গল্প

মধ্যরাতের ডুবসাঁতার

শান্তা মারিয়া | 23 Dec , 2018  


রাহাতের মৃত্যুর খবরটা ফেসবুকে পেল শম্পা। তাদেরই আরেক বন্ধু লিপির স্ট্যাটাসে। লিপি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার তেমন বন্ধু ছিল না। বন্ধু ছিল সোনালি। একসময় তারা প্রায় সারাদিন ডাকসু ক্যাফেটেরিয়াতে গড়াতো। সোনালি, রাহাত, জ্যোতি, শুক্লা, ইমরান, বনি, বিপু সব মিলিয়ে বেশ বড় একটা গ্রুপ ছিল তাদের। সেটা ইউনিভারসিটির সেকেন্ড ইয়ার। নব্বইয়ের দশক। ওরা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের। কিন্তু সাবসিডিয়ারি এক। সেই সূত্রেই বন্ধুত্ব। সেই সূত্রেই কি? মনে হয় না। শম্পা মনে করার চেষ্টা করল ঠিক কি সূত্রে রাহাতের গ্রুপে সে ও সোনালি ঢুকে পড়েছিল। শম্পার স্কুলফ্রেন্ড ছিল মিলা। মিলা আর রাহাত পড়তো ফিলোসফিতে। মিলাই তাকে নিযে গিয়েছিল ডাকসু ক্যাফেটেরিয়াতে। আর পরে মিলার চেয়েও তারই বেশি বন্ধু হয়ে গিয়েছিল রাহাতের সঙ্গে। বলা ভালো রাহাতদের সঙ্গে। সে আবার সোনালিকে নিয়ে গিয়েছিল সেই আড্ডায়।
রাহাতের মৃত্যুর খবরের প্রায় তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শম্পার মনে প্রশ্ন জেগেছিল বিপু কোথায়? বিপু মানে বিপাশা কি এই খবরটা জানে? সে কি রাহাতের মৃত্যুর সময় তার পাশে থাকতে পেরেছিল? লিপি তার স্ট্যাটাসে লিখেছে রাহাতের কার্ডিয়াক অ্যাটাক হয়েছিল। তার মানে সময় পাওয়া যায়নি একেবারেই। মনে মনে হিসাব করল শম্পা। পঞ্চাশের আশপাশে যাদের বয়স তাদের কার্ডিয়াক অ্যাটাকের প্রথম ধাক্কাতেই শেষ হয়ে যায় সবকিছু। বৃদ্ধদের বরং কিছুটা সময় মেলে। বিপু কি এখন ঢাকায় নাকি বিদেশে? কয়েক বছর আগে তাদের আরেক বন্ধু রনির কাছ থেকে শম্পা শুনেছিল রাহাত শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেনি। বিপুর জন্যই নাকি। বিপুর বিয়েতে ওরা সবাই গিয়েছিল দলবেঁধে। রাহাত ছাড়া। সেদিন বিপুকে চুটিয়ে গালাগাল করতে ইচ্ছা হয়েছিল শম্পার। বিয়ের আসরে সবার সামনে ওর গালে একটা চড় কষিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়েছিল ‘হারামজাদি। একজনের সঙ্গে মজা নিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করতে লজ্জা করছে না?’। কিন্তু বলতে পারেনি বলাই বাহুল্য। বরং বিপুর গয়নাটয়না দেখে তারা বান্ধবীরা বেশ আনন্দমাখানো ঈর্ষাই বোধ করেছিল।
বছর পাঁচেক আগে, রনি আফশোস করে বলছিল, ‘দ্যাখ, মজাটা। বিপু তো ঠিকই বিয়ে করেছে। কিন্তু বিয়ের পরও রাহাতের সঙ্গে তলে তলে ঠিকই রিলেশন চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝখান থেকে বোকা রাহাতটা বিয়ে না করে বিপুর প্রেমে মজে আছে।কালকেও ওদের দেখেছি বসুন্ধরার ফুডকোর্টে।’ ‘সেকি বিপুর সঙ্গে রাহাতের এখনও প্রেম রয়েছে নাকি?ওর হাজবেন্ড কিছু বলে না?’ শম্পার প্রশ্নে প্রাণখোলা হাসি হেসেছিল রনি। ‘গাধা, তুই এখনও আগের মতোই গাধা আছিস। বিপুর হাজবেন্ড জানলে তো বলবে। ও খুব ওস্তাদ। দ্রৌপদীর থ্রিজি অ্যাডিশন। হাজবেন্ড ওর প্রেমে মুগ্ধ। আবার রাহাতও। বিপু নাকি রাহাতকে বলেছে তার অন্তত একটি সন্তানের বাবা হবে রাহাত।’ ‘বিপুর কি মাথা খারাপ নাকি?’ ‘আরে না। রাহাতকে মূলা ঝুলিযে রেখেছে আর কি’ রনি এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিল।
ফেসবুকে আরও অনেক বন্ধুই রাহাতের মৃত্যুতে পোস্ট দিয়েছে। মৃত রাহাতের অ্যাকাউন্টে গিয়ে ওর ছবিগুলো দেখছিল শম্পা। তারও তো একটা পোস্ট দেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পর রাহাতের সঙ্গে শম্পার আর কোন যোগাযোগ ছিল না্। সে সময় শম্পাও তো তার পুরনো প্রেমিককে ছেড়ে নতুন আরেকজনের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ইমরান ছিল রাহাতের বেশ ঘনিষ্ট বন্ধু। একই গ্রুপের ছিল ওরা। সেই আড্ডা থেকেই রাহাত যেমন বিপুর প্রেমে পড়েছিল তেমনি শম্পাও ইমরানের। ইমরানকে যখন ও ছেড়ে দিল তখন ইচ্ছাকৃতভাবেই পুরনো সার্কেলের সঙ্গে সব যোগাযোগ কাট করে দিয়েছিল সে। না, তার নতুন প্রেমিক মাহির তাকে এ বিষয়ে বাধ্য করেনি। বস্তুত মাহির কোনদিন মাথাই ঘামায়নি তার পুরনো প্রেম ট্রেম নিয়ে। এমনকি বিযের পরও কখনও ইমরান বিষয়ে কোন অনুসন্ধান বা জেরা কিছুই চালায়নি। তবু কেন যেন শম্পা, ইমরানকে ভোলার জন্যই ওই সার্কেলের সঙ্গে টোটালি সব যোগাযোগ কাট করেছিল। এখন সেজন্য তার একটু আফশোস হলো।
রাহাতের চেহারা তো খুব বেশি বদলায়নি দেখা যাচ্ছে। সেই কালো দীর্ঘ মেদহীন দেহ। হাসিটা আগের মতোই আকর্ষণীয়। চুল বোধহয় একটু কমে গিয়েছিল। অথবা পিছনে ঝুঁটি বাঁধা দেখে তা মনে হচ্ছে। ঝুঁটি বাঁধা কেন? ওহ, রাহাত তো ব্যান্ডে গানটান গাইতো। খুব একটা নাম করেনি অবশ্য। তবু ওর ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে বেশ কয়েকটা মিউজিক ফেস্টে অংশও নিয়েছে। রাহাতের কণ্ঠ্ও মনে পড়লো শম্পার। হ্যা, বেশ ভালো গান গাইতো রাহাত। গিটারটা ওর সঙ্গেই থাকতো বলা যায়। রাহাতদের বাড়ি ছিল ধানমন্ডিতে। মোটামুটি বড়লোকের ছেলে। পরিচয়ের শুরুর দিকে রাহাতের প্রতি শম্পার বেশ আকর্ষণও ছিল। একটু আধটু ফ্লার্টিংও চলছিল। হয়তো সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু তারমধ্যেই বিপু ঢুকে পড়লো। আর রাহাতও একেবারে লেজেগোবরে প্রেমে পড়ে গেল বিপুর। কেন? এ প্রশ্নটা তখনও শম্পা করেছিল সোনালিকে। সোনালিও বুঝতে পারেনি। সোনালিরও বেশ আগ্রহ ছিল রাহাতের দিকে। সোনালিও সুন্দরী ছিল। বলতে কি বিপুর চেয়ে বেশিই সুন্দরী। কিন্তু সোনালি থাকতো রোকেয়া হলে। মফস্বলের মেয়ে। আর বিপু ছিল লালমাটিয়ার। হ্যা বিপুর চটক ছিল। শম্পাও ঢাকার মেয়ে। সুন্দরীও। কিন্তু পুরান ঢাকার। তাই বিপুর স্টাইলটা শম্পার মধ্যে ছিল না। রাহাত যখন বিপুর প্রেমে হাস্যকরভাবে হাবুডুবু খেতে লাগলো তখন শম্পাও সেকেন্ড চয়েজ ইমরানকে বেছে নিল। ইমরানও মফস্বলের ছেলে। রাহাতের মৃত্যুতে সোনালি, লিপি, মুনা আরও অনেকে বেশ শোক প্রকাশ করেছে। কিন্তু বিপুর কোন স্ট্যাটাস চোখে পড়লো না। অথচ রাহাতের বন্ধু তালিকায় তো বিপু জ্বলজ্বল করছে দেখা যাচ্ছে। ‘হারামজাদি’। বিপুকে গালি দিয়ে বেশ তৃপ্তি বোধ করলো শম্পা। এই গালিটা স্ট্যাটাসে দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সেটা শোভন হবে না। শম্পা উইমেন অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে আজকাল বেশ ভালো পরিচিতি পেয়েছে সোশাল মিডিয়ায়। নারীকে গালাগাল করা তার ইমেজের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু মনে মনে গালি দিতে তো বাধা নেই। ‘হারামজাদি। কুত্তার খড়। নিজেও খেল না। আর অন্যদেরও রাস্তা আটকে রাখলো।’ রাহাতের মতো একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম হলে শম্পার জীবনটাই অন্যরকম হতে পারতো। ইমরানের সঙ্গে ব্রেকআপ, মাহিরের সঙ্গে টিমটিমে দাম্পত্য, আর্থিক টানাপড়েন কোনটাই হতো না হয়তো। রাহাতদের ধানমণ্ডির বাড়িটার কথা মনে পড়লো শম্পার। অনেক আগে রাহাতের জন্মদিনে একবার গিয়েছিল। কি সুন্দর বাড়ি। তার সঙ্গে প্রেম হলে রাহাতের জীবনটাও তো অন্যরকমই হতো। তারা দুজনই দুজনের জীবন ভরিয়ে তুলতে পারতো। গোছানো সংসার হতো তাদের।
বইমেলার স্মৃতি মনে পড়লো শম্পার।তখনও গ্রুপে বিপুর প্রবেশ ঘটেনি। প্রায়ই দলবেঁধে বইমেলায় যেত তারা। মাঝে মধ্যে নিরবে দুপুরে খাওয়া খুব জমতো। বেশিরভাগ দিনই রাহাত স্পন্সর করতো। পহেলা ফাল্গুনে একবার তাকে দেখে মুগ্ধ রাহাত তাত্ক্ষণিকভাবে মুখে মুখে একটা গান বানিয়ে গেয়ে উঠেছিল্। ভীষণ খুশি হয়েছিল সে। গ্রুপের সবারই দারুণ ভালো লেগেছিল গানটা। এমনকি জ্যোতি তো সেটা পরেও গাইতো। রাহাত্ও। তবে পরে সেটা রাহাত গেয়েছিল বিপুর জন্য। বিপু কি কখনও জেনেছিল যে এ গানটা কার জন্য বেঁধেছিল রাহাত। সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি শম্পাকে প্রোজেক্ট প্রোপোজালের কাজ থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে নিয়ে গেল। সে একটা এনজিওতে কাজ করে। অনেক চড়াই উতরাইয়ের পর আজকাল আর্থিক সংকট কিছুটা কেটেছে। তবু এনজিওর চাকরি কখন আছে, কখন নেই সেটা বলা যায় না। বিকেল চারটা বাজে। আজকে ছটার মধ্যে প্রোপোজালটা শেষ করতে হবে। তারপর ডিনারে সেটা গেলাতে হবে ডোনারদের। সুইডেনের ডোনার এজেন্সির তিন মোরগাকে নিয়ে দিনাজপুরের অফিসে এসেছে শম্পা। বিদেশি মোরগা। তারা ফিল্ড না দেখে টাকা দিতে রাজি নয়। আজকে সকালটা গেছে ওদের নিয়ে। সন্ধ্যায় ডিনার। সেখানে নতুন করে টাকা ঢালায় তাদের রাজি করাতেই হবে। নইলে চাকরি থাকবে না। রাহাতের চিন্তা প্রায় জোর করেই সরিয়ে রেখে কাজে মন দিল শম্পা।
তখনকার মতো রাহাতকে দূরে সরিয়ে রাখলেও রাতের গভীর অন্ধকারে ফিরে এলো সে। নির্জন গেস্ট হাউজের বালিশে মাথা রেখে আবার ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায় চলে গেল শম্পা।
রাহাতের সঙ্গে যোগাযোগ নেই প্রায় বাইশ বছর। বাইশ বছর যে বন্ধুর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই তার শোকেও কি চোখে এত জল আসে? সে কি কাঁদছে রাহাতের জন্য নাকি হারিয়ে যাওয়া সেই মোহময় ভোরবেলার জন্য? প্রথম তারুণ্যের বন্ধুদের জন্য কি সত্যিই এত ভালোবাসা জমে থাকে বুকের ভিতর? শুধু ভালোবাসা? কামনাও কি নয়? রাহাতের ছবিগুলো দেখতে দেখতে বাইশ বছর আগের মৃত কামনাও কি জেগে ওঠেনি? রাহাতের অসামান্য শারিরীক আবেদনের স্মৃতিও তো অবচেতনেই আঘাত করছিল। সেই সঙ্গে একটা অপরাধবোধও জাগছিল। একজন মৃত মানুষের প্রতি তীব্র কামনা বোধ করা কি সঠিক। যে দেহে এতক্ষণে পচন ধরেছে, মাটির নিচে কীটের খাদ্য হতে চলেছে, সেই দেহের প্রতি কল্পনাতেও কাম জেগে ওঠা তো মনে হয় অন্যায়। সে দেহকে জড়িয়ে ধরার এমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা তো সে কোনদিন ইমরান বা মাহিরের প্রতিও বোধ করেনি। শম্পা নিজেকে একটু ঘৃণার সঙ্গে বললো, রাহাতের মৃত্যু তো বরং তোমার জন্য ঘন্টাধ্বনি হওয়া উচিত। এখন বিদায়ের পালা শুরু হলো, দরজায় মধ্যবয়স। সে রাহাতের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া করতে চাইল। কিন্তু পারলো না। বরং বিপুকে চুটিয়ে গালাগাল করার বাইশ বছরের পুরনো ইচ্ছাটাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো।
Flag Counter


2 Responses

  1. মাহমুদুল হাসান says:

    অনেকদিন ধরে আপনার লেখার একজন ভক্ত। খুব ভালো লাগলো। আপনার কবিতাও খুব ভালো লাগে।
    ভালো থাকবেন।

  2. shanta maria says:

    অনেক ধন্যবাদ। প্রেরণা পেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.