বইমেলা

সংযোজন

মেলার বই থেকে দুই পৃষ্ঠা

admin | 4 Jun , 2009  

[মেলায় প্রকাশিত বইকে পাঠকের কাছে আরো প্রামাণ্য করে তোলার জন্য আর্টস-এ সদ্য প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ, বই সম্পর্কিত বিবরণ আর প্রথম দুই পৃষ্ঠা স্ক্যান করে ‘মেলার বই থেকে দুই পৃষ্ঠা’য় দেয়া হচ্ছে। বইয়ের পাতা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি গ্রহণ করা হয়েছে। — বি. স.]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস। গবেষণা। ড. রতন লাল চক্রবর্ত্তী। প্রকাশক: দি ইউনিভার্সেল একাডেমী।

drl_c.jpgদি ইউনিভার্সেল একাডেমী (৪০/৪১ বাংলাবাজার, ঢাকা ১১০০) থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস বইটি প্রকাশ করেছেন এ. এস. এ. ভূঁইয়া শিহাব। অনেক দিন ধরে বিভিন্ন রেকর্ড রুম আর আর্কাইভ ঘেঁটে এ বই রচনা করেছেন ড. রতন লাল চক্রবর্ত্তী।

বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ের নামকরণে রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন লেখক। যথা: প্যাক্স ব্রিটানিকা বনাম ছাত্র-শিক্ষক সমাচার; মুক্তির মন্দির সোপান তলে; অহো, কী সান্ধ্র সম্পর্ক!; অথ গোলাম মঙ্গল কাব্য; সবশেষে পণ্ডিত বিদায় পালা–ইত্যাদি। লেখা সম্পর্কে ভূমিকায় লেখক বলছেন, ‘এই গবেষণা কর্মের যৌক্তিকতা এখানেই নিহিত যে এই গ্রন্থে লিখিত পাঁচটি
—————————————————————–
ইংরেজ সেনাসদস্যদের সাথে প্রথমে তথা ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময়, যখন ছাত্র ও জনগণের উপস্থিতি সেনাবাহিনী অবাঞ্ছিত মনে করে। ক্রীড়া নৈপুণ্যে ব্যর্থ সেনাসদস্যের প্রতি ছাত্র ও জনগণের ‘হাসি’ সেনাসদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে জনৈক সেনাসদস্য উপস্থিত ছাত্র জনতাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিত ছাত্রদের কয়েকজন এর প্রতিবাদ করে।
—————————————————————-
ratan-lal-chakraborty.jpg……..
ড. রতন লাল চক্রবর্ত্তী
……..
অধ্যায় সম্পূর্ণভাবে নতুন এবং এই বিষয়সমূহ সম্পর্কে অদ্যাবধি কোন গবেষণামূলক রচনা কোথাও লক্ষ্য করা যায় না।’ তিনি জানাচ্ছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে রচিত ও সংকলিত গ্রন্থের সংখ্যা একেবারে কম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সর্বপ্রথম যে গ্রন্থখানা রচিত হয় তা হলো একটি স্মরণিকা। ১৯৭৪ সালের ৩১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের রামকৃষ্ণ ইন্ষ্টিটিউট অব কালচারে কলিকাতায় অবস্থানরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী-অধ্যাপকদের এক পুনর্মিলন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষে প্রকাশিত হয় “আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” শীর্ষক স্মরণিকা, যা প্রকৃত অর্থেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল সময়ের মূল্যবান স্মৃতিচারণায় সমৃদ্ধ এক অমূল্য দলিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ষাট (৬০) বছর পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুর রহিম The History of the University of Dacca শীর্ষক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, যদিও এই প্রকল্প আরম্ভ হয়েছিলো ১৯৭৫ সালে। ড. আবদুর রহিম রচিত এই গ্রন্থখানাই হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে পেশাদার ইতিহাসবেত্তার প্রথম গবেষণা কর্ম। ড. আবদুর রহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক ইতিহাসের উপর সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন বিধায় এই বিদ্যাপীঠে সংঘটিত ঘটনাবলীর উপর বেশী আলোকপাত করতে পারেননি। তবে একটা বিষয় উল্লেখ না করে পারা গেল না যে ড. আবদুর রহিমের এই গ্রন্থে তথ্য-বিভ্রান্তি রয়েছে–যার কিছু কিছু উল্লেখ বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে।

[…] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে “আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” শীর্ষক স্মৃতিকথা ব্যতীত ঢাকা হতে কয়েকখানা স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে। এসকল স্মৃতিকথার মধ্যে মুহম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পাদিত “স্মৃতিকথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯২), সরদার ফজলুল করিম, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এর আলাপচারিতা”, (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৩), কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও সরদার ফজলুল করিমের “চল্লিশের দশকের ঢাকা” (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ২০০১), আনিসুজ্জামান সম্পাদিত ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলামনাই কনভেনশনের স্মরণিকা “চোখের দেখা, প্রাণের কথা” (ঢাকা, ১৯৯৮) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
—————————————————————–
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের “বাংলা বিভাগের ইতিহাস” শীর্ষক গ্রন্থখানা ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। এই গ্রন্থখানার অভিনবত্ব হলো যে এখানে ১৯২১ সাল হতে ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত বাংলা বিভাগের সকল শিক্ষকের নাম ও তাঁদের প্রকাশনার অসম্পূর্ণ তালিকা এবং একই সাথে এই সময়ের মধ্যে বাংলা বিভাগে প্রথম হতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত সকল শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত শ্রেণীসহ নামোল্লেখ রয়েছে।
—————————————————————-
[…] আশির দশকে প্রকাশিত বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের “বাংলা বিভাগের ইতিহাস” শীর্ষক গ্রন্থখানা ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। এই গ্রন্থখানার অভিনবত্ব হলো যে এখানে ১৯২১ সাল হতে ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত বাংলা বিভাগের সকল শিক্ষকের নাম ও তাঁদের প্রকাশনার অসম্পূর্ণ তালিকা এবং একই সাথে এই সময়ের মধ্যে বাংলা বিভাগে প্রথম হতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত সকল শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত শ্রেণীসহ নামোল্লেখ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থও রয়েছে কয়েকখানা। অধ্যাপক রঙ্গলাল সেনের “বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়”, (ঢাকা: শিখা প্রকাশনী, ২০০৩) গ্রন্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে কয়েকটি প্রবন্ধ রয়েছে যা নিঃসন্দেহে সুলিখিত ও গবেষণামূলক। উল্লেখ্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে অধ্যাপক রঙ্গলাল সেনের প্রবন্ধসমূহ ইতোপূর্বে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং লেখক সেকথা প্রথমেই উল্লেখ করেছেন। তবে অধ্যাপক রঙ্গলাল সেনের প্রবন্ধসমূহ সম্পূর্ণভাবে মৌলিক উৎসের উপর ভিত্তি করে রচিত নয় এবং কোন কোন প্রবন্ধে তথ্য-বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর” (ঢাকা: অনন্যা, ২০০৩) শীর্ষক গ্রন্থখানা অধ্যাবধি এ সম্পর্কে প্রকাশিত গ্রন্থে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির সাহায্যে রচিত। এই গ্রন্থখানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে তথ্যবহ। তবে এই গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে অসংলগ্নতা ও তথ্য-বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যায়। সৈয়দ রেজাউর রহমানের আয়াসসাধ্য “গৌরবোজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়”, (ঢাকা: মউর, ২০০১) শীর্ষক রচনাকে গ্রন্থ না বলে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘ডিরেক্টরী’ বা নির্দেশিকা বলা যায়। তবে এই গ্রন্থেও তথ্য-বিভ্রান্তি রয়েছে। এসকল তথ্য-বিভ্রান্তি বর্তমান গ্রন্থের বিভিন্নস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে উপরোক্ত গ্রন্থসমূহের পুনঃপ্রকাশের পূর্বে উল্লেখিত তথ্য-বিভ্রান্তির অবসান ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রয়াস গ্রহণ করা যায়।… যাইহোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে গবেষণার ক্ষেত্রে বর্তমান গ্রন্থকারের “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ, ১৯২১-২০০০” (ঢাকা: কল্যাণ প্রকাশন, ২০০২) ও “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী, ১৯২১- ১৯৫২” (ঢাকা: কল্যাণ প্রকাশন, ২০০৪) শীর্ষক গ্রন্থদ্বয়ের উল্লেখ করা যেতে পারে। এই মৌলিক গবেষণামূলক গ্রন্থদ্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি স্বতন্ত্র বিষয়ের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে।’

দুই.
বইয়ের প্রথম অধ্যায় (প্যাক্স ব্রিটানিকা বনাম ছাত্র-শিক্ষক) রচিত হয়েছে ঢাকায় ইংরেজ সৈন্য মোতায়েন ও এর ফলে সংঘটিত ঘটনা ও পরিস্থিতির বর্ণনা করে। লেখক জানাচ্ছেন, “ঢাকায় সর্বপ্রথম ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর আগমন ঘটে আঠারো শতকের শেষার্ধে ফকীর-সন্যাসী আন্দোলনের সময়। এখানে সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময়।… ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজ সেনাসদস্যদের সাথে প্রথমে তথা ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময়, যখন ছাত্র ও জনগণের উপস্থিতি সেনাবাহিনী অবাঞ্ছিত মনে করে। ক্রীড়া নৈপুণ্যে ব্যর্থ সেনাসদস্যের প্রতি ছাত্র ও জনগণের ‘হাসি’ সেনাসদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে জনৈক সেনাসদস্য উপস্থিত ছাত্র জনতাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিত ছাত্রদের কয়েকজন এর প্রতিবাদ করে। সেনাকর্তৃপক্ষ ছাত্রদের প্রতিবাদের প্রতি কর্ণপাত না করলে ছাত্রবৃন্দ প্রতিকারের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিকট গমন করে। কিন্তু উপাচার্য জর্জ হ্যারী লাংলী প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য তিনি এ বিষয়ে জরুরীভাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। উত্তেজিত ছাত্রবৃন্দ নিজদের অপমানিত মনে করে উপাচার্যের প্রতি অনাস্থামূলক মনোভাব প্রদর্শন করে। ফলে আত্মাভিমানী উপাচার্য জর্জ হ্যারী ল্যাংলী ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রদের প্রতি যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তা খুবই তাৎপর্যবহ।” বৃটিশ সেনাবাহিনী কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল এই অধ্যায়ে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলার রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের একাংশ প্রকাশ্যে বা গোপনে মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাদের সম্পর্কে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। লেখক এ অধ্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সম্পূর্ণ অজানা এক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।
—————————————————————–
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উস্কানী ও উত্তেজনা, এমন কি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও সংঘটিত হয়েছে একাধিকবার, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কিত সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গ তাঁদের কোন স্মৃতিচারণায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন নি<
—————————————————————-
তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। লেখকের ভাষায়, ‘আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক উস্কানী ও উত্তেজনা, এমন কি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও সংঘটিত হয়েছে একাধিকবার, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কিত সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গ তাঁদের কোন স্মৃতিচারণায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন নি, বরং কেউ কেউ এই বিদ্যাপীঠকে সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে বলে বক্তব্য রেখেছেন। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন বরেণ্য ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘জীবনের স্মৃতিদীপে’ গ্রন্থে উপাচার্য থাকাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সংঘটিত একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সম্পর্কে তাঁর দুঃখময় অভিজ্ঞতার তথ্য প্রদান করেছেন। লাহোর প্রস্তাবের পর ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনায় ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। মানুষ জাতি বিভক্ত ও চিহ্নিত হয় ধর্মের পরিচয়ে এবং সংঘটিত হয় নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলঙ্কিত হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগে। […] ১৯৫০ সালের দাঙ্গা এককভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধের প্রয়াস গ্রহণ করে হিন্দুদের প্রাণ বাঁচায়।’

চতুর্থ অধ্যায়ে নিম্নবেতন ভোগী কর্মচারীদের ধর্মঘট ও তাদের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের ঐক্য নিয়ে লেখা।

পঞ্চম অধ্যায় ‘সবশেষে পণ্ডিত বিদায় পালা’। লেখক জানাচ্ছেন, ‘দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলার সরকারের মধ্যে কোন সময় এমন ধারণার প্রতিফলন দেখা যায় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শিক্ষকবৃন্দ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধী এবং সরকার মনে করেন যে এসকল শিক্ষকবৃন্দের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষাসহ অন্যান্য আন্দোলনে মুসলিম ছাত্রসমাজ যোগদান করছে।

[…] এই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষক সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হিন্দু শিক্ষকদের সম্মান সমুন্নত রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রের আদর্শ যখন সাম্প্রদায়িক সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য স্থায়ীভাবে চলতে পারে না; সেখানে ব্যক্তিবিশেষের জন্য বিরাজ করে নিরাপত্তাহীনতা — যার ফলে শেষ পর্যন্ত হিন্দু শিক্ষকবৃন্দের অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হন।’

তিন.
লেখক জানাচ্ছেন, “এই গ্রন্থের সকল অধ্যায় মৌলিক উৎস ও উপাত্তের উপর ভিত্তি করে রচিত। এসকল মৌলিক উৎস ও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে বাংলাদেশ আরকাইভস্ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেকর্ড রুম হতে। উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের নথিপত্রের সত্যিকার অর্থে কোন নির্ঘণ্ট না থাকায় তথ্যানুসন্ধানে সুদীর্ঘ সময় লেগেছে। পরিশ্রমী গবেষক একটু সচেষ্ট হলেই তথ্য নির্দেশ অনুসরণ করে সহজেই বাংলাদেশ আরকাইভসের তথ্যসমূহ প্রয়োজনে যাচাই করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু উৎসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে “D-Register” শিরোনামে এক প্রকার নথিপত্র রয়েছে যার আয়োজন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি অতুলনীয়; কেননা পৃথিবীর কোন লেখ্যাগার, মহাফেজখানা বা আরকাইভসের আয়োজন ও সংরক্ষণ পদ্ধতির সাথে এর কোন মিল পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে এখানে রয়েছে বিবিধ প্রকার নথিপত্রের এক মূল্যবান সমাবেশ। বিশ্বের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগের দলিলপত্র। এ সকল ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আইনষ্টাইন, সত্যেন বসু, বার্টান্ড রাসেল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বহু সাহিত্যিকের পত্রগুচ্ছ।
—————————————————————–
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মচারী এসব দলিলপত্র [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আইনষ্টাইন, সত্যেন বসু, বার্টান্ড রাসেল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ বহু সাহিত্যিকের পত্রগুচ্ছ] পুড়িয়ে ফেলার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কেননা, তাঁর মতে এসব তথ্যাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের সম্পর্ক যুক্ত নয়। যাই হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডরূমে কর্মরত কর্মচারীদের চেষ্টায় এসব বহুমূল্যবান দলিলপত্র শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে।
—————————————————————-
D-Register এ পাওয়া যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় সমস্যা, পরিকল্পনা, উন্নয়ন, সমকালীন রাজনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তার সম্পর্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী সম্পর্কে বিস্তৃত ও প্রামাণিক তথ্য। বিজ্ঞ গবেষক ও পাঠক একটা কথা শুনলে অবশ্য আশ্চর্য হবেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মচারী এসব দলিলপত্র পুড়িয়ে ফেলার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কেননা, তাঁর মতে এসব তথ্যাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের সম্পর্ক যুক্ত নয়। যাই হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডরূমে কর্মরত কর্মচারীদের চেষ্টায় এসব বহুমূল্যবান দলিলপত্র শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে। বিষয়টি অবগত হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাঁরই হস্তক্ষেপে D-Register আসন্ন ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা পায় এবং স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডরুমের তৎকালীন শাখা অফিসার জনাব আবদুল কুদ্দুস সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উল্লেখ্য যে D-Register ছিলো খুবই এলোমেলো। এই ঘটনার পর জনাব আবদুল কুদ্দুস D-Register এর পূর্বতন আয়োজন পরিবর্তন করেন এবং প্রতিটি ফাইলের বিষয় উল্লেখ পূর্বক নতুন করে ফাইলের নম্বর দেন। এই ঘটনাটি ঘটেছিলো আমার তথ্য সংগ্রহের শেষের পর্যায়। ফলে আমার পক্ষে D-Register এর নতুন নম্বর এই গ্রন্থে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি এবং এর ফলে এই গ্রন্থের পাঠক D-Register-এর মূল উৎস খুঁজে পেতে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হবেন। D-Register ব্যতীত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেকর্ডরুমে রয়েছে হল সম্পর্কিত নথিপত্র এবং বিভিন্ন শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ফাইল। ব্যক্তিগত ফাইল দু’টি ভাগে বিভক্ত — একটি হলো ব্যক্তি এবং অন্যটি হলো নিয়োগ নথি। এ সকল দলিলপত্র সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী সাজানো এবং পাঠকবর্গ সহজেই এখানে মূল দলিলপত্র পাবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ আরকাইভস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেকর্ডরুমের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীগণের প্রতি আন্তরিকভাবে ঋণী। তাঁদের সহযোগিতা এই গ্রন্থের অধ্যায়সমূহ রচনার জন্য ছিল অতিপ্রয়োজনীয়। আমার সহধর্মীনি কল্যানী চক্রবর্ত্তী আমাকে সংসারের সকল কাজ হতে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দিয়ে আমার লেখার ক্ষেত্রে প্রচুর সময় ও সুযোগের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নিকট আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার সর্বশেষ ছাত্র শ্রী উত্তম কুমার পাল তাঁর নব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অপটু হাতে সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি কম্পিউটারে টাইপ করেছে। শ্রীমান উত্তমের এই প্রয়াস ও উদ্যমের ক্ষেত্রে নতুন যন্ত্রে কাজ করার আগ্রহ ছাড়াও আমার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধাও বিদ্যমান ছিল। শ্রী উত্তম কুমার পাল অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। শ্রীমান উত্তমের অপটু হাতে কম্পিউটারে টাইপকৃত পাণ্ডুলিপি মুদ্রণোপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করেছেন আমার বন্ধুবর শ্রী কিশোর কুমার মুখোপাধ্যায় ও শ্রী শিশির কুমার ঘোষ, যাঁদের সাহজিক সাপ্তপদীন সাহচর্য সততই আমার কাম্য।”

চার.
বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন এ. এস. এ. ভূঁইয়া শিহাব। প্রচ্ছদে বইয়ের নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস’ দেখা গেলেও ভেতরে নাম হিসাবে বাড়তি অংশ আছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস (১৯২১-১৯৫২)’। ৫২০ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম রাখা হয়েছে ৬৫০ টাকা। বাংলাবাজারের দি ইউনিভার্সেল একাডেমী ছাড়াও ঢাকার নিউ মার্কেটের ‘গ্রন্থকলি’সহ কিছু দোকানে বইটি পাওয়া যায়।

এ রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বইয়ের বানান ও বাক্য গঠনের ব্যাপারে লেখক আরো সময় দিতে পারতেন। এবং নিকটজনদের বদলে দক্ষ লোকদের দায়িত্ব দিলে প্রকাশনাটি প্রফেশনাল মান অর্জন করতো। লেখক ভূমিকায় আগে প্রকাশিত অন্যদের বই সম্পর্কে লিখেছেন, “এসকল তথ্য-বিভ্রান্তি বর্তমান গ্রন্থের বিভিন্নস্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে উপরোক্ত গ্রন্থসমূহের পুনঃপ্রকাশের পূর্বে উল্লেখিত তথ্য-বিভ্রান্তির অবসান ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রয়াস গ্রহণ করা যায়।…” ভালো পরামর্শ। বানান ও বাক্য সংস্থানের ব্যাপারে এ বইয়ের লেখক যদি পুনঃপ্রকাশের কালে প্রয়োজনীয় প্রয়াস গ্রহণ করেন ভবিষ্যৎ পাঠকের জন্য বইটি অনায়াস পাঠ্য হবে।

—————————————————————-
পৃষ্ঠা ৪৫>
drl_45.jpg

পৃষ্ঠা ৪৬>
drl_46.jpg
—————————————————————-
মেলার বই থেকে দুই পৃষ্ঠা

● ● ●


অদিতি ফাল্গুনী
তিতা মিঞার জঙ্গনামা

অরবিন্দ্‌ আডিগা
দ্য হোয়াইট টাইগার


আনোয়ারা সৈয়দ হক
সন্দেহ

আবদুল মান্নান সৈয়দ
ডায়েরি: ১৯৭৮-২০০৮

আবদুশ শাকুর
রসিক বাঙালি


এবাদুর রহমান
গুলমোহর রিপাবলিক


গোলাম মুরশিদ
আঠারো শতকের গদ্য: ইতিহাস ও সংকলন


জয়নাল হোসেন
রাজা ভাওয়াল সন্ন্যাস ও ভাওয়াল পরগণা

জাকির তালুকদার
মুসলমানমঙ্গল


নাসির আলী মামুন
শামসুর রাহমান আল মাহমুদ তফাৎ ও সাক্ষাৎ

নেসার আহমেদ
ক্রসফায়ার


বারাক ওবামা
দ্য অ্যডাসিটি অব হোপ


মুনতাসীর মামুন
দেয়ালের শহর ঢাকা

মশিউল আলম
বাবা


শহীদুল জহির
আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু


সাইমন জাকারিয়া
কে তাহারে চিনতে পারে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
কানাগলির মানুষেরা


হাসান আজিজুল হক
কে বাঁচে কে বাঁচায়

হুমায়ূন আহমেদ
আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রণ

(বইমেলা ২০০৯-এ প্রকাশিত বিবিধ বই উপস্থাপিত হবে এ বিভাগে।)


4 Responses

  1. শুভ says:

    বেশ ভালো একটি সাইট। এর ফলে সিলেটে বসে মেলার খোঁজ-খবর নিতে পারছি। ধন্যবাদ।

    – শুভ

  2. মনসুর আজিজ says:

    চমৎকার। দেখে খুবই ভালো লাগলো। এর মাধ্যমে বিদেশে যারা আছেন তারাও বাংলাদেশের বইমেলা ও নতুন বইগুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন। তবে বিখ্যাত লেখকদের বইগুলোই নয়, সেইসাথে কম পরিচিত লেখকদের বই সম্পর্কেও তথ্য থাকা জরুরি। বড় প্রকাশকদের প্রকাশিত বইগুলোর পাশাপাশি ছোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বইয়ের তথ্য থাকলেও ভালো হয়। মেলার নয় দিন অতিবাহিত হতে চলেছে সেই তুলনায় বইয়ের সংখ্যা কম কেন?

    – মনসুর আজিজ

  3. রশীদ আমিন says:

    এই সাইটটি ভাল লেগেছে , সূদুর চীন দেশে বসে বই মেলার খবর পাচ্ছি।

    – রশীদ আমিন

  4. ইতিহাসবিদ ড. রতনলাল চক্রবর্ত্তীর এই গ্রন্থটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সেই রতনলাল চক্রবর্ত্তীও ‘পণ্ডিত বিদায় পালা’-র পণ্ডিত হিসেবে নিজের নাম লেখাতে বাধ্য হয়েছেন। দেশে ছেড়ে চলে গেছেন অজানা শঙ্কায়। এই ধরনের পণ্ডিত শিক্ষকদের আমরা ধরে রাখতে পারিনি, হায়!

    রতন স্যার এখন কোথায় আছেন?

    – তপন বাগচী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.