আর্টস

হারুকি মুরাকামি’র অন্তর্জগৎ

এমদাদ রহমান | 18 Dec , 2018  


[‘বাতাস যেখানে গান গায়’ নামে মুরাকামি প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন ‘৭৯ সালে, তারপর টানা ৩ দশক ধরে তিনি মানুষের মনোজগতকে আশ্চর্য দক্ষতায় পর্যবেক্ষণ করেছেন। শুধু জাপানেই নয়, হারুকি মুরাকামি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম। বিশ্বের কয়েক কোটি পাঠক পড়েছেন তার লেখা। ইতোমধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার বইগুলি। সেসব বইয়ে পাঠককে তিনি অদ্ভুত ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চেয়েছেন। ২০০৫-এ বেরিয়েছে তার বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘কাফকা অন দ্য শোর’, এবং ২০১৭ সালে সঙ্গীত নিয়ে সেজি ওযাওয়া’র সঙ্গে আলাপচারিতার বই ‘এবসোলিউটলি অন মিউজিক’।
মুরাকামি টোকিও’র ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তার পাঠ্য বিষয় ছিল ‘নাটক’।
জে.ডি স্যালিঞ্জারের ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’, এফ. স্কট ফিটজিরাল্ডের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ বইদুটি তিনি অনুবাদ করেছেন। ফিটজিরাল্ডের উপন্যাসটিকে লেখক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই মনে করেন।
লেখালেখির শ্রমসাধ্য দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে তিনি ভিডিও গেমস প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ‘লিখতে বসে কখনও মনে হয় ভিডিও গেম ডিজাইন করছি। আমিই প্রোগ্রামার, আমিই প্লেয়ার। এক বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড়’। দৌড়বিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। ২০০৮-এর জুনে দ্য নিউইয়র্কারে মুরাকামি’র ‘দৌড়বিদ উপন্যাসিক’ লেখাটি প্রকাশিত হয়, একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনস্মৃতি ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’।
তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালে, জাপানের কিয়োটো’য়। তিনি উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক। ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স, আফটার দ্য কোয়েক, দ্য স্ট্রেঞ্জ লাইব্রেরি, ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইম্যান, এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ, নরওয়েজিয়ান উড, দি উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল, স্পুটনিক সুইটহার্ট, ওয়ানকিউএইটফোর ইত্যাদি তাঁর অন্যতম সৃষ্টি।

এডিনবরা আন্তর্জাতিক বই উৎসবে, ‘দ্য গার্ডিয়ান বুক ক্লাব’-এর আয়োজন নিয়ে মার্থা বাসেলের প্রতিবেদনটি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। প্রতিবেদনটি ‘গার্ডিয়ান’ তাদের নিয়মিত পত্রিকা ও সাইটে প্রকাশ করে। গার্ডিয়ান বুক ক্লাবে’র অতিথি হিসেবে সেদিনের আলোচনাচক্রে যোগ দিয়েছিলেন ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি; আলোচনাচক্রে, তার লেখালেখির নানাদিক উঠে আসে, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে।]

এডিনবরা আন্তর্জাতিক বই উৎসবে ‘গার্ডিয়ান বুক ক্লাব’-এর হোস্ট জন ম্যুলান তাদের ‘এ-মাসের অতিথি’ হারুকি মুরাকামিকে সভামঞ্চে আহ্বান জানান এভাবে- ‘যখনই আপনি মুরাকামি’র উপন্যাস পড়তে শুরু করবেন, আপনার জীবনও তখন উপন্যাসের মতো হয়ে উঠবে, তার লেখার এই এক বিশেষ জাদু’। ‘নরওয়েজিয়ান উড’ এবং ‘ওয়ানকিউএইটফোর’-এর লেখককে কদাচিৎ এরকম খোলা জায়গায় উপস্থিত কিংবা সাক্ষাৎকার দিতে দেখা দেখা যায়। কেননা, মুরাকামি’র পাঠকরা তার দেখা সহজে পান না, মাঝে মাঝে পান। বর্তমানে তিনিই একমাত্র জীবিত লেখক যার বই মাসে এক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়, যিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য বছরের পর বছর ধরে বিবেচিত হন। কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে তার এযাবৎ সর্বশেষ উপন্যাস ‘কালারলেস সুকুরু তাজাকি এন্ড হিজ ইয়ার্স অব পিলগ্রিমেস’, বইটি পাঠকদের মধ্যে এমন আগ্রহ জাগিয়েছে যা কেবল হ্যারি পর্টারের ক্ষেত্রে ঘটত, যুক্তরাজ্যে শত শত পাঠক মধ্যরাত থেকে দোকানগুলোর সামনে অপেক্ষা করছিল কাঙ্ক্ষিত কপিটির জন্য। যুক্তরাজ্যের বাইরেও এই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যা গতবছর তার নিজদেশ জাপানে হয়েছিল।
এবারের ‘এডিনবরা বই উৎসবে’ দুটি বিশেষ ইভেন্টের জন্য তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, যার একটি ছিল ‘গার্ডিয়ান বুক ক্লাব’-এর সাহিত্যসভা, যার পরিচালক প্রখ্যাত সমালোচক জন ম্যুলান। সেখানে আলোচনার জন্য তিনি মুরাকামি’র ১৯৯৪ সালের উপন্যাস-‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’কে বেছে নেন; উপন্যাসটি সমালোচকদের চোখে ছিল এক মাস্টারপিস, আর এই উপন্যাসটির মাধ্যমে মুরাকামি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।
বক্তার আসনে মুরাকামিকে দেখতে পাওয়া ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা। তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল, প্রশ্নত্তোরের সময় কৌতুকপূর্ণ, কথা বলেছেন রসিকতার মেজাজে, ইংরেজিতে; হাসতে হাসতে বলেছেন- ‘আমি হাওয়াইয়ে’র লোক, তাই আমার ইংরেজি আপনাদের চেয়ে ভিন্ন হবে।’ তার পাশে একজন দ্বিভাষী অনুবাদক ছিলেন, তাকে দেখিয়ে মুরাকামি বললেন, টোকিও’য় তিনি ও তার স্ত্রী যখন বার চালাতেন তিনি তখন সেখানে পরিচারিকার কাজ করতেন।
১৩টি উপন্যাস আর বেশকিছু ছোটগল্পের লেখক মুরাকামি রসিকতা করে বলেন, এ পর্যন্ত যা কিছু লিখেছেন সেসবের কিছুই তার মনে নেই, একেবারেই ভুলে গেছেন। তাকে যখনই কোনও লেখার প্লট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তিনি চমকে ওঠেছেন, স্মিতহাস্যে বলেছেন- সত্যিই কি আমি লেখাটি লিখেছি? তারপর অডিয়েন্সের দিকে কৌতুকপুর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন, নিজেও হেসেছেন, সবাইকে হাসিয়েছেন। একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে ‘সত্যিই?’ এবং ‘আমি মনে করতে পারছি না’ ছিল তার সবচেয়ে বেশি দেওয়া উত্তর। হাসতে হাসতে বলেছেন- ‘বইটি ২০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল, তারপর একবারও পড়িনি।’ প্রশ্নটি ছিল ‘উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ সম্পর্কিত, যা এই ইভেন্টের একেবারে কেন্দ্রে ছিল, আলোচনার জন্য।
মুরাকামি আপনাদের বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং বলেছেন তার লেখালেখি, তার নায়ক, ব্যক্তিজীবন, স্বপ্ন এবং কিভাবে তার জীবনে উপন্যাসগুলি লিখিত হয়েছে সেসব কথা। পড়ুন তার উত্তরগুলি এবং এডিনবারা আন্তর্জাতিক বই উৎসবে গার্ডিয়ান বুক ক্লাবের সেদিনের আলোচনাচক্রের উল্লেখযোগ্য অংশ। এখানে আমরা আলোচনাচক্রের সেশনে শ্রোতাদের প্রধান কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর সন্নিবেশিত করেছি। [নোট : প্রশ্নত্তোরের জন্য সময় বরাদ্দ ছিল কম, তাই আপনাদের প্রশ্নগুলিকে আমরা বাছাই করেছি আলোচনার জন্য, বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরও আলোচনা থেকেই আপনারা পেয়ে গেছেন। আমরা আশা করছি আলোচনাচক্রের এই সংক্ষিপ্তসার আপনাদের কৌতূহলকে কিছুটা হলেও নিবৃত্ত করবে।

অনুবাদ : এমদাদ রহমান

নাম পুরুষে লিখতে আমি অস্বস্তি বোধ করি, মনে হয় কেউ যেন আমার চরিত্রগুলির দিকে হা করে তাকিয়ে আছে! আমি প্রথম উপন্যাসটি লিখি ১৯৭৯ সালে, তারপর থেকেই প্রতিটি উপন্যাস আমি উত্তম পুরুষে লিখেছি, যদিও বেশ কয়েকবার নাম পুরুষে লেখার চেষ্টা করেছিলাম, সেই চেষ্টায় কেটেও গেছে ২০টি বছর, এই সময়ের মধ্যে প্রথম যে উপন্যাসটি লিখতে পেরেছিলাম সেটা ‘কাফকা অন দ্য শোর’। নাম পুরুষে লিখতে গিয়ে সব সময়ই অস্বস্তি বোধ করেছি, সহজ হতে পারিনি; মনে হয়েছে আমি শুধু নিচের দিকে তাকাতে পারছি, আটকে যাচ্ছি, চরিত্রের দিকে মনোযোগ দিতে পারছি না। আমি চাচ্ছি যেভাবেই হোক তাদেরকে সমানভাবে দেখতে, তাদের সমান্তরালে দাঁড়াতে, আমার চরিত্ররা যেভাবে দেখছে। আর এভাবে দেখাটাই গণতান্ত্রিক। নাম পুরুষে তাদেরকে আমি ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলাম না!
ছোটবেলা থেকেই আমি শান্ত আর চুপচাপ হতে চেয়েছিলাম; নির্জন আর অলক্ষ্য একটা জীবন কামনা করেছিলাম নিজের জন্য। আমার নায়ক ‘তোরু ওকাদা’ (দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকলের নায়ক)। ছেলেবেলায় আমি ওকাদা’র মতো হতে চেয়েছিলাম। আমি কেবল এক চুপচাপ মানুষ হতে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, সবার অলক্ষ্যে থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন আর কোথাও সেই নির্জনতা নেই, সেই প্রগাঢ় একাকীত্বও নেই। জীবন বিস্ময়কর একটা কিছু।
‘হ্যাঁ, কাপড় ইস্ত্রি করতে পছন্দ করি, আমার স্ত্রীও পছন্দ করেন’–এভাবে কথায় কথায় সময় ফুরোতে থাকে, মুরাকামি ব্যাখ্যা করে বলেন, তার বইগুলোতে অনেকগুলি থিমের পুনরাবৃত্তি হয়েছে যা সরাসরি তার নিজের জীবন থেকে উঠে এসেছে- প্রিয় বিড়াল, পছন্দের রান্না, প্রিয় সঙ্গীত এবং জীবন জুড়ে প্রবহমান নিরবচ্ছিন্ন মর্মপীড়া। লেখার শৈলী সম্পর্কে ধারাবাহিক কথার অংশ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি একটি বইয়ের মধ্যে অনেকগুলি গল্পের সৃষ্টি করেন-
: একটি উপন্যাস লিখতে শুরু করলে, শেষ হতে হতে আমার এক থেকে দু’বছর সময় লেগে যায়। এই সময়টায় আমি দিনের পর দিন লিখি, লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি… স্বাস্থ্যকর বাতাসের তৃষ্ণায় তখন ঘরের জানালাগুলি খুলে দিই। তারপর গল্পের আরও একটি লাইন লিখি, আনন্দের জন্য। তখন মনে হয় পাঠকরাও ঠিক আমার মতো এই জায়গাটা পড়লে আনন্দ পাবেন। আমি উত্তম পুরুষেই লিখি, আর তাই আমাকে গল্পের স্টোরিলাইনের জন্য (প্লট, ন্যারেটিভ) কিছু জিনিশের দরকার হয় : অক্ষর, অথবা কারো জীবনের গল্প। মানুষের সহিংস আচরণ, যৌন নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়ে লিখতে পছন্দ করি না তবে গল্পের প্রয়োজনে কখনও লিখতে হয়।
ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে লেখা আমার কয়েকটি গল্প আছে, এ সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করলে তিনি ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এর মধ্যে ভয়ানক উত্তেজনাপূর্ণ কিছু মুহূর্ত সম্পর্কে বলেন :
আমি যখন ঘটনাগুলির বর্ণনা করছিলাম তখন ভীত হয়ে পড়েছিলাম! অনুবাদকরা অভিযোগ করেছিলেন- দৃশ্যগুলি ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো, কিন্তু আমার পক্ষে এগুলি লিখে ওঠাটাও ছিল ভীতিকর! লিখতে গিয়ে তা টের পেয়েও লিখেছি, কারণ আমাকে গল্পটা লিখতে হবে। এই গল্পের ক্ষেত্রে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলি ছিল একটা কিছু উন্মোচনের উদ্দীপনা। ঘটনাগুলি আমি লিখতে পছন্দ করিনি কিন্তু গল্পের জন্যেই লিখেছি।
আমার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল কুয়ার ভেতর বসে থাকা। এ আমার সারাজীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটি সত্যি হয়ে উঠেছে। ম্যুলান জিজ্ঞেস করেন- দুঃস্বপ্ন নয়?
না।
কেন নয়?
মুরাকামি : আমি সত্যিই জানি না…
আমি ভাবলাম : উপন্যাস লেখা একটা মজার কাজ, দারুণ উপভোগ্য। আপনি ইচ্ছা খুশি লিখতে পারেন। তাই আমি স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। এখন, স্বপ্নে তো আমি কুয়ার একেবারে তলায় বসে থাকতে পারি, বিচ্ছন্ন হয়ে…কী আশ্চর্য!
তার পাঠকরা অনুবাদের ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। বইগুলির ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে তার নিজের সম্পর্ক কতখানি তা জানতে চাইলেন। বাসলি নামের একজন জিজ্ঞেস করলেন :
আপনার গল্প বলায় অনেক সূক্ষ্ম দ্যোতনা এবং সূক্ষ্মদর্শিতা থাকে, আমি জানতে চাইছি সেইসব পাঠকের কথা, মূল জাপানিতে পড়তে না পেরে অনুবাদে সূক্ষ্মদর্শিতার কতখানি তারা পড়তে পারেন না, হারিয়ে ফেলেন, পাঠকরা কি তা ভাবেন?
উত্তরে মুরাকামি বলেন:
আমি ইংরেজি বই পড়তে পারি কিন্তু ফরাসি, রুশ, জর্মন কিংবা অন্যকোনও ভাষার লেখা পড়তে পারি না। আমার বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ শেষ করে অনুবাদকরা পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়ে দেন যাতে আমি পড়ে বুঝতে পারি কেমন অনুবাদ হয়েছে। পাণ্ডুলিপিটি যখন পড়ি তখন সেটা আমার কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে, তখন চিন্তা করি না পাঠকের কোনও সমস্যা হবে কিনা- তার পাঠে কী ঘটবে! কেবল মনে হয়- যেহেতু আমার পড়তে ভাল লাগছে, অনুবাদটি তাহলে যথার্থ হয়েছে। তাই আপনি নিঃসন্দেহ থাকুন, বইটি আনন্দচিত্তে পড়ুন। যদি কখনও ভুল খুঁজে পাই, তৎক্ষণাৎ অনুবাদককে সেটা বলি কিন্তু এই ভুলের সংখ্যা বেশি হলে তিন থেকে চারটি হয়, সম্ভবত, তার বেশি নয়।
শ্রোতাদের একজন ছিলেন এডওয়ার্ড লিওলিন, তিনি প্রশ্ন করলেন :
যতগুলি বই আপনি লিখেছেন, সেগুলো লিখতে বসার আগে গল্পগুলি কি আপনার জানা ছিল, কল্পনা করে নিয়েছিলেন, না কি পাঠকরা যেভাবে সম্পূর্ণ অজানা একটা গল্পের ভেতরে দিয়ে যাত্রা করে, ধীরে ধীরে সব জানতে পারে, ঠিক সেভাবে আপনিও লিখে লিখেই অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, লিখতে লিখতেই গল্পটি আপনি গড়ে তুলেছিলেন?
মুরাকামি বললেন : যখন লিখতে শুরু করি, লেখা শুরুর মুহূর্তে কোনও ধারণাই থাকে না ঠিক ‘কোথায় যাচ্ছি, সামনে কী আছে’ সে সম্পর্কে। জানি না কখন কী হবে! যেমন, ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ লিখতে শুরু করে যে-অভিজ্ঞতা হল তা বিস্ময়কর। লিখতে বসে প্রথমেই আমি পাখির ডাক শুনতে পেয়েছিলাম, কারণ আমার ঘরের পেছনের উঠোনে সত্যিকারের পাখিটি ডাকছিল। মনে হয়েছিল এই প্রথমবার আমি এধরনের শব্দ শুনতে পেলাম, আগে আর কখনও এমন শুনিনি। আমি অনুভব করলাম, পাখিটি কিছু একটা বলছে, হয়তো কোনও ভবিষ্যতবাণী করছে! তখন আমি এই বিষয়টিকেই লিখতে চাইলাম। তারপর আসুন, স্প্যাগেটি রান্না প্রসঙ্গে। এখন যা যা ঘটবে তার সঙ্গে আমি জড়িয়ে যাব। তখন স্প্যাগেটি রান্না করছিলাম, হঠাৎ কেউ আমাকে ডাক দিয়েছিল, নাম ধরেই ডেকেছিল। আমিও উপন্যাসের শুরুতে এই দুটি ঘটনা নিয়ে এসেছি। বইটি আমি দু’বছর ধরে লিখেছিলাম। পুরো সময়টা আমার জন্য একটা মজার খেলার মতো ছিল–আমি জানতাম না এরপর কী ঘটবে, তারও পর কী ঘটছে! এভাবে দিনের পর দিন কী এক উত্তেজনা! প্রতিদিন নতুন বিস্ময়। নতুন কিছুর মুখোমুখি। ঘুম থেকে উঠলাম, লেখার টেবিলে গেলাম, কম্পিউটারে স্যুইচ অন করলাম ইত্যাদি সবই ছিল সেই অদ্ভুত উত্তেজনাপূর্ণ খেলার এক একটি টুকরো, আর নিজেকে অবিরাম বলা- আজ কী ঘটতে চলেছে? আমার কল্পনা শক্তি বিশেষ এক ধরনের প্রাণির মতো। আমি যা কিছু ভাবি, আমার ‘কল্পনা’ তার সবই জীবন্ত করে রাখে। আমি আচ্ছন্ন হয়ে আছি সেই কুয়ার কথা ভেবে, এবং সেই হাতি, সেই রেফ্রিজারেটর, বিড়াল, কাপড় ইস্ত্রি…সব…আমি আর কিছুই ব্যাখ্যা করতে পারব না।
জন ম্যুলান জানতে চাইলেন, কেন তিনি উপন্যাসগুলিতে আকস্মিকের এত বেশি ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন, যখন বহু লেখক তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। তারা মনে করতেন পাঠকদের কাছে আকস্মিক ব্যাপারটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মুরাকামি’র উত্তর : ডিকেন্সের বইগুলি আকস্মিক ঘটনায় পরিপূর্ণ, ঠিক এরকম র‍্যামন্ড চ্যান্ডলারের ‘ফিলিপ মার্লো’ এঞ্জেলেস শহরে অসংখ্য মৃতদেহ খুঁজে পায়, যারা এনকাউন্টারে মারা গেছে। পড়লে মনে হবে এটা রিয়ালিস্টিক নয়, কিন্তু কেউ এ সম্পর্কে অভিযোগও করে না। এই ঘটনা ছাড়া গল্পটি কীভাবে সম্ভব হতো? এটাই আমার ভাববার জায়গা। তাছাড়া আমার নিজের জীবনটাও তো অজস্র আকস্মিকে পূর্ণ, এমন অনেক কিছুই ঘটেছে; আমার জীবনে ঘটা বহুকিছুর সঙ্গে এরকম আশ্চর্য সব আকস্মিক ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে। আমাদের জীবন অদ্ভুত সব আকস্মিকে ভরে আছে।
উপস্থিত একজন সদস্য জানতে চাইলেন-তিনি কীভাবে উপন্যাস লেখার সময় পছন্দের সঙ্গীত বেছে নেন? তিনি কি আগে থেকেই কোনও সাউন্ডট্র্যাক চালিয়ে রাখেন? গার্ডিয়ান বুক ক্লাবের বেশ কয়েকজন পাঠকও এ ব্যাপারে জানতে উদগ্রীব ছিলেন। মুরাকামি বলেছিলেন-
: ব্যাপারটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। আমি যখন উপন্যাসটি লিখতে থাকি, তখন আমার এমন কিছুর দরকার হয় যেখানে সুর আছে। তখন গান যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমার কাছে আসে। গান থেকে আমি বহুকিছু গ্রহণ করি, শিখি–সংগতি, ঐকতান, তাল, লয়, টঙ্কার ইত্যাদি। ছন্দোময়তা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসে নিয়মিত প্রবাহের ব্যাপারটা এখান থেকে বুঝেছি। পাঠককে ধরে রাখতে হলে সঙ্গীতের মতো লেখাতেও তাল, লয় থাকতে হয়। সাধারণত আমি তখনই গান শুনি যখন লিখতে বসি। আর আমার বইয়ের ভেতরে সঙ্গীতের যে টঙ্কারটা থাকে, ঐকতান থাকে তা কিন্তু এভাবেই আসে। লিখতে গেলেই আমার সঙ্গীতের দরকার হয়।
শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞাসা করলেন- উপন্যাসের চরিত্রগুলিকে কেন অসুখি আর বিমর্ষ মনে হয়? শুনে মুরাকামি অবাক কণ্ঠে বলেন- তাই নাকি? ম্যুলান যোগ করেন- আপনার তোরু ওকাদা তার বিবাহিত জীবন নিয়ে হতাশ…মুরাকামির উত্তর, ‘আমরা প্রত্যেকেই তাই!’
রহস্যময় কৌতুকে ভরা হাসি দিয়ে কথাটি তিনি বললেন, তারপর, একটু থেমে যোগ করলেন, ‘দুঃখিত, বিষণ্ণ চরিত্রদের নিয়ে লেখার আমার আগ্রহ নেই।’
Flag Counter


1 Response

  1. Namhin says:

    কুয়োর ভেতর বসে থাকা- বেশ তো।
    অনুবাদও বেশ সুখপাঠ্য হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.