অনুবাদ কবিতা

রবার্ট ফ্রস্টের কয়েকটি কবিতা

মোস্তফা তোফায়েল | 5 Jan , 2019  


অ্যামেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্ট বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় সমসাময়িক। তাঁর জন্মসাল ১৮৭৪; মৃুত্যুসাল ১৯৬৩। ১৯৬১ সালে ভারতবর্ষে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন উপলক্ষে অ্যামেরিকার এবিসি টেলিভিশনে, ফ্রস্ট, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সে-ভাষণের অডিও কপি ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, কিন্তু লিখিতরূপ পাওয়া যায় না। সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে আছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও আছে তাঁর কবিতার হাজার হাজার মুগ্ধ পাঠক। বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে ১৯৫৭ সালে। অনেকগুলি আন্তর্জাতিক মানের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সম্মাননা পেলেও রবার্ট ফ্রস্ট নোবেল পুরস্কার পাননি। তবে, তাঁর মরণোত্তর বছরগুলি থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো প্রান্তেই তাঁর কবিতার জনপ্রিয়তা কমেনি। তিনি এখনও বহুলপঠিত এবং বিপুলভাবে জনপ্রিয় একজন কবি।
ফ্রস্টের যেকোনো কবিতার শুরুটা খুবই সাদামাটা; দিনানুদৈনিক জীবন থেকে নেয়া। আলাপী ভঙ্গিতে সাক্ষাৎ ঘটে তাঁর কবিতার প্রথম চরণ কিংবা প্রথম স্তবকের সাথে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁচ করা যায় রহস্যময়তার আঁধারিমা। সন্ধ্যায় নেমে আসা অন্ধকার, শহরের অন্তঃসারশূন্যতা, নিসর্গের রহস্যজড়ানো নীরবতা, শব্দের দুর্বোধ্য বা অর্ধ-স্ফূট ভাষা হয়ে দাঁড়ায় মানব আত্মার প্রতীক অথবা মনস্তাত্ত্বিক নিঃসঙ্গবোধের দ্যোতক। ফ্রস্টের কবিতার ভাবসম্পদ কীরকম তার উদাহরণ হতে পারে Acquainted With The Night নামক একটি কবিতা। চৌদ্দ লাইনের সনেট আয়তন বিশিষ্ট কবিতাটিতে I have উক্তিটির পুনরাবৃত্তি আছে। কবিতার কথক একজন আধুনিক মানুষ যিনি একঘেয়েমী ও শূন্যতার বাসিন্দা; সেটি বুঝানোর জন্য একই কথার পুনরাবর্তন। কবিতাটির কথক তার নিজ বাসস্থানের পার্থিব আলোকিত অবস্থান থেকে বৃষ্টিবিঘ্নিত রাতে বেরিয়েছে শহরের অন্ধকার অলিগলি পথে। সেসব অন্ধকার গলিপথে মানুষের কষ্টদুঃখ ব্যথাবেদনাবিজড়িত জীবনের কান্না তার কানে ধরা পড়ে না, কান পেতে থাকলেও না। দারোয়ান প্রশ্নকাতর চোখে তার দিকে তাকায়, সে চোখ নিচু করে এড়িয়ে যায়, উত্তর দেয়ার তাগিদ তার বোধে আসে না। অলিগলিতে যেসব মানুষ জীবনযন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠে, কবিতার কথক তা শোনার জন্য উৎকর্ণ, কিন্তু তার কানে কোনো ধ্বনি প্রবেশ করে না। ওরা তাকে ডাকে না, ওরা তাকে বিদায় সম্ভাষণও জানায় না। কথক এমনই নিঃসঙ্গ আধুনিক শহরে। শহরের মাঝখানে আলোকিত দেয়াল ঘড়িটি শহরবাসীদের জানাতে থাকে তাদের জীবনে বয়ে যাওয়া ঘন্টা ও কাল। সে ঘড়িটিও কথককে বলে না কিছু। শহরের মানুষ শ্রেণীবিভক্ত। এক শ্রেণীর পাথরতুল্য নিষ্পৃহতা অপর শ্রেণীর মানুষজন থেকে। আধুনিক নাগরিকের এই সংকট ফুটে ওঠে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় এমন ভাষায়, এরকম প্রতীকে ও আবেদনে। আপাতঃসরল ভাষার আবরণে ফ্রস্ট বলেন অনেক মর্মভেদী গভীর অসুস্থতার কথা। যে-কবিতা তিনি শুরু করেন সহজ সরল আলাপী ভাষায়, সে-কবিতাই শেষ স্তবকে পাঠককে নিয়ে যার ভাষার বন্ধন থেকে মনস্তাত্তিক সংকটের যোজন যোজন ব্যবধানিক দূরত্বে, নাগরিক মানুষের সংকট চিত্রায়ণে।

একজন নিশিরাতের সাথী
Acquainted With The Night

আমি তো হয়েই গেছি একজন নিশিরাত সাথী।
হেঁটেছি বৃষ্টিতে ভিজে– বৃষ্টিতেই ফিরেও এসেছি।
পার হয়ে গেছি আমি শহরের দূরতম বাতি।

সর্বাধিক দুঃখক্লিষ্ট গলি আমি স্বচক্ষে দেখেছি
দায়িত্বপালনকারী দারোয়ানে কাটিয়েছি পাশে।
চোখের দু’পাতা ফেলে, ব্যাখ্যা সব গোপন রেখেছি।

থমকে দাঁড়িয়ে গেছি পদশব্দ যদি কিছু নাশে
কান্নার শব্দের তুল্য– কোনো কান্না দূর থেকে হয়,
পাশের সড়ক থেকে বাড়ির উপর দিয়ে আসে,

কিন্তু কেউ ডাকেনি তো, বিদায় বচনটিও নয়;
আরো দূরে, বহু দূরে অপার্থিব কোনো উচ্চতায়,
আলোকিত ঘড়ি এক আকাশের উল্টো থেকে কয়

না-শুভ বা না-অশুভ এই কাল আজিকার বাতি।
আমি তো রয়েই গেছি একজন নিশিরাত সাথী।

এক ঝলক তাকিয়ে দেখা
A Passing Glimpse

দেখি আমি কত ফুল, দ্রুতগামী ট্রেনে বসে বসে,
সহসা হারিয়ে যায় নাম জানা হতে-না হতেই ।
ভাবি যে নেমেই যাবো ট্রেন থেকে, গিয়ে দেখে নেবো
রেল লাইনের ধারে, থরে থরে কোন ফুল সেই ।

কত যে ফুলের নাম মনে করি, নয় তারা নয়;
পোড়া বনে ফুটে-ওঠা লজ্জাবতী, তাও, তারা নয়
অপরাজিতাও নয় টানেলের মুখে ফুটে -থাকা,
শুক্নো বালিতে ফোটা নাগফণি, সে-নয় নিশ্চয়।

আমার অন্তর তলে ঘসা দিয় দ্রুত গেল চলে,
পৃথিবীর কেউ খুঁজে পাবে কি-তা, স্মৃতির অতলে?
সরগের দিব্য ফুল চমকেই তাদের দেখায় ,
অধরা মাধুরী যারা ‘ধরা’ ভেবে হাত না-বাড়ায় ।

রূপরেখা
Design

দেখলাম, টোল-খাওয়া, মোটাসোটা মাকড়শা এক
সাদা-রঙ সেটা বটে, সাদা-রঙ সর্বরোগহর,
একটি কুসুম বেয়ে উঠে গিয়ে পিপীলিকা ‘পর
বসালো ছোবল যেন মারণাস্ত্র মৃত্যুর পেরেক;
পিপীলিকাটিও সাদা, খড়খড়ে, এদের প্রত্যেক
ঘাতক চরিত্র আছে, বিষ আছে ; প্রথম প্রহর
প্রেতের পাচনতুল্য শরবতে শুরু, নৃত্যপর,
পুষ্পতুল্য বুদ্বুদ মাকড়শা ঘুড়ি যেন এক।

কুসুমের সাদা রঙ কী কাজের, সুবোধ কতেক
সর্বরোগহর লতা, নীল-পাতা কোন কাজে লাগে?
মাকড়শা উঠে যায় কার টানে উচ্চতা অনেক;
রাত হলে পিপীলিক যায় সেথা, কোন অভিষেক?

আঁধারের রূপরেখা, প্রশ্নময় বিভীষিকা জাগে
ক্ষুদ্রতেই রূপরেখা, বৃহতেরা তাই স্বস্তি মাগে।

আলাপচারিতার উপযুক্ত সময়
A Time to Talk

একজন বন্ধু যদি ডাক দেয় রাস্তা থেকে হেঁকে,
থামিয়ে ঘোড়াটি তার, ধীরে ধীরে, আলাপী ভঙ্গিতে,
নিড়ানি থামিয়ে আমি পাহাড়ের চারিদিকে চেয়ে
ক্ষতি হয়ে গেল কাজে আফসোসে সে জায়গা থেকে
দেই না সজোরে হাঁক,“কী হে বন্ধু, কার খোঁজ নিতে
চলেছ কোথায়?” বরং এ-আলাপ কাল হাতে পেয়ে
হাতের নিড়ানি ধরে উল্টোদিক, চাপ দেই জোড়ে,
পাঁচ ফুট দীর্ঘ সে-নিড়ানিটা দেই খাড়া পুঁতে ।
দ্রুত পায়ে হেঁটে যাই থপ্ থপ্ হৃদ্যতার ঘোরে ,
পথ পাশে উঁচু খাড়া দেয়ালটা তড়িঘড়ি ছুঁতে ।

জন্মস্থান
The Birthplace

যে কোনো স্বপ্নের চেয়ে বহু বেশি উচ্চতায় গিয়ে
এখানে এ-জায়গায়, পাহাড়ের ঢাল বেছে নিয়ে
আমাদের বাবাজান ঘিরে দেন শেকলের বেড়া;
ঘাসদের বেড়ে-ওঠা, মাটির বৃদ্ধির সাথে সাথে
দিলেন থামিয়ে তিনি শক্তভাবে, খোদ নিজ হাতে।
আমাদের ক‘জনের জীবনকে পৃথিবীতে এনে
বাড়তে দিলেন তিনি আমাদের, তার রীতি মেনে।
আমরা ছিলাম বেশ, ছেলেমেয়ে ডজনখানেক,
মনে হলো, পাহাড়টা এইসব মেনেছে অনেক।
আমাদের জীবনের স্পন্দন সে করেছে লালন।
কিছুকাল অবশ্যই হাসিমুখে করেছে পালন ।
ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আজকে সে, নাম আমাদের
(মেয়েরা তো সত্যি সত্যি কোনোদিন স্বনাম তাদের
রাখে না কখনো ধরে; বদলায় ভিন্ন পরিবেশে।)
হাঁটু দিয়ে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দিয়েছে অন্য দেশে
সে-পাহাড় আমাদের; পরিবর্তে বহু গাছপালা
কোলে তার খেলা করে ভরে দিয়ে আনন্দের ডালা।

পাতা কুড়োনো
Gathering leaves

কোদালেরা পারে পাতা কুড়োনোর কাজ
চামুচের চেয়ে বড়ো বেশি ভালো নয়,
শুক্নো পাতার বস্তা ভর্তি হলেও
বেলুনের মতো হাল্কাই বটে হয়।

সারাদিন আমি পাতা কুড়োনোর কাজে
করি খস্খস্ শব্দের তোলপাড়,
খরগোশ আর হরিণেরা ছুটে গেলে
যেমন শব্দে করে দেয় একাকার।

পাতার পাহাড় যখন বানিয়ে ফেলি,
পারিনে সে-বোঝা জাপ্টে ধরতে আর;
বাহুর বাঁধনে উপ্ছে যায় সে-বোঝা,
মুখটাও ঢাকে বড়ো আয়তন তার।

বোঝা বাঁধা আর বোঝা খুলে ফেলা কাজ,
বারে বারে আমি একই কাজ করে যাই;
সারাটা গুদাম ভরাট হওয়ার পর
বুঝে ফেলি আর করার কিছুই নাই।

ভোঁতা, স্য্যাঁৎস্যাঁতে, ময়লাটে হয় ওরা,
ওজন করার ব্যাপার থাকে না আর;
মাটির পরশে হারায় রঙের ছটা,
রঙের ছটার বাহার থাকে না তার।

ব্যবহার করি, তেমন থাকে না কিছু,
তবু, জানি আমি–ফসল, ফসলই বটে;
ফসল তোলার ফলসম্ভার কাল
বলে কোন জন, শেষটা কোথায় ঘটে ?

গোচারণভূমিতে
Pasture

বাইরে বেরোতে যাবো ঝরনার জল শোধনেতে
থামবো খানিক শুধু পাতাদের ঝাড়– দেয়া কাজে
(দেখে নিতে পারি শুধু শুদ্ধ জল ঝরনার মাঝে):
যাবো না যাবো না দূরে। তুমিও আসো হে বন্ধু সাথে।
একটু বাইরে যাবো গরুর বাছুরটিকে নিতে
মা’র সাথে রয়েছে যে। কত ছোট, কিশোর বাছুর
চাটে তাকে মা যখন, টলোমলো কেমন ভঙ্গুর।
যাবো না যাবো না দূরে। তুমিও আসো হে বন্ধু সাথে।

জল আনতে গিয়ে
Going for Water

এক যে ছিল দরোজা, তার পাশে ছিল শুক্নো কুয়ো;
আমরা দু’জন সেই সুবাদে, বালতি হাতে, ঘড়া কাখে
সেই বাড়িটার পেছন দিকে মাঠ যে ছিল, মাঝ দিয়ে তার
ধেই-ধেই-ধেই খুঁজতে গেলাম, হারানো সেই ঝরনাটাকে।
বাইরে যেতে বাধা দেয়ার কেউ ছিল না, কেউ ছিল না,
শরৎ দিনের সাঁঝবেলাটা ছিল যেন মন-মাতানো
(যদিও হিমেল), তারপরেও, খোলা মাঠ তো আমাদেরই,
বনের ঝোপ, সে আমাদেরই, তারই পাশে ঝরনা, জানো।

দৌড়ে গেলাম ধরবো বুঝি চন্দ্রিমাটা হাতের মুঠোয়,
গাছ-গাছালির আড়াল দিয়ে উঠছে যেটা মন্দগতি,
শুক্নো ছিল সমস্ত বন, লতাপাতা একটিও না,
পাখ-পাখালি তা-ও ছিল না, বাতাসটাও মন্দ অতি।

আড়ালেতে ঝোপের ভেতর, চাঁদের আলোর আড়াল হয়ে
যক্ষ যেন লুকিয়ে ছিলেম-আবার বুঝি চাঁদ এসেছে–
চাঁদ এসেছে খুঁজতে মোদের, হেসেছি তাই লজ্জা পেয়ে,
টুপ করে ফের দিয়েছি দৌড়, লুকিয়েছি ফের, বাঁচা গেছে।

পরস্পরে পিঠের ’পরে রেখেছি হাত, থম্কে চেপে।
পেতেছি কান শুনতে শুধু, হয়নি সাহস চোখ খুলবার;
চুপ্-চুপ্-চুপ্ ফিস্-ফিসানি, হলাম জড়ো হলাম ঘন,
শুনতে পেলাম বুঝতে পেলাম ঝরনা ধ্বনি, সেই ঝরনার।

একটি ছোট জায়গা থেকে একটি মিহি সুরের মতো
জল তির-তির জলের প্রপাত টিপে টিপে নেমে এল,
ফোঁটা ফোঁটা যায় বয়ে যায়, যায় বয়ে যায়, যায় বয়ে যায়,
মুক্তো দানা ওই দেখা যায়, রূপোর ফলক ভেসে গেল।

একটি নগণ্য পাখি
A Minor Bird

চেয়েছি তো, ঐ পাখিটা যায় যেন সে দূরে, উড়ে,
গায় না যেন সারাটা দিন বাড়ির পাশে, সুরে সুরে;
দরোজাটায় দাঁড়িয়ে আমি দিলেম তালি, তাকে দেখে,
যখন আমার মনে হলো, কী হবে আর সেটায় রেখে।

দোষের ভাগটা, অনেক অংশ, পড়া উচিত আমার ওপর,
বাঁচার চাবি সুরটা যে-তার, দোষের ব্যাপার নয় সেটা ওর।
নিশ্চিত যে এ-কাজেতে, আমার ছিল অনেকটা দোষ
থামিয়ে দেয়া যেকোনো গান, করে দেয়া কাউকে না-খোশ।

ইডেন পাখির গান সমগান কখনো হবে না
Never would be the Song like Eden

যেমন নিজেই তিনি করতেন বিশ্বাস, তেমনই
ঘোষণাও করে দিতে পারতেন: পাখিরা ইডেনে
সর্বব্যাপী বিচরণ প্রাক্কালে ইভা কণ্ঠধ্বনি
করায়ত্ত করেছিল বৃদ্ধিগুণে, নব গান জ্ঞানে;

ইভারই কণ্ঠস্বর তাল-লয় ওঠানামাগুলি
অর্থভেদ ব্যতিরেকে নিয়েছিল; মোলায়েম বাণী
প্রকৃতঃই ছিল সেটা; সে-প্রভাব কণ্ঠস্বরে তুলি
পাখিরা হয়েছে ধন্য। ডাক ছিল, ছিল হাস্যধ্বনি-
এমন যা-কিছু ছিল, ইভা ছিল সঙ্গীতে তাদের;

ইভার কণ্ঠস্বর পাখিদের কণ্ঠ সাথে মিশে
বনমাঝে আত্তীকৃত হয়ে যায়–সকল কালের;
হারাবে না কোনো দিন সেই গান পাখিদের শিসে।

ইডেন পাখির গান সমগান কখনো না হবে।
মর্ত্যরে পাখির কণ্ঠে তা-ই দিতে এসেছে সে ভবে।

যে-পথে যাইনি আমি
The Road not Taken

ফ্যাকাশে সে-বনটার দু’টি পথ বেঁকেছে দুদিকে,
খুবই দুঃখিত আমি, মাত্র এক ভ্রমণ পথিক
একাই দু’দিকে যাবো– তা পারিনে, কোন পথটিকে
বেছে নেবো ভেবে দেখি– চেয়ে থাকি দৃষ্টি অনিমিখে
কোন দিকে বাঁক নেয় এক পথ, ঢুকেছে সঠিক ।

অন্যটি নিলেম বেছে, মনে হলো সেটিই উত্তম,
সেটারই দাবী বেশি যোগ্যতর হবে সম্ভবত;
অবহেলা মাখা এটা, ঘাসেঢাকা, পদচ্ছাপ কম,
চলাচল চালু হলে এই পথও হবে সেরকম,
যেমন অপর পথ, ব্যবহারে থ্যাত্লানো কত;

সেদিনের সে-সকালে দু’টি পথই ছিল পাতাভরা
একইরকমভাবে, চিহ্ন কোনো পায়ের ছাপের
পড়েনি তখনও; আহা, প্রথমটি রেখে দিয়ে ত্বরা
দ্বিতীয় পথই ধরি; তবে বুঝি দু’য়ে মিলে ওরা
চলে গেছে একই লক্ষ্যে, আহা, আমি ফিরব কি ফের !

কত কাল, কত যুগ পরে, এই ভ্রমণকাহিনি
গভীর নিশ্বাস ফেলে বলে বলে শোনাবো সকলে:
কোনো এক বনে ছিল দু’টি পথ, না জানি না চিনি-
আমি সেই একজন, বেপথু যে, ভিন্ন পথে যিনি
গিয়েছেন লক্ষ্যপথে, ব্যতিক্রমী হয়েছেন, ফলে।

জনালার পাশে বৃক্ষ
Tree at my window

জনালার পাশে একটি বৃক্ষ, বৃক্ষ দাঁড়ানো,
রাত এসে গেল, শার্শি বন্ধ, শার্শি নেমেছে;
মশারি নামেনি, থাকুক মশারি, যেমন রয়েছে,
থাকুক তোমার আমার মধ্যে চোখের তাকানো।
স্বপ্ন জড়ানো আলুথালু মাথা ভূমি থেকে দূরে
মেঘেদের মতো আকাশমুখীন ছিটানো ছড়ানো,
চটুল তোমার কথাগুলি সব আবেশ জড়ানো,
কিন্তু গভীর নয়তো সেগুলি অন্তঃপুরে।
তবু হে বৃক্ষ দেখেছি তোমাকে ললিত ভঙ্গী,
তুমিও হয়তো দেখেছো আমাকে ঘুমেতে লগ্ন,
দেখেছো হয়তো ক্ষুব্ধ মনন চিন্তামগ্ন
এবং নিঃস্ব, এবং দুর্বিপাকের সঙ্গী ।

সেই ঝড়ো দিনে ক্ষুব্ধ বাত্যা এ দু’টি মাথা,
কল্পলোকের কোন সে বিধানে বাঁধলো গাথা,
তুমি তো তোমার বাহির ভুবনে বলছো কথা,
আমার সঙ্গী গোপন আমার নীরবতা ।
তুষার সাঁঝে বনের ধারে থেমে গিয়ে

তুষার সাঁঝে বনের ধারে থেমে গিয়ে
Stopping by Woods on a Snowy Evening

এই বনভূমি কোন মালিকের, বোধ করি, আমি জানি:
যদিও পল্লীগাঁয়ে তার বাড়ি, মানি:
থেমে গেছি আমি এখানে সহসা, সেটা সে দেখতে পাবে না,
দর্শক আমি, বরফ মাখানো তারই বনভূমিখানি।
ছোট্ট আমার ঘোড়াটির মনে খট্কা লাগবে বটে,
যেখানে থেমেছি, লোকালয় কোনো নেই কাছাকাছি মোটে,
বনভূমি আর হিম হয়ে যাওয়া হ্রদের মধ্যটুকু,
বছরের সেরা আঁধার তমসা এইখানে এসে জোটে।

গলায় ঝুলানো ঘুন্টি দুলিয়ে ঘন্টার সংকেতে
ডাকে সে আমাকে, যেন আমি দেই সতর্ক কান পেতে ।
আশেপাশে শুধু আরেক শব্দ বাতাসের ঝিরিঝিরি
ফিসফিস বয়, তুষার পতনে সহজ ছন্দে মেতে।

এই বনভুমি লোভনীয়, তবে বিদঘুটে সুগভীর ,
কিন্তু, অটল শপথ বাঁধনে আমিও যে সু-স্থির,
শয়নের আগে বহু মাইল যাবো তারপর হবো থির;
শয়নের আগে বহু মাইল যাবো তারপর হবো থির।
Flag Counter


1 Response

  1. আনোয়ার রশীদ সাগর says:

    নিয়মিত পড়তে পারব সে প্রত্যাশা রাখছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.