কবিতা

শাহনাজ মুন্নীর `লীলা বিহারে’

শাহনাজ মুন্নী | 17 Dec , 2018  


জামাল আহমেদের চিত্রকর্ম


গল্প আর গুজবেরর গন্ধে ভরা এই পুরনো শহরের রাস্তায়
বাজ পাখি কাঁধে নিঝুম দুপুরে কে যেন হেঁটে যায়
আমিও যেতে চাই লীলা বিহারে–ভয়শূন্যতার আলো গভীরে
পাখি-পেঁচা-কাঠবেড়ালি আর হরিণ শিশুদের বিস্ময় ভরা জগতে
রক্তের ভেতরে যেসব লাল পিপড়া হাঁটে, লাইন করে দল বেঁধে
তারা জানে, নিস্ফল আকাঙ্ক্ষার পেছনে
আমৃত্যু ঊর্ধশ্বাসে দৌড়ানোই আমার নিয়তি
প্রতিদিন খাম খুলে পাই যে নীল স্তব্ধতা
প্রেমের রাতে সেইসব স্তব্ধতা ভেঙে
শত টুকরো করে ছড়িয়ে দেই পৃথিবীর গরম বাতাসে
দেখি নরম চাঁদের মতো প্রেম ক্ষয় হয়ে মায়া নাম ধরে
তোমার ধ্যানের শান্ত ডুবন্ত সুরে
মতিচ্ছন্ন মানুষের অনন্ত কান্না ঝরে পড়ে …

২.
সমতলের নদী হয়েও আমি সুউচ্চ পর্বত ভালবাসি, মাঝে মাঝে তার চকিত ছায়া পড়ে আমার উত্তাল রক্তে, মাঝে মাঝে সহৃদয় পাখিরা ঢেউয়ের সিম্ফনি বয়ে নিয়ে যায়, আমরা কেউ কারো কান্নার ভাষা বুঝি না, ফলে অবিনাশি অভিমানে আয়না ভেঙে ফেলি, ভান করি বৃষ্টির সুররিয়েল দিনগুলি ভুলে যাবার, নিজস্ব তাঁতে আমি বুনতে থাকি উপেক্ষার চাদর আর আক্ষেপের ওড়না, আমরা ছিলাম বাস্তবিকই ভ্রমণপ্রেমী, মীমাংসা অযোগ্য রাস্তায় কেবল পাশাপাশি হাঁটতে চেয়েছিলাম, কোথাও পৌঁছুতে না।

৩.
নারীরাই উত্তম মেষপালক,
তারাই দান করে স্তন ও স্তন্য, দেহ ও অন্ন
মেষরা চিনেছে নারীর ব্যাকুল কন্ঠ, নারীও চিনেছে মেষ শাবকের আকুল ব্যা ব্যা
নারীই চিরকাল তাড়িয়েছে নেকড়ের পাল
নারীই ভেসে যায় পলাতক মেষদের পিছু পিছু গহীন গড্ডালিকায়
জরায়ুতে ভ্রুণের মৃদু নত নড়া-চড়া
হৃদয়ে প্রহারের গাঢ় ঘন দাগ নারীগণ বেশ টের পায়
চুম্বন প্রলম্বিত করে নারীই ডেকে নেয় গোপন গুহায়,
নারীই পেয়েছে ঐশীবাণী তোমার ঠোঁটে, তোমার জিহবায়
দিগন্তে প্রসারিত নৈঃশব্দে তারা অলৌকিক শব্দ শুনতে পায়
আশ্লেষে সব শেষে মেষ লোমে নারীরাই স্বপ্নের উষ্ণ পোষাক বানায়

৪.
যাদের ব্যাগে লুকানো ছিল মানুষের হাড় কাটার করাত আর হরর ফিল্মের অশুভ ফুটেজ, তাদের কাছে ইহকাল বিক্রি করে মহাজাগতিক ম্যাজিক কিনতে চেয়েছো, যাদুতে পাওয়া পায়রাগুলো উড়ে গেলে কি করবে তাও জানো না, ধুলোর সঙ্গে মিশে যাওয়া মৃত মানুষেরা জানে, জানে ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়া মানুষের দল, সাপ ও শেয়াল কখনো পোষ মানে না, বন্ধ দরজার ওপাশে লুকিয়ে থাকে অবিশ্বাস, গুপ্ত ক্যামেরায় অকস্মাৎ আটকে আসে নক্ষত্রের শ্বাস, অনাথ গল্পগুলো ভালবাসে জীবনের ধোয়া উঠা গরম দীর্ঘশ্বাস।

৫.
অশান্ত উন্মাদের মতো এই নীল জীবন
তাকে জোর করে আটকে রাখি আত্মশ্লাঘার বৃত্তে,
অদৃষ্টবাদের শেকল দিয়ে বেঁধে রাখি হাত-পা
বলি, যেয়ো না নিষিদ্ধ মানুষের কাছে, খেয়ো না তার দেওয়া অমৃত ফল
এবার একটু থামো হে অস্থির পরিব্রাজক
তোমার দুর্বল হৃদয় নয়তো ততটা সুরক্ষিত
যা সহ্য করতে পারে একলা ভ্রমণের বিষাদ
তোমার নখের ভেতর, জিভের লালায় থেকে যাবে বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন
যতই লুকাতে চাইবে রোদের আলোয় ততই স্পষ্ট হবে অনুতাপ
আমি তো সরল দোয়েলের মতো ব্যক্তিগত মৃত্যু শয্যার নিভৃত ছবি এঁকে রেখেছি
চশমার পেছনে পালিয়ে থাকা চোখগুলো যেন কিছুতেই খুঁজে না পায় কান্নার দাগ
শান্ত মন্দ্র মেদুর ঢং-এ ভুলে যাবো মিথ্যা অনুরাগ,
সারা গায়ে মেখে নেবো পাললিক নীরব আঁধার
মাঝে সাঝে মৃদু শ্বাসকষ্ট হলে কবর ছেড়ে বেরিয়ে এসে
রক্ত পান করে যাবো সবুজ পূর্ণিমার
Flag Counter


2 Responses

  1. সাকিরা পারভীন says:

    অসাধারণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.