আলোকচিত্র

এই স্থিরচিত্ত আনোয়ার হোসেনকে আমি দেখতে চাইনি

এন. রাশেদ চৌধুরী | 15 Dec , 2018  


চলচ্চিত্রগ্রাহক ও ফটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় মোরশেদুল ইসলামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চাকা’র শুটিং এর সময়। ‘চাকা’ চলচ্চিত্রের শুটিং এ আমিসহ শর্ট ফিল্ম ফোরামের আরো অনেকেই কাজ করেছিলেন। ছিলেন আশিষ খন্দকার, আমিরুল হক চৌধুরীর মতো গুনি অভিনেতারা। বর্তমানে প্রথম আলোর সহ-সম্পাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা এ.কে.এম জাকারিয়া, ফোরামের প্রাক্তন সভাপতি, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা আমিনুল ইসলাম খোকন, চলচ্চিত্র নির্মাতা সরওয়ার জাহান খান, ছিলেন মোস্তফা জামান রায়হানী, এখনকার বিখ্যাত সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাতা রতন পাল। ‘স্বপ্নডানায়’ খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা গোলাম রাব্বানী বিপ্লব ছিলেন ছবির প্রোডাকশন ম্যানেজার। সিনেমাটির চিত্রগ্রাহক-সূর্যদীঘল বাড়ি-খ্যাত চলচ্চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন। তাঁর চেয়েও বেশী ছিলেন তিনি একজন স্টিল ফটোগ্রাফার। আমাদের সিনেমার লোকেশন ছিলো নওগাঁ জেলার মহাদেবপূরের এক অজো পাড়া-গাঁওয়ে। শ্যুটিং হতো আরোও অভ্যন্তরে, এক দূর্গম অঞ্চলে। যেখানে প্রতিদিন যেতে সময় লাগতো প্রায় ১ ঘন্টা এবং পুরোটাই পায়ে হাঁটা পথ। আমাদের সাথে যেসব শ্যুটিং এর যন্ত্রপাতি ছিলো-যেমন লম্বা পাইপ সহ ট্রলি- ট্র্যাক, লাইটের ভারী সরঞ্জামাদী ও আরোও আরোও অনেক কিছূ। সেগুলো ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব ছিলো আমাদের মতো যারা বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ তাদের ওপর। আমি যদিও শ্যুটিং ইউনিটের একজন অন্যতম সহকারী পরিচালক ছিলাম-আমার ওপর বাড়তি দায়িত্ব ছিলো আনোয়ার ভাইয়ের নিজস্ব ফটোগ্রাফিক ক্যামেরা ব্যাগটি বয়ে বেড়ানো। অবিশ্যি কেউ আমায় এ দায়িত্বটি চাপিয়ে দেয়নি, বরং বয়সে আমার অন্ততঃ ২৫ বছরের বেশী একজনকে এমন একটি ব্যাগ, গলায় ঝোলানো আরো দুটি বৃহতাকারের ক্যামেরা এসব সহ মাঝে মাঝেই বেসামাল দেখাতো-অথচ কেউ এগিয়ে আসছে না দেখে-আমিই স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম এ দায়িত্ব। তবে সবকিছু ছাপিয়ে অসম্ভব আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের আনোয়ার ভাইয়ের সার্বক্ষনিক সংস্পর্শ পাওয়াই হয়ে উঠলো আমার নেশা। আনোয়ার ভাই অনর্গল ইংরেজি-বাংলায় কথা বলতে পারতেন। সারাক্ষন নিজের ভাবনাই প্রকাশ করতেন-তাতে কিইনা ছিলো! জীবন বীক্ষায় টলটলায়মান মনে হতো তাঁকে। আর অভিজ্ঞতার ঝুলি… সেটি তো বিশ্ববীক্ষায় পূর্ণ। ততোদিনে ফটোগ্রাফির কল্যানে তিনি ঘুরে ফেলেছেন পৃথিবীর অনেকটা গোলার্ধ। দিনশেষে আস্তানায় ফিরে খানিক বিশ্রাম নিয়েই সবার আগে নিজের ওয়াকম্যানে ছাড়তেন কনিকা’র রবীন্দ্র সংগীত অথবা কোন খেয়াল। পরে বুঝেছি, এসবই লোকদেখানো নয়। তাঁর পরিচিতজন মাত্রই স্বীকার করবেন-সংগীত শোনার চর্চা ছিলো তাঁর প্রাত্যহিকতার এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। কতগুলো আঁধ-পাকা সারিবদ্ধ রুমে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিলো। আমরা অনেকেই গাদাগাদি করে থাকতাম মেঝেয় ছড়ানো খড়ের বিছানায়। আনোয়ার ভাই সিনিয়র ক্রু হিসেবে একখানা ছোট্ট ঘর বরাদ্দ পেয়েছিলেন, সেখানে ফিরেই জামা কাপড় ছেড়ে গান শুনতে শুনতে সারদিনে এই প্রথম নিস্তব্ধতা নেমে আসতো আনোয়ার ভাইয়ের অবয়বে। কেমন শান্ত, সৌম্য, জিসাসের মতো দেখাতো তখন তাঁকে। জিসাসকে খুব পছন্দ ছিলো কোন এক অজানা আবেগে (খুঁজলেই জিসাসের পোজে মেঝেতে শোয়া তাঁর ছবি পাওয়া যাবে নির্ঘাত)! রুমে ফিরে, সেই ক্ষনিক নিস্তব্ধতার ফাঁকেই আমি পালিয়ে যেতাম। কারন আমার জন্য আরেকজন অপেক্ষা করতেন-তিনি প্রিয় আশিষ খন্দকার। এই দুজনের অম্ল-মধুর সম্পর্কও আমাকে আনন্দ দিতো। দুজন গুণী শিল্পীর স্নেহে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিনগুলো কাটতো স্বপ্নের মতো। সারাজীবন সিনেমা নিয়েই কাটাবো এমন সিদ্ধান্ত আরোও আগেই নিয়েছিলাম-সেই স্কুলজীবনের শেষে ফিল্ম সোসাইটির দিনগুলোতে-তা যেন পালে হাওয়া লাগার মতোন করে দ্বিগুন বইয়ে দিলেন এইসব শিল্পীরা। ছবির প্রত্যেক দৃশ্যের শ্যুটিং কন্টিনিউটি রাখার পরও সেই সাড়ে ৮ কেজি’র ব্যাগ টানা ও টানা শেষে রাতে ফিরে নিজের ঘাড়ের দাগকে সার্ভিসিং করা হয়ে দাঁড়ালো-আমার বাড়তি কাজ। তাই খুব অল্পদিনেই আমার সাহচর্য প্রত্যাশী অন্যান্য বন্ধুরা আমার নাম দিয়েছিলো-‘আনোয়ার ভাইয়ের ক্যামেরা এসিসটেন্ট-লক্ষন দাস (চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের ক্যামেরা সহকারী-যিনি নব্বইয়ের দশকে প্রতিবেশীদের অত্যাচারে বসতবাটি বিক্রি করে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন), লক্ষন দা’র এসিসটেন্ট ওয়াসীম (লক্ষন দা দেশ ছাড়ার পর, ইনি নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদের শ্যুটিং ইউনিটে কাজ করতেন, পরে তারেক ভাইয়ের সাথে একই সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন) আর এই ওয়াসীমের এসিসটেন্ট হলো রাশেদ-এই অধম। এখন হঠাৎই মনে হলো-তবে কি ১৬ মি.মি. ক্যামেরা-অধ্যায়ের সমাপ্তির সাথে সাথে এঁদের হারিয়ে যাওয়ারও কোন যোগ ছিলো!

শ্যুটিংএ আনোয়ার ভাইকে দেখেছি শ্যুটিং এর কাজের ফাঁকে অনবরত ফটো তুলছেন। জানতাম এখানে উনি সিনেমাটির চিত্রগ্রাহক-কিন্তু একজন জাত ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর যে দায়িত্বকর্ম ছবি তোলা তা থেকে যেন কখনো বিচ্যুত না হোন-তাই অনবরত ছবি তুলতেন। ছোট হিসেবে সবসময়ই আমরা বড়দের বিলা করতাম। যেমন শ্যুটিং এ তাঁর স্টিল ছবি তোলার বহর দেখে তো আমাদের এক সঙ্গি বলেই বসলে, আনোয়ার ভাই একটা কম্পোজিশনের জন্য যতগুলো ছবি তোলেন-ঐ ২০ টা স্ন্যাপ তুললে ওর মইধ্যে আমারও একটা ভালো ছবি বারাইতো! সেসময় আমার কাঁচা অনুভবে বিষ্ময়কর লেগেছিলো এই ভেবে-একটা ভালো ছবি, মনের মতো ছবির জন্য আনোয়ার ভাই প্রত্যেকটা মুহূর্ত যেভাবে নিষ্ঠার সাথে, প্রাত্যহিকতার আদলে নিজের আরাধ্য কাজ চালিয়ে যান-এই কি তবে শিল্পির দায়বদ্বতা! এই অধ্যবসায় বুঝি সব শিল্পীরাই পালন করেন! জেনেছিলাম চাকা’র শুটিং এর অল্প কিছুদিন আগেই ডলি ভাবী আত্মহত্যা করেছেন। মারিয়ম নামে তাঁর যে বর্তমান স্ত্রী-তিনিও তাঁর সাথেই চাকা’র শ্যুটিং এ এসেছিলেন। এঁরা কিছূদিন পরই বিয়ে করেন। মারিয়ম ফরাসি নাগরিক, কাজ করতে এসেছিলেন ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রসেজ এ-সেখানেই পরিচয় আনোয়ার ভাইয়ের সাথে। আমি যখন আনোয়ার ভাইয়ের সংস্পর্শে আসি তখন তিনি সমগ্র বাংলাদেশেরই একজন কাল্ট ফটোগ্রাফার ও সিনেম্যাটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো তৈরী করে ফেলেছেন। এত কাজের পরও আনোয়ার হোসেন নবীন ফটোগ্রাফারদেরকে টপকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নবীনদের ভালোবেসেছেন জীবনের শেষ দিন অবধি। তাঁদের মাঝেই যেন দেখতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সিনেমার স্বপ্ন। তাই আমাদের মাঝেও সঞ্চারিত করতেন সেসব স্বপ্ন প্রতিনিয়ত।

একদিন চাকা’র শ্যুটিং শেষে এলো শেষ বিদায়ের মূহূর্ত! আনোয়ার ভাই আমার ল্যান্ডফোন নম্বর টুকে রাখলেন তাঁর নোটবুকে। এতবড় একজন শিল্পীর জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর নিয়মানুবর্তী। সবসময় ডায়েরী, কাগজকলম, প্রয়োজনীয় বই এগুলো রাখতেন সযত্নে গুছিয়ে। এখন আমার মনে হয়, আনোয়ার ভাই হয়তো আমাদের আধুনিক ধারার ফটোগ্রাফির জনক হয়ে অনেক বাড়তি দায়িত্ব অনুভব করতেন। তাই বাধ্য হয়েই তাঁকে অনেক বেশী সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের বাড়তি বোঝাও বহন করতে হতো। আর চিত্রগ্রাহকদের নানান নোট নিতে হয়-তাঁদের নানান ফটোগ্রাফিক মানের হিসেব রাখতে। কিন্তু প্রথম যেদিন তাঁর বাড়িতে গেলাম আমার চোখ ছানাবড়া। কি গোছানো পরিপাটি বাসা কাম স্টুডিও তাঁর মোহাম্মদপুর, বাবর রোডের এক দোতলা বাড়িতে। অত্যন্ত আকর্ষনীয় আর বেশ পুরোনো আমলের বাংলো বাড়ি। আনোয়ার ভাই সবসময় মেঝেতে তোষক বিছিয়ে শুতেন। আর সারা বাড়ি সাজানো আফ্রিকার নানা দেশের টোটেম ও মাস্কের সংগ্রহে। তাঁর প্রিয় ছবিগুলো বাঁধানো ছিলো নানা ঘরের দেয়ালে। অবাক হলাম তাঁর বইয়ের সংগ্রহ দেখে। একজন শিল্পীর নিজের শিল্পী-জীবন নিয়ে যে জাত্যাভিমান আর উচ্চাকাঙ্খা থাকে-তাকে অন্য মানুষেরা প্রায়শঃই ভূল বোঝেন আত্মাহঙ্কার মনে করে। এমনকি তাঁর কাছের আপনজনেরাও। আনোয়ার ভাই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের আধুনিক ফটোগ্রাফির প্রতিষ্ঠা আর নিজের শিল্পীসত্তা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা হয়তো আনোয়ার ভাইকে বোঝার ক্ষেত্রে এমনই এক ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। নিত্যদিন সেই বাড়িতে আসা যাওয়ায়, অল্প ক’দিনেই আমি আঁচ করতে পারি, তাঁর প্রানপ্রিয় স্ত্রী ডলি আনোয়ারের প্রয়াণের বেদনা তখনো সেই বাড়ির চারদেয়ালে মিশে আছে। তাঁর গৃহকমীর্ ও ফটোগ্রাফিক এসিসটেন্টের মুখে ততোদিনে আমি জেনেছি, কি করুণ ভাবেই না মৃত্যুবরণ করেছিলেন প্রতিভাবান, অভিমানী, আনোয়ারের চির-সঙ্গী, এই অভিনয় শিল্পী। যতদিন আনোয়ার ভাই এবাড়িতে ছিলেন, ততোদিন একমুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকেননি ডলি আনোয়ারকে। চাকা সিনেমা নির্মাণের পরপর অন্ততঃ তিনবছর টানা প্রতিদিন আমি গিয়েছি আনোয়ার ভাইয়ের বাসায়। আমার কাজ ছিলো সকালে গিয়ে বাসায় উপস্থিত হওয়া, সিনেমা বিষয়ে তাঁর সংগ্রহে থাকা অসংখ্য বই, নিজের সম্পাদিত-বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রকাশনা, ‘আয়না’ ও অন্যান্য সাময়িকী যেগুলো আনোয়ার ভাইয়ের সংগ্রহে ছিলো, আর তাঁর নিঃশর্ত
স্নেহ যা অজানা কারণেই অবাধে প্রবাহিত ছিলো আমার প্রতি। আর সেই স্নেহলাভের লোভ আমাকে বারবার টেনে নিয়ে যেত তাঁর বাড়িতে। এভাবে একদিন আমি তাঁর কাছে বন্ধু হিসেবে পরিচিতি পাই যা আমার বন্ধু মহলে অনেকেরই ইর্ষা জাগিয়েছিলো। কিন্তু সবচেয়ে বেশী কি আমাকে আকর্ষণ করেছিলো আনোয়ার ভাইয়ের প্রতি? আমি হয়তো খুব কাছ থেকে দেখতে চেয়েছিলাম-এমন একজন চিত্রগ্রাহক কিভাবে জীবন অতিবাহিত করেন!
আনোয়ার ভাইয়ের কাছে একবার গল্প শুনেছিলাম, শোবার ঘরের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখা জিসাসের ক্রুসবিদ্ধ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘জানো, জেসাস নামে কোন এককালে যে এক মহাপুরুষ ছিলেন তিনি কিন্তু কালের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিলেন জনশ্রুতির আড়ালে। তাঁর সময়কালের অন্ততঃ ৫শ বছর পর ততোধিক কোন এক পাগল নাকি জেরুজালেমের আনাচে কানাচে ঘুরেঘুরে সংগ্রহ করেছেন যিশুর বানী-যা পরে বাইবেল আকারে সংগৃহিত হয়।’ নিজেকে নিয়ে যিশুর অবয়বের সেই রোমান্টিকতায় ভাসতেন তিনি। জানি না জীবনের শেষ অব্দি তাঁর সেই রোমান্টিকতা ছিলো কিনা! কারণ ততোদিনে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম আনোয়ারকে। একজন খাঁটি শিল্পীর এই আত্মাভিমানকে আমি আর নিতে পারিনি বেশী দিন। আমাদের মতোন সাধারণ মাণের শিল্পকর্মী যারা জীবনের আবেগের হাতছানিতে বিপর্যস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কেবলই খাবি খেতে হয় যাদের! নিখাঁদ শিল্পীর জীবন আর হয় না তাদের!

আনোয়ার ভাইয়ের মতো নিষ্ঠাবান আর শিল্পের জন্য নিবেদিতপ্রান এমন শিল্পী আমি বাংলাদেশে খুব কম দেখেছি। প্রতিদিন তাঁর সকাল শুরু হতো ফটোগ্রাফি নিয়ে আর দিনশেষে বাড়ি ফিরতেন একগাঁদা প্রিন্ট বা ফটোগ্রাফিক সরঞ্জামাদি নিয়ে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সারাটা জীবন! সকালে ঘুম থেকে উঠেই চাই তাঁর বেড টি এককাপ। এরপর আর কোনকিছুই তাঁকে ক্লান্ত করতে পারতো না। ফটোগ্রাফি বিষয়ে কত পুরস্কার যে ততোদিনে তিনি পেয়েছেন, তা সম্ভবত তাঁর নিজেরও মনে ছিলো না। আর বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি যে কখনো এর পুরোধাদের হীনমন্যতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি সেবিষয়ে মনোবেদনায় তাঁকে বারবার ক্লান্ত হতে দেখেছি। একসময় বেগআর্ট ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক থাকাকালীন সাংগঠনিক মতদ্বৈততার কারণে, প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি। সেখান থেকে অনিন্দ্য সুন্দর একটি সাময়িকী প্রকাশিত হতো, নাম ছিলো বিপিএস নিউজলেটার। আনোয়ার ভাই দীর্ঘসময় প্রকাশনাটি সম্পাদনা করেন। এখনও এমন অভিনব, সমসাময়িক ফটোগ্রাফির নন্দনতাত্ত্বিক চর্চা’র কোন সাময়িকী চোখে পড়ে না সচরাচর। ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিপিএসও ছাড়তে হয় তাঁকে। পরে ‘আয়নার পত্র’ নামে তাঁর সম্পাদনায় আরেকটি ফটোগ্রাফিক সাময়িকি প্রকাশিত হয়! নিজের কঠিন শিল্পীসত্তার তাড়নায়, শেষ অবধি তিনি আর চাননি এসব জটিলতা-কুটিলতায় জড়িয়ে থাকতে।

আমি ফটোগ্রাফি শিল্প বিষয়ে সমঝদার নই। তাই আনোয়ার ভাইয়ের ছবি বিশ্লেষণ আমার কম্ম নয়। এক সময় আমার হাতে আসে শিল্পকলা একাডেমীর -‘কনটেমপোরারি আর্ট সিরিজ অব বাংলাদেশ-১৩’ শিরোনামের একটি প্রকাশনা-আনোয়ার হোসেন এর ফটোগ্রাফি বিষয়ে। আনোয়ার ভাইয়ের একটি একক প্রদর্শণীর প্রাক্কালে এটি ডিসেম্বর, ১৯৭৮ এ প্রকাশিত হয়। আনোয়ার ভাইয়ের প্রয়াণের পর পুরোনো লেখা-পত্র ও তাঁর বই ঘাটতে গিয়ে সেটি হঠাৎ আবার নজরে এলো। ক্যাটালগটিতে চার পৃষ্ঠার এক মুখবন্ধ লিখেছেন, কানাডার-কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয় আটোয়ার-আর্ট বিষয়ক অধ্যাপিকা প্যাট্রিসিয়া গডশেল। সেখানে তিনি আনোয়ারের নামমাত্র কিছু ফটোগ্রাফিক ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব আসরে পুরস্কার জেতা বিষয়ে একজায়গায় লিখছেন-‘…the reason for this I am sure, is that Anwar is an artist in the full sense of the word. His camera and his equipment are merely the tools of his art; they remain secondary to the human factors, his eye and his intelligence. Unable to purchase sophisticated instruments, he has not become a victim of them. Yet he has still had to face the technical challenge of meeting contemporary professional standards. The result has been a strengthening of his natural talents and powers of imagination. What might appear to have been his misfortune has, in fact, helped him to avoid a dependence on mechanical aids that can often undermine genuine creativity.’
আনোয়ারের ছবির শিল্প সুষমা বিষয়ে এই লেখিকা বলছেন- His sense of composition is powerful. There is satisfaction in nothing the relationships between the objects, the solid forms in open spaces; the tension that is created between two parts of a picture, as the eye moves from one to the other. His use of light that gives life to coloure and tone, and emphasizes textures, is skillfully handled-the more remarkable in view of his limited technical resources which force him to rely almost entirely upon natural light.’
পরিশেষে প্যাট্রিসিয়া লেখেন, ‘…For at heart, it is human beings that fascinates him; the way they look; the way they behave; the problems they have to face…so he is not concerned with isolating beauty alone, but in looking at the world from every angle, and at particular events as they actually happen.’

আনোয়ারের শোবার ঘরে, তাকে তাকে সাজিয়ে রাখা রবীন্দ্র সঙ্গীতের সংগ্রহ আমার চোখ খুলে দিয়েছিলো। কনিকা ছিলেন প্রিয় শিল্পী। কনিকার এমনসব গান তাঁর কাছ থেকে কপি করে নিয়েছিলাম-সেগুলো তখনো কোনদিন শুনিনি। আর তাঁর ছিলো বিশাল ভল্যুমের খেয়াল সংগ্রহ। ভীমসেন জোশী ছিলেন খুব প্রিয়। আর আমির খান, কিশোরী আমানকার, পন্ডিত জশরাজ, বেলায়েত আর আমজাদ খাঁন সাহেব। নিজের সংগ্রহে যেগুলো ছিলো না সেগুলো সংগ্রহের জন্য কি ব্যাকুলই না ছিলেন আনোয়ার ভাই! শিশুর সারল্যে ভরা ছিলো তাঁর মন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতেন হঠাৎ কোন আগ্রহের সামগ্রী খুঁজে পেলে। কিন্তু নশ্বর এই পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী হয় না! তাঁকেও একসময় প্যারিসে ঘর বাঁধতে চলে যেতে হয়। ছেড়ে যেতে হয় তাঁর সংগৃহিত সব সামগ্রী এবং এই বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিরল অনুরাগ। তখনকার দিনে তাঁর লাইব্রেরিতেই সম্ভবতঃ ছিলো দেশ বিদেশের সিনেমা বিষয়ক সবচেয়ে বেশী বইয়ের সংগ্রহ। সেখানে খুঁজে পেলাম আমাদের অকাল প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের নামাঙ্কিত বহু সাহিত্য ও সিনেমার বই। কবিরের প্রিয় লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রায় সব প্রকাশিত বই। এলিয়ট, ইয়েটস এর নানা কবিতার বই। আমার বরাবরই লোভ ছিলো বইগুলোর প্রতি। আর সেগুলো একদিন যে আমার কাছেই থাকবে তা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবিনি কখনো। সিনেমা নিয়ে নানা আলাপে আমাদের সেইসব ঐশ্বর্যময় দিন কাটতো। তাঁকে সবসময়ই বিচলিত দেখেছি, কি সে আমাদের সিনেমার সুদিন আসবে এই ভেবে! তিনি আশাবাদী ছিলেন শর্ট ফিল্ম ফোরামের তৎকালীন নবীন নির্মাতাদের প্রতি। তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, সরওয়ার জাহান খান এঁদের অনেকগুলো ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন। এছাড়াও তার চিত্রগ্রহণের সুখ্যাতি ছড়িয়ে ছিলো দেশের বাইরেও। প্রবাসী নানান চলচ্চিত্র নির্মাতারাও দেখি আনোয়ার ভাইকে খুঁজে নিয়ে কাজ করতে উদগ্রীব-তাদের পরবর্তী কোন সিনেমায়। তখনকার দিনে বিকল্প ধারার নির্মাতারা একটি অলিখিত নিয়ম চালু করেছিলেন, এসব সিনেমার ক্রু ও অভিনয় শিল্পীরা যেন বিনা পারিশ্রমিকে তাঁদের এই চলচ্চিত্র-নির্মাণ যুদ্ধে শরিক হন। আর সবসময়ই আনোয়ার ভাইকে দেখেছি সবার থেকে বেশী এই উদ্যোগে হাজির হতে। একবার আমি তাঁর বাসায় গিয়েছি রোজার মাসের কোন এক দুপুর বেলায়। দেখি বাইরে বারান্দার কড়িডোরে বসে আছেন সূর্য দীঘল বাড়ির অন্যতম পরিচালক শেখ নিয়ামত আলী যিনি আনোয়ার ভাইকে ক্যামেরায় নিয়ে পরবর্তীকালে তাঁর দহন ও অন্যজীবন ছবিগুলো করেছিলেন। আমি সেদিন বেডরুমে ঢুকে দেখি, আনোয়ার ভাই এদিক ওদিক থেকে টাকা গুছিয়ে একটা খামে ভরে ফের ঘরের বাইরে যেখানে নিয়ামত ভাই বসে ছিলেন। সেখানে গিয়ে তাঁর পাশে বসলেন। তিনি চলে গেলে আনোয়ার ভাই নিয়ামত ভাইকে নির্দিষ্ট সংখ্যক টাকা দেবার কথা স্বীকার করেন। আমার জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে বলেছিলেন, কি করবো বলো, যখন দেখি আমাদের দেশের এমন গুণী একজন নির্মাতার পরিবারের সদস্যদের ঈদে অন্ততঃ কিছু কিনে দেবার সামর্থও নেই! পরে আমি আনোয়ার ভাইয়ের সহকর্মীর কাছ থেকে জেনেছিলাম, অনেকবারই ওরা নিয়ামত ভাইকে বাসায় আসতে দেখেছিলেন বেশ খানিকক্ষণ বসে থেকে আনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু একটা নিয়ে চলে যেতে।

একসময় আনোয়ার ভাইয়ের ফ্রান্স যাবার সময় ঘনিয়ে আসে। একদিন তাঁর বাড়ি গিয়ে দেখি সব মালপত্র এলোমেলো, ছড়ানো ছিটানো। প্রথমেই বসেছেন নিজের ফটোগ্রাফ, নেগেটিভ, কন্টাক্ট শিট এগুলো কিভাবে ম্যানেজমেন্ট করবেন সেসব নিয়ে। বাড়িতে আসবাব বলতে ছিলো একটা কাঠের আলমিরা যেখানে ওঁর নামমাত্র কয়েকটি পোষাকই ছিলো, আর কাঠের তৈরী সেলফে তাকভর্তি ক্যাসেট, অনেক বই, আর ছিলো একটিমাত্র তোষক-মেঝেতে বিছানো। তাই খুব বেশী সময় লাগেনি সেসব অরগানাইজ করতে। নিজের তোলা সব ছবি, নেগেটিভ এসব সংরক্ষন শেষে, একে ওকে এটা সেটা বিলিয়ে দেবার পরই যখন বইগুলোর প্রসঙ্গ এলো-আমি ভয়ে ভয়ে বললাম আনোয়ার ভাই, আপনার সিনেমার বইগুলো আমি আমার কাছে রাখি! তিনি তৎক্ষনাৎ বললেন-আমি ভেবেছিলাম সিনেমার বইগুলো তানভীরকে (তানভীর মোকাম্মেল) দিয়ে যাবো! কিন্তু তুমি যেহেতু আমার বেশী প্রিয়, তাই তুমিই ওগুলো রাখো। উত্তেজনায় আমার কয়েকদিন ঘুম এলো না। বিশেষ করে আলমগীর কবির তখন সদ্যপ্রয়াত। আর তাঁর নামাঙ্কিত বইগুলো যে আমার কাছে থাকছে-এর চেয়ে ওই মুহূর্তে আমার আনন্দের আর কি হতে পারে! তাঁকে কথনও জিজ্ঞেস করিনি বইগুলো তাঁর সংগ্রহে কি করে এলো…যদি ফের ওঁর মত বদলে যায়। বইগুলো এখনও আমি স্বযত্নে আগলে রেখেছি আনোয়ার ভাই! নষ্ট হতে দেইনি! হেমিংওয়ে এখন আমারও অন্যতম প্রিয় লেখক হয়ে উঠেছেন-আপনার দেয়া ওই বইগুলোর ভেতর দিয়েই। পরে আরও অনেকবারই আনোয়ার ভাইকে দূর থেকে দেখেছি, কিন্তু কাছে যাইনি। নিজের পুঞ্জিভূত দুর্বলতা ঠেলে আপনার মুখোমুখি হবার সাহসই হয়তো ছিলো না আমার। শিল্পের জীবনযাপনে ফাঁকি চলে না। এখন বুঝি, ওই ধোঁকাবাজির, ফাঁকিবাজির স্বরূপ নিয়ে হয়তো ভয়েই আপনার মুখোমুখি হইনি আর। কিন্তু আপনার শিখিয়ে দেয়া শিল্পীর জীবনের হাতছানিও এড়ানো যায় না। আর এ বিষয়ে আপনার চেয়ে সার্থক আর কে ছিলো আমাদের যিনি নিজ জীবন দিয়েই শিখিয়ে দিয়েছিলেন শিল্পীর জীবনাচরণ-দর্শন।

যেদিন আনোয়ার ভাইয়ের মরদেহ শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হলো-সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে, সেদিনটাও কেমন যেন মর্মান্তিক হয়ে উঠেছিলো। সকাল না হতেই আমরা সমবেত হতে লাগলাম শহীদ মিনারে। জাহিদুর রহিম অঞ্জন ফোন করে জানলেন কখন এসে পৌঁছাচ্ছি! সরাসরি ওঁর কাছেই গিয়ে দাঁড়ালাম। এক অঞ্জন দা’ই আছেন– বন্ধু, অগ্রজ তারেক শাহরিয়ার, তারেক মাসুদসহ আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারের সকল আত্মীয় বিয়োজনে–যার আশ্রয়ে আমি বার বার অবলম্বন খুঁজি, তাঁকেও অসহায় বোধ হচ্ছিল আনোয়ারের মৃত্যুতে। আমি বললাম মৃত ব্যক্তির লাশ আমার একদম দেখতে ইচ্ছা করছে না। তারেক মাসুদের লাশের দিকে আমি তাকাবার সাহসই পাইনি। আমি দেখতেও চাইনি এমন যোদ্ধার মৃত-চির শান্ত মুখাবয়ব। বিশেষ করে আনোয়ার ভাইয়ের, অমন জেসাসের মতো শশ্রুমন্ডিত হাসিমাখা মুখের চিরস্তব্ধ প্রতিকৃতি! এমন প্রাণ চাঞ্চল্যেপূর্ণ একজন জাতশিল্পীর নিথর দেহ আমাকে অসহায় করে দেবার আগেই আমি ফিরে যেতে চেয়েছিলাম। আমার চেয়ে আরও বাস্তববাদী অঞ্জন দা’ও শেষ পর্যন্ত বললেন, আনোয়ার ভাইয়ের মৃতমুখ তিনিও দেখতে চাননি। আমরা পাশাপাশি তাঁর নিথর দেহ দ্রুত অতিক্রমণকালে এক সৌম্যজ্যোতির কান্তিময় পূরুষকে দেখেছিলাম! দেখলাম, সেই যে যুবাবয়সে ছবি তোলার জন্য আনোয়ার ঠিক যেভাবে মেঝেতে যিশুর ভঙ্গিতে শুয়েছিলেন, আজো সেভাবেই যেন শুয়ে আছেন। আর তাঁর এবারের অভিনয় যেন আমাদের অন্তরাত্মা চিঁড়ে জানান দিচ্ছে-তাঁর এই ঘুম আর ভাঙবে না কোনদিনই!

Flag Counter


1 Response

  1. ইকবাল করিম হাসনু says:

    হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে দিলে। ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.