আর্টস

‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’ : মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় সংকলনের উজ্জ্বল উদাহরণ

আবদুল্লা আল মোহন | 25 Dec , 2018  


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার নামের আগে-পরে কোন বিশেষণ যোগ করার দরকার হয় না। এক কঠিন সংগ্রামের পথ বেয়ে নিজ প্রতিভায় বিকশিত তিনি। বিশ্বমানবের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত আজ তিনি। সাঁইত্রিশ বছর ধরে একটানা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে থাকা, তিন-তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং এখনও প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা সত্যিই গর্বিত হওয়ার মতো। পিতার মতো দুর্জয় সাহস নিয়ে দেশের রাজনীতি ও জনগণের পক্ষে নিজের দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন, যুদ্ধ করছেন মানবিক রাজনীতির সমাজ সৃষ্টিতে। আর তাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখনও এগিয়ে চলছেন। এই সুযোগ্য নেতার বহুমাত্রিকতা এবং ব্যক্তি মানুষকে নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সাবেক ছাত্রনেতা লেখক ও গবেষক রুদ্র সাইফুল এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ধীমান লেখক গোলাম রাব্বানী সম্পাদিত ‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’ শীর্ষক সংকলন। গ্রন্থটি ৫০টি প্রবন্ধের সমন্বয়ে সংকলিত হয়েছে। দেশবরেণ্য লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের লেখা নিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। এই গ্রন্থে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার সামগ্রিক অর্জন ও সফলতার আদ্যপান্ত। লেখকদের মূল্যবান প্রবন্ধে সংকলিত এই গ্রন্থে বাংলার গণমানুষের প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার দীর্ঘ জার্নির কথা উঠে এসেছে। কারো কারো লেখায় উঠে এসেছে নেতা ও মানুষ শেখ হাসিনার ব্যক্তিজীবনের অজানা কথাও। জানা যায়, অপরূপ সম্ভাবনার বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা আজ যে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে তাতে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে নিশ্চিত।

দুই
‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘একাত্তর’। ৩২০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের মূল্য রাখা হয়েছে ৬০০ টাকা। ‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’ গ্রন্থের সম্পাদনা পর্ষদে আছেন-আবেদ খান, ড. আতিউর রহমান, অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, নিজাম চৌধুরী, অধ্যাপক ওমর সেলিম শের, কামাল পাশা চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, এস এ রহমান অরূপ, মাহমুদা আফরোজ লাকী, তৌহিদুর রহমান হিমেল, জুলিয়াস সিজার তালুকদার। বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসের আলোকে লিখিত রচনায় সমৃদ্ধ বইটি পাঠ করে ঋদ্ধ হই। আমরা জানি, এদেশের গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বদা সোচ্চার ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি জাতীয় পরিচিতি দিয়ে গেছেন। তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বিশ্বে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে নিয়ে ব্যতিক্রমী পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র সূচিত হয়েছে। সেই মহান নেতৃত্বের নানা দিকের আলোকপাতে কল্যাণের রাজনীতির শিল্পকলাকে অনুধাবনে উপকৃত হই। সরকার ও রাজনীতির একজন ছাত্র হিসেবে প্রতিথযশা অর্থনীতিবিদদের মন্তব্য বুঝতে কষ্ট হয় না-বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীজন হওয়ার জন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার প্রয়োজন নেই, ব্যক্তি সদিচ্ছা দিয়ে উন্নয়নের চিত্র মূল্যায়ন করতে জানার মনোভাবটা শুধু চাই।

তিন
‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’ গ্রন্থটি যাদের লেখায় সাজানো সংকলিত হয়েছে তারা হলেন: এম এ ওয়াজেদ মিয়া, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, পবিত্র সরকার, তোফায়েল আহমেদ, ওয়ালিউর রহমান, শামসুজ্জামান খান, আবেদ খান, বেবী মওদুদ, মোহাম্মদ নাসিম, নূহ-উল-আলম লেনিন, ড. শরীফ এনামুল কবির, ড. আতিউর রহমান, প্রাণ গোপাল দত্ত, মুনতাসীর মামুন, ড. হারুন-অর-রশিদ, আবদুল মান্নান, প্রকৌশলী এম এ মান্নান, মুহম্মদ শফিকুর রহমান, এম. নজরুল ইসলাম, মো. সাহাবুদ্দিন চুপপু, ড. মীজানুর রহমান, ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. শহীদ উল্লা খন্দকার, ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার, মহসীন হাবিব, সুভাষ সিংহ রায়, মাহবুবুল হক শাকিল, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আফজাল হোসেন, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন, অধ্যাপক ড. রেবা মণ্ডল, ডা. নুজহাত চৌধুরী, কেয়া চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, নাজনীন বেগম, মিল্টন বিশ্বাস, মাহমুদুল বাসার, সাজ্জাদ সাকিব বাদশা, আশরাফ সিদ্দিকী বিটু, সিলভিয়া পারভিন লেনি, শেখ আদনান ফাহাদ, মশিউর রহমান, আমিনুল হক পলাশ, গোলাম রাব্বানী, ড. শাহজাহান মণ্ডল, সাদ্দাম হুসেইন, ইব্রাহিম হোসেন।

চার
এই গ্রন্থের নিবন্ধগুলোতে বাংলার গণমানুষের জননন্দিত নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিশুকাল, রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা, বহু চড়াই-উতরাই, শিক্ষাজীবন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াবহ কালরাত্রি পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার রাজনৈতিক জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন চার দশকের বেশি সময় ধরে চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদী বিধৌত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবকাল কাটে পিত্রালয়ে। ৫৪’র নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বাবা-মার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবন থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। শুধু জাতীয় নেতাই নন, তিনি আজ তৃতীয় বিশ্বের একজন বিচক্ষণ বিশ্বনেতা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন নতুন ভূমিকায়। সর্বশেষ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ‘বিশ্ব মানবতার বাতিঘর’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন বিশ্ব নেতাদের কাছ থেকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় শেখ হাসিনা কেবল আমাদের জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা এবং তাঁর রাজনীতির উত্তরসূরি হিসেবে গণমানুষের প্রধান নেতার আসনে স্থান পাননি, তিনি জেল-জুলুম, মামলা-হামলা, হত্যা চেষ্টাসহ হাজারো হুমকির মুখে অটল থেকে নেতৃত্বের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি নবপর্যায়ের বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের নির্মাতা।

পাঁচ
শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তার হাত ধরে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। দেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য শেখ হাসিনা বিশ্রামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষক শেখ হাসিনার উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসা করে তাকে আধুনিক যুগের জোয়ান অব আর্ক হিসেবে তুলনা করেছেন। তাকে গণমানুষের প্রতীক হিসেবে বলা যেতে পারে। শেখ হাসিনার মধ্যে সহজ-সরল মহত্ত্ব রয়েছে, যা সকলের শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা আকর্ষণ করে। নানা ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে জাগ্রত তিনি। সমগ্র জাতিকে নিষ্ক্রিয়তা, নির্জীবতা, বিমূঢ়তা থেকে মুক্ত করার জন্য দীর্ঘ লড়াই তিনি অব্যাহত রেখেছেন। সংগঠক হিসেবে নিজ দলকে এবং দেশকে করে তুলেছেন গতিশীল। তিনি বাঙালির প্রতীক এবং পুরো দেশের প্রতিনিধি। স্বাধীনতার শত্রুমুক্ত দেশের জন্য আজও তার নির্দেশ পুরো জাতিকে সাহসে উজ্জীবিত করে রেখেছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অগ্রসরতার নায়ক শেখ হাসিনা বিশ্ব-নায়ক অভিধার দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন বলেই বিভিন্ন রচনায় তাকে নিয়ে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে, তার সাথে সংশয় প্রকাশ করার সুযোগ নেই।

ছয়
আমরা জানি, শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় টুঙ্গিপাড়ার এক পাঠশালায়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর পরিবারকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তিনি পুরান ঢাকার মোগলটুলির রজনী বোস লেনে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হন। আবাস স্থানান্তরিত হয় ৩ নম্বর মিন্টো রোডের সরকারী বাসভবনে। ১৯৫৬ সালে শেখ হাসিনা ভর্তি হন টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে। এভাবেই শুরু হয় তাঁর শহরবাসের পালা, তাঁর নাগরিক জীবন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটির দারোদ্ঘাটন হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত এই বাড়িতেই অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে শেখ হাসিনা আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ঢাকার বকশী বাজারের পূর্বতন ইন্টারমিডিয়েট গবর্নমেন্ট গার্লস কলেজ (বর্তমান বদরুন্নেসা সরকারী মহিলা মহাবিদ্যালয়) থেকে। ওই বছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কলেজছাত্রী সংসদের সহ-সভানেত্রী পদে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় কিশোর বয়স থেকেই তার রাজনীতিতে পদচারণা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন এবং ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সহজ সারল্যে ভরা তার ব্যক্তিগত জীবন। মেধা-মনন, কঠোর পরিশ্রম, সাহস, ধৈর্য, দেশপ্রেম ও ত্যাগের আদর্শে গড়ে উঠেছে তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। পোশাকে-আশাকে, জীবনযাত্রায় কোথাও তার বিলাসিতা বা কৃত্রিমতার কোন ছাপ নেই। নিষ্ঠাবান ধার্মিক তিনি। নিয়মিত ফজরের নামাজ ও কোরান তেলওয়াতের মাধ্যমে তার দিনের সূচনা ঘটে। পবিত্র হজব্রত পালন করেছেন কয়েকবার।

সাত
শেখ হাসিনা সম্প্রতি তার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাল্যকাল থেকে আমি দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমার বাবা ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের অপরিসীম নির্যাতনের আমি সাক্ষী। আমার বাবা তাঁর জীবনের বিরাট একটি অংশ জেলে কাটিয়েছেন। যখনই জেলের বাইরে ছিলেন, রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও দলের সাংগঠনিক কাজে নিজেকে তিনি ব্যস্ত রেখেছেন। আমার মাকে দেখেছি বাবার রাজনৈতিক সাথী হিসেবে এবং বাবার অনুপস্থিতিতে পর্দার আড়াল থেকে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দলীয় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমাদের পারিবারিক পরিবেশে আমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ১৯৬২ সালের দুর্বার ছাত্র আন্দোলন এবং স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির সমর্থনে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের সময় আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। সারাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা- ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও জনসাধারণ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবির ম্লোগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। আমি বিক্ষোভ-মিছিল ও সভায় যোগ দিয়েছি, গণবিরোধী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছি। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে কোন রাজনীতি-সচেতন বাঙালীর পক্ষে রাজনীতির মূলধারা থেকে বিচ্যুত থাকা সম্ভব ছিল না। কাজেই আমিও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারিনি।’

আট
আমরা জানি, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ৬ দফা দাবিতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এক অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়। শাসকগোষ্ঠী ভীত-সন্তস্ত্র হয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। শুরু হয় প্রচ- দমন-নির্যাতন। আটক থাকা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী দায়ের করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তার জীবন ও পরিবারের ওপর নেমে আসে গভীর বিপদাশঙ্কা ও দুঃসহ দুঃখ-কষ্ট। এই ঝড়ো দিনগুলোতেই, কারাবন্দী পিতা বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয় ১৯৬৮ সালে।বিয়ের কিছুদিন পর শুরু হয় ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেত্রী হিসেবে তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন। জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ডাক আসে দেশ-মাতৃকার হাল ধরার। সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম। জেল-জুলম, অত্যাচার কোনকিছুই তাঁকে তাঁর পথ থেকে টলাতে পারেনি।

নয়
লেখকদের রচনায় শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার পুরো সাফল্যটাকে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরেছেন : ১. সামরিক শাসনের অবসান ঘটানো, ২. জাতির জনকসহ সব নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচারের জন্য সোচ্চার হওয়া এবং সর্বশেষ বিচার করা, ৩. জাতির জনকের নেতৃত্বে প্রণীত ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে আসা, ৪. অনগ্রসরতা ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, ৫. বাধ্যতামূলক ফ্রি শিক্ষা এবং উপবৃত্তি প্রদান, ৬. ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারী সম্পত্তি ভোগ-দখলমুক্ত করা, ৭. নারী শিক্ষাসহ নারী অগ্রগতি এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা, ৮. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং খাদ্য রফতানি করে অতীতের সব অপবাদ ঘোচানো, ৯. কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং সময়মতো সার বিতরণ, ১০. প্রতি বছর ১ জানুয়ারি বিনা মূল্যে বই বিতরণ এবং একযোগে সারাদেশে বই উৎসব, ১১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিতকরণ এবং রায় বাস্তবায়ন, ১২. মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং ভাতা ও বেতন অক্ষুন্ন রাখা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি, ১৩. বিদ্যুত উৎপাদনে অসামান্য অর্জন, ১৪. বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ১৫. রাস্তাঘাট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, ১৬. মৎস্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানো, ১৭. সবজি উৎপাদন ও রফতানিতে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ, ১৮. রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন, ১৯. ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, ২০. উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতকরণ, ২১. আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা জয়, ২২. ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিরোধের স্থায়ী সমাধান, ২৩. সড়ক-মহাসড়ক ও জনপদের ব্যাপক উন্নয়ন, ২৪. রেলপথ উন্নয়ন ও মেট্রোরেল স্থাপন, ২৫. ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ২৬. সর্বশেষ মহাকাশ জয় অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, ২৭. তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা এবং পরিবার পরিকল্পনার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রতি ৬০০০ জনের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা ও উপদেশ প্রদান, ২৮. ভূমি সংস্কার, ২৯. ধর্মকে রাজনীতির বাইরে তার নিজস্ব পবিত্র আসনে প্রতিষ্ঠা, ৩০. ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্রের খাদ্য সংস্থান, ৩১. পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ ও কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করা, ৩২. গড় আয়ু বৃদ্ধি, ৩৩. শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস, ৩৪. ধর্মীয় স্বাধীনতা, ৩৫. অটিজমসহ স্নায়ুবিক দুর্বলতার স্বীকার শিশুদের ভাতা এবং বিশেষ যতœ এবং বিশেষ সুরক্ষা ট্রাস্ট আইনসহ ৩৬. সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রগতিও সমতা অর্জন এবং কল্যাণকর রাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন সেক্টরে ভাতা প্রদান ইত্যাদি অনেক উন্নয়নমূলক কাজ। রাষ্ট্রের এই অগ্রযাত্রা, সার্বিক উন্নয়ন সূচকের উন্নতি, কৃষিতে সমৃদ্ধি ইত্যাদি অনেক কারণেই তিনি আজ জগৎ নন্দিনী।

দশ
২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো প্রধান ইরিনা বোকোভা শেখ হাসিনার হাতে ‘শান্তি বৃক্ষ’ পদক তুলে দেয়ার সময় বলেছিলেন, ‘সাহসী নারী শেখ হাসিনা সারা পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছেন।’ দারিদ্র্য বিমোচন, শান্তি স্থাপন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, সুশাসন, মানবাধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যখাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নারী ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো এবং ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাফল্যে প্রশংসনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশরতœ শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন বিদ্যাপীঠ তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করেছে। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭০তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ প্রদান করা হয় তাঁকে। নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সারা বিশ্বে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে।

এগারো
বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রীতোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, ‘তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করেন। ক্যাবিনেট মিটিংগুলোতে যথাযথ হোমওয়ার্ক করে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে মিটিংয়ে আসেন। একনেক বা ক্যাবিনেট মিটিংয়ের দু’একদিন আগেই মিটিংয়ের আলোচ্যসূচী, প্রস্তাবাবলি আমাদের ফাইলে দেয়া হয়। যখন একটি বিষয় প্রস্তাব আকারে পেশ করা হয় তখন সেই বিষয়ের খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় তিনি সভায় সবিস্তারে তুলে ধরেন এবং সঠিকভাবে প্রতিটি প্রস্তাবের উপরে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেন। তাঁর এই অবাক করা প্রস্তুতি আমাদের মুগ্ধ করে। জাতির পিতার কন্যার কাছে গরিব-দুঃখী মানুষ যখন হাত পাতে পিতার মতো তিনিও তাদের সাহায্য করেন।আমাদের দেশে যারা বুদ্ধিজীবী-কবি-সাহিত্যিক-সমাজসেবক, তাঁদের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ান তিনি। একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বহু পুরস্কার এবং খেতাবে তিনি বিভূষিত। পিতা-মাতার মতো সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত শেখ হাসিনা সংস্কৃতিবান এবং খাঁটি বাঙালী নারী। বাংলার মানুষের প্রতি শেখ হাসিনার দরদ এবং মমত্ববোধ, তাঁর জ্যোতির্ময় পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনা থেকে আহরিত। তবে এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে, তিনি কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসেবে পরিচিত, বরং আপন যোগ্যতায় সমহিমায় বাংলার কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি অধিষ্ঠিত। শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক না, আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে ইতোমধ্যে বিশ্বজনমত ও নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণে তিনি সক্ষম হয়েছেন।’

বারো
অনেকের আলোচনায়, রচনাতেই ঘুরে-ফিরে এসেছে, ফুটে উঠেছে শেখ হাসিনার জীবনের প্রায় চার দশকের আন্দোলন, নির্বাচন, বিরোধী দলের আসনে বসা গণতন্ত্রের স্বার্থে জীবনের সব ধরনের ঝুঁকিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সহজভাবে মেনে নেওয়ার কথা। বঙ্গবন্ধু যেমন সামরিক শাসনের অধীনে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে গণতন্ত্রের জনক আব্রাহাম লিঙ্কনকে স্পর্শ করেছিলেন তেমনি একাত্তরের ৭ মার্চের পরে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধীর সমকক্ষ হয়েছিলেন এবং ২৬ মার্চ সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বা চে গুয়েভারাকে অতিক্রম করেছিলেন। সেই যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে গঠন করে চলছেন সেই দুঃখিনী কন্যা শেখ হাসিনা।বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. প্রাণগোপাল দত্তের মতে, ‘১৭ মে ১৯৮১ মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে প্রকৃতির কান্নার মাঝে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সে ভাষণ ছিল বাংলাদেশের নিয়তির অভিসার। সর্বস্ব হারানোর ব্যথা, দৃপ্ত শপথ, ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে, যেই রাজনৈতিক দর্শন তিনি অন্তরে লালন করেছেন, তা ছিল বাঙালী জাতি তথা বাঙালীর মুক্তির অভিপ্রায়। ১৯৮১ থেকে ২০১৮, সুদীর্ঘ ৩৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি দেশের ইতিহাসে এটা খুবই অল্প সময়। অল্প সময় হলেও প্রাপ্তি এক বিশাল। মানবকল্যাণ সূচক উন্নয়নের দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায় এবং গবেষণায় বাংলাদেশ-ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায় সবাই এ উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ Award দিতেও কুণ্ঠিত বোধ করেনি।’

তেরো
বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অনুধাবনের পাশাপাশি নেতৃত্বের বিকাশধারা গবেষণার ক্ষেত্রে‘গণমানুষের শেখ হাসিনা’সংকলনটি একটি আকরগ্রন্থ। বর্তৃমান এবং ভবিষ্যতকালের রাজনীতি সচেতন পাঠকের, গবেষকের জন্য এই সংকলন প্রকাশনা একটি অতি প্রয়োজনীয় ও জরুরি দায়িত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করি। অনেক প্ররিশ্রমের মাধ্যমে সংকলন প্রকাশনার জন্য সম্পাদকদ্বয়কে সাধুবাদ জানাই। তাদের যৌথ এই মহতী উদ্যোগকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে কোন প্রকার কৃপণতা প্রকাশ সুবিবেচনার হবে না বলেই স্বীকার করি। আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণৃ দলিল এই গ্রন্থটির বহুল প্রচারণা ও পাঠ প্রত্যাশা করি।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.