গদ্য

জল হাওয়া পূর্ণিমা ও পাথর

শামীম আজাদ | 2 Dec , 2018  

বহুদিন সিথানে সভ্যতা, বাজুবন্দে উল্কার ঘাম ও পরাজয় নিয়ে বসে আছি
এ বিধুর কালে ঠোঁটের আঁকে একটিও প্রজাপতি কি দেখা যায়…

যখন জলে ভাসি তখন জানি এই যে উতলা জলখন্ড তার গভীর অতল লেগে আছে মৃন্ময়ীর তলপেট। মাটি মহামায়া। তুমি আছ তাই ভরসা করে পা ফেলি পানসী থেকে পর্বতে। শিখড় থেকে শিখড়ে। এই ভূধর হইতে ভূধরে। কোন ভয় নাই। পা ফস্কালেই মাটি। কিন্তু আকাশের রূপালী ধাতবে পা ছোঁয়ালে সে যখন পাখির মত ওড়ে তখন আমার ভয় হয়। মনে হয় ‘পায়ের নিচে মাটি নাই’। নেই কোন সলিড পাথর। প্লেনের জানালার ওপাশে হাওয়ার হুড়োহুড়ি, মেঘের মন্দাক্রান্তা ধ্বনি, ঐ নিচের রোদের পরত কিছুই আমাকে আস্থা দেয় না। আমার বিন্দু এই মহাকালের এক বেওয়ারিশ বাবল হয়ে যায় । আমি ক্ষ্যাপা হয়ে খুঁজি মাটির পরশ। কোথাও না কোথাওতো আমাকে পা রাখতে হবে। তাই যেদিন থেকে উড়ছি প্রাচীন এ পৃথিবীর এ্যান্টেনায় ঝুলে ঝুলে- আমি আঠা হয়ে আছি ঐ বহুদূরের দেশমাতৃকার অতলের ভাষা, অধীতবিদ্যা, গায়ের বাকল, চোখের চশমা, জুতা, গায়ের গিটার ও স্বাদের আস্বাদ দিয়ে নতুন চুম্বনে চুম্বনে। আমি আমার অধিকার জানান দিয়ে উড়ি। কারো না কারোর সঙ্গে এইসব ছায়াবাজী করে হলেও বুঝিয়ে দিই ‘তোমারই মত ঐখানে আমার ও কিছু আছে চাহিবার’। তো মানুষের জন্যইতো মাটি। প্রাণীর জন্যই ধরা। উড়ন্ত সংসার বলে কোন কথা নেই। প্রজাপতি, পতঙ্গ, পাখিও ফিরে আসে যতক্ষন না তার নখে লাগে মাটিতে গেঁথে থাকা গেহ-গাছ।

কিন্তু মাটিতে স্পর্শ লাগলেই তখন শুরু হয় এক দুর্ভাবনা। যখনই যেখানে দাঁড়াতে চাই তার সীমানার আঁক কষে মালিকানার দাগ নিয়ে পাহারাদার নিয়ে খাড়া হয়ে যায় ভিন্ন এক মানব। সে নাকি আমার আগে ঐ স্থানে এসেছিলো অথবা তার পিতা অথবা তার পিতৃব্য অথবা পৈর দাদা। আমি তার ভাষা বুঝিনা কিন্তু দাবী বুঝি। বুঝি এই পার্বত্যভূম বা সমতল বা জলের দাবীদার বংশ পরম্পরায় এভাবেই হয়েছে। ভাবি কিন্তু যাঁরা চলে গেছে তারা কি নিয়ে এসেছিলো? যাবার সময় তাদের এই যে এত লট এত ঘট হাড়ি সরা ভান্ড কিছুই কি নিয়েছে সাথে? নেয় নাই। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিতে পারে নাই। সেওতো তাহলে ছিল আমারই মতো কোন এক নোম্যাড। এক সময় মার্কিন মুলুকে ছি্লো রেড ইন্ডিয়ান। এখন তারা নোম্যাড। বেগার্স আর নট চুজার্স।

সৃজন পিয়াসী আমি তার জলের কাঙাল। হাত খুলে থাকে শিল্পক্ষুধায়। যাহা পাই তাহাই চেটেপুটে খাই। কড়ে আংগুলে লেগে থাকা কনাও রাখি না বাকি। এডিনবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালের ফাঙ্গাস হওয়া থেকে কস্টা ক্যাফের ফোঁকড়েও ঢুকে যাই। শিল্পধর্মের দিক্ষায় দিতে দিতে এতটাই বদলে গেছি যে দেশে আমি আর যথেষ্ট বাংলাদেশী নই। আর সব ছাড়তে পারিনি বলে বিলেতে, নট এনাফ ব্রিটিশ। আমি এক উদ্ভট ঊট, এক খয়েরী কারি, প্রাচীন অথচ পিষ্ট তরবারি।

আড়াই যুগ আগে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আড়াই কাঠা থান ছিলো। অনুপস্থিত মালিক বলে দেশে নাকি কোন কথা নেই তাই এখন তা চাঁদা-রাজনীতিবাজদের দখলে চারতলা দালান। আমি এখন নিজ বাসভুমে পরবাসী-নোম্যাড। লিখে লিখে সালমান রুশদী বা অরুন্ধতী বা হুমায়ুন না হলে দাঁতের ক্যারিজের ফুটো বন্ধ করেই আর দেশে গিয়ে ছেলেমেয়ের শিল্পক্লাশ নিয়েই ফতুর হতে হয়। আমরা একদিন বুক কেটে এই বিদেশে ফুটিয়ে ছিলাম বাংলাদেশের বিজয়ফুল- সেও এখন অন্য। আমি তাই এখন জাবরকাটা, অতীতবাট্‌ চোখের কুসুম খোলা এক প্রাগৈতিহাসিক প্রানী সদৃশ। কিন্তু আমারও তো তার আগের অতীত ছিলো। এ বাংলাদেশ নির্মানের নৃত্বত্ত ছিলো, জন্ম ছিলো ব্রম্মপুত্রের ঘাটে। লিপিবদ্ধতার আগে হোমারের মত মুখ ছিলো, বাল্মিকীর মত- কাহ্নুর মত শ্লোক ছিলো। কে আর অতীতের খোঁজে হাঁটে? অতীততো আরেক বিদেশ বিভূঁই। সেখানে গুদামে শুধু ক’খানা ছবি ফ্রেমে আটকে পড়ে আছে।

এই অব্যাহত যাত্রায় তাই নিয়ে চলেছি প্রায় ত্রিশ বছর। বাতাস, বর্ষা, আকাশ, আশপাশ, নতুন ফুল ও কুঁড়ির মদ্যপান করি আর এলপি হার্টলীর লাইন বলি “ দ্যা পাস্ট ইজ এ্যা ফরেন কান্ট্রি; দে ডু থিংস ডিফারেন্টলি দেয়ার।”

এখানে ইতিহাস ক্লাশের শিক্ষক পড়ায় কৃতদাসের কাহিনী। কিন্তু ডিয়ার টিচার একবারও কি ভেবেছো তোমাদের ও বহু আগে তারা মুক্ত ছিলো। তাদের নিজের ভাষা ছিল। পশু বধের পর পুড়িয়ে খাবার প্রক্রিয়া বের করেছিলো তারাই। তাদের মাটি তাদেরই ছিলো। যাযাবর বানিজ্যে কার নৌকা মাটি ছুঁতে পারবে তাও বলা কঠিন। তবে তিষ্টাবার প্রথম কৌশলই বুঝি ভাষা। সারমেয়ের মত শব্দ নয় রিয়্যাল সংযোগ স্থাপন। ভাষাবীজ অভিবাসীর প্রথম বপন। এমনকি গত শতাব্দীতে হারিয়ে যাওয়া আমার মা’ও সেটা বুঝেছিলেন।

সেবার আম্মা তার লন্ডন সফর কোটা শেষে বুজানের কাছে টেক্সাস যাবেন। এরপর ভাইয়ার কাছে ক্যানাডা। সেখান থেকে দেশে শুবুর কাছে। একাকী প্লেনে মহাসাগর পাড়ি দিতে পথে তার পানি, ওষুধ, বাথরুম, ব্যাগ, খুচরা পয়সা, চা কত কিছু লাগবে! জিজ্ঞেস করতেই গুয়ামুরী হাসি দিইয়ে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটি পুরানো নোট বই বের করে দেখালেন তিনি তার ভ্রমণকালীন অত্যাবশ্যকীয় বস্তু ও ইংরাজী সংলাপগুলো বাংলায় বানান করে লিখে রেখেছেন! দরকার মত বই দেখে ব্যবহার করে করে দেশগুলো টপকে বেড়াচ্ছেন। সব দেশেই তার পৌত্র পৌত্রী আছে তারাই তার ঠিকাদার। ভাবা যায়! ভাষার গুলাইল মেরে মেরে আকাশেও মাটি খুঁজে নেবেন মহিলা। জাদরেল মিসেস তরফদার!

তাকে এয়ারপোর্ট দিতে গিয়ে লক্ষ্য করি ঝাঁকে ঝাঁকে সুন্দর সুন্দর বুড়ো-বুড়িরা হুইল চেয়ারে ঈটির মত উড়তে আছেন। সন্তানদের সূত্র ধরে তারা দখল করছেন ভিন দেশের মাটি বালি জল ও পাথর। আর আমরা তার তেজারতি করছি অবিরল। বিদ্যা বানিজ্য বংশবৃদ্ধিতে- ভাষায় আশায় ভালোবাসায়। সে যে সে মাটি হোক তার প্রতিটি ইঞ্চিতে মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষেই আছে অধিকার। সেখানে যারা আছে তাদের হাত ধরে হাঁটলে, একসঙ্গে খেলে, কিছুটা দিলে, আচারানুষ্ঠানের আংটা খুলে দিলে, ঘুড়িতে আঠা হয়ে থাকলে, অতীতের অথৈ গল্প করলেই কেবল তিষ্টে থাকার কালে অন্তত আধিকারটা জন্মাতে পারে। কি বলেন! সে শূন্যে হলেও।

তা করলেও অন্তর্জ্বালা আছে। তুমি তোমার ইচ্ছে মত মানুষের হাত ধরতে পারবে না। তোমার যৌণতা, জীবন, জগৎ, জাত সব ঠিক করে দেবে সেখানে আগে আসা পুরুষ ও পুরোহিত, মক্তব ও মোল্লা, পিতা ও পাদ্রী।

পাখির কোন পাশপোর্ট লাগে না। ভিসা বা ভষ্ম মাখতে হয় না। ডিঙি নাও লাগে না। তাদের বর্ডার পুলিশ নেই। মানুষেরা আটকে যাই। তারকাঁটায়, বৈদূতিন জালে, প্লেনের পাখায়। পিষে যাই চ্যানেল টানেলের চাকার তলায়। ডুবে যাই সাগরে। শুকিয়ে মরি মরুভূমিতে। তারপর কৌশলে যা আদায় করি তা এক মালিকানাহীন মালিকানা। গৃহবিহীন গৃহ। কিন্তু যতটা যাওয়া যায়- ততটাই যাওয়া যায়।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.