বিশ্বসাহিত্য

নোবেলজয়ী নাদিয়া মুরাদ নামের ‘শেষ মেয়েটিকে দাবায়ে রাখতে পারে নি’

আনিসুর রহমান | 11 Dec , 2018  


সুইডিশ একাডেমীর আভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কারণে ২০১৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় নি। একাডেমী আগেই এরকম সিদ্ধান্ত জানিয়ে রেখেছিল। তবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়া না হলেও এবারের নোবেল পুরস্কারের আলোচনায় সাহিত্য অনুপস্থিত নয়। ২০১৮ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে যৌথভাবে ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ২৫ বছর বয়সী নাদিয়া মুরাদ এবং কঙ্গোর স্ত্রীরোগ বিশারদ ডেনিস মুকওয়েজিকে। আমি আমার এ লেখায় নাদিয়া মুরাদ প্রসঙ্গে বিশেষ করে তাঁর লেখা বই ‘শেষ মেয়েটি’ (দ্য লাস্ট গার্ল) নিয়ে আলোচনা করব।
২০১৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভের আগেই নাদিয়া মুরাদ পশ্চিমা দুনিয়ায় আলোচনায় এসেছিলেন। কে এই নাদিয়া মুরাদ?
নাদিয়া মুরাদের বয়স আজ ২৫। তাঁর জন্ম বেড়ে ওঠা ইরাকের সিনযার জেলায় কচো গ্রামে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ে। ইসলামিক স্টেট নামে ইরাকে দুশমনি চক্রের আর্বিভাব হলে ইয়াজিদি সম্প্রদায় এই দুষ্টচক্রের আক্রোশের শিকার হয়। তারা কচো গ্রাম দখলে নিয়ে নেয় ২০১৪ সালে। গ্রামের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোকজন যে সুযোগ পেয়েছে পালিয়ে গেছে; বাকিরা আইএস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে বন্দী হয়েছে, মারা পড়েছে, অনেক মেয়ে যৌনদাসী হতে বাধ্য হয়েছে। নাদিয়া মুরাদ এরকম একজন হতভাগা ইয়াজিদি মেয়ে যে যৌনদাসী হয়ে হাত বদল হতে হতে শেষতক সুন্নী এক মুসলমান যুবকের সহযোগিতায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। পালিয়ে এসেই থেমে থাকে নি; নিজে আত্মরক্ষা করেছে, যোগাযোগ স্থাপন করেছে সমমনা ইয়াজিদি কূর্দি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে – তার যোগাযোগের গণ্ডি বিস্তৃত হয়েছে তার ব্যক্তিগত আইনজীবী থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে অবরুদ্ধ মানুষ, জাতিসংঘসহ নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা। তিনি মুখ বন্ধ করেন নি, দমে যান নি, এমনকি ধরেছেন কলম। রচনা করেছেন অসাধারণ এক সাহিত্যকর্ম ‘শেষ মেয়েটি’ (দ্য লাস্ট গার্ল)।
এই বইটিকে বলা যায় একটা সার্থক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস।
শান্তিতে না হলেও কেবল সাহিত্যের জন্যে হলেও এই গ্রন্থ নোবেল পুরস্কার পাবার সমকক্ষ, একজন পাঠক হিসেবে বইটি পড়তে পড়তে আমার এমনটাই মনে হয়েছে।
নাদিয়ার কণ্ঠ থেকে কলম সকল যুদ্ধই নারীকে লক্ষ করে যৌন সন্ত্রাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। নাদিয়া যেমন উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার, তেমনি পাকিস্তানি মেয়ে মালালা ইসুফজাই তালেবান সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, যিনি ২০১৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। নাদিয়া মুরাদের ‘শেষ মেয়েটি’ গ্রন্থখানা পড়তে গিয়ে আমার কেন জানি মালালার কথা মাথায় খুব একটা আসে নি যতটা এসেছে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীরঙ্গনা মা বোনের কথা। নাদিয়ার এই জীবন কাহিনী বা মহাকাব্য বা উপন্যাস কেন জানি আমার কাছে খুব একটা নতুন মনে হয় নি। মনে হয়েছে আমার জানা অনেক গল্পের অনন্য একটি। বিশেষ করে আমার কানে ও কল্পনায় বার বার ভেসে উঠেছে আমাদের কিংবদন্তী ভাস্কর ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জীবনের গল্প, নিগ্রহ আর নির্যাতনের কথা। তিনিও থেমে থাকেন নি। তাঁকেও দাবায়ে রাখা যায় নি। অন্যদিকে আবার চট্টগ্রামের রমা চৌধুরীর মত অনেক বীরাঙ্গনা নীরবে নিভৃতে নিগৃহীত জীবন পার করে গেছেন।
নাদিয়ার ‘শেষ মেয়েটি’ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমি যেন বাস্তবকে আশ্রয় করে লেখা কোন উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কি অনুপুঙ্খ বর্ণনা! নিরেট সত্য। যে সত্য ইতিহাসে পাওয়া যাবে না; গণমাধ্যমের কোন প্রতিবেদনে মিলবে না। নানা সংস্থার দলিল দস্তাবেজেও এরকম সত্যের তালাশ পাওয়া যাবে না; যেমনটা সম্মোহনী বয়ানে নাদিয়ার কলমে উঠে এসেছে।
নাদিয়া তুলে এনেছেন অবরুদ্ধ মানুষের জীবন ও মনের এমন সব নৈর্ব্যক্তিক তথ্য। অথচ ঘটনার ঘনঘটা অনেকটা কল্পনাশ্রিত কথা সাহিত্যের আদলে। ঘটনার কেন্দ্রে স্বয়ং লেখিকা।
বইটি পড়তে পড়তে আমার কখনও মনে হয়েছে লেখিকা যেন ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে চলেছেন আর তার গলায় ঝুলানো ক্যামেরা দিয়ে ক্যামেরাবন্দী করেছেন। তার সামনে ঘটেছে সব। তিনি যেন পাখির মত গাছের আগডালে বসে জমিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেখে গেছেন আর হৃদয়দেশে ধারণ করেছেন। পরে সময় বুঝে লিখে প্রকাশ করেছেন। এই বর্ণনায় আছে নাটকীয়তা, কবিতার প্রকাশ। নির্মম ও নির্মোহ সত্যের সমাবেশ। আরও আছে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলে আসা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নিষ্পেষণের কথা। ধর্মের নামে মিথ্যাচারের এক মুখোশ উন্মোচন।

রক্তের পর রক্ত জীবনের পর জীবন দিয়ে আদিবাসী নৃগোষ্ঠীরা নিজেদের নাম পরিচয় জন্ম অনুষঙ্গ সংস্কৃতিকে বুকে ও মুখে ধারন করে। ইয়াজিদ জাতিগোষ্ঠীও এর ব্যতিক্রম নয়। সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করার উদ্দেশে যুগে যুগে নিপীড়নের মুখে পড়ে দেশে দেশে আদিবাসী নৃগোষ্ঠী; এর ব্যতিক্রম ইয়াজিদিরাও না। তারা প্রায় সকল শাসকগোষ্ঠীর দ্বারাই কম বেশি নিপীড়ন আর বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তার সবই উঠে এসেছে নাদিয়ার ‘শেষ মেয়েটি’ গ্রন্থে গল্পে গল্পে। তবে জাতিগত নির্মূলের মত এরকম হামলা ইসলামিক স্টেট নামের শয়তানি আমলেই ঘটেছে। নাদিয়া যেন এর সব অনুপুঙ্খ ছবি এঁকেছেন তাঁর নিজের জীবনের রক্ত আর দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। তার বর্ণনা পড়ে বোধগম্য হয় রক্তের নহরের পরে শরীরের খত শুকালেও ভেতরের খত নিয়ে জয়ী হয় যুদ্ধের সন্ত্রাসের শিকার ‘শেষ মেয়েটি’। নাদিয়া জীবনের কথা বলে জীবনের জয়গাঁথা রচনা করেই থেমে থাকেন নি।
তিনি ছুটছেন এদেশ থেকে ওদেশে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন নিজ নৃগোষ্ঠীর ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মুক্তির জন্যে। এ লড়াই চলমান।
তাঁর ৩০৬ পৃষ্ঠার বইটি লিখেছেন জেনা ফ্রাজেস্কি নামের এক লেখিকাকে সঙ্গে নিয়ে। বইটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য থেকে একাযোগে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে। বইয়ের মূল শিরোনামের নিচে উপশিরোনাম হিসেবে রয়েছে আমার বন্দীদশার গল্প এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধ। তিন খণ্ডের প্রথম অংশে ইয়াজিদি নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস গল্পের ঢঙে নাদিয়া নিজেকে কেন্দ্রে রেখে বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয় খণ্ডে কিভাবে আইএস তাদের গ্রাম জেলা দখলে নিল সে প্রসঙ্গ, আর নাদিয়াসহ অন্য মেয়েরা কিভাবে আইএস এর যৌনদাসী হিসেবে বন্দী হল তার বর্ণনা। যৌনদাসী হিসেবে তাঁর তিন মাস বন্দি জীবনের কাহিনী।
তৃতীয় পর্বে তার মুক্তি এবং মুক্তির পর দেশে দেশে আইএস এর বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করা, তার জীবনের উপর ঘটে যাওয়া যৌনসন্ত্রাসের বিষয়ে বিশ্বকে জানিয়ে দেয়া।
আর এই জানানোটা কার্যকর হয়েছে তা তার বইয়ের তৃতীয় পর্বে এবং প্রথম পর্বের অনুক্রমণিকায় আলোকপাত করা হয়েছে।
এই বইটি এক কথায় আদিবাসী নৃগোষ্ঠী ইয়াজিদিদের ইতিহাস নির্ভর এক আখ্যান, আর নাদিয়া মুরাদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌনসন্ত্রাসকে উপজীব্য করে লেখা এক আধুনিক উপন্যাস। যার পরতে পরতে নাটকীয়তা ভরা; দারুণ এক সাহিত্যকর্ম।
পুনশ্চ: বইটির বাড়তি আকর্ষণ নাদিয়া মুরাদের পারিবারিক কিছু ছবির সংযোজন।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.