সাক্ষাৎকার

নন্দিতা দাস: আমি দেখেছি ধর্মকে কীভাবে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে

রিফাত মুনিম | 19 Dec , 2018  


নন্দিতা দাস ১০টি ভাষায় ৪০টির বেশী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ২০০৮ সালে ‘ফিরাক’ (Firaaq) চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়; ভারত এবং বহির্বিশ্বে এই চলচ্চিত্র ব্যাপক প্রসংশা অর্জন করে। মান্টো তাঁর পরিচালিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র; সাদাত হোসেন মান্টোর জীবন ও কর্মের উপর ভিত্তি করে এগিয়েছে এই চলচ্চিত্রের গল্প। ডিএলএফ (ঢাকা সাহিত্য উৎসব) এর দ্বিতীয় দিনে এটি প্রদর্শিত হয়। প্রদর্শনী শুরুর আগে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে নন্দিতা তাঁর নতুন চলচ্চিত্র এবং একজন শিল্পী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যসম্পাদক রিফাত মুনিম-এর সাথে।

রিফাত মুনিম-এর সাথে আলাপচারিতায় নন্দিতা দাস

রিফাত মুনিম: ঢাকায় এটা আপনার দ্বিতীয় সফর?
নন্দিতা দাস:প্রথমবার এসেছিলাম ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১২ এর সময়ে। তখন এসেছিলাম আমার নাটক বিটুইন দ্য লাইনস নিয়ে যা আমরা এখানে মঞ্চস্থ করেছিলাম।
রিফাত মুনিম:এবার আপনি এসেছেন আপনার পরিচালিত চলচ্চিত্র মান্টো নিয়ে। মান্টো’র বাংলাদেশে প্রিমিয়ার উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানে আপনার কেমন লাগছে?
নন্দিতা দাস:আমি ভীষণ রোমাঞ্চিত। মান্টো অসংখ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে, যা সারা পৃথিবীর মধ্যে বিখ্যাত এবং অনেক সম্মানজনক উৎসব। কানে প্রদর্শিত হওয়া আমার জন্য অনেক সম্মানের বিষয় ছিল। এরপর আমরা গিয়েছি সিডনি, টরেন্টো, লন্ডন, কোরিয়া এবং আরো অসংখ্য দেশে। কিন্তু এটাই প্রথম উন্মুক্ত প্রদর্শনী যা কোন চলচ্চিত্র উৎসবের অংশ নয়। মান্টো মুক্তি পেয়েছে ভারতে এবং আমরা সত্যিই চেয়েছিলাম এটা বাংলাদেশেও মুক্তি পাক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এ বিষয়ে আমাদের দুদেশের মধ্যকার আইন খুবই কঠোর। এটা খুবই দুঃখজনক যে আমরা সাত সমুদ্র পেরিয়ে দূর দূরান্তের দেশে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করতে পারছি, অথচ প্রতিবেশী দেশে অতটা সহজে এই চলচ্চিত্র নিয়ে যেতে পারছি না।

“মান্টো এমন সব বিষয়ে কথা বলেছেন যা আমাদের উপমহাদেশের সকল মানুষের অন্তরের উপলব্ধি, কারণ এখানে আত্মপরিচয়ের কথা বলা হয়েছে — জাতিপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার তাগিদ দিয়েছেন।”

আমার মনে হয়, মান্টো এমন সব বিষয়ে কথা বলেছেন যা আমাদের উপমহাদেশের সকল মানুষের অন্তরের উপলব্ধি, কারণ এখানে আত্মপরিচয়ের কথা বলা হয়েছে — জাতিপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি ছিলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঘোরতর সমর্থক। বাংলাদেশে, আমাদের দেশে বা সমগ্র উপমহাদেশেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজও ভীষণভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে আমাদের সবারই সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে। আমার মনে হয়, যতদিন না মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্জিত হচ্ছে ততদিন এ সংগ্রামে মান্টো আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবেই থাকবেন।

“এটা খুবই দুঃখজনক যে আমরা সাত সমুদ্র পেরিয়ে দূর দূরান্তের দেশে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করতে পারছি, অথচ প্রতিবেশী দেশে অতটা সহজে এই চলচ্চিত্র নিয়ে যেতে পারছি না। ”

রিফাত মুনিম:এক বছর বা দু’বছর আগে স্ক্রল (Scroll) এ আমি আপনার লেখা একটি কলাম পড়েছিলাম। এটা ছিল আপনার নেয়া মান্টো’র কন্যার সাক্ষাৎকার। লেখাটি পড়ে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার আগে আপনি মান্টো সম্পর্কে অনেক গবেষণা করেছেন। সে সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।
নন্দিতা দাস:এই চিত্রনাট্য লিখতে আমার চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগেছে। আমি মান্টোতে নিবিষ্ট হই ২০১২ সালে। আমি কলেজজীবনে তাঁর লেখা পড়েছি। কিন্তু ২০১২ সাল ছিল মান্টোর জন্মশতবর্ষ উদযাপন, এ উপলক্ষ্যে অনেক লেখক মান্টো সম্পর্কে লিখতে শুরু করেন, এবং আমি তাঁর প্রবন্ধ পড়া শুরু করি। প্রবন্ধ পড়ে আমার মনে হয়, তিনি যেসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন তা আজো খুবই প্রাসঙ্গিক, এবং তিনি খুবই আধুনিক; যেসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আমরা আজো কঠিন পরিশ্রম করে চলেছি তিনি সেসব বিষয় নিয়েই কথা বলেছেন। ফলে আমি তাঁর লেখার মাধ্যমে তাকে জানার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি, কিন্তু পারিবারিকভাবে আমি উর্দুভাষী পরিবারের লোক নই। ফলে, আমার অনেক মানুষের সাহায্য নিতে হয়েছে। আমি মান্টোর কিছু লেখার অনুবাদ পড়েছি, কিন্তু চিত্রনাট্য লেখার প্রয়োজনে তাঁর অনেক লেখা মূল ভাষা উর্দুতে পড়তে হয়েছে।
রিফাত মুনিম:আমরা মূলত আপনাকে চিনি একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে যিনি সবসময় মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিপরীতে ভিন্নধর্মী কাজ করেছেন, অভিনয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন এমনসব চলচ্চিত্র যেগুলোর বিশেষ সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। অভিনয়শিল্পী থেকে চলচ্চিত্র পরিচালক, কেন এই রূপান্তর?
নন্দিতা দাস:আমার জন্য এটা কোন রূপান্তর নয়। আমি সত্যিকার অর্থে কখনোই মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে থাকতে চাইনি। আমি সবসময়ই মূলধারার বাইরে স্বাধীন চলচ্চিত্রে বেশী আগ্রহী ছিলাম। হিন্দি ভাষায় একটি স্বাধীন চলচ্চিত্রের অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় কারণ এখানে প্রতিযোগিতা করতে হয় বিশাল প্রভাবশালী বলিউড চলচ্চিত্রের সাথে।
২০০২ সালে যখন গুজরাটে দাঙ্গা হয়, সে দাঙ্গা আমাকে চুড়ান্তভাবে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং আমি দেখেছি ধর্মকে কীভাবে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে। আমার মনে হয়, নিজের পরিশুদ্ধির জন্য এটা প্রয়োজনীয় ছিল। এসবের ধারাবাহিকতায়, ‘ফিরাক’ এর জন্ম হয়েছিল ২০০৮ সালে। ২০১২ সালে মান্টোর গল্পের অমোঘ প্রভাবে আবারো আমি চালিত হই, আমার মনে হয় এইতো সেই গল্প, ঠিক যে গল্প আমি বলতে চাই। আমি আমার চারপাশে যা ঘটছে তাতেই সাড়া দিতে চাই। আমার মনে হয় না আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করেছি। এক অর্থে, যে দুটি চলচ্চিত্র আমি পরিচালনা করেছি তা আমার পছন্দ বলে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিইনি; বরং এই দুটি গল্প আমাকে এতটাই প্রভাবিত এবং তাড়িত করেছে যে আমি চিত্রনাট্য লিখতে বাধ্য হয়েছি।
রিফাত মুনিম:মান্টো চলচ্চিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচনে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

“আমার সহপাঠি আমাকে বলেছিল যে এখানে জানাম নামে একটি গ্রুপ আছে, সাফদার হাসমি এটা পরিচালনা করতেন। তিনি আমার গুরু ছিলেন। এটা ছিল আমার প্রথম সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি।”

নন্দিতা দাস:নওয়াজ এর সাথে আমি ১০ বছর আগে ‘ফিরাক’ এ কাজ করেছি। এটা ছিল হিন্দি চলচ্চিত্রে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয়। যখন আমি চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেছিলাম তখন আমি ভেবে রেখেছিলাম, নওয়াজই এই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত। ২০১৩ সালে যখন আমি তাকে বলেছিলাম যে আমি মান্টো নিয়ে কাজ করছি, সে বলেছিল সে মান্টোর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত এবং আমি যেভাবে চাই সেভাবেই আমাকে তাঁর জীবনের দুই বছর সময় দিতে রাজি আছে। কিন্তু এরপর তিনি তারকা খ্যাতি পেয়ে গেলেন। আমাকে জীবনের দু’বছর সময় দেয়ার মত সময় তাঁর আর রইল না। কষ্টেসৃষ্টে ঠিক দৃশ্যায়নের সময়টুকু দিতে পারলেন, কিন্তু তিনি এমনই একজন স্বভাবজাত গুণী শিল্পী যে তিনি অনায়াসে চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন।
রিফাত মুনিম:আমি কোথাও পড়েছিলাম যে আপনি একটি জনপ্রিয় ভারতীয় যাত্রা দল (Indian street theater) জননাট্য মঞ্চ (জানাম) এর সদস্য ছিলেন। আমরা কি আপনার সেই জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারি?
নন্দিতা দাস:মানুষের জীবনের সকল কাজ ভবিষ্যত জীবনের পথ নির্মানে তার উপর প্রভাব ফেলে। তখন আমার বয়স ছিল ১৭ বছর, আমার সহপাঠি আমাকে বলেছিল যে এখানে জানাম নামে একটি গ্রুপ আছে, সাফদার হাসমি এটা পরিচালনা করতেন। তিনি আমার গুরু ছিলেন। এটা ছিল আমার প্রথম সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি। যদিও আমি শিল্পানুরাগী এক পরিবার থেকে এসেছি, আমরা কখনো কোন মতবাদ নিয়ে কথা বলতাম না। আমার বাবা-মা ছিলেন ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং আন্তরিক। তারপরও, আমার প্রথম রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছিল সাফদার এর কাছে কারণ, আমরা প্রধাণত শ্রমিক অধিকার, কমিউনিজম এবং ভারতীয় সমাজের জন্য ক্ষতিকর নানান সামাজিক সমস্যা সম্পর্কিত নাটক মঞ্চস্থ করতাম। জানাম এ কাজ করা সেই চার বছর সময় ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় যা ব্যক্তি হিসেবে সত্যিকার অর্থে আমার রূপান্তর ঘটিয়েছিল।
Flag Counter


1 Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.