুয়েত ও ইরাকে; এবং ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায়। ২০০০ সালে বেক্সিমকো গ্রুপে যোগদান করেন।দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের এ্যাডভাইজার হিশেবে।
হাবীবুল্লাহ্ সিরাজীর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৫ সালে। নানা বিষয়ে গ্রন্থসংখ্যা ৬৫। এর মধ্যে কবিতা ৪১, অনুবাদ কবিতা ২, উপন্যাস ২, ছোটগল্প ১, প্রবন্ধ ৪, স্মৃতিকথা ১, ছড়া-পদ্য ১৩, সম্পাদনা ১। কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিস, মালয়, হিন্দি, উর্দু এবং ফার্সি ভাষায়। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের নানা পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেছেন বর্ষিয়ান এই কবি। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যাণ্ড, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, ভারতবর্ষ, মালয়েশিয়া ভ্রমণ ক’রেছেন আশির দশকে ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখা কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন তিনি। ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’, ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’, ‘স্বপ্নহীনতার পক্ষে’, ‘আমার একজনই বন্ধু’, ‘পোশাক বদলের পালা’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘কৃষ্ণ কৃপাণ ও অন্য কবিতা’, ‘সিংহদরজা’, ‘জয় বাংলা বলোরে ভাই’, ‘সারিবদ্ধ জ্যোৎস্না’, ‘স্বনির্বাচিত প্রেমের কবিতা’, ‘কতো কাছে জলছত্র’, ‘কতোদূর চেরাপুঞ্জি’ ‘ভুলের কোনো শুদ্ধ বানান নেই’, ‘ইতিহাস বদমাশ হলে মানুষ বড়ো কষ্ট পায়’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। সাক্ষাৎকারটি বাংলা একাডেমির নতুন ভবনে মহাপরিচালকের কক্ষে নেয়া হয়েছে ৯ জানুয়ারি সকাল সারে এগারোটার দিকে। শ্রুতিলিপি করেছেন সাব্বির জাদিদ।

সাক্ষাৎকার ও ভূমিকা: শিমুল সালাহ্উদ্দিন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রিয় সিরাজী ভাই, অভিনন্দন আপনাকে, সম্প্রতি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এবং সময় খুবই কম, বইমেলা দ্বারপ্রান্তে। বিশদিনের মতো সময় আছে। প্রথমে জানতে চাই যে, বাংলা একাডেমির সাথে আপনার ওঠাবসা, জানাশোনা তো দীর্ঘ সময়ের, লেখক-জীবন যত বছরের, প্রায় তত বছরেরই। বাংলা একাডেমির দায়িত্ব নেয়ার কথা যখন প্রথম উঠলো, তখন আপনার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: ধন্যবাদ। আমি শুরুতেই কৃতজ্ঞতা জানাই, শিমুল সালাহ্উদ্দিন এসেছে, তাকে আমি স্বাগত করি। ১৯৬৪ সনে প্রথম ঢাকা শহরে আসি। সেটা ছিল আমার খুব স্বল্পকালীন ঢাকা শহর দেখা। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি বাংলা একাডেমি, সেহেতু আমি ১৯৬৬ থেকে শুরু করব। আমার উচ্চ পর্যায়ের পাঠের অংশ ছিল বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, তখনকার পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা একাডেমি তখন থেকেই একটা মোহময় ব্যাপার ছিল আমার কাছে। একটিমাত্র বর্ধমান হাউজ। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সকালবেলা অনুষ্ঠান। এটা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে পেতে ঊনসত্তুরে এসে বাংলা একাডেমি আমার কাছে একটি প্রাণ এবং প্রণয়ের সম্পর্কের মতো হয়ে গেল। বর্ধমান হাউজ, বাংলা একাডেমি সেই সময়ে, অনেকের খেয়াল থাকতে পারে, রাজনৈতিক চরিত্র ছিল উত্তাল এবং সেই উত্তাল সময়ের ভেতর সবাই একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে, যেটাকে এখন আমরা লিটলম্যাগ বলি, তখন একুশের সংকলন বেরোতো সকালে; আমরা একুশের সংকলন ফেরী করে বিক্রি করতাম। সেই বিক্রির প্রধান জায়গা ছিল শহিদ মিনার। তারপর বাংলা একাডেমি। এরপর বিকালবেলা পল্টন ময়দান। এই কথাগুলো বলার কারণ, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ততা, অন্তত মানসিক যুক্ততা সত্যিকার অর্থে ১৯৬৯ সালে যে তৈরি হয়েছিল, আজ অবধি তা ছিন্ন হয়নি। প্রথম এখানে আসার ব্যাপারে যখন আমি প্রস্তাবটি পাই, আমি নিজে চমকিত হয়েছিলাম। চমক লাগার প্রথম কারণ, আমি কোনো একাডেমিশিয়ান না। আমি কোনো সরকারের উচ্চ পদও ধারণ করি না। সামান্য দু-চার লাইন লেখালেখি করি। সেখানে আমাকে যে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, সেটি আমার কাছে বড় গৌরবের ছিল। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া এবং সমুদয় কার্যপ্রণালী শেষে ডিসেম্বরের ২০ তারিখে আমি জয়েন করি। তখন আমার কাছে মনে হলো, এই দেয়ালের বাইরে থেকে আমি যা দেখেছি, আর এখন দেয়ালের ভেতরে এসে যা দেখছি, অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসে, তাতে আকাশ-পাতাল ফারাক। এই অর্থে ফারাক, কর্মজীবনে আমার যেভাবে চলাফেরা, যাদের সাথে চলাফেরা, তার অধিকাংশই ছিল আমার শিক্ষাপ্রণালীর একটা অংশ। তার বাইরে ছিল আমার লেখালেখি জগতের বন্ধুরা। এবং সেখানে সারাজীবনই আমার চেয়ে বয়সী যারা, আমার চেয়ে শ্রদ্ধেয় যারা, তারা এবং আমার চেয়ে বয়স কম তরুণ যারা, তাদের সঙ্গেই আমার সখ্য ছিল দারুণ। উল্লেখ করতে পারি রফিক আজাদের কথা। উল্লেখ করতে পারি আপনাদের সময়ের তরুণদের কথা। এখন যে কর্মপ্রণালীর ভেতরে আছি, সেটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রণালী এবং একটি বাংলা একাডেমির নিজস্ব কাজকর্মের প্রণালী। এখানে কাজকর্মের চেয়ে প্রতিষ্ঠানটি বড় হয়ে আছে। এবং প্রতিষ্ঠানটি যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য যে বিধিমালা দরকার, সেই বিধিমালার কিছু ঘাটতি আছে। যার ফলে লোকবল এবং জনবলের সমন্বয় সাধন করতে যেয়ে আমি যখন দেখছি, আমার কিছু সরকারি সাহায্য দরকার। যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে, এবং আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের একটি সারাংশ তাদের কাছে ন্যস্ত; আশা করি অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যাটির সমাধান করা যাবে। যেহেতু রাষ্ট্র পরিচালনায় গত দশ বছর একটি দল আছে, যারা বিশ্বাস করে এবং আমি নিজেও বিশ্বাস করি, তারা সংস্কৃতি-বান্ধব, জনবান্ধব। অতএব এই প্রতিষ্ঠানকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া কোনো বিষয়ই না। তবে, আপনার প্রশ্নের শুরুতে যেটা ছিল, আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সবাইকে। তারা তাদের বিবেচেনায় একজন হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে বাংলা একাডেমির মতো একটি মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ করেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবং এই প্রতিষ্ঠান ভাষা আন্দোলনের কোল থেকে জন্ম নিয়েছে। এবং মুক্তিযুদ্ধে এদেশের লেখক-সাহিত্যিকরা বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাদের অনেকেই সম্পৃক্ত ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে। আপনার বিধিবদ্ধ যে কার্যাবলি রয়েছে এর বাইরে আপনি একজন কবি এবং স্বাপ্নিক মানুষ। কবির কাজ জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। আপনি বাংলা একাডেমি নিয়ে জাতিকে নতুন কী স্বপ্ন দেখাতে চান?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: একটি ভাষার স্বপ্ন দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। এবং সেই জন্য আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম। পরবর্তীতে যারা এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন, তারা নানাভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। কলেবর বৃদ্ধি করেছেন। এবং এর কার্যক্রমকে বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নিয়ে গেছেন। তাদের সূত্র ধরে আমি এইটুকু বলতে পারি, যেটুকুন সুনাম বাংলা একাডেমির বহাল আছে, তার সঙ্গে আমিও আমার মতো করে মহাপরিচালক হিসেবে কিছু যুক্ত করতে চাই। এবং যুক্ত করতে পারব। সেই পারার অংশ হিসেবে আমি চাই, একাডেমির ভেতরে জ্ঞান এবং প্রকাশনা দুটি বিষয় কাজ করে। জ্ঞানের সঙ্গে গবেষণা আছে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে একটি জনগোষ্ঠী। যে জনগোষ্ঠীটি ঠিক সাধারণ নয়। সাধারণের একটু উপরে। যারা শিক্ষার সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, সভ্যতার সঙ্গে যাতায়াত করে। আবার একটি অংশ আছে, যারা তথ্যউপাত্ত নিয়ে কিছু কাজকর্ম করতে চায়। আমাদের গ্রন্থাগার, আমাদের গবেষণা কার্যক্রমের অংশ, আমাদের সংরক্ষণ, লোকজ থেকে শুরু করে নানা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ আমি মনে করি ঋদ্ধ। এবং এর ভেতর দিয়ে নতুন মাত্রায়, যেহেতু পৃথিবী যাচ্ছে ডিজিটালাইজেশনের দিকে এবং আধুনিককরণের মাত্রা বদলে গেছে, বইয়ের চাহিদা বদলে গেছে, বইয়ের চাহিদার মাত্রা অন্য রকম হয়ে গেছে— আমরা সেই কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে চাই। আমার কার্যক্রম প্রাথমিকভাবে তিন বছরের। এই তিন বছরের ভেতরে আমি যা স্বপ্ন দেখি, বাংলা একাডেমি মানে এখনকার সাধারণ যে ভাবনা, একটি বইমেলা করা, কিছু বই প্রকাশ করা, শুধু তাই নয় আমার স্বপ্নের সীমানা। এখান থেকে কিছু তুলে আনা তরুণদের দিয়ে। সেই তোলার স্বপ্নটা আমার তরুণদের দিয়ে। যেন এমন একটি তরুণ গোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা মূল্যবোধের বিকাশে পৃথিবীর সভ্যতার সঙ্গে বাংলা একাডেমির কার্যক্রমকে যুক্ত করতে পারে। তারা যেন সেই সুযোগ সুবিধা এখানে পায়, যা দিয়ে তারা তাদের মননশীলতার চর্চাকে আরো ঋদ্ধ করতে পারে। তাদের সৃজনশীতার চর্চাকে আরো ধনী করতে পারে। এবং সর্বোপরি তারা বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারে। এই কথাগুলো মোটা দাগের কথা। যদি রেখাটিকে একটু সরু করে বলি, বিভিন্ন পর্যায়ে আমি কার্যকর সাহিত্যবান্ধব কাজ করতে চাই।

“এটুকু বিশ্বাস রাখবেন, আমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করতেও রাজি আছি, যদি বাংলা একাডেমির ভালো হয়।”

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিরাজী ভাই, বাংলা একাডেমি জাতির মননের প্রতীক। লেখক হিসেবে আপনি নিজেও জানেন, আপনি যদি চান, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের একটি সংকলন একজন তরুণের হাতে তুলে দেবেন, এদেরকে পড়লে তুমি বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে তুমি জানবে, সেই সংকলন তো বাংলা একাডেমির নাই। সেইভাবে নাই গল্পের একটা সংকলন। কিংবা একটা উপন্যাসের সংকলন। কিংবা প্রবন্ধের সংকলন। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের কোনো সংকলন বাংলা একাডেমির নাই, যেটা পাতে দেয়ার মতো। এই যে সংকট, সাতচল্লিশ বছর তো স্বাধীনতার, বাংলা একাডেমি তারও আগের প্রতিষ্ঠান, ফলে দীর্ঘ সময়ে যখন এই ব্যাপারগুলো হয় নাই, এই ব্যর্থতা থেকে বাংলা একাডেমিকে উদ্ধার করার কোনো চিন্তা আপনার আছে কি না?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: এইটা বাংলা একাডেমির ব্যর্থতা না। এইটার কার্যক্রম করতে যেয়ে এই বিষয়গুলো নিয়ে হয়তো তারা চেষ্টা করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে এর আগে আধুনিক বাংলা কবিতার একটি সংকলন বেরিয়েছিল। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সময়ে বিষয়ভিত্তিক সংকল বেরিয়েছে। কিন্তু আপনি যে কথাটি বলেছেন, ধারন করার মতো একটি আধুনিক বাংলা কবিতার, বাংলা গল্পের, বাংলা উপন্যাসের রিপ্রেজেন্টিটিভ কোনো সংকলন হয়েছে কি না, নানা বিবেচনায় তা হয়তো হয়নি। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে আমরা একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। সেই পরিকল্পনার ভেতরে সাধারণভাবে বাংলা কবিতা এবং কবিতার সঙ্গে যে শাখাগুলো বললাম, সেই বইগুলো করব। কিন্তু আপনাকে একটি জিনিস বলি, আমরা সহসাই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মাত্র তিন বছর আছে। আপনার দায়িত্বের মধ্যেই এসে যাবে হয়তো।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: আমরা পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে এবং আমাদের বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হবে। এ নিয়ে আমরা একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। আমরা একশখানা বই করব। এই বইগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হবে। এবং এই বইগুলো পাঁচটি ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করব, কিছু অংশ। বইয়ের গুরুত্ব বুঝে পঞ্চাশখানা বইয়ের অন্তত দশখানা বই ইংরেজি কিংবা ফরাসি বিভিন্ন ভাষায় করার চেষ্টা করব। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে আমরা আরবি, স্প্যানিশ, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ এবং জর্মান— এই ভাষাগুলোর ব্যাপারে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। এবং কার্যক্রমও আমরা গ্রহণ করছি। এই প্রসঙ্গে তরুণদের নিয়ে যে কথাবার্তা হবে, ভাষাভিত্তিক কথাবার্তা। এখানে তরুণ লেখক প্রকল্প ছিল, এখানে তরুণ লেখক প্রকল্পের অংশ হিসেবে ভাষাভিত্তিক একটি তরুণ প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। এই ভাষাগুলোর যারা আগ্রহী হবে, ভাষার সৃজনশীল রূপটিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করব। তাদের ভেতর থেকে আমরা তুলে দেব কিংবা কমিশন করব, যে, ভাই, আপনি এই বইটি আরবিতে অনুবাদ করবেন। আপনি এই বইটি অনুবাদ করবেন ফ্রেঞ্চ ভাষায়। এটি আমার তিন বছরের পরিকল্পনার একটি অংশ। যাতে করে আমি আমার বাংলাদেশের সাহিত্যকে, আমার সৃষ্টিকে এই তরুণদের ভেতর দিয়ে আমি পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারি। এ ব্যাপারে আমার সহায়তা লাগবে বিদেশি মিশনগুলো থেকে শুরু করে যাদের কার্যক্রম আছে তাদের। অল্প সময়ের ভেতরে হলেও আমি এ কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমার মনে হয় বাংলা একাডেমির যে সুনাম, এবং জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠান, জাতির মননের প্রতীক, তাদেরকে সহায়তা করতে কোনো এম্বাসির আপত্তি থাকার কথা না।
হাবীবুল্লাহ সিরজী: আমাদের এপ্রোচের মধ্যে কিছু ঘাটতি আছে, যথাযথ ইংরেজী বা ভাষাভিত্তিক যোগাযোগের ঘাটতি আছে। আমাদের পরিকল্পনার সাথে অন্যদেরকে যুক্ত করার জন্য কিছু কিছু মিসিং লিংক আছে। এইগুলোকে পূর্ণ করতে হবে। যেমন, আমি যদি কোনো কিছু করতে যাই, আমার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আছে, আমার অর্থমন্ত্রণালয় আছে, আমার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আছে, আর যে কথাটি বললাম এর সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্ত। আশা করছি, অন্তত আমার সেই সুবিধাগুলো নিতে অসুবিধা হবে না। যার ফলে তরুণ লেখক প্রকল্পেরই একটি বিকল্প প্রকল্প আমি চিন্তা করেছি। আর একটি কথা না বললেই নয়, যেহেতু সামনেই মেলা আছে, আপনিও জিজ্ঞেস করেননি, মেলা বাংলা একাডেমির জন্য একটি বাড়তি দায়িত্ব। আমরা মাসব্যাপী আমাদের দেশের এবং বাংলাভাষায় যারা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে খ্যাত হয়েছেন, পরলোকগতও যারা আছেন, তাদের উপরে অনুষ্ঠানাদি করে থাকি। সেটি একটি ভালো বিষয়। এর অংশ হিসেবে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করি। বাংলা একাডেমির একটি রেওয়াজ ছিল, যেহেতু আপনিও কবিতা করেন আমিও কবিতার সঙ্গে যুক্ত, রেওয়াজ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে কবিতা পাঠ। এটি একটি বড় আনন্দের বিষয় ছিল আমাদের তরুণ বেলায়। কিন্তু বিষয়টি ক্রমান্বয়ে এতবেশি বড় হয়ে গেল এবং এতবেশি এলোমেলো হয়ে গেল, এবার থেকে ওই অনুষ্ঠানটি থাকবে, এটা সহসা বন্ধ করা যাবে না, কারণ এটার সাথে সেন্টিমেন্ট জড়িত হয়ে গেছে; আমরা প্রতিদিন, ২ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেলে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, আমরা তার আগে বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত তরুণ এবং প্রবীণ, দুজন করে কবি কবিতা পড়বেন। এবং যথাযথভাবে তাদের সম্মানী দেয়া হবে। আমি গৌরবের এই অংশটুকু মাসব্যাপী বিস্তৃত করতে চাই। সঙ্গীত হচ্ছে, নৃত্যকলা হচ্ছে, কিন্তু কবিতা নিয়ে কাজ করব, এটাকে যদি বলেন আমার পক্ষপাতিত্ব, তা হতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে যদি আমি বিবেচনা করি তাহলে এটার একটা যৌক্তিকতা থাকা উচিত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয় কবিরা আপনার এই ব্যাপারে খুবই খুশি হবেন বা যারা সৃজনশীল লেখালেখি করেন, তারাও খুশি হবেন। বাংলা একাডেমির মেলা নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে। এই মেলার দায়িত্ব তো আসলে প্রকাশকদের। বাংলা একাডেমি কেন এই ভারটা নেয়? বিকল্প প্রস্তাবও তো দেয়া হয়েছে। এখানকার যেসব প্রকাশক আছেন, তাদেরকে বলা হয়েছে বাংলা একাডেমি শুধুমাত্র মাদার অর্গানাইজেশনের দায়িত্ব পালন করবে, মেলাটার আয়োজনের দায়িত্ব থাকবে প্রকাশকদের। এই ব্যপারে আপনার ভাবনা কি?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: আমার ভাবনা আছে। আমি অনেকদিন যাবতই ভেবেছি। আপনি যে কথাটি বললেন, শুরুতে এই বইমেলাটি ছিল আমাদের মননের একটি অংশ। আজ যে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হয়, সেখানে মননের চেয়ে বাণিজ্যের অংশটি বড় হয়ে গেছে। যেহেতু বাণিজ্যের অংশটি বড় হয়ে গেছে এবং আমরা মোটামুটিভাবে মোটা দাগে বিভাজনও করে ফেলেছি, ভেতরের একটি মেলা, বাইরের একটি মেলা। এখানে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক সমিতি দুটি সংস্থা জড়িত। আমরা ভবিষ্যতে চাইব, এর সমন্বয় সাধনের জন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হবে। সেটি হলো জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র। আমি জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি মেলার চরিত্র বদলানোর ব্যাপারে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রকে পরামর্শ দিয়েছি কিংবা অনুরোধ করেছি— তোমরা জুন মাসে, এই আর্থিক বছরের শেষভাগে জুন মাসে তোমরা একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা করো। সেটার চরিত্র পুরো বাণিজ্যিক হোক। এইটা যদি তারা সুন্দরভাবে করতে পারে, সুষ্ঠুভাবে করতে পারে তারই অংশ হিসেবে আমি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব করব বাংলা একাডেমির ভেতরে। এই উৎসবটি হবে ওরই একটি পরিপূরক অংশ। এটা যদি হয়, সরকার যদি সহায়তা করেন এবং আপনারা যদি আমার সঙ্গে থাকেন, আমি বাংলা একাডেমির এই চেতনার অংশ থেকে বাণিজ্যের অংশটুকু বিচ্ছিন্ন করার হয়তো কোনো নতুন পরিকল্পনার ভেতরে যাব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিরাজী ভাই, বাংলা একাডেমিতে এখন পর্যন্ত আপনি যে লোকবল পেয়েছেন, আপনার কি মনে হয় সেটা দিয়ে আপনার এই কাজগুলো করা সম্ভব?

“তবে এবারের মেলার জন্য টয়লেটের ব্যাপারটি, বিশ্রামের ব্যাপারটি এবং খাদ্যের ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের নতুন পরিকল্পনা আছে।”

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: বাংলা একাডেমির লোকবল বৃদ্ধি মূলত নব্বই দশক থেকে শুরু হয়েছে। এবং জনবলের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাবিত। এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যখনই কোনো সরকার আসেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তার প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য সেই কর্মটি করে থাকেন। তারই অংশ ধরে আমি এখন যে অবস্থার ভেতর আছি, বাংলা একাডেমির নিজস্ব একটি প্রবিধান যাকে বলি, সেটি এখনো অনুমোদিত নয়। যার ফলে যে লোকবল আমার দরকার তার থেকে অনেক কম লোকবল নিয়ে আমি কাজ করছি। এবং লোকবিভাগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার কী কাজ, কে কী করবে, এটির জন্য আমি একটু বিপদে আছি। আশা করছি, অচিরেই আমরা প্রবিধানটি, সরকারি মন্ত্রণালয়ের সহয়তায় শুদ্ধভাবে উপস্থাপন করতে পারব। এবং পরবর্তীতে এর একটি বর্ধিত রূপ হবে। হলে পরে এ বছরের ভেতরেই সাংগঠনিক কাঠামোগত একটি নতুন চরিত্র দাঁড়াবে। এবং সেই চরিত্র বিকাশে আমরা কিছু জনবল নতুন করে নিতে পারব। সেই জনবল যদি এসে যায়, তাহলে বাংলা একাডেমি একটি নতুন মাত্রা পাবে, অন্তত কার্যক্রম বিস্তারের জন্য। আর এই প্রতিষ্ঠানের নানা অংশ দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণেই হোক, অর্থনৈতিক কারণেই হোক, অবিন্যস্ত অবস্থায় আছে। সেটি সংশোধন এবং সুষ্ঠু রূপ দেয়া মুশকিল। এর জন্য সময় লাগবে। আমি সবার কাছে বলব, বিনীত প্রার্থনা করব, আমাকে কিছুদিন সময় দেবেন। অন্তত একটি বছর সময় দেবেন। যাতে আমি আমার মতো করে, আমার সহযোগীদেরকে নিয়ে, আমার মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে এটিকে এমন মাত্রায় নিতে পারি, যাতে আপনারা চিহ্নিত করতে পারেন, যে, বাংলা একাডেমি একটু অন্য মাত্রায় যাচ্ছে বা বাংলা একাডেমি তার কার্যক্রমের মূল অংশে ফিরে যাচ্ছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি প্রকৌশলী ছিলেন। এবং এবারই প্রথম আপনি কয়েকজন স্থপতিকে ডেকে মেলাপ্রাঙ্গনের ডিজাইন করতে বলেছেন।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: স্থপতিদের ডাকার কারণ হলো, আমরা বিবেচনা করেছি, একজন যোগ্য লোকের কাছ থেকে উপদেশ নেয়া। আমাদের এখানে উপদেশ দেয়ার জন্য কিংবা মেলা কমিটির ভেতরে লোক ছিলেন। কিন্তু প্রফেশনালিজম ব্যাপারটির প্রাধান্য ছিল বেশি। এবার চেষ্টা করছি অন্তত প্রায়োগিক দিকটি প্রফেশনালিজমের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এই জন্য আমরা নির্ঝর সাহেবকে নিয়েছি। তার সঙ্গে আমরা আরেকটি বড় কমিটি করেছি। এতে আমাদের সরকারের স্থাপত্য পরিদপ্তরের যিনি প্রধান, তিনি আছেন। ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টের যিনি প্রধান, তিনি আছেন। আছেন আমাদের স্বনামখ্যাত শিল্পী হাশেম খান, হাশেম ভাই আছেন। আছেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের ডিন নিসার সাহেব। এর পাশাপাশি আরো যাদের বিবেচনা করেছি, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিবেচনা করেছি তাদের, যাদের উপদেশ নেয়া উচিত। কাগজে কলমে না হলেও প্রতিদিন আমি তাদের কাছ থেকে মতামত এবং পরামর্শ নিই। অন্তত এবারের মেলাটিকে একটু ভিন্ন করে উপস্থাপন করা যায় কি না। আর যদি বেঁচে থাকি এবং এখানে থাকি, আগামী বছরের মেলা, আমার বন্ধুরা আমার শুভার্থীরা ভালোবেসে বলবেন, সিরাজী যে কাজটি করেছে সেটি করার যোগ্যতা সে রাখে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মেলা নিয়ে সব সময় কিছু সমালোচনা থাকে। কিছু অসুবিধা নিয়ে সব সময় আলোচনা হয়। এবং সেগুলো আপনার জায়গা থেকে একটা নির্দেশনা দিলেই সেটা হয়তো ঠিক হয়ে যাওয়া সম্ভব। যেমন ধরেন, মেলায় যে খাবারের দোকানটি থাকে, সেটা থাকে এক কোণায়, সেখানে যেতে সবারই খুব কষ্ট হয়। এবং তার দামও থাকে প্রায় তিনগুণ। মেলায় বিশ্রামের জায়গা থাকে না। অনেকে অনেক বইপত্র নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে একটা জায়গায় গিয়ে যে বসবে, সেই জায়গাটি থাকে না। আমি মনে করি আপনি নিজেও এগুলোর সাফারার। এইসব ব্যাপারে আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন কি না?

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: যেহেতু এটি ক্ষণস্থায়ী মেলা। অল্প সময়ের মেলা। তাই ব্যয়ের ব্যাপারটি সেখানে একটি বড় অন্তরায় হয়ে যায়। এ ব্যাপারে সার্বিকভাবে একটি ফেস্টিভ্যাল পার্ক করার একটি পরিকল্পনা আমার আছে। এটা বড় পরিকল্পনা। তবে এবারের মেলার জন্য টয়লেটের ব্যাপারটি, বিশ্রামের ব্যাপারটি এবং খাদ্যের ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের নতুন পরিকল্পনা আছে। এখন না বলে মেলা শুরু হলে আপনারা সেটা দেখতে পাবেন। আরেকটি ব্যাপার আছে এখানে। পানীয় জলের সংকট আছে। মেলায় পানি পাওয়া যায়। দোকান থেকে কিনে খেতে হয়। আমরা নতুনভাবে একটি ব্যবস্থা করেছি। আপনারা স্বল্পমূল্যে পানি মেলার ভেতর থেকে কিনে নিতে পারবেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যেটা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করেছে। যেমন ধরেন এখানে যখন বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎসব হয়, সেটা গণমাধ্যমের কোনো পত্রিকার হইতে পারে, লিট ফেস্টের মতো কোনো আয়োজন হইতে পারে— এইসব অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি নিজে আয়োজকের অংশ হিসেবে কাজ করেছে। এবং আমরা দেখেছি যে, একটা উৎসব, সেই উৎসবের হয়তো বড় অংকের টাকা দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, আবার বাংলা একাডেমিও তার অংশ হচ্ছে। এই যে ব্যাপারগুলা… অনেক ক্ষেত্রে এগুলা হয়তো কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের উৎসব–এই ব্যাপারগুলোতে আপনার কী ভাবনা?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: এই ব্যাপারে আমার স্পেসিফিক ভাবনা আছে। সেই ভাবনার কারণেই…. আমার সময়ও কম ছিল… বাংলা একাডেমিতে যে উৎসব হতো সেই উৎসবটির ব্যাপারে অনেকেই খুশি ছিলেন না। এই উৎসবটির মান নিয়েও কথা ছিল, যেহেতু এখানে, বাংলা একাডেমির ভেতরে ঢাকা লিট ফেস্ট নামে একটি উৎসব হয়। সেই উৎসব তারা যেভাবে করেন, তাদের উৎসবের চরিত্র নিয়ে আমি কথা বলব না। তবে আমার বাড়িতে বাইরের একজন মেহমান এসে ভালো খানাপিনার আয়োজন করে যাবে, ভালো গেস্ট নিয়ে আসবে, ভালো লোকজন ডাকবে, ভালো কিছু করে যাবে, অথচ আমি পারব না, সেটা আমার জন্য কষ্টকর। একারণেই এবার একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে পহেলা ফেব্রুয়ারিতে যে সাহিত্য উৎসব হতো, সেটাকে আমি পিছিয়ে দিয়েছি। যেটা আমি আপনাকে কিছুক্ষণ আগে বলছিলাম, আন্তর্জাতিক বইমেলার সময় এটা করতে চাই। এবং এমনভাবে করতে চাই, ঢাকা লিটফেস্ট আমার ঘরের ভেতর করে যাচ্ছে, তারচেয়ে যেন ভালো হয়। আর ঢাকা লিট ফেস্ট সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। সেটা বাংলা একডেমির নয়। সেগুলো আমি পরবর্তীতে আমার পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করে করব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাণিজ্যিকভাবে বাংলা একাডেমিকে ভাড়া দেয়া, আমি এখানে ভাড়া দেয়া কথাটাই বললাম…

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে বাংলা একাডেমি কিছু কিছু সময় অসহায় হয়েছে, মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো চাপে। কিন্তু আমাকে অন্তত স্টাবলিশড করতে হবে যে, এরচেয়ে ভালো অনুষ্ঠান আমি করতে পারি। ওদের ডেকে এনে আমার অনুষ্ঠান করার দরকার নাই। আর বাংলা একাডেমির ভেতরে যদি এই ধরনের অনুষ্ঠান হয়, সেটা বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণ। বিদেশি ভাষা এবং সাহিত্যের বাংলাদেশিকরণ নয়। এই চরিত্রটি যাতে বজায় থাকে, আমরা সেভাবে একটি উৎসব করার পরিকল্পনা নিয়েছি। দেখা যাক সেটা কী হয় সামনে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলা একাডেমির কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার, সাংবাদিক হিসেবে আমার মনে আছে, একটা চেষ্টা করেছিলেন আগের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। সেটা হলো, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা একাডেমির কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, লেখালেখির কর্মশালা করা। সারা দেশে লেখালেখির একটা উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: এখনো নির্দিষ্টভাবে কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে লেখালেখির সাথে বই যুক্ত। বইয়ের পরিবেশনা যাতে সারা দেশব্যাপী হয়, সেই উদ্যোগটি প্রারম্ভিকভাবে নেয়া হয়েছে। আগের মহাপরিচালক মহোদয় নিয়ে গেছেন। সেই কার্যক্রমটাকে আমি বিস্তৃত করব। আর আপনি যেটা বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক একটি চেতনার অংশ বাংলা একাডেমি জাগরুক করতে পারে কি না এটি ভালো প্রস্তাব। এটি অবশ্যই আমি বিবেচনায় নেব। এবং কী করা যায় অদূর ভবিষ্যতে দেখব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠান বিভাগের যে সমস্ত কার্যক্রম সেটি নিয়ে কি এর মধ্যে তাদের সাথে কোনো কথা বলেছেন?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: মোটামুটিভাবে অনুষ্ঠান বিভাগের সাথে কথা হয়েছে শুধু নয়, আমরা একটা কার্যক্রম খসড়া করেছি। আশা করি এই বিষয়টি নিয়ে আপনাদের আপত্তির অংশ ক্ষীন হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিরাজী ভাই, ছোট্ট একটা প্রশ্ন, আপনার আগের যিনি মহাপরিচালক ছিলেন, তিনি দীর্ঘ সময় মহাপরিচালক ছিলেন। আপনি যখন যোগদান করেছেন, তিনি কি আপনাকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন?
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: যোগদান করার পরে আমি ব্যক্তিগতভাবে তার বাড়িতে গেছি। দেখা করেছি। এবং আমি বিশ্বাস করি, যে কোনো সময় তিনি আমার সঙ্গে থাকবেন। কারণ, এখানে বৈরিতার কোনো প্রশ্ন নেই। এখানে সহযোগিতার প্রশ্ন। এখানে সমন্বিত একটি যাত্রার প্রশ্ন। আর বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের এমন একটি যাত্রা কেন্দ্রে অবস্থান করে, যা সবাইকে নিয়ে যাওয়ার ফল। আমি সাক্ষাতের শুরুতে সবাইকে একটি কথা বলি, আপনি যদি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হতেন, আপনি কী করতেন আমাকে একটু বলেন। এবং এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির আগে যারা মহাপরিচালক ছিলেন, মেলাটা গেলে তাদের সবার সাথে বসব, তারা কী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছেন, তা শুনব। এবং ভবিষ্যতে যারা এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে পারেন, আমি অন্তত যে স্বপ্নটি দেখি, তাদের কাছ থেকে তার মতামত শুনব। আমি বড় একটি মতবিনিময় সভা করব। এগুলো আমাকে তৈরি করার জন্য। আমাকে উপস্থাপন করার জন্য এইসব আয়োজন। কতটুকু পারব জানি না; তবে এটুকু বিশ্বাস রাখবেন, আমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করতেও রাজি আছি, যদি বাংলা একাডেমির ভালো হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলা একাডেমির ওয়েবসাইট খুবই সেকেলে, প্রায় কিছুই পাওয়া যায় না!
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: আপনি যে প্রশ্নগুলো করেছেন, সেটির উত্তর আমি হয়তো ছ মাস পরে পরিপূর্ণভাবে স্পেসিফিকভাবে পরিসংখ্যানসহ আপনাকে দিতে পারব। তবু এখন বলি, বইয়ের তথ্যাদি ডাটাবেজ করা— এই কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এবং আমি দপ্তর ওয়াইজ বিভিন্ন জনের সাথে বসছি। আমার টেবিলে প্রত্যেকেরই পরিকল্পনার অংশ আছে। আগের মহাপরিচালক মহোদয়ের পরিকল্পনা তারা যেভাবে ন্যস্ত করেছেন, সেটি আছে। যেমন আগামী শনিবার আমি লাইব্রেরির সঙ্গে বসব। আমি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অলরেডি বসে আছি। অনুষ্ঠানের সঙ্গে বসে আছি। পত্রিকার সঙ্গে বসছি। আপনারা দেখেওছেন মনে হয়। আমি চাই অদূর ভবিষ্যতে, অনুগ্রহ করে ছ মাস পরে এই কথাগুলো প্রতিফলনের জন্য আরেকবার আমাকে কথা বলা সুযোগ দেন, তাহলে যোগ বিয়োগটি আপনি সহজে করে নিতে পারবেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবশ্যই। নিশ্চয় আমরা ছয়মাস পর আপনার সাথে বসার চেষ্টা করব।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী: শিমুল সালাহ্উদ্দিন, আমি একটি কথা বলতে চাই, আপনারা সাংবাদিকেরা, সতীর্থ বন্ধুরা, আমাকে যারা স্নেহ করেন, আমাকে যারা ভালোবাসেন, কিংবা আমাকে যারা শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে সামান্যতমও দেখেন— উপদেশ দেবেন। অনুরোধ করবেন। আদেশ করবেন। এবং যেটা বাংলা একাডেমির জন্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য, আমাদের ভাষা-সাহিত্য-জাতিসত্তার জন্য সুফল বয়ে আনে, সেটা আমি অবশ্যই অগ্রগণ্য বিবেচনা করব এবং মাথা পেতে নেব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সিরাজী ভাই, অনেক সময় দিলেন, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
হাবীবুল্লাহ্ সিরাজী: আপনাকেও ধন্যবাদ, আমি বন্ধু শত্রু বাংলা সাহিত্যের ভালো চান এমন সবার পরামর্শ চাই বাংলা একাডেমির দুর্নাম ঘোঁচাতে। যেকোন মাধ্যমে সে পরামর্শ আপনারা আমাকে দিতে পারেন। বাংলা একাডেমির দরোজা এখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আর ধর্মান্ধদের ছাড়া সবার জন্য খোলা।
Flag Counter


6 Responses

  1. আবুল মোমেন says:

    মেলার ঠিক আগে আগে হওয়ায় এই সাক্ষাৎকারটি প্রাসঙ্গিক ছিল। ভালো লেগেছে প্রাণখোলা অকপট আলাপ। বাংলা একাডেমির নতুন কাণ্ডারির জন্য শুভকামনা।

  2. আফজাল আহমেদ হৃদয় says:

    সিরাজী সাহেবের প্রতি অনুরোধ, শিক্ষিত সাহিত্যবোধ আছে এমন তরুণদের একাডেমির কাজে সম্পৃক্ত করুন। বাংলা একাডেমি জাতির মননের প্রতীক, সকল সাহিত্যিক যেন মনে করে এই একাডেমি আমার, সেই স্পেস তৈরি করুন।

    ভাল লাগল সাক্ষাৎকারটি।

  3. দীপঙ্কর চৌধুরী says:

    অনুবাদ বিভাগটিকে কার্যকর করুন। খ্যাতনামা অনুবাদক, সাহিত্যিকদের যুক্ত করুন একাডেমিতে। বিশ্বসাহিত্যের ভালো বাংলা অনুবাদ এবং বাংলা সাহিত্যের ভালো ইংরেজি, স্প্যানিশ, জার্মানে অনুবাদ যে নতুন মহাপরিচালক জরুরি মনে করেছেন এজন্য তাকে সাধুবাদ।

    কবি হাবীবুল্লাহ্ সিরাজীর জন্য শুভকামনা।

    • দৃষ্টি says:

      একপেশে নয়,
      পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিন সবদিকেই শুধু নয়,
      নিকট-দূর প্রতিবেশীদের সাথেও ভালো জানাশোনা থাকা জরূরী।

  4. মানিক বৈরাগী says:

    পড়লাম,সাংবাদিক কবি সমালোচক শিমুল সালাউদ্দীন-এর উলটা পালটা প্রশ্নে সিরাজী ভাই কাবু হন নি। তিনি খুব সাবলীলভাবে চমৎকার উত্তর দিয়েছেন।
    প্রিয় কবি সিরাজী ভাই দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন বাংলা একাডেমীতে আর জামাত জঙ্গি মৌলবাদী শক্তির স্থান হবে না।

  5. দৃষ্টি says:

    প্রয়োজনীয় বইগুলোর (যেমন, অভিধানের সর্বশেষ সংস্করন) ডিজিটাল সংস্করন, বিনামুল্যে অনলাইনে পেতে চাই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.