১৯৭১

সৈয়দ মুজতবা আলীর অগ্রন্থিত লেখা: বাংলাদেশ জয়লাভ করবেই করবে

সৈয়দ মুজতবা আলী | 9 Dec , 2018  


যে-বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা ভাষা-আন্দোলন থেকে, সৈয়দ মুজতবা আলী সেই সূচনা থেকেই জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে। ৫২-এর একুশের ফেব্রুয়ারির বহু আগেই তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বই লিখে পূর্ব পাকিস্তানের শাসকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন উর্দু চাপিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। আবারও বিশ বছর পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে অবিরাম লিখে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অংশ নিয়েছিলেন। সেসব লেখার প্রায় সবই গ্রন্থভুক্ত হয়ে প্রকাশিতও হয়েছে। কিন্তু এখনও কিছু কিছু লেখা রয়েছে যা তার রচনাবলীতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এটি সেরকমই একটি। এই লেখাটি সংগ্রহ করে দিয়েছেন তরুণ প্রাবন্ধিক ও গবেষক মুহিত হাসান। লেখাটি ৯৭ সালের আগস্টে ‘ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তবে লেখাটি যে ৭১-এর স্বাধীনতা-যুদ্ধ চলাকালে রচিত তা লেখাটি পড়লে যে-কেউ বুঝতে পারবেন। ‘ভারত বিচিত্রা’ লেখাটি কোন সূত্র থেকে পুনঃপ্রকাশ করেছিল তা উল্লেখ করেনি।

কিছুদিন ধরে পূর্ব বাঙলায় দ্রুতগতিতে যে নাটকীয় পটপরিবর্তন হচ্ছে সেটা বিশ্বজনকে বিস্মিত করেছে। এর শেষ কোথায় কে বলতে পারে? তবে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে ‘বাংলাদেশ’ শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করবেই করবে। ইতিহাস কী বলে? ইতিহাসের ভিতর যারা তত্ত্বানুসন্ধান করেন অর্থাৎ ফিলসফারস অব হিস্ট্রি–তাঁরা দুই দলে বিভক্ত। এক দল বলেন, ইতিহাস একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে না; অন্য পক্ষ বলেন, পৃথিবীর সর্বত্রই ইতিহাস একই প্যাটার্ন বার বার বুনে যাচ্ছে। অবশ্য দেশকালপাত্রভেদে সেগুলোতে কিছু-–না-কিছু তফাত থাকেই; সেটা বাহ্য, হেয়।

এই বিষয়ে আমাদের মনে কণামাত্র সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশ গত সাতশ’ বছর দরে একই প্যাটার্ন বুনেছে, বারবার বুনেছে। তার নাম “বিদ্রোহ”। তাই পাঠান-মোগল উভয়ই তিক্তবিরক্ত হয়ে এই গৌড়ভূমি, লক্ষণাবতীর নামকরণ করেছেন “বলগাকপুর”, ফারসি ভাষাতে বলগাক্ শব্দের অর্থ “চিৎকার কলরোল” “কলহদ্বন্দ্ব” এবং সেখানে আরেকটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে, গৌড়জন, (ফারসিতে বাংলাদেশের জন্য প্রায়শ “গৌড়” শব্দ ব্যবহৃত হত) কারোরই আদেশ মানতে চায় না। তাই একাধিক বিদেশী ঐতিহাসিক এই “কুখ্যাত” বল্গাক্পুর নামের অনুবাদ করেছেন “দি সিটি অব রেবেলিয়ন”। অতএব “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” বাঙালি কমিউনিস্ট ভায়াদের এমন কিছু হৃৎপি- রক্ত দ্রুতগামিনী অভিনব আবিস্কার নয়। অবশ্য করজাড়ে আমরা এ স্থলে একটা বিষয়ে একমত। তাঁরা বলেন, “অর্থনৈতিক কারণ ভিন্ন কোনো বিদ্রোহ, কোনো ঐতিহাসিক যুগ পরিবর্তন হয় না।” এস্থলেও তাই। দিল্লি যে এই “বিদ্রোহী” গৌরবভূমির বিরুদ্ধে উত্তপ্ত হয়ে কটু নামকরণ করেছিল তার একমাত্র কারণ ‘বাঙাল’ দেশের লোক যে রীতিমতো “ওক্তমাফিক” খাজনা পাঠায় না, তাই নয়, সুযোগ পেলেই (এবং সুযোগ না হলেও “ব্যাটারা” চান্স্ নেয়) ওরা দিল্লির প্রাপ্য একটা কানাকড়িও পাঠায় না। অথচ ও দেশের কী অর্থের অভাব! স্থূলতম হস্তী থেকে সূক্ষ্মতম মসলিন ওরা সুদূর চীন থেকে ফিরিঙ্গি মুল্লুকে রপ্তানি করে প্রচুর অর্থলাভ করে। দিল্লির হুজুরেরা এর কিছুটা পেলে বড়ই আপায়িত হন। যাকে আজকের দিনে ভাষায় বলে ফরেন এক্সচেঞ্জ। হুজুরদেরও দরকার বিদেশ থেকে এটা ওটার।
কিন্তু প্রশ্ন এই “বাঙাল গোঁয়াররা” দিল্লি শাহ-ইন-শাহ বাদশাহ, বাদশাহ-ই-দীন ও দুনিয়া (ধর্ম ও পৃথিবী উভয়ের অধিপতি), জিল্লুলাহ (ধরাধামে আল্লাহতালার ছায়াবৎ)–এঁকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করত কোন সাহসে?
আজ পূর্ববঙ্গে যা হচ্ছে সেটা তারই পুনরাবৃত্তি। সেই প্রাচীন প্যাটার্ন।

১.এদের ভৌগোলিক পার্থক্য। আপনি গজনি কান্দাহার তাশকন্দ সমরকন্দ যেখান থেকেই বেরোন না কেন (এমনকি বিলেত থেকেও স্থলপথে) এই বাংলাদেশ না পৌঁছানো পর্যন্ত এমন নদনদীর আশ্চর্য অপ্রাচুর্যতা পাবেন না। ব্রহ্মপুত্র পদ্মা যে দেশকে রক্ষা করার জন্যে কী ব্রহ্মদত্ত বর্ম, সেটা পাঠান মোগল তুর্ক উজবেক সবাই জানত। তাদের দেশে যেসব নদী আছে সেগুলো বর্ষার কলকাতার তিন দিন বরাবর বৃষ্টির পর রাস্তায় যে জল জমে নদনদী সৃষ্টি করে তার কাছেও হার মানবে। পদ্মা মেঘনা বাদ দিন। এদেশ জয় করা অসম্ভব নয়। সেটা তো আর এমন কিছু নতুন কথা নয়। আজ রাশা বা আমেরিকা, কন্টিনেন্টের বৃহত্তম দেশ জার্মানির উপর গোটা চারেক অ্যাটম বম্ ফেলে তাকে পদানত করতে পারে। কিন্তু তার উপর রাজত্ব করা? সে তো সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। আজ সিংহলের “সহায়তায়” পশ্চিম পাকিস্তান প্রাণপণ সৈন্য পাঠাচ্ছে। পাঠাক। তাতে ভীত হবার কী আছে! অবশ্য জানি, আজকের দিনে পদ্মা মেঘনা বমার ফাইটার ঠেকাতে পারবে না, একদা যে রকম বর্ষাকালে দিল্লির স্বাধিকার প্রমত্তদের ঠেকিয়ে রাখতে পারত। বাংলাদেশেরই এক ঐতিহাসিক বলেছেন, পদ্মার উত্তাল তরঙ্গজল দেখামাত্রই কাবুল দিল্লির সেনাবাহিনীর ঠোঁটের জল শুকিয়ে যেত। কিন্তু কাহিনীর শেষ তো এখানেই নয়। এখানে যে বক্তব্য সর্বাতিশয় গুরুত্বব্যঞ্জক সেটি এই: ভৌগোলিক অবস্থার পরিপূর্ণ সুযোগ নিয়ে, পাঠান মোগলকে (পূর্ববর্তী হিন্দুযুগেও নিশ্চয়ই তাই ছিল; নইলে রাতারাতি তো কোনো একটা জাত অকস্মাৎ বীরর্ষভে পরিণত হয় না) যারা যতদূর সম্ভব মাতৃভূমিধর্ষণ থেকে ঠেকিয়ে রেখেছিল, কখনো হার মেনেছে, কখনো জিতেছে, তারা আপন জানা-অজানাতে বীরবংশের সৃষ্টি করে। আজ পদ্মা মেঘনা জনাব য়েহইয়া খানের কাছে দুর্লঙ্ঘ্য নয়, বোমারু বিমানাদি তার বিস্তর আছে। তারা নদনদীর বাধা মানে না। তিনি হয়তো কার্পেট বম্বিং করে পূর্ব বাংলাকে ধরাশায়ী করে দেবেন। তাঁর শেষ মরণকামড় দেবেন। কিন্তু ঐ বীরের দেশের উপর তিনি রাজত্ব করতে পারবেন না, রাজত্ব করতে পারবেন না।
পূর্ব বাংলার লোক অধিকাংশ মুসলমান। তবুও তারা দিল্লির পাঠান মোগল যুগের স্বধর্মীয় মুসলিম শাহ-ইন-শাহদের বিরুদ্ধে লড়াই দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে চেয়েছে।

আর আজ তারা রাওলপিণ্ডির পিণ্ডি চটকাবে!!

সূত্র: ভারত বিচিত্রা, আগস্ট ১৯৯৭

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.