গল্প

ব্রুটাস পর্ব এবং কর্তার শারীরিক অবনতি

মিলটন রহমান | 16 Jan , 2019  


অতএব বড়কর্তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি হয় নি। চৌপদী ঘষটানি অব্যাহত থাকলে রোগে ভুগে এক সময় মারা যাবে নির্ঘাত। দশক তিন কি সাড়ে তিন পূর্বে ফিরে গিয়ে আবার দিন গুনে গুনে আজকের দিনটি পর্যন্ত একটি গল্প বলা যায় বৈকি। এই দীর্ঘ সময়ের সবল কিংবা দুর্বল ঘটনাগুলো আমাকে খুব একা পেলে মরুভূমির উটের মতো গ্রীবা বাড়িয়ে দেয়। ‘তুমি জ্ঞাতসারে যা ইচ্ছা আমাকে নিয়ে গদ্যে কিংবা পদ্যে আঁকতে পারো‘ এরকম কথাবার্তাও মাঝেমধ্যে গুলিগুলি অন্ধকারে আমার নিদ্রামগ্নতায় শুনিয়ে যায়। আমার ইচ্ছের সাথে প্রস্তাবের কাকতালীয় মিল খুঁজে পেলে আর দু‘মিনিটও অপেক্ষা করতে চাই না।

বড়কর্তা পুরো পরিবারের ঘূর্ণাবর্তনের কেন্দ্র। তবুও দু‘চারজন সদস্য যে বৃত্ত ভাঙতে চায় না এমনটি নয়। বৃষগরুর মতো সুঁচালো শিং দিয়ে বৃত্তের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে নতুন পথ সৃষ্টিতে তৎপর হয়ে ওঠে কেউ কেউ। পরিবারের অনেকেই বিদ্রোহীদের আবিস্কার করতে পারলে শকুনের দৃষ্টিতে দেখে। তবুও বিদ্রোহী দলের সদস্যরা পুরাতন বৃত্ত ভেঙে নতুন বৃত্ত আঁকতে চায় বড়কর্তাকে ঘিরেই। অনেকেই আবার যোগান দিতে গিয়ে ‘শীলের মতো বুকের পাটা আছে বৈকি‘ ভাবের বাক্য কানে তুলে দিয়ে বিদ্রোহীদের ঘাড়ে দুলিয়ে দেয় তেজী ঘোড়ার কেশর। ‘যে কেশর একবার দুলিয়ে দেয়া হয়েছে তা কখনো থামানো যাবে না যতক্ষণ বৃত্ত ভাঙার সংবাদ না রটে‘। এরকম পণ-উদ্বেলিত হলে পরিবারের অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে পুরাতন বৃত্ত বিরোধীরা। স্বভাববশত বড়কর্তা কোনও পক্ষাবলম্বন ব্যতিরেখেই মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাবার পক্ষতুষ্ট। হোক তা বিদ্রোহের আগুনে, তাতে কি। বড়কর্তার ইচ্ছে সিংহের মতো গর্জন করে বেঁচে থাকা। ইতিমধ্যে বৈরী বাতাসের তোড়ে পারিবারিক শান্তি লেজ গোটাতে থাকে। বিশাল পরিবারের মাঝখানটায় যেনো কঠিন পলেস্তরার দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়। দু‘অংশের কেউই ক্ষোভ প্রশমনের পক্ষে নয়। অতএব অনরিুদ্ধ বিদ্যুৎ চমকায় আকাশে। শুধু বাজ পড়লেই বৃত্ত ভাঙবে কিংবা পুরাতন বৃত্ত আরোও দ্বিগুন শক্তি পাবে। অতঃপর চতুর্দিকে সাইরেনের শব্দে অনেকে ভগবান গৌতম বুদ্ধের আশির্বাদ মাগে বড়কর্তার জন্য। কেউ কেউ মাজারে শিরনি মানত করলে, অনেকে মঙ্গল দেবীর চরণে কপাল ঠোকে। কি জানি কি হয় বড় কর্তার। আর যাই হোক ‘কর্তার পাছায় বাঁশ দিতে হবে‘ এমনটি কারোও মুখ ফসকে বেরুবার সম্ভাবনা দেখা যায় না। সবাই চায় বড়কর্তার সান্নিধ্য। অতএব রসালো ডালিম বিচির মতো পরিস্কার হয় বিরোধের মূলে বড়কর্তাই কারণ। ফলে ‘কাকের মাংশ কাকে খায়‘ পরিস্থিতির উদ্রেক হলে, বিদ্রোহীরা গুরতর তৎপর হয়ে ওঠে। সবার চোখের পাতা উল্টে যেনো ঠিকরে বেরিয়ে আসে নতুন বৃত্তের স্বপ্ন। উপাদান হিসেবে যুক্ত হয় দা-খুন্তি থেকে শুরু করে কামানের গোলা পর্যন্ত। বিদ্রোহীদের যোগানশক্তি ক্ষীণ হলে দৌবারিককেই শক্তির উৎস হিসেবে ধরে নেয়। তবে পাড়া পরবর্তীদের পাড়া প্রতিবেশীদের অনেকেই বারুদের ঘ্রান তুলে দেয় নাকে। তাতে তেজী ঘোড়ার কেশরে বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় আশি-পঁচাশি মাইল বেড়ে যায়। দমিয়ে রাখে কার সাধ্য। অতএব লাল পতাকায় বাতাস লাগলে বেঁধে যায় তুমুল হট্টগোল। বৃত্ত ফিনকি দিয়ে উঠলে স্রোতে ভেসে যায় পুরাতন বৃত্তের এবং নতুন বৃত্ত বিরোধীদের অনেকেই। অন্যদিকে রক্তমাংশের দলা পাকিয়ে বড়কর্তা পড়ে থাকে নিশ্চুপ। তো এক সময় অনিবার্য ফলাফল মুঠোয় ধরা গেলে দেখর যায় বৃত্ত বিরোধীরা উড়িয়েছে নতুন বৃত্ত খচিত পতাকা। রক্তের ফোটা আর সবুজের হাতছানি। তারপর বড়কর্তা পুন:রায় হীরে-জহরত মুড়িয়ে চিকচিক করে নতুন বৃত্তায়নে। সব ঠিকঠাক। নতুন পরিবারে বড়কর্তাকে ঘিরেই সদস্যদের স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। মতদ্বৈততার ধুম্রজালে কেউ আটকে না গিয়ে কর্তার ঠিকঠাক যত্ন এবং সভ্যদের পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হলো পারিবারিক নেতা বসু মিয়ার হাতে। সবাই দন্ডমুন্ডের কর্তা মানলেন তাঁকে। তারপর বসু মিয়া এবং কর্ত্রী শান্তির ঘুমে পায়রা উড়িয়ে দেয় সুখের রাজ্যে। কিন্তু মাস কি বছর না ডিঙ্গাতেই ধবল পায়রাটির ওড়াওড়ি অনেকের ক্রোধের কারণ হয়ে ওঠে। সময় গড়ায়, উত্তপ্ত হয় রাজনীতি। সেই সাথে আকাশটাও ধুমসি মেঘের তিলক পড়ে যেনো কাঁদতে উদ্যত হয়। বসুর গুনকীর্তন করলে ‘পরিবারের কুকুর বেড়ালও লংকায় যাবে‘ এমন রূঢ় যুক্তি দাঁড় করিয়ে কেউ কেউ ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়। একেবারে নিমক খেয়ে হজম করতে কষ্ট হলে যেমনটি হয়। সবে মাত্র বসু মিয়ার সতেজ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময়। এরিমধ্যে তাঁর যোগ্যতাহীনতার সহস্রপদের অভিযোগ কিলবিল করতে শুরু করে। কেউ কেউ স্ব স্ব ব্যস্ততায় মতবিরোধ সৃষ্টি জরুরী মনে করে। তারা সংকট তৈরীতে বিরামহীন সময় বরাদ্ধ করে রাখে। ‘ধর থেকে মাথাটা আলাদা করাই জরুরী‘ এমন সাংঘাতিক প্রচারে নামলে, মাথা আলাদা করা কেনো জরুরী তার প্রমাণ হিসেবে দু‘চারটি অলিখিত খোড়া যুক্তিও দাঁড়িয়ে যায়। দুষ্টু চক্রের বেলুনটাযে ফুলে-ফেঁপে মুখ ভার করে আছে খুব ভালোই বুঝতে পারেন বসু। তবুও রা নেই তাঁর। ‘কে কি ঝাড়লো তাতে আগুনের ভাব উঠলে কিসের আর কর্তাগিরি‘ এরকম মৌন প্রচার এক আধটু আঁকার-ইঙ্গিতে করে থাকেন বসু মিয়া। তবুও কেনো জানি দক্ষিণের হাওয়া ফিরে গিয়ে উত্তরে বয়। উত্তপ্ত বাতাসে শরীরে ফোস্কা ফুটার উপক্রম হয়। বড়কর্তাও আকাশের ধুনট মেঘ ধার করে মুখে মেখে আড়মোড়া হয়ে বসে থাকে। মেঘের আড়ালে সূর্য পুবদিক থেকে উদিত হয়ে কখন যে পশ্চিমে অস্ত যায় বোঝা যায় না। আবহাওয়ার পোশাক পরিবর্তন কারো দৃষ্টি এড়ায় না। এমনটি খুব ভালো লক্ষণ নয়, বুঝতে পারেন মিয়া সাহেবের পক্ষাবলম্বনকারীরা। এরিমধ্যে পারবিারিক সাম্পর্কিক টানাপোড়েনের মধ্যে ডানা মেলে দুর্ভিক্ষের শকুন। ‘এ অলক্ষণ নির্ঘাত বসু মিয়ার কারণেই‘ এমন মন্তব্য বিরোধী তাবু থেকে প্রচার করতে লাউড স্পীকারের প্রয়োজন পড়ে না। অতএব এ বিরোধ রক্তকণিকার সাথে মিশে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করতে শুরু করলে নিরুপায় বড়কর্তা দেবশিশুর ভূমিকায় দাঁড়ান। এখন মিয়ার ব্যাটাই ভাগ্য নিয়ন্তা। এরিমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে যায় আরোও কয়েক কদম। তবে কি শকুন উড়বে মাথার উপর? প্রশ্নের সাথে অলক্ষুণে বিরোধের মিল খুঁজে পাওয়া গেলে ফুটো হয়ে যায় রূপালী চাঁদের ঠিক মাঝখানটায়। কালো কান্না ঝড়ে। কালো রক্তের মতো জল। বড়কর্তা ক্ষণিক ভ’মিকম্পের মতো কেঁপে ওঠেন। শহড় জুড়ে থমথমে ভাব। কারো মুখে কোন শব্দ নেই। চোখেমুখে প্যান্ডুলামের মতো ঝুলে আছে প্রশ্ন। চতুর্দিকে সংবাদ রটে যায়। বসু মিয়ার দেহটা দুমড়ে মুষড়ে পড়ে আছে সিঁড়িতে। নিস্তেজ দেহ থেকে ভাব ওঠা রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে মাটি ছুঁয়েছে। জুলিয়াস সিজারকে হত্যার স্বাদ নিয়ে ব্রুটাস যে পর্বেও সূচনা করেছিলো সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো বড় কর্তার পরিবারে। পরিবারের কেউ রক্ষা পেলো না। কেউ কক্ষে আর কেউ এখানে সেখানে ঘরময় ছড়িয়ে আছে। মুহুর্তে যেনো বড় কর্তার চেহারা পাল্টে গেলো। চেনা যাচ্ছিলো না তাঁকে। কি তাঁর পরিচয়? কে দিয়েছিলো এই পরিচয়? এমন সব প্রশ্ন যেনো তার চেহারায় ডিগবাজি খেলে যায়। দ্বিতীয়বারের মতো হোছট খেয়ে বড়কর্তার শাররিরীক ধকল সইতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। সমুহ অনিশ্চয়তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরিবারের ঠুনকো সদস্যরা ক্ষোভ প্রশমনে তৎপর হয়ে ওঠে আসন্ন বিপদ সম্ভাবনায়। এক সময় বসু বিরোধীরা পথের কাঁটা উপড়ানো পর্বের ফলাফলের আনুকূল্যে তৎপর হয়ে ওঠে বড় কর্তার সেবায়। বড়কর্তা দুর্বল শরীরে শোকের চাদর মুড়িয়ে পড়ে থাকে বাররুদ্ধ। এবং বড়কর্তার শারিরীক অবনতি ঠেকাবার ধোঁয়া তুলে পরিবার পিরচালনার দায়িত্ব দেয়া হলো সৈয়দ হাবিলদারের হাতে। তারপর গায়ে সর্বেসর্বার পোস্টার সেঁটে সিংহের মতো গর্জে ওঠে হাবিলদার। ডান-বাম হাতের যোগানশক্তি অপ্রতিরোধ্য গতি পেলে গায়ে ধুলো পড়াটাও সহ্য হয় না। অন্যদিকে গৃহপালিত বুদ্ধিজীবিরা যেদিকে স্রোত সেদিকে ভেসা যাওয়ার অভ্যেস রপ্ত করলে খুব বেশি নিরাপত্তা থাকে না বড়কর্তার। সুযোগের হাতটান হবার পূর্বেই হাবিলদার মশাই স্বেচ্চায় নির্মিত কিছু আইন রপ্ত করাতে চায় পরিবারের সদস্যদের। অনেকের এই আইন হজমে বিঘ্ন ঘটার কোনও লক্ষণ পরিস্কার না হলেও কারও কারও হয়। এই টানাপোড়েনের সুযোগে কারোও কারোও কপালে সেঁটে যায় চাঁদ-তারা। অতএব স্বাধীন পরিবারে পুরনো ভূতের আসর অনেকের মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। চন্দ্রের পূর্ণ গ্রহনের মতো ঢেকে যায় বড়কর্তার মুখাবয়ব। কিন্তু হাবিলদার সাহেবের স্বার্থের নিয়মে যে কোনও বড় ঘটনা কিংবা দূর্ঘটনা উড়ে যায় ধুলোবালির মতো। ভাবেন ছড়ি হাতে এখন পরিবারকে দেখিয়ে দেয়া যেতে পারে ক্ষমতার চারহাত। এদিকে ব্রুটাসের রক্ত পরম্পরায় আরওযে ব্রুটাস জন্ম নিতে পারে সে খবর হাবিলদার সাহেবের প্রায় অজানাই। বসু মিয়ার খুন মাটি ছুঁলেই চরম মতদ্বৈততার জন্ম নিতে শুরু করে পরিবারে। সে হিসেব কষতে জাবিলদারের স্মৃতিভ্রমের লক্ষণ পরিলক্ষিত না হলেও ঘটনাটি চিন্তায় খুব বেশি জায়গা পায় না। অতএব পারিবারিক কাজকর্ম পূর্বের চেয়ে চৌগুন বেশি হচ্ছে বলে, সবার হাতে ধরিয়ে দেন এক একটি মূলো। কেউ কেউ সন্তুষ্টি প্রকাশের ভাষা খুঁজতে শুরু করলেও কারও কারও শিরদাঁড়ায় ব্যথা অনুভূব করে। হাবিলদার দীর্ঘ সময় ক্ষমতার পাছায় মাঝা-ঘষা করলেও এক সময় সেই শিরপীড়াই সমূহ বিপদের কারণ হয়। অতএব ব্রুটাস পূণরায় সক্রিয় হয়। সমুদ্রের গোঙানী দ্বিগুন হলে, বাতাসের গতিবেগের সাথে পাল্লা দিয়ে ধুমসি মেঘের বোরাকে খবর পৌঁছে যায় সবার কানে কানে, সৈয়দ হাবিলদারের নিখোঁজ সংবাদ। অতএব বড়কর্তা ঘষটানির ঘানি টেনে টেনে এখন দাঁড়িয়েছেন তৃতীয় সিঁড়িতে। তিনি বুড়ো হয়ে গেলেন নাকি কুঁজো হয়ে গেলেন, পরিবারের কেউ এমন খবর রাখেন, সেরকম কারো সন্ধান মেলে না। হাবিলদারের অস্তিত্ব সংকটে কারোও পাঁজর চুঁয়ে রক্ত বেরুবার উপক্রম হলেও কেউ কেউ শীড়পীড়া থেকে আরোগ্য লাভের সুযোগ হয়েছে ভেবে বুক টান টান করে দাঁড়ায়। ওদিকে পাহাড়ি ঝোপঝাড়ে হাবিলদারের অস্তিত্ব সংকটের ক্ষীণ আলামত আবিষ্কার হলে অনেকে বড়কর্তার মুমুর্ষতার খবর নেয় অনেটা যেচেই। কর্তার জন্য কে কতটুকু ঘোলাজল পান করেছে, আদাজল খেয়ে কে কতটুকু নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে, এরকম শতক আত্মধ্বনি প্রচারিত হতে শুরু করে। হাবিলদার নেই তো কি হয়েছে, সেজন্যে কি দেশ থেমে থাকবে? না, দেখা দেয় নতুন প্রয়োজন। অতএব প্রয়োজনের কুপিটা মৃদু জ্বলে উঠলে আরও একজন কর্তার আবশ্যকতা মাথাঝাড়া দিয়ে ওঠে। সেই আবশ্যকীয় কর্তার আসনে অনেকের আশির্বাদে আসীন হলেন নেতা হারাধন। ভিক্ষার কৃপায় আসন গেড়ে বসে, বড়কর্তার সেবায় কিঞ্চিত ভাটা পড়বেনা ভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে অস্তিত্ব টিকাবার চেস্টায় তিনি খড়কহস্ত হলে ক্ষমতার কেন্দ্রশক্তি চটে যায়। অতএব হারাধনের পতন নিশ্চিত করা জরুরী মনে হলে পরিবারের ক্ষমতাসম্পন্নদের একজন নের্তৃত্ব দেন। নের্তৃত্বের জালস্বপ্ন খাঁটি বাস্তবে রূপ নিলে হারাধনের ছুটির ঘন্টা বাজিয়ে আনসার আলী সেজে যায় পরবর্তী কর্তা। হাজার হলেও কেন্দ্রীয় শক্তির উৎসমুখ বলে কথা। কার সাধ্য কর্তাগিরিতে বাঁধ সাধে। বসুমিয়াকে হত্যায় হাবিলদার কলকাঠি নেড়ে যেভাবে নিরাপদ ক্ষমতাপোক্ত করে, ঠিক একইভাবে আনসার আলী হাবিলদারের হত্যায় রহস্য হয়েই থাকে। জুড়ে বসে ক্ষমতায়। এ এক রহস্য বড়কর্তার বুকে ঘূর্ণির মতো পাক দিতে থাকে। অত:পর পরিবারের সাধারণ্যের পেলব দৃষ্টি ফেরাবারে লক্ষে বড়কর্তার দুর্দদশায় মেকি কান্নার রোল তোলে আনসার আলী। তাতে অনেকের গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া শুকয়ে গজাতে শুরু করে নতুন চামড়া। এতে করে সৈয়দ হাবলিদারের ডান-বাম হাতের অনেকেই খোসা ছড়ানো কলা ঝুলতে দেখে আটকে যায় ইঁদুরের কলে। তবুও বাক দেয়া মোরগের মতো ঝুটি দুলিয়ে ক্ষমতার হাই তুলতে পারবে সেটাই তাদের তাৎক্ষণিক সান্তনা। অল্প ক‘দিন আনসার আলীর ক্ষমতা বিন্যাসের তালিকায় দু‘চারজনের নাম লেখা হলে ভাগ্যে দক্ষিণের হাওয়া ছুঁয়ে যায়। ইতোমধ্যে ঝাটকা মাছ ধরার জাল বোনায় তার দক্ষতার সংবাদ রটে যায় নিন্দুক কিংবা বিদ্রোহীদের মুখে। সংবাদটি সত্যিই বাতাসের গতি পেয়েছে শুনে তিনি কপালে দু‘চারটি ভাঁজ টানেন। সব অবগত হলেও মীরস্বভাবের আনসার আলী বড়কর্তার শোকে গুমোট আবহাওয়ার অবতারনা করে খোসা ছড়িয়ে পাকা কলাটি ঝুলিয়ে বসে থাকে। এই প্রাণান্তকর চেষ্টার ফসল হিসেবে কর্তাগিরি দীর্ঘ সময়ের পথ অনেকটা সুগম হতে শুরু করে। কিন্তু নাগরিক অশান্তির বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবার লক্ষণ দেখা যায় না। কারণ ইতোমধ্যে বসু মিয়া এবং হাবিলদারের রক্তের শপথ অনেকের অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠেছে। দু‘কর্তার উত্তরাধিকারীরা জেগে স্বপ্ন দেখার অভ্যেস রপ্ত করে। সেই স্বপ্নে বড়কর্তার নাম ভাঙ্গিয়ে অগ্রাধিকারে নিয়ে আসে ব্যক্তিগত ক্ষোভ। অতএব চতুর্দিকে মিশ্র পরিস্থিতির উদ্রেক হলে কিছুটা বেকায়দায় পড়েন আনসার আলী। প্রতিকূল বাতাসের ঘাড় মটকে আনুকুল্য পাওয়া জরুরী মনে হলে তিনি সবরিকলা ফেলে সাগরকলার খোসা ছাড়িয়ে ঝুলাতে শুরু করেন। তাতে লাভের ফুলচন্দনই বাড়ে বৈ কমে না। সৈয়দ হাবিলদারের সুবাধে যাদের কপালে চাঁদ-তারা খচিত হয়েছিলো, এরিমধ্যে তারাও অস্তিত্বের স্বীকৃতি নিয়ে সক্রিয় হয়। যদিও সৈয়দ হাবিলদার তাদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলো। এত সক্রিয় অস্তিত্বের পদধ্বনি বড়কর্তার ভার ঠেকে। চৌপক্ষের টানাহিচড়ায় থেতা শরীরে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। কিন্তু যাবে কোথায়? তাঁকে নিয়েইতো মাকড়সা বারবার জাল বোনে। মাকড়সাই ঘনঘন পারিবারিক অসুস্থতার কারণ হয়। তবুও আনসার আলী ভেঙে যাওয়ার পক্ষপাতি নয়। বেতের মতো বাঁকা হয়ে যাবে কিন্তু মছকাবে কিংবা ভাঙবে না। নাকের জলের সাথে চোখের জল মিশিয়ে ক্ষমতার খুঁটিটা জমিয়ে তোলে বেশ। শতেক কৌশলে বারবার বিপদ সংকেত উতরে গেলে অনেকেই আনসার আলীর মাথায় আধ্যাত্মশক্তির ছায়া রয়েছে বলে অনুমান করে। এ অনুমান প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে কারও কারও মুখে প্রমাণ হিসেবে দু‘চারটি যুক্তিও দাঁড়িয়ে যায়। অতএব এ যুক্তির আনুকুল্যে আনসার আলীর অস্তিত্ব লাভ করে দীর্ঘ আয়ু। অন্যদিকে এই দীর্ঘ সময়ে বসু মিয়া ও হাবলিদারের উত্তরাধিকারীরা হাল ধরে বসে থাকে। তারা জোটবদ্ধ হয়ে প্রমাণ করতে চাই যে, স্বৈরতন্ত্র বড়কর্তার শারীরিক অবস্থার জন্য নিরাপদ নয়। সেই সাথে নিরাপত্তাহীনতার বহু প্রামান্য দলিলও দাঁড়িয়ে যায় মাঠে-ময়দানে-জনলোকে। ধীরে ধীরে যুক্তির সাথে উপরি যুক্তি যোগ হলে বিরোধ চরমে ওঠে। অন্যদিকে প্রকৃতির রুদ্র রোষানলে দগ্ধ হতে হতে আনসার আলীর অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার যোগাড় হয়। আকাশ চারবার গর্জে উঠলে পরিবারের স্বার্থে তিনি পাঁচবার হাক ছাড়ের পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকবেন বলে। বিধি বিপরীত, বঙ্গোপসাগর থেকে দৈত্যটা উপকূলে থাবা বিস্তার করে। বিপদ হামলে পড়েছে। আনসার প্রতিশ্রুতির পুরোটা ভুলে না গিয়ে কিছুটা মনে রাখলে সদস্যদের কারও কারও হাতে মঙ্গল প্রদীপ জ্বলে ওঠে। তবুন উত্তরপ্রতিনিধিরা দমে যাওয়ার পক্ষে নয়। বরং প্রকৃতির বৈরিতাকে গন্ধরক হিসেবে আবিস্কার করে চৌগুন আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অতএব সব মিলিয়ে আনসার আলীর অন্তরীন হওয়ার যোগাড় হলে, উত্তরপ্রতিনিধিরা হাতে হাতে মিলিয়ে চৌদ্দশিখের গরাদ নির্মাণ করতে শুরু করে। চতুর্দিকে বেজে ওঠে দামামা। দম বন্ধ উত্তেজনায় নির্মাণ শ্রমিকদের কারো কারো অন্তর্ধানের পথ রচিত হলে তারা চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠেন। আবার সেই অন্তর্ধানের পথেই আনসার আলীকে অন্তরীণ করার চেস্টায় চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়। আবারো বড়কর্তা অনিশ্চয়তায় পড়ে গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করেন। ‘কি হয় কি জানি‘ এরকম অনিশ্চয়তায় পরিবারের সাধারণ সদস্যরা হাফ ছাড়ার সুযোগ না পেলে কিছুটা সচেতন হয়। সে হিসেবে চতুর্দিকে জবর খবর রটে গণতান্ত্রিক নিয়মে ব্যালটের মাধ্যমে পরবর্তী কর্তা নির্বাচন করা হবে। উত্তরপ্রতিনিধিরা গরাদ নির্মাণ পর্ব শেষ করে কঞ্চির ঠিক মাথায় উড়িয়ে দেয় নিজস্ব পতাকা। যে বড়কর্তার জন্য এতো ঘনঘটা, তাঁর ভ’মিকা শুধু নিরব দর্মকের। অসম্ভব অনিয়মের ভারে কুঁজো হতে হতে এখন যেনো মৃত্যুও অভাবে সময় গোনা। অথচ অন্যদিকে কোলোব্যাঙের মাটির ঘরেও সাজ সাজ রব। দিনক্ষণ ঠিক করে জমে ওঠে খেলা। নারকেল পাতার ফাক ফোঁকর গলে সূর্য পশ্চিমে নদীগর্ভে বিলীন হলে খবর পাওয়া যায়, সৈয়দ হাবিলদারের উত্তরপ্রতিনিধি রূপবানী হয়েছেন পরিবারের নতুন কর্তা। সাথে যোগ করেছেন চাঁদ-তারার কপাল। খবর রটে এবার রূপবানীই দেখবেন বড়কর্তার সামগ্রিক মঙ্গল। সেই প্রক্রিয়ায় রূপবানী হাত দিলেও নিজের স্বার্থবিরোধী হয়ে উঠতে পারেন না। সেইসাথে ব্যবসায়ীক বেলুন বিক্রেতা গৃহপালিত বুদ্ধিবিক্রেতারা হাত-পা চার অঙ্গ মিলিয়ে বাহবা দেয়। সমর্থক সুবাধে চাঁদ-তারাদের ব্যবসাও জমে ওঠে বেশ। রূপবানীর ডান-বাম হাতের যোগানশক্তি সক্রিয় করে পাছায় আঁচল পেঁচিয়ে নামেন। লক্ষ্য ব্যবসায়ীক সফলতা। ব্যবসায়ীক পথ ধরে খুব বেশি এগুতে না পারলেও একেবারে কম যান না। মাঝে বাঁধ সাধে বসু মিয়ার উত্তর প্রতিনিধিরা। অতএর বিরোধী পক্ষের পাছায় বাঁশ চালান করতে গিয়ে বড় কর্তার পাছায় দু‘চার ইঞ্চি সেঁধেছে কিনা সে খবর নেবার তাগিদ অনুভব করেন না রূপবানী। এ পরিস্থিতির তপ্ত হাওয়া কিছুটা চাঁদ-তারায় ঠেকলে পুনরায় বিরুদ্ধাচরণের অভ্যেস রপ্ত করে নেয় তারাও। সময়ের ঘুর্ণায়নে অনেকটা কোণঠাসা হবার সংবাদ আঁচ করতে পারলে মরনকামড় দিতে উদ্যত হয় রূপবানী। বিদ্রোহীদের অনেকে কর্মকারের লোহার রূপ ধারণ করে। ‘স্বৈরাচার উৎখাত পুনরায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয় নি‘ এরকম বক্তব্য চতুর্দিকে স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। রূপবানী গোঁদে ফোঁড়ার অস্তিত্ব টের অনুভব করলে ঝড়ের তোড় যে থামানো সম্ভব নয় তা বুঝতে পারেন। একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার মতো তো নয়ই। যাকে বলে মৌলিক গণতন্ত্র। যদিও যুক্তিতে ‘মৌলিক‘ শব্দটির টিকে থাকা দায়। তবুও সেই মৌলিকত্বের দোহাই-ই রূপবানীর সরে দাঁড়াবার পথ নিশ্চিত করে। আবারও আনন্দের ঝংকার বড়কর্তার উপর দিয়ে বয়ে গেলে কেঁপে কেঁপে ওঠেন তিনি। আর কতো আনন্দ হবে কে জানে। বড়কর্তা কেবল থির থির কাঁপেন ভ’মিকম্পের আশংকায়। কর্তার ক্ষীণ শরীর নিয়ে পরিবারবর্গের আর কতো আয়োজন রয়েছে কে জানে। আবারও বুদ্ধিবাণিজ্যের বিণকদের এক-আধটু হাঁক ছাড়ার সুযোগ মুষ্ঠিবদ্ধ হলেও দু‘ঠোঁটে আঠা লেগে যায়। অতএর রূপবানীর পূর্ণাঙ্গ অপসারন নিশ্চিত হলে আবারো শুরু হয় গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধের আয়োজন। উত্তরপ্রতিনিধিদ্বয়, চাঁদ-তারা এবং অন্যান্য কর্তাব্যাক্তিদের সাথে লোহার গরাদের ফাঁক থেকে অভুক্ত সিংহের ক্ষীণ গর্জন শুনা যায়। খবর রটে আনসার আলী বড়কর্তার সেবায় আবারো নিজেকে সমর্পন করতে চান। এবং তাই হয়। নির্দিষ্ঠ দিনে একেবারে খোলামাঠে আয়োজিত হয় চ’ড়ান্ত কুস্তি খেলার। আছাড়ি-পাছাড়ি পালা শেষে যখন চতুর্দিকে চুরুটের ধোঁয়া ওঠে তখন আলো আঁধারিতে খবর পৌঁছে কানে কানে। এবার কর্তার আসনে বসবেন বসু মিয়ার উত্তরপ্রতিনিধি নেতা বিলকিস বেগম। সেকি আনন্দ। বুদ্ধির বেলওনওয়ালারা নাকে এক আধটু বসুর গন্ধ পেলে ছুঁড়ে দেয় লম্বা বিবৃতি। টোপ ঠিকঠাক বোয়াল মাছের পেটে প্রবেশ করেছে, এমনটি টের করতে পারলে ফুলের তোড়ার সাথে মিশিয়ে এক শিশি খাঁটি সরিষার তেল উপহার দেয় বিলকিস বেগমকে। এরিমধ্যে আবার দু‘চারজন বোদ্ধা সমস্ত পারিবারিক কর্তাদের চতুর্থ শ্রেনীর মানুষের কাতারে দাঁড় করালে বেজে ওঠে ক্ষীণ পাগলাঘন্টা। এতোকিছুর মধ্যে লাইটপোস্টের চতুর্দিকে পোকামাকড়গুলোও কিলবিল করে মহা আনন্দে। অতএব বিলকিস বেগমের দাপট শুরু হয়ে গেলে সিদ্ধহস্তের আনসার আলী পুন:রায় চর্চা শুরু করে দক্ষ কৌশলের। আপাদ টুকরো চাহিদার তালিকায় স্থান পায় চৌদ্দ শিখের বাইরে আকাশ দেখা। বিলকিস বেগমও আনুগত্যের সিংহভাগ আদায় করে তার দু‘বাহুতে আকৃপন হাতে সংযোগ করে মুক্ত পাখা। এখন মুক্ত আকাশচারী আনসার আর চাঁদ-তারা খসে যাওয়ার ভয়ে ফতোয়া- পক্ষ আতংকে দিন গুজরায়। কিন্তু রীপবানী ক্ষোভ প্রশমন করতে ভুলে গেলে হিংস্র হায়েনার থাবা প্রস্তুত করে। বড়কর্তা অনিশ্চয়তার ভারে কুঁজো হতে হতে শরীরে বলিরেখা দেখা দিলে শংকায় দৃষ্টি থির করে দু‘একজন বোদ্ধা। কিন্তু সেদিকে ভ্রক্ষেপের পক্ষপাতি কাউকে পাওয়া গেলো না কর্তাবাবুদের দলে। খুব ভুল না হলে কলার খোসাটাও ফেলেন না নিজের মঙ্গলচিন্তায়। অতএব এখন বিলকিস বেগমের সাথে বিরোধী পক্ষের পাঞ্জা লড়ার আশংকা চূড়ান্তের দিকে এগুতে শুরু করে। ধুনট মেঘ জমতে শুরু করেছে আকাশে। সমুদ্রের তীব্র গর্জন বড়কর্তাকে ভেসে যাওয়ার সংবাদ দেয় যেনো। এ পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলে বড়কর্তার সমুহ শারীরিক অবনতির চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন গুটিকয় বোদ্ধা। বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করতে চান তারা। কিন্তু চতুর্দিকে ডাইনির আাঁচড় গুলিয়ে দেয় সব। কে শোনে কার কথা। অত:পর নিরুপায় চিকিৎসকরা পর পর অপারেশন থিয়েটারের দরজায় লালবাতি জ্বালিয়ে বিবৃতি দেয়-‘বড়কর্তার শারীরিক অবস্থার কোনও উন্নতি হয় নি। চৌপদী ঘষটানি অব্যহত থাকলে একসময় রোগে ভুগে মারা পড়বেন নির্ঘাত‘।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.