স্মরণ

কলকাতা ফেরত দুই স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

আনিসুর রহমান | 10 Jan , 2019  


ছোট সময় থেকে ছেলেটির পড়াশোনায় মন বসে না। কেবল ছবি আঁকতে ভাললাগে; ফুল, ফল, পাখির বাসা, পাখি, মাছ প্রাণী বিশেষ করে গরু ছাগলের ছবি। ছেলেটি স্কুলের পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে ময়মনসিংহ থেকে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন ষোল বছর বয়সে। উদ্দেশ্য একটা কলকাতার সরকারি চারুকলা বিদ্যালয় নিজের চোখে দেখবেন। সেই ছেলেই আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রতিষ্ঠাতা।
তার প্রতিষ্ঠিত চারুকলা শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রটি এই বার সত্তর বছর উদযাপন করছে। চারুকলা অনুষদ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করার আগে শিল্পাচার্য সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই।
বালক জয়নুল আবেদিনের বাবা ছিলেন পুলিশের দারোগা যা আমরা প্রায় সকলেই জানি। নয় ভাই বোনের মাঝে জয়নুল ছিলেন সকলের বড়। জয়নুল কলকাতায় সরকারি চারুকলা বিদ্যালয় ঘুরে বাড়ি এলেন ঠিকই। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন দৃঢ় এক পণ। সে প্রতিজ্ঞা যে করেই হোক তিনি চারুকলার এই প্রতিষ্ঠানে পড়বেনই। তার ছবি আঁকার পেছনে মায়ের সায় ছিল ঠিক ঠিক। শেষতক মায়ের গলার হার বিক্রির টাকায় কলকাতার চারুকলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন; তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে চারুকলায় স্নাতক হলেন। গল্প এখানে অন্যদিকে মোড় নিতে পারত। যেমন তিনি কলকাতার চারুকলা শিক্ষার পতিষ্ঠানেই শিক্ষক হিসেবে থেকে যেতে পারতেন। সেখান থেকে এক সময় বিদেশে বৃত্তি নিয়ে বড় কোন ডিগ্রী নিয়ে কলকাতায় স্থিত হওয়া বা দুনিয়ার অন্য কোন শহরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। নিদেন পক্ষে চারুকলায় নিজের প্রখর মেধার জোরে পৃথিবীর বড় বড় শিল্পীদের কাতারে দাঁড়িয়ে দেশে দেশে নামীদামী গ্যালারিতে প্রদর্শনী করে কোটি কোটি টাকার পেছনেও ছুটতে পারতেন। কিন্তু জয়নুলের জীবনের গল্প সেদিকটায় মোড় নেয় নি। কেন নেয় নি? তাঁর স্বপ্ন ও দূর দৃষ্টি অন্য কোনখানে।
আমাদের জয়নুল প্রসঙ্গে আরও বিশদ বলার আগে অন্য একজন বাঙালি ছেলে, যিনি জয়নুলেরই সমসাময়িক, তাঁর গল্প একটু বলে নিতে চাই।
জয়নুল আবেদিন যে বয়সে কলকাতায় গিয়েছিলেন তার কাছাকাছি বয়সেই বাংলার অজ পাড়াগাঁয়ের আর একটি ছেলে কলকাতায় গিয়েছিলেন। তাঁর নাম আমরা সকলেই জানি। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিরই প্রতিষ্ঠাতা। বড় হয়ে জয়নুল আবেদিন উপাধি পেলেন ‘শিল্পাচার্য’ আর শেখ মুজিবুর রহমান উপাধি পেলেন ‘বঙ্গবন্ধু’।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার স্কুল বালকের সঙ্গে দেখা হল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একে ফজলুল হকের এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। তারা সাংগঠনিক সফরে গোপালগঞ্জ এলেন। সভাশেষে সোহরাওয়ার্দী বালক শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বললেন। ছেলেটির নাম ঠিকানা লিখে নিলেন। কলকাতা ফিরে গিয়ে মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী বালক শেখ মুজিবুরকে চিঠি লিখলেন। শেখ মুজিবুর সেই চিঠির জবাব দিলেন। এরপর কলকাতা গিয়ে সেই ছেলে মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করে এলেন। বালক শেখ মুজিব গোপালগঞ্জের পড়ালেখার পাট চুকিয়ে ভর্তি হলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে।
জয়নুলের মত ছোটবেলা থেকেই শেখ মুজিবের পড়ালেখায় খুব একটা মন বসে না। তার ভাল লাগে সাংগঠনিক কার্যক্রমে, খেলাধুলায় আর অন্যের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়তে। শেখ মুজিবও চাইলে নিজের জীবনকে ঝামেলাহীন ভারত বা পাকিস্তানের জনপ্রশাসনের বড় কর্তা, কিংবা বড় ব্যবসায়ী অথবা উকিল বা সাংবাদিক হতে পারতেন। অনেক সম্ভাবনাই তার সামনে খোলা ছিল। কিন্ত তিনি স্বপ্ন দেখলেন বাঙালি জাতির মুক্তির, একটা শোষণ বঞ্চনাহীন ন্যায়ভিত্তিক ধনী গরীব সকলের সকল ধর্ম ও মতের বর্ণ ও গোত্রের এক বাংলাদেশ।

জয়নুল শেখ মুজিবের চেয়ে কয়েক বছরের বড় ছিলেন। জয়নুলের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর আর শেখ মুজিবুরের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। জয়নুল ১৯৩০ এর দশকের গোড়ার দিকে কলকাতায় আগমন করেন। আর বঙ্গবন্ধু ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে কলকাতায় যান। জয়নুল কলিকাতায় চারুকলা পাঠ আর অভিজ্ঞতায় স্বপ্ন দেখলেন স্বদেশে চারু ও কারুশিল্পের ভিত নির্মাণের। শেখ মুজিব স্বপ্ন দেখলেন বাঙালি জাতির মুক্তির। জয়নুল ও বঙ্গবন্ধু উভয়েই হৃদয় ধারণ করেছিলেন গোটা এক বাংলাদেশ তারা দুজনেই একই রকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। দেখেছেন হাড়ভাঙা কৃষক আর হাড়ভাঙা কঙ্কালসার তার হালের গরু। দেখছেন তারা অর্ধাহারি অনাহারি ভূখা মানুষের মুখ। অনাহারে মরে থাকা পড়ে থাকা মানুষের মৃতদেহ দেখেছেন মরা মানুষ নিয়ে কাক কুকুরের টানাটানি। জয়নুল সেসব তাঁর তুলিতে তুলে ধরেছেন, ছবিতে এঁকেছেন। আর তরুণ বঙ্গবন্ধু নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
শিল্পাচার্য ও বঙ্গবন্ধু উভয়ই নিজেদের জীবন ও সময় থেকে পাঠ নিলেন তারা বাংলার মানুষের স্বপ্নের পথ নিজেরা তৈরি করে গেলেন।
জয়নুল ফিরে এসে ১৯৪৮ সালে চারুকলা শিক্ষার বিকাশ ও প্রসারের জন্যে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন। এই চারুকলা বিদ্যালয় আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। এর প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল আবেদিন সম্পর্কে আমার প্রথম পরিচয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে। তার ছেলেবেলা ঘিরে ব্রাহ্মপুত্র নদ, আর তার দুই তীরে কাশবনের গল্প, দুর্ভিক্ষ নিয়ে তার আঁকা ছবির কথা। তখনও বালক আমার কল্পনায় কাজ করেছে এরকম মানুষ বুঝি স্বপ্নের রাজ্যে বাস করে।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ফিরে এসে ধাপে ধাপে দেশটাই স্বাধীন করে ফেললেন। তার কথা প্রথম শুনেছি ছেলেবেলায় আমার ছোট দাদা আর বাবার কথোপকথনে। তারা বঙ্গবন্ধুকে শেখ সাব বলে সম্বোধন করতেন। কিন্তু শেখ সাবকে ঘিরে সেই গল্প মনে হয়েছে এগুলো বুঝি স্বপ্নতাড়িত কারও জীবনের গল্প। ১৯৮৬ সালে মধুপুর উপজেলা সদরে ১৫ আগস্টের জাতীয় শোকদিবসের প্রাক্কালে হঠাৎ দেখি দেয়ালে দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর মোহনীয় চমৎকার ছবি। উপরে লেখা জাতীয় শোক দিবসের ডাক। আমি অই বয়সে ছবির সামনে, পোস্টারের সামনে অনেকক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন আমাদের পাঠ্যবইয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা, তাঁর স্বপ্নের কথা অইভাবে থাকত না।
এবার ফিরে আসি জয়নুল প্রতিষ্ঠিত চারুকলা অনুষদ প্রসঙ্গে, প্রতিষ্ঠানটি আজ সত্তর বছর উদযাপন করছে। এই ফেলে আসা সত্ত্র বছর এই প্রতিষ্ঠানের অর্জন, কর্মযজ্ঞ ও সাফল্যের খতিয়ান বিশাল। এখান থেকে প্রতিবছর আটটি বিভাগ থেকে ছেলেমেয়েরা চারুকলায় ডিগ্রি নিয়ে বের হয়। নানাক্ষেত্রে কর্মসংস্থান করে চারুকলা পাঠদান ও চর্চায় অবদান রাখে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা চরুকলার অনন্য একটা সংযোজন।

আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের সড়কগুলোতে যে আল্পনা আঁকার প্রবর্তন এটা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে রাজপথে এত সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ আল্পনা আঁকার দৃষ্টান্ত আছে কি না আমার জানা নাই। তারপর এই চারুকলায় নবান্ন উৎসব বা বসন্ত উৎসবের মত আমাদের স্বদেশীয় ঐতিহ্য ধারণ ও লালনের ব্যাপারেও অগ্রগণ্য।
এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা নিয়েই আমাদের পরবর্তীকালের শিল্পীরা আমাদের জাতীয় মানস গঠন রুচি নির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন। বইয়ের প্রচ্ছদ আর ভেতরের অলঙ্করণ, ভবনের ভেতরের রঙ ও নকসা, অনুষ্ঠান পার্বণে মার্জিত রুচির প্রকাশ ও চর্চা চারুকলা শিক্ষার অবদান। চলচ্চিত্র, নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সৃষ্টিযজ্ঞেও চারুকলা থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিভাবানদের অবদান উল্লেখ করার মত। এখানেই শেষ নয় একটি নান্দনিক ও রুচিশীল সংবাদপত্র বা সাময়িকী এমনকি দূরদর্শনে অনুষ্ঠানের অঙ্গসজ্জা একজন চারুশিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় পূর্ণতা লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চারুকলাকে অণুসরণ করেই দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যান্য শহরে এমনকি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং শিশু একাডেমীর মাধ্যমে চারুকলার বিকাশ ও প্রসার অব্যাহত।

চারুকলার সত্তর বছর উদযাপন উপলক্ষে আমি এই অণুষদের ডিন চিত্রশিল্পী নিসার হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ৭০ বছর আগে জয়নুল আবেদিন যে স্বপ্নের জায়গা থেকে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেছিলেন সত্তর বছর পরে আমরা কি সেই স্বপ্নকে সমুন্নত রাখতে পেরেছি? তিনি জানালেন-আসলে জয়নুল আবেদিনের পরের প্রজন্ম আমরা যারা এইখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে গিয়েছি কিংবা এখানে শিক্ষকতা করেছি আমরা আমাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্র তৈরিতে যতটা মনোযোগী ও সদয় হয়েছি, জয়নুলের হৃদয়ে ধারণ করা স্বপ্নটা আমরা আমাদের ভেতরে সেভাবে লালন করতে পারি নি। জয়নুল নিজের ছবি আঁকার চেয়ে চারুকলা শিক্ষা ও চর্চার বিকাশ ও প্রসারের জন্যে যে আতœনিয়োগ করেছিলেন। সেটা আমরা পারি নি।
পরিশেষে বঙ্গবন্ধু ও শিল্পাচার্যকে ঘিরে একটি ঘটনার উল্লেখ করে এই লেখাটি শেষ করছি।
১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোগ নিল। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেবার জন্যে অনুরোধ করা হল। তিনি জানালেন তিনি রাজনীতির মানুষ। সাহিত্যের এই আয়োজনে তার আসার দরকার কি? আয়োজকদের প্রবল আগ্রহের কারণে তিনি শর্ত দিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরীকে অতিথি করা হলে তিনি সম্মেলনে যাবেন। বাংলা একাডেমী কথা রেখেছিল বঙ্গবন্ধুও সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, শিল্পাচার্য আর উপাচার্যের উপস্থিতিতে।
Flag Counter


1 Response

  1. বাহ! বেশ লাগলো লেখাটা।
    দুই কিংবদন্তীকে পাশাপাশি রেখে দুইটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয়ের জন্মের ইতিহাস থেকে বিকাশলাভ এবং পর্যালোচনা।
    আরও বেশি মুগ্ধ হয়েছি কিছু বিষয়ে লেখকের স্মৃতির সাথে নিজের শৈশবের ঘটনা মিলে যাওয়ায়।
    যেমন তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে প্রথম যেভাবে আবিস্কার করেছিলেন আমিও ঠিক একইভাবে।
    আবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাবা মায়েদের কাছে এমন প্রচুর গল্প শুনে শুনে বড় হওয়া। হারিয়ে গিয়েছিলাম পুরনো দিনে।
    অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.