বইয়ের আলোচনা

গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্তর শিল্পকৌশল ও স্বাতন্ত্র্য

নন্দিতা বসু | 31 Dec , 2018  


গল্পরচনা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে চলেছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তাঁর ছাত্রজীবন থেকে। যতদূর জানি বগুড়াতে কলেজে পড়বার সময়ে কলেজ ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম গল্পটি প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত একটানা ভাবে লিখে গেছেন এবং ১৯৮৮ থেকে আজ পর্যন্ত গল্পলেখা নিয়ে জ্যোতিপ্রকাশের অবিরাম পরীক্ষানীরিক্ষা চলেছে। মাঝখানে যে আঠারো বছরের বিরতি তার কারণ ১৯৬৯ তে জ্যোতিপ্রকাশ আমেরিকা যুক্তরাস্ট্রে পড়াশোনার জন্য চলে যান এবং নানাকাজে জড়িয়ে পড়াতে লেখার দিকে মন দিতে পারেননি।
গল্পরচনার এক ভিন্ন রীতির উপস্থাপনা পাই তাঁর লেখায়। বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জীবনের নানা দিক নিয়ে তিনি নিরন্তর বুনে চলেছেন গল্পের পর গল্প। ঢাকা থেকে মাওলা ব্রাদার্স তাঁর দুটি গল্প-সংকলন প্রকাশ করেছেন, প্রকাশিত কিন্তু অগ্রন্থিত গল্প-ও আছে, আছে ‘শীতাংশু তোর সমস্ত কথা’র মত সংকলন-ও। জ্যোতিপ্রকাশের গল্পের ভাষা এবং বুননের মধ্যে এমন একটা পারিপাট্যের ছাপ আছে যে অনেক নিবিষ্টতা নিয়ে এই গল্পগুলি পড়তে হয়, একটু অসতর্ক হলেই গল্পের অনেকটা হারিয়ে যায়। কারণ গল্পগুলিতে অনেক ভাঁজ আছে, আর সে ভাঁজে ভাঁজে লুকোনো আছে গল্পগুলির প্রাণস্পন্দন, যা পদে পদে না চাখলে তার পুরোমাত্রার স্বাদ অধরা থেকে যায়। আর একটা কথাঃ জ্যোতিপ্রকাশের গল্পগুলি কিন্তু একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্যে ধরা যায় না। কারণ প্রতিটি গল্পের মালমশলা আর বাঁধনরীতি আলাদা। এই কথাটা আমাদের মাথায় গজাল মেরে না ঢোকালে চলবে না। এই লেখকের কিছু গল্প আছে যার মধ্যে ঘটনা ততটা নেই, যেমন, ’যদি পাড় ভাঙে’ বা ‘যদি পাখি না ওড়ে’, ‘যেন এক চিরন্তনী গল্প’; বা ‘শূন্য গগনবিহারী’ ইত্যাদি যেখানে লেখক জীবনের একটি দৃশ্য দেখিয়ে যেন এই দৃশ্যটি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনায় মেতে যান গল্পটির প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত মায়াবী প্রকৃতিকে স্থাপন করে। পাঠক ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা যে গল্পের পাত্র-পাত্রী কি করছে বা ভাবছে, গল্প যেন কেন্দ্রান্তরিত হয়ে প্রকৃতির মায়াজড়ানো সৌন্দর্যে নিমজ্জিত করে পাঠককে অন্য এক লোকে নিয়ে যায়। তাতে অবশ্য পাঠক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, কারণ ততক্ষণে অন্য স্বাদের অন্য এক প্রাপ্তিতে পাঠকের ঝুলি ভরে ওঠে । ‘যদি পাখি না ওড়ে’ গল্পটির কথাই ধরা যাকঃ দুই সামান্য পরিচিত নরনারীর হঠাৎ করে দেখা যায় নদীতীরে। নারীটি ঘরে ফিরে যেতে চায়না জেনে, জীবিকা অর্জনে অসফল পুরুষটিও ঘরে ফিরতে বিশেষ ইচ্ছুক নয়, তখন দুজনে মিলে এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নানা বাধায় বেশি দূরে যেতে পারে না তারা। নদী পেরোবার জন্য খেয়া নৌকা পাওয়া যায়না। পরদিন যদিও বা পাওয়া যায়, ঘাট পেরিয়ে লালমাটির পাহাড়ের দিকে বেশি এগোতে পারেনা তারা। পাখির দল পথ ঘিরে থাকে, সঙ্গিনীটি চায় শেষ পাখিটি উড়ে গিয়ে পথ ছেড়ে দিলে তবেই সে যাবে।
গল্পটিতে ঘটনার বহর ওইটুকুই। কিন্তু এর মধ্যে লেখক বুনে দিয়েছেন বর্তমান বাংলাদেশের জীবন ও জীবিকার তীব্র সঙ্কটকে। পরিবারগুলি বড় হতে হতে জমি ভাগে চাষ করে আর পেট চালানো যাচ্ছেনা। তাই বাধ্য হয়ে জীবিকান্তরে যেতে হচ্ছে। কেউ তিন চাকার গাড়ি চালিয়ে, কেউ ঠেলায় করে প্রত্যন্ত এলাকায় আচার বিক্রি করে দিন গুজরানের চেস্টা করছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও প্রকৃতি কুহকিনী পাত্রপাত্রীকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের রাজ্যেঃ বালিয়াড়ির শেষে যখন তারা নদীটির পাড়ে এসে দাঁড়ায় , তখনো সূর্যে তাপ আছে। শুকিয়ে যাওয়া মহানদীর বালিয়াড়ি পার হওয়া বড় ক্লেশের। কেবল তারা দুজন-ই নয়, নিজ হাতে বিছানো কাঠের গাড়িটিও তাদের সঙ্গে। সেটিকেও কখনো চালিয়ে, কখনো ঠেলে আনতে হবে জলের সীমানায়।
সময়ের মহানদী এখন ক্ষীণস্রোতা। সময়ের সঙ্গেই তার জল দূরে চলে যায়। ফেরে কখনো বর্ষায়। তখন বালিয়াড়ি থাকে না। নদীর নিচে শুয়ে পড়ে। গাঙশালিকের ঝাঁক উড়ে বেড়ায়, কখনো কেউ বেগে নামে নদীর বুকে—জল ছুঁয়ে ওপরে উঠে যায়। কিন্তু তখন ঐ না-বর্ষা, না-শরৎ না-হেমন্তের কালে, মরা কার্তিক আর ধূসর অঘ্রাণের শেষে কেউ থাকে না। আসে যদি তখন বসন্ত, কোনো ফুলবন দেখা যাবে না, এটা বনভূমি নয়, কেঊ সাজবে না, খাতে নেমে যাওয়া নদীর বালিয়াড়ির বুকে ছায়া ফেলে উড়বে তখন অজানা পাখির দল’।
এই যে এক গল্পের ভাঁজে আরেকটা গল্প গুঁজে দেওয়া হয়েছে তাতে কিন্তু গল্পটি ডানা ভেঙে কোথাও মুখ থুবড়ে পড়েনি এটা জ্যোতিপ্রকাশের লেখার এটা একটা চোখে পড়ার মত বৈশিষ্ট্য। যেহেতু এই গল্পটি ঘটনাপ্রধান নয়, পাঠক ঠিক ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা যে কেন ঐ মহিলাটি ঘর ছেড়ে চলে এসেছে, কেনই বা কাঠ-চেরাই এর জন্য গাছ খুঁজে বেড়ানো লোকটি একটি তিন চাকার গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করে, সেটি কি একটা সাইকেল রিক্সা না অটো রিক্সা, চাকাগাড়ি নিয়ে আচারবিক্রেতার সঙ্গে ওই ঘর ছেড়ে আসা মহিলাটির কি কোনো যোগাযোগ আছে এসব প্রশ্নগুলি বড় হয়ে ওঠেনা, কারণ আগের যেটার উল্লেখ করা হয়েছে যে গল্পটা অন্যস্তরে এমন একটা মায়াভোজ তৈরি করে যে পাঠক আগের না পাওয়াগুলির কথা ভুলে যায়। এই যে গল্পে ঘটনার মাত্রা কমিয়ে, বা ঘটনার অংশকে বেশ খানিকটা নেপথ্যে রেখে নিমীলিত এক দৃষ্টিতে লেখক বাস্তবকে পরিবেশন করেন, অথবা বলা যায় গল্পের বিষয়বস্তু করে তোলে, যা বাংলা গল্পের পক্ষে এক নূতন ঘরানাও বটে, তার সৃষ্টিকার হলেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।
আবার অনেক গল্পে তিনি লৌকিকের সঙ্গে অলৌকিককে মিশিয়ে দিয়েছেন। উপরে যে গল্পটির কথা আমরা আলোচনা করলাম তার মধ্যেও এই ভাবটি আছে। বিশেষভাবে আছে ‘রূপসাগরে ডোবে না ঈভ’ গল্পে। মাসির এক বান্ধবী, যাদের সংসার অত্যন্ত দারিদ্র্যক্লিষ্ট, মাতৃহীন সংসারে মেয়েটি ভুতের খাটুনি খাটে, তার জনমজুর বাবা বেশিরভাগ দিন-ই অসুস্থ শয্যাশায়ী থাকে বলে বাবার কাজগুলো মেয়েটিকে সামলে দিতে হয়। শুধু গৃহস্থালি বা বাবার কামলা খাটার কাজ নয়, বনে-বাদাড়ে ঘুরে শাকপাতা সংগ্রহ করে, বাড়ির পেছনে সব্জি ফলিয়ে পরিবারে অর্ধাহারের ব্যবস্থাও করে মেয়েটি। অত্যন্ত স্নেহময়ী, পরোপকারী, কর্মপটু সে, লেখাপড়ার সুযোগবঞ্চিত, কিন্তু গল্প শুনতে ভালোবাসে। কিন্তু জন্মদুঃখিনী সে, কিছু শারীরিক ত্রুটির জন্য বিয়ের পর পর-ই স্বামীপরিত্যক্তা হয়। এমনটি যে ঘটবে তার জন্য সে প্রস্তুত-ই ছিল। এবং রাতের অন্ধকারে পদ্মবিলের দিকে ছুটে যায়।
কিন্তু আত্মহত্যা করে কি? স্পষ্টভাবে গল্পে বলা নেই কিন্তু। কিছু ইঙ্গিত আছে সেখানে, যা দিয়ে গল্পের ঘটনার ক্রমটি আমাদের বের করে নিতে হবে। আমাদের এই আলোচনায় আগের গল্পটি ‘যদি পাখি না ওড়ে’-র তুলনায় ‘রূপসাগরে ডোবে না ঈভ’ –এ বাইরের ঘটনার ক্রম বেশি। এই গল্পের যে কথক সে ন’দশ বছরের একটি মাতৃহীন বালক, গ্রামে মামাবাড়িতে থাকতে এসেছে, যেখানে বৃদ্ধ দাদু-দিদিমা, বিধবা মাসি এবং একজন কুমারী মাসি থাকেন। ছোটমামা শহরে থেকে টাকা রোজগার করে সম্ভবত গ্রামের বাড়ির সকলের অন্ন সংস্থান করেন, বাড়ি এলে গায়ে খেটে সংসারের নানাবিধ সুসার করেন, কথক ছেলেটি তাকে বেড়া বাঁধার কাজে সাহায্য করে, দূরের পোস্টাপিস থেকে বাড়ির চিঠি নিয়ে আসে, দাদুর সঙ্গে বাজারে যায়। মাসির কাছে শুতে দেওয়া হয় না তাকে হয়তো এজন্য যে মাসির শোয়া খারাপ ছিল। মাসি ও তার সইকে গল্প শুনিয়ে মুগ্ধ করত কথকটি। গল্পটির এই মঞ্চসজ্জা আমাদের চেনা পৃথিবীকে চিনিয়ে দেয়। কিন্তু, ‘রূপ সাগরে ডোবে না ঈভ’ –এর প্রাণভোমরা এখানে নেই, এর প্রাণভোমরা আছে লৌকিকের সঙ্গে অলৌকিকের, বাস্তবের সঙ্গে না-বাস্তবের মিশ্রণে। কীভাবে? গল্পে তার অজস্র সংকেত ছড়ানো আছে। তার দু’একটি নিদর্শনঃ গল্পের সূচনাতেই একটা রূপকথার বিবৃতি যাতে সৎমার সংসারে দুঃখিনী ছিন্নবস্ত্রা কন্যাটি পদ্মবিলে ডুব দিয়ে রাজকন্যার পোশাকে, অলঙ্কারে পুনঃ প্রকাশিত হয়। তা দেখে তার হিংসুটি সৎবোনটি সেই বিলে ডুব দিয়ে উঠে দেখে জলজ কীট ঘিরে আছে তার শরীর, তার মখমল-মসলিনের পোশাক অন্তর্হিত হয়ে ভিখারিণীর চিরবস্ত্রে সজ্জিতা সে। আমাদের বিবেচ্য এই গল্পটিতে এই পটভূমিরচনা করে লেখক কী সংকেত দিতে চাইলেন? একাধিক জায়গায় গল্পের মূল চরিত্রের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে “তুই যা বলিস সব-ই সত্যি হয়। এটিও হবে, তাই না? কিন্তু কী ঘটলো গল্পের শেষে? বিয়ের রাতেই মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হোল। কোথায় গেল সে? গভীর রাতে কথক বালকটি দেখলো নববিবাহিতা তার পাশে শুয়ে আছে। সে বলে “কাউকে ডাকিস না। এই আমি চলে যাচ্ছি ওরা আমায় নিল না। সাদা জ্যোৎস্নায় তার চোখে জলের রেখা স্পষ্ট দেখা যায়। তখন প্রায় নিঃশব্দে বলে সে, না থাক আমার কিছু—-আমিও তো মেয়ে। তার সঙ্গে আমিও উঠে দাঁড়াই। আমাকে আবার , শেষবারের মতোই বুঝি, জড়িয়ে ধরে সে। বলে তোর কথা সব-ই তো সত্যি হয়, তাই না? আমি কিছুই না ভেবে, কোনো কথা না ভেবে, সত্য কী অথবা কী মিথ্যা না-ভেবে চোখ বন্ধ করে বলি, হ্যাঁ।
আমাকে ছাড়ে সে। বারান্দা থেকে নেমে বাইরের দরজার দিকে যায়। জ্যোৎস্নার আলো আবার তখন মানকচুর পাতাটিকে কনে বঊ বানিয়ে দেয়।
পরদিন সারা গাঁ খুঁজেও তাকে কেঊ পাবে না। আমি যদিও জানি সে কোথায়। জানি, সে বড় রাস্তার শেষে পদ্মবিলের কিনারা দিয়ে যাওয়া পায়ে হাঁটা পথ ধরে হাঁটবে। জ্যোৎস্নার শেষে না-আলো না-অন্ধকারের প্রভাত তার সামনে পথরেখা স্পষ্ট করে দিলে, সে তার সামনে পাশে পদ্মবিলের শ্বেতরক্তিম শালুক আর সোনালি পদ্মের যোজনবিস্তৃত প্রান্তর দেখবে। আকাশের কোলে লাল মেঘের নিচে তখন আলোর আধার। সেই আলোয় চিনে নেবে সে পদ্মবিলের স্বচ্ছতোয়া স্থানটিকে। লাল দিগন্তের দিকে মুখ করে জলে নামবে সে। দু’পা নেমে আরো দু’পা গিয়ে প্রথম ডুবটি দেবে, তারপর উঠে আসবে। রক্তিম দিগন্তের উৎস তখন তার সম্মুখে। জলের কিনারায় দাঁড়াবে সে, মাথা সামান্য নিচু করে দেখবে তার মুখচ্ছবি। দেখবে, জলে কাঁপে নিরাবরণ, নিরাভরণ সৃষ্টির প্রথম নারী। ঈভ”।
একথা সত্যি যে গল্পের শেষে কী ঘটল তা লেখক খোলাখুলি বলেন নি। পাঠককে সেটা বুঝে নিতে হবে। তাতে সব পাঠক সহমত হবেন না। আর লেখক ইচ্ছে করেই একটা ব্যাসকূট তৈরি করে দিয়েছেন। জিজীবিষা আর আত্মহননের টানাহ্যাঁচড়ার জবরদস্ত পরিচয় আছে এই গল্পে। তাতে এর আকর্ষণ-ও বেড়ে গেছে বৈকি। “রূপসাগরে ডোবে না ঈভ”-এর স্থানাঙ্ক আত্মহত্যাকেই একমাত্র পথ বলে বাতলাতে চায়। কিন্তু আগেই বলেছি যে গল্পটিতে লৌকিক-অলৌকিকের সমাহার এই সহজ বাতলানো পথে হাঁটতে নিষেধ করে। কল্পনার তুলির টানে পদ্মবিল হয় সীমাহীন সৌন্দর্যের আধার। “শ্বেতরক্তিম সেই আঙরাখার যে শেষ নেই। কিন্তু সে বুঝেছিল নিশ্চয়, দেখেছিল সব-ই দৃশ্যের আড়ালে রয়ে গেলেও।” এই যে দৃশ্যের আড়ালে অনেক কিছু থেকে যাওয়া, বিনিদ্র রাতের অনুপম জ্যোৎস্না, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় পেছনে অশরীরীর উপস্থিতি, ধবধবে জ্যোৎস্নায় মানকচুপাতার নারীমূর্তি পরিগ্রহণ, ভরা বর্ষায় চোখ বন্ধ করে একবাঁশের সেতুতে নদী পারাপার করা, প্রতিবেশীরা যার ব্যাখ্যায় অশরীরীর উপস্থিতি দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করে– কোথাও কোনো কুসংস্কারকে না মেনে— লেখক এমন কৌশলে এই সংকেতগুলি সাজিয়েছেন যা মূল চরিত্রের জীবনীশক্তি বেদম বাড়িয়ে দিয়েছে। আচ্ছা, মেয়েটি যদি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতো তাহলে গল্পের শেষে অনেক বেদনাবোধ, ব্যর্থতাবোধ প্রকাশিত হতো না কি? গল্পটি কী বলতে চায় তা বোঝবার জন্য এতে চারিয়ে দেওয়া সংকেতগুলির অভিনিবেশ ভীষণ জরুরী। ‘আকাশের কোলে লাল মেঘের নিচে তখন আলোর আধার’, ‘আঁধার’ নয় কিন্তু। মেঘ লাল তো সূর্যোদয় হচ্ছে বলেই। ডুব দিয়ে উঠে আসা, সামনে রক্তিম দিগন্তের উৎস দেখতে পাওয়া এগুলো তো এগিয়ে যাওয়ার সংকেত, পেছোবার নয়। মেয়েটি আত্মরক্ষার মানচিত্র গল্পে স্পষ্ট নয়, বাস্তবতার ফ্রেমে বাঁধা নয় সেটা, সেজন্যই লেখক অলৌকিককে এই গল্পে এত যত্নে সাজিয়েছেন।
অলৌকিক সময়বিশেষে বাস্তব ঘটনা হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন অনেক ঘটেছে। যাঁরা হেনা দাসের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়েছেন তাঁরা জানেন হেনা দাস সপরিবার কী ঐন্দ্রজালিকভাবে সেদিন রাজাকারদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। স্পেনযুদ্ধের সময় মুক্তিকামী জননেত্রী লা পাসিওনারিয়ার জীবনেও এরকম বহু ঘটনা ঘটেছিল।
জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের প্রতিটি গল্প এতো আলাদা ধরনের যে গল্পগুলির কোনো থোক আলোচনা করা যায় না। কথাটা আগেও একবার বলেছি। অনেক সময়েই মনে হয় যে গল্পটা তিনি বলছেন, তার সবটা বলছেন না, কিছুটা তার নেপথ্যে রেখে দিচ্ছেন। এ যেন পাহাড়ের গায়ে কোনো ধুলিধূসরিত প্রাচীন শিলালিপি যার সবটা স্পষ্ট নয়। এই পদ্ধতি লেখকের সচেতন নির্মাণ। ‘যদি পাড় না ভাঙে’-র মত গল্পে অনেক ঘটনাই ঘটে, কিন্তু লেখক ঘটনার ক্রমটি স্পষ্ট করেন না। ফাটাফাটাভাবে অনেক কথা স্বগোতোক্তি হিসেবে বলে যান। পাঠকের বুঝে নিতে হবে যে এটাই লেখকের শীলমোহর। গল্পে যে কথাটা আগে বলা হয়নি কখনোই ‘কিন্তু কোনোমতে মনে পড়ে না এতোকাল ধরে বুকে পুরে রাখা ভুলে যাওয়া সেই কথা—‘যদি না আনতাম তাকে তুলে, না-আনাই বুঝি ভালো ছিল।‘ কিন্তু এই কথাটার উল্লেখ তো এই গল্পে কোথাও নেই! অথবা ‘যেন এক চিরন্তন গল্প’ বা ‘শূন্য গগনবিহারী’র মত গল্প যা এক-ই গল্প কিন্তু দু’বার দু’ভাবে লেখা হয়েছে। গল্পগুলির মধ্যে মাঝে মাঝে বেহালার ছড় এমন আলতো ভাবে ছুঁইয়ে দেওয়া হয়েছে যা পাঠকের মনের কপাট ভেঙে এক্কেবারে ভেতরে ঢুকে যায়।
‘সরল সংসার’ বা ‘রংরাজ ফেরে না’র মতো গল্প যেখানে আমাদের চেনা পরিসরের উপস্থিতি অনেক বেশি সেই গল্পগুলিতে ছেঁকে তোলা কৌতুকরস ভীষণ-ই উপভোগ্য কিন্তু সে আলোচনা এখানে করলে ‘পুঁথি বেড়ে যায়’, গল্পগুলি ভিন্নগোত্র বলে, একটা বড়সড় ভূমিকা না ফেঁদে তা হবার নয়। সেজন্য এই কাজ বারান্তরের জন্য আপাতত তোলা রইলো।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.