অনুবাদ গল্প

কেন লিউ: কাগজের খেলনা

প্রিসিলা রাজ | 28 Dec , 2018  


কেন লিউ (Ken Liu) চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক। চীনের লানঝাউ এলাকায় ১৯৭৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এগারো বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন এবং সেখানেই থিতু হন। বর্তমানে কানেকটিকাটে বাস করছেন। মূলত বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও ফ্যান্টাসি লেখক তিনি। মূলত ইংরেজি ভাষায় লেখেন ও চীনা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁর লেখা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এফঅ্যান্ডএসএফ, আসিমভস, অ্যানালগ, লাইটস্পিড, ক্লার্কসওয়ার্ল্ড পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এছাড়া বছরের নির্বাচিত গল্প সংকলনগুলোয় একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে।
“পেপার মিনেজেরি” (কাগজের খেলনা) শীর্ষক গল্পটি প্রথম গল্প হিসাবে একাধারে ‘নেবুলা’, ‘হিউগো’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। ছোট গল্প ‘মোনো নো অ্যাওয়ার’ ২০১৩ সালে হিউগো পুরস্কার পেয়েছে এবং উপন্যাসিকা ‘ম্যান হু এন্ডেড হিস্ট্রি: আ ডকুমেন্টারি’ও একই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। ইংরেজিতে অনূদিত ‘থ্রি বডি প্রব্লেম’ উপন্যাস ২০১৫ সালে হিউগো পুরস্কারে ভূষিত হয়।
কেন লিউ এখন সাগা প্রেসের জন্য দ্য ড্যান্ডেলিয়ন ডাইনাস্টি ধারাবাহিকের জন্য লিখছেন। এই ধারাবাহিকে তাঁর দ্য গ্রেস অব কিংস উপন্যাস ২০১৫ সালে নেবুলা পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত পর্বে মনোনয়ন পায়।
হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে পাশ করা আইনজীবী কেন লিউ এখন প্রযুক্তিখাতে আইনি পরামর্শক হিসাবে কাজ করছেন।

আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রথম স্মৃতি হচ্ছে, আমি কাঁদছি আর মা-বাবা আমাকে নানাভাবে ঠা-া করার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষমেষ ব্যর্থ হয়ে বাবা শোবার ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেল। মা আমাকে কোলে নিয়ে চলে এল খাওয়ার ঘরে। খাবার টেবিলের ওপর আমাকে বসিয়ে দিল।
তারপর “কান, কান,” বলতে বলতে মা ফ্রিজের ওপর থেকে এক টুকরো মোড়কের কাগজ টেনে নিল। বড়দিনের উপহারের মোড়কগুলোকে গুছিয়ে ফ্রিজের ওপর রাখত মা। এভাবে ফ্রিজের ওপর মোড়কের একটা স্তূপ জমে গিয়েছিল।
মোড়কটাকে নিয়ে মা সাদা দিকটাকে ওপরে রেখে বিছিয়ে নিল। তারপর ভাঁজ করতে শুরু করল। কাগজ নিয়ে কারিকুরি করতে দেখে আমার কান্না জুড়িয়ে এল। আমার কৌতূহলী চোখ তখন মায়ের দিকে।
কাগজটাকে উল্টিয়ে আবার ভাঁজ করে নিল মা। নানারকম ভাঁজ দিয়ে, মুড়িয়ে, বের হয়ে থাকা অংশগুলোকে জায়গামতো ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে মোড়কটাকে এমন করে ফেলা হলো যে একসময় সেটা মায়ের মোড়ানো হাতের ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর কাগজের পুঁটলিটাকে মুখের কাছে নিয়ে ফুঁ দিল মা, ঠিক বেলুনের মতো।
“কান,” মা বলল, “লাওহু।” ভাঁজ করা হাতটাকে টেবিলের ওপর রেখে খুলে দিল।
দেখলাম ছোট্ট একটা কাগজের বাঘ টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আকারটা হাতের দুই মুঠি একত্র করে যতটা হয় তত বড়। মোড়কের কাগজের নকশাটাই বাঘের গায়ের নকশা – সাদা পটভূমির ওপর লাল ক্যান্ডি ও সবুজ ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে করা।
আমি হাত বাড়িয়ে মায়ের সৃষ্টিকে ধরতে গেলাম। ওটার লেজটা নড়ল, খেলার ছলে আমার আঙুল তাক করে লাফ দিল। “গররর…” মৃদুস্বরে আওয়াজ করে উঠল কাগুজে বাঘটা। আওয়াজটা হলো বিড়ালের গরগর ও কাগজের খসখসের মাঝামাঝি।
আমি হাসলাম, চমকেও উঠলাম কিছুটা। তারপর তর্জনি দিয়ে ওটার পিঠে টোকা দিলাম। কাগজের বাঘ আমার আঙুলের ছোঁয়ায় গরগর করে উঠল।
“ঝে জিয়াও ঝেই,” মা বলল। এরই নাম ওরিগ্যামি।
ব্যাপারটার নামটা আমি সেসময় জানতাম না। তবে মায়ের জিনিসগুলোর বিশেষ গুণ ছিল। নিজের নিঃশ্বাস সে ওগুলোর ভেতর ঢুকিয়ে দিত। ফলে মায়ের শ্বাসে ওরা শ্বাস নিত। এভাবে মায়ের প্রাণ থেকে শক্তি নিয়ে ওরা নড়ত-চড়ত, চলত-ফিরত। মায়ের জাদু ছিল সেটা।
#
বাবা মাকে একটা ক্যাটালগ থেকে বেছেছিল।
হাইস্কুলে থাকতে বাবার কাছে পুরো গল্পটা শুনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা চেয়েছিল বিষয়টা নিয়ে আমি যেন মায়ের সঙ্গে কথা বলি।
বাবা ১৯৭৩-এর বসন্তে ঘটকালির কোম্পানিতে নাম লিখিয়েছিল। ওরা যে ক্যাটালগ পাঠিয়েছিল সেটার পৃষ্ঠাগুলো দ্রুত উল্টে গিয়ে তার চোখটা আটকেছিল মায়ের ছবিওয়ালা পাতাটাতে।
সেই ছবি আমি কখনও দেখিনি। বাবার কাছে তার বিবরণ শুনেছিলাম কেবল। একটা চেয়ারে বসা ছিল মা। একটা পাশ ফেরানো ছিল ক্যামেরার দিকে। পরনে ছিল একটা সবুজ রেশমের আঁটো চিয়ংসাম, যেটা কিনা চীন-জাপানের গাউন জাতীয় পোশাক। ক্যামেরার দিকে ফেরানো মুখে দু’পাশ দিয়ে কালো লম্বা চুল কাঁধ ও বুকের ওপর কায়দা করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শান্ত শিশুর দৃষ্টি নিয়ে ক্যাটালগের পাতা থেকে আমার বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
“ক্যাটালগটার আর কোনো পৃষ্ঠা আমি দেখিনি,” বাবা বলেছিল।
ক্যাটালগে তার বয়স লেখা ছিল আঠারো। নাচ করতে ভালবাসে ও হংকংয়ের বাসিন্দা হওয়ার কারণে ভাল ইংরেজি বলে। তবে কোনো তথ্যই পরে আর সঠিক প্রমাণিত হয়নি।
বাবা তাকে চিঠি লিখল। ঘটকালির কোম্পানি তাদের চিঠি চালাচালিতে সাহায্য করল। তারপর বাবা উড়ে গেল হংকংয়ে।
“আসলে কোম্পানির লোকজন ওর হয়ে চিঠির উত্তর দিত। ও তো ‘হ্যালো’ আর ‘গুডবাই’ ছাড়া কোনো ইংলিশই বলতে পারত না।”
কী ধরনের মহিলা হলে কেউ বিক্রি হওয়ার জন্য ক্যাটালগে নিজের ছবি দেয়? হাইস্কুলের ছাত্র আমি ভাবছিলাম। তখন তো আমি সবজান্তা সমশের – সবকিছুই জানি, সব বিষয়ে মহাজ্ঞানের অধিকারী। বিদ্বেষের অনুভূতি চমৎকার লাগত সেসময়। অনেকটা মদের মতো।
ঘটকালির অফিসে চড়াও হয়ে পয়সা ফেরত চাওয়ার বদলে বাবা যেটা করল সেটা হচ্ছে, অনুবাদ করার জন্য রেস্টুরেন্টের ওয়েট্রেসকে পয়সা দিল।
“আমি যখন কথা বলছিলাম চোখে ভয় আর আশা দুই নিয়ে ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। রেস্টুরেন্টের মেয়েটা যখন আমার কথাগুলো অনুবাদ করে দিল তখন ধীরে ধীরে ওর মুখে হাসি ফুটল,” বলেছিল বাবা।
কানেকটিকাটে ফিরে এসে বাবা তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসার জন্য কাগজপত্র গোছাতে শুরু করল। তার এক বছর পর আমার জন্ম হলো। সেটা ছিল বাঘের বছর – দ্য ইয়ার অফ দ্য টাইগার।
#
আমার আবদারে মোড়কের কাগজ দিয়ে মা একটা ছাগল, হরিণ আর জলমহিষও বানিয়েছিল। লাওহু গরগর করতে করতে ওদের পেছন পেছন ছুটত আর ওরা ঘরময় দৌড়ে বেড়াত। যখন কোনোটাকে ধরতে পারত লাওহু, মেঝের ওপর চেপে ধরত যতক্ষণ না ভেতরের বাতাস বেরিয়ে একদম চ্যাপ্টা হয়ে যায়। আমি তখন ফুঁ দিয়ে আবার ফুলিয়ে দিতাম। ওরা দৌড়াতে শুরু করত আবার।
প্রাণীগুলো মাঝে মাঝে অদ্ভুতুড়ে বিপদে পড়ত। একবার ডিনারের সময় জলমহিষটা সয়াসসের বাটির মধ্যে গিয়ে পড়ল। (আসলে ওটা সত্যিকার জলমহিষের মতো কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে চেয়েছিল।) প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওটাকে তুলে নিয়ে এলাম। কিন্তু ততক্ষণে কাগজটা বেশ খানিকটা সস শুষে নিয়েছিল, ফলে ওর পায়ের ওপর দিক পর্যন্ত ভিজে গেল। সসে ভেজা নরম পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে টেবিলের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল। ওটাকে বাইরে নিয়ে রোদে শুকালাম। কিন্তু জলমহিষটার একটা পা কিছুটা খোঁড়াই থেকে গেল। ও তখন লেংচে লেংচে দৌড়াত। মা পরে ওটাকে প্লাস্টিকে মুড়ে দিল যাতে মনের আশ মিটিয়ে সে কাদায় গড়াগড়ি দিতে পারে।
লাওহু চড়–ই পাখি দেখলে ঝাঁপ দিত ধরার জন্য। এটা সে করত যখন আমরা, মানে আমি আর ও পেছনের উঠানে খেলা করতাম। একবার একটা ভীতসন্ত্রস্ত চড়–ই মরিয়া হয়ে ওর কানে বেদম ঠোক্কর বসিয়ে দিল। আমি ওকে মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। ওকে ধরে রাখলাম আমি, আর মা আহত কানে স্কচটেপ পেঁচিয়ে দিল। ব্যথায় ককিয়ে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল সে। তারপর থেকে পাখিদের আর ধাওয়া করত না লাওহু।
একদিন টেলিভিশনে হাঙরের ওপর একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখে মায়ের কাছে হাঙর বানিয়ে দেওয়ার আবদার ধরলাম। মা বানিয়েও দিল একটা। কিন্তু বানানোর পর টেবিলের ওপর সেটা লেজ আছড়াতে লাগল। ডাঙায় মোটেই খুশি ছিল না সে। আমি তখন বেসিনটা পানিতে ভর্তি করে হাঙরটাকে সেখানে ছাড়লাম। মহানন্দে ওটা পানির ভেতর সাঁতরে বেড়াল। কিন্তু অল্পক্ষণ পরই পানিতে ভিজে কাগজগুলো নেতিয়ে পড়ল। পানির তলায় ডুবে গিয়ে কাগজটা সাটপাট হয়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে ওটাকে উদ্ধার করলাম। কিন্তু তখন আর সেটা হাঙর নেই, একটা ন্যাতানো কাগজ হয়ে গিয়েছে।
লাওহু বেসিনের কানায় সামনের দুই পা তুলে দাঁড়িয়ে মাথাটাও সেখানে রাখল। তার কানগুলো ঝুলে গেল। নিচু স্বরে গোঙানি শুনতে পেলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হলো আমার।
মা এবার আমার জন্য আরেকটা হাঙর বানাল। এবার আর কাগজ দিয়ে নয়, টিনের পাতলা পাত দিয়ে। এই হাঙরটা আমাদের গোল্ডফিশের গামলায় মহাসুখে বাস করতে লাগল। লাওহু ও আমি গামলার ধারে বসে হাঙরটাকে গোল্ডফিশ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য দেখতাম। লাওহু আমার উল্টোদিকে বসত। মুখটাকে উঁচু করে গামলার কানায় ঠেস দিয়ে রাখত। ওর চোখগুলো কফির কাপের মতো বড় বড় দেখাত।
#
তখন আমার বয়স দশ। শহরের অন্য প্রান্তে নতুন বাড়িতে উঠে এলাম আমরা। প্রতিবেশী দু‘জন মহিলা আমাদের স্বাগত জানাতে এলেন। বাবা তাঁদেরকে পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করল। তারপর ক্ষমা চেয়ে ছুটল বাড়ির আগের মালিকের রেখে যাওয়া পানি-বিদ্যুতের বিলের সুরাহা করতে। “আপনারা আরাম করুন। আমার স্ত্রী খুব বেশি ইংরেজি বলতে পারেন না। উনি যে আপনাদের সঙ্গে কথা বলছেন না তাতে দয়া করে কিছু মনে করবেন না।”
আমি খাওয়ার ঘরে পড়ছিলাম আর মা রান্নাঘরে কাজ করছিল। প্রতিবেশীরা বসার ঘরে বেশ জোরে জোরে কথা বলছিলেন।
“লোকটাকে দেখলে তো স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এই কাজটা করতে গেল কেন?”
“এমন মিশ্র বিয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে যেটাকে কোনোভাবেই ঠিক বলে মনে হয় না। বাচ্চাটাকে দেখলে কেমন যেন শেষ হয় নাই শেষ হয় নাই মনে হয়। খুদি খুদি চোখ, সাদা মুখ, মনে হয় ছোটখাটো একটা দৈত্য।
“কী মনে হয় তোমার, ও কি ইংলিশ বলতে পারে?”
মহিলারা চুপ করে গেলেন। একটু পরে খাওয়ার ঘরে ঢুকলেন।
“এই যে বাবু! তোমার নাম কী?”
“জ্যাক,” আমি উত্তর দেই।
“নামটা খুব একটা চীনি চীনি মনে হচ্ছে না তো!”
মা খাওয়ার ঘরে এল। মহিলাদের দিকে চেয়ে হাসল। তারা তিনজন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে হাসতে থাকল। কোনো কথাবার্তা নেই যতক্ষণ না বাবা ফিরে এল।
#
আমাদের এক প্রতিবেশীর ছেলে মার্ক, সে এল তার স্টার ওয়ার্সের খেলনাগুলোকে নিয়ে। স্টার ওয়ার্সের চরিত্র ওবি-ওয়ান কেনোবি ছিল ওগুলোর মধ্যে। ওটাকে চালু করল মার্ক। আলোর তরোয়াল জ্বালিয়ে ওটা এদিক-ওদিক হাত ঘুরিয়ে চিকন স্বরে হুঙ্কার ছাড়ল, “শক্তি ব্যবহার করো!” একবারের জন্যও আমার মনে হলো না ওই খেলনাটা বিন্দুমাত্র আসল ওবি-ওয়ানের মতো।
আমরা একসাথে কফি টেবিলের ওপর ওর নড়াচড়া দেখলাম পাঁচবার। “ও কি আর কিছু করতে পারে?”
মার্ক বিরক্ত হয়ে বলল, “সব খুঁটিনাটিগুলো দেখো।”
আমি দেখলাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম না কী বলব।
আমার আচরণে মার্ক কিছুটা আহত হলো। “আমাকে তোমার খেলনা দেখাও।”
কাগজের খেলনা ছাড়া আমার আর কোনো খেলনা ছিল না। শোবার ঘর থেকে আমি লাওহুকে নিয়ে এলাম। ততদিনে লাওহু অনেক পুরানো হয়েছে। ওর গায়ে আঠা আর কাগজের অনেক তাপ্পি পড়েছে। মা আর আমি মিলে ওর ক্ষত সারানোর জন্য যা যা করেছি তারই সাক্ষী এগুলো। আগের মতো অত ক্ষীপ্রও আর নেই সে। ওকে আমি কফি টেবিলের ওপর বসালাম। আমার অন্য প্রাণীগুলোর পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম কাছেই। বসার ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ওরা উঁকিঝুঁকি মারছিল।
“জিয়াও লাওহু,” আমি বলি। তারপরই থেমে গিয়ে ইংরেজি শুরু করি। “এটা হচ্ছে বাঘ।” লাওহু সতর্কভাবে হেঁটে গেল, মার্কের দিকে গরগর আওয়াজ করে তার হাত শুঁকল।
মার্ক মনোযোগ দিয়ে ক্রিসমাসের মোড়কে গড়া লাওহুর শরীরটা দেখল। “এটাকে মোটেই বাঘের মতো দেখতে না। তোমার মা ফেলে দেওয়া কাগজ দিয়ে তোমার জন্য খেলনা বানিয়ে দেয়?”
লাওহুকে আমার কখনোই আবর্জনা মনে হয়নি। কিন্তু এখন আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সত্যিই তো, ও তো এক টুকরো মোড়কের কাগজ ছাড়া আর কিছু না!
মার্ক ওবি-ওয়ানের মাথায় আরেকবার ঠেলা দিল। ওটার আলোর তরোয়ালটা আবার জ্বলে উঠল। ওটার হাত ওপর-নিচ হতে থাকল। “শক্তি ব্যবহার করো!”
লাওহু ঘুরে দাঁড়িয়ে দিল এক লাফ। প্লাস্টিকের খেলনাটাকে টেবিল থেকে নিচে ফেলে দিল। মেঝেয় পড়ে খেলনাটা ভেঙে গেল। ওবি-ওয়ানের মাথা সোফার নিচে গড়াগড়ি খেতে লাগল। “গরররররর,” লাওহু তার অট্টহাসি দিল, ওর সঙ্গে যোগ দিলাম আমিও।
মার্ক আমাকে খুব জোরে ঘুঁষি মেরে বসল। “দামী খেলনা ছিল ওইটা! এখন দোকানেও পাওয়া যায় না। তোর বাপ তোর মাকে যত টাকা দিয়ে কিনেছে তার থেকে বেশি দাম এইটার!”
ঘুষি খেয়ে আমি মেঝেয় পড়ে গেলাম। লাওহু মার্কের মুখ লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল।
চেঁচিয়ে উঠল ছেলেটা, যতটা না ব্যথায় তার চেয়ে বেশি ভয় ও বিস্ময়ে। কাগজের তৈরি লাওহুর কতই বা শক্তি।
মার্ক লাওহুকে খামচে ধরল। গলা চিপে ওর গরগরানি বন্ধ করে দিল। ওর শরীরটা দুমড়ে ছিঁড়ে দু’ভাগ করল। তারপর আমার দিকে কাগজের টুকরো দুইটা ছুড়ে মারল। “এই নে তোর সস্তা চীনা জঞ্জাল।”
মার্ক চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ অবধি আমি লাওহুর কাগুজে শরীরটাকে সোজা করার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। ভাঁজগুলো নতুন করে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কাজ হলো না। ধীরে ধীরে অন্য প্রাণীগুলো বসার ঘরে এসে আমাদের ঘিরে ধরল। আমি আর ছেঁড়াখোঁড়া কাগজ যা একসময়ে ছিল লাওহু।
#
মার্কের সঙ্গে আমার লড়াই সেখানেই শেষ হয়নি। মার্ক স্কুলে জনপ্রিয় ছিল। ওই ঘটনার পরে দুই সপ্তাহ স্কুলে আমাকে কীসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তা আমি আর কখনোই মনে করতে চাই না।
দুই সপ্তাহের শেষে শুক্রবার এল। স্কুলশেষে বাড়ি এলে মা জিজ্ঞেস করল, “ঝুয়েঝিয়াও হাও মা?” উত্তর না দিয়ে আমি বাথরুমে ঢুকলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলাম। আমার কিছুই মায়ের মতো না। আমি মায়ের মতো দেখতে নই।
রাতে খেতে বসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার চেহারা কি চীনাদের মতো?”
বাবা চপস্টিক নামিয়ে রাখল। যদিও আমি বাবাকে স্কুলের কোনো ঘটনাই বলিনি, কিন্তু বাবা মনে হয় আঁচ করেছিল। চোখ বুঁজে বাবা নিজের নাকের বাঁশিতে হাত ঘষল। তারপর বলল, “না, তোকে দেখতে ওইরকম না।”
মা বাবার দিকে তাকাল। বুঝল না কিছু। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “শা জিয়াও চিঙ্ক?”
“ইংলিশ,” আমি বললাম, “ইংলিশ বলো।”
“কী ঘটেছে?” মা ইংরেজিতে বলার চেষ্টা করে।
আমি আমার চপস্টিক আর বাটি দূরে ঠেলে দেই। মা আজ পাঁচটা মশলায় গরুর মাংস দিয়ে সবুজ মরিচ ভাজি করেছিল। “আমাদের আমেরিকান খাবার খেতে হবে।”
বাবা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। “অনেক বাড়িতেই মাঝে মাঝে চাইনিজ রান্না হয়।”
“আমরা সেইসব পরিবারের মতো না।” তার দিকে তাকিয়ে বলি, “ওইসব পরিবারে এমন মা নেই যে আর সবার মতো না।”
বাবা অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, “আমি তোমাকে রান্নার বই এনে দেব।”
মা আমার দিকে ফিরে বলে, “বু হাওছি?”
“ইংলিশ,” আমি বললাম, ইংলিশ বলো।”
আমার দিকে এগিয়ে আসে মা। জ্বর হয়েছে কিনা দেখতে কপালে হাত ছোঁয়ায়। “ফাশাও লা?”
তার হাত আমি ঠেলে সরিয়ে দিলাম। “আমি ভাল আছি। ইংলিশে কথা বলো!” চীৎকার করে বলি আমি।
“ওর সঙ্গে ইংলিশে কথা বলো।” বাবা মাকে বলল। “তুমি জানতে একদিন না একদিন এটাই হবে। কী আশা করেছিলে তুমি?”
মায়ের হাত দু’টো দু’পাশে ঝুলতে লাগল। সে চেয়ারে বসল। তারপর একবার বাবার দিকে একবার আমার দিকে তাকাল। কথা বলতে চেষ্টা করল বারবার। কিন্তু বারবারই থমকে গেল।
“তোমাকে পারতেই হবে।” বলল বাবা। “আমি আসলে তোমাকে কোনো চাপই দেইনি। জ্যাককে এখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।”
বাবার দিকে তাকাল মা। “আমি যদি ‘ভালবাসি’ বলতে যাই তখন ‘আই লাভ’ বললে মনে হয় আমি এখান থেকে বলছি,” নিজের ঠোঁটে হাত রাখে সে। “আর যদি আমি ‘আই’ বলি আমার মনে হয় আমি এখান থেকে বলছি।” হৃদপি-ের ওপর হাত রাখে মা।
বাবা মাথা নেড়ে বলে, “কিন্তু মনে রাখতে হবে তুমি এখন আমেরিকায় আছ।”
মায়ের দেহটা চেয়ারে কুঁজো হয়ে যায়। তাকে দেখতে লাগছিল লাওহুর হাতে তছনছ হওয়া সেই জলমহিষটার মতো, দুমড়েমুচড়ে যেটার হাওয়া বের করে দেওয়া হয়েছিল।
“আর আমার কিছু সত্যিকারের খেলনাও লাগবে।”
#
বাবা আমাকে স্টার ওয়ার্সের সব পুতুলগুলো কিনে দিল। তার মধ্য থেকে ওবি-ওয়ান কেনোবিটাকে মার্ককে দিয়ে দিলাম।
কাগজের খেলনাগুলোকে একটা বড় জুতার বাক্সে ভরে খাটের নিচে চালান করলাম।
পরদিন সকালে জন্তুগুলো জুতার বাক্স থেকে বেরিয়ে আমার ঘরে তাদের প্রিয় কোনটাতে গিয়ে জড়ো হলো। ওগুলোকে ধরে এনে জুতার বাক্সটাতে আবার ভরলাম। এবার ঢাকনাটাকে শক্ত করে এঁটে বন্ধ করলাম। কিন্তু সেটার ভেতর থেকে এমন বিকট আওয়াজ বেরোতে লাগল যে বাক্সটাকে চিলেকোঠায় ঠেসে দিয়ে এলাম।
মা যদি আমার সঙ্গে চীনা ভাষায় কথা বলত আমি উত্তর দিতাম না। এরপর থেকে সে যতটা সম্ভব ইংলিশ ব্যবহার করার চেষ্টা করত। কিন্তু তার ভাঙা ভাঙা উচ্চারণ আমাকে বিব্রত করত। সংশোধন করে দিতাম আমি। একটা সময়ে এসে সে আমার উপস্থিতিতে কথা বলাই বন্ধ করে দিল।
আমাকে যদি কিছু জানানোর দরকার পড়ত মা আমাকে ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করত। টিভিতে দেখে আমেরিকান মায়েদের কায়দায় আমাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করত। কিন্তু তার এই কায়দা আমার কাছে বানানো, কৃত্রিম ও হাস্যকর বলে মনে হতো। আমি বিরক্ত হচ্ছি দেখে মা সেটাও বন্ধ করে দিল।
“তোমার মায়ের সঙ্গে এভাবে আচরণ করাটা তোমার ঠিক হচ্ছে না।” বাবা একদিন বলল। কিন্তু কথাটা বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারেনি। চীনের এক কিষানীকে ধরে এনে কানেকটিকাটের শহরতলিতে ফিট করানোর চেষ্টা যে একেবারেই ভুল ছিল, মনের ভেতরে সেটা তো সে ঠিকই বুঝেছিল ।
আমেরিকান পদ রান্না করতে শিখে গিয়েছিল মা। আমি ভিডিওগেম খেলতাম আর ফরাসী ভাষা শিখতাম।
প্রায়ই দেখতাম মা রান্নাঘরে বসে মোড়কের কাগজ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছে। তারপর অবধারিতভাবেই একটা কাগজের জন্তু আমার খাটের পায়ায় দেখা দিত। আমার সঙ্গে সেটা আহ্লাদ করতে আসত। আমি তখন ওটাকে ধরে, মুচড়ে ওর হাওয়া বের করে দিতাম। তারপর চিলেকোঠায় রাখা সেই বাক্সে ঠুসে দিয়ে আসতাম।
অবশেষে মা ক্ষান্ত হলো আমি যখন হাইস্কুলে উঠলাম তখন। আর জন্তু তৈরি করত না সে। ততদিনে তার ইংলিশ অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু ততদিনে আমি সেই বয়সে পৌঁছে গেছি যখন তার কোনো কথাতেই আমার আর আগ্রহ নেই। সেটা যে ভাষাতেই হোক না কেন।
মাঝে মাঝে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন মাকে রান্নাঘরে ব্যস্তভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখতাম। হয়ত তার গলায় থাকত কোনো চীনাভাষার গান। নিজেকে শোনাতেই সে গাইত। অবিশ্বাস্য লাগত আমার। এই মহিলা কী করে আমায় জন্ম দিল? তার সঙ্গে কোনো কিছুতেই কোনো মিল নেই আমার। এই মহিলা যদি চাঁদ থেকেও আসত তাহলেও কিছু বলার ছিল না, এমনই আমাদের অমিল। দ্রুত আমি নিজের ঘরে ঢুকে যেতাম। সেখানে সত্যিকার আমেরিকান সুখের পেছনে ছোটার কার্যক্রম অপেক্ষা করত আমার জন্য।
#
হাসপাতালের বিছানায় শোয়া মায়ের দুই পাশে আমি আর বাবা দাঁড়িয়ে ছিলাম। মায়ের বয়স তখনও চল্লিশও হয়নি। কিন্তু তাকে লাগত আরো বেশি।
বছরের পর বছর ব্যথায় ভুগেছে কিন্তু কখনও ডাক্তারের কাছে যায়নি। বলত, ব্যথাটা তেমন কিছু না। অবশেষে অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে যখন হাসপাতালে এল ততদিনে ক্যান্সার অনেক বেশি ছড়িয়েছে, অস্ত্রোপচারের অতীত।
আমার মনটা যদিও হাসপাতালের ওই ঘরে ছিল না। ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্টের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম চলছে তখন। আমার সমস্ত মনোযোগ বায়োডাটা, ট্র্যান্সক্রিপ্ট, স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারভিউ শিডিউল তৈরিতে নিবদ্ধ। করপোরেট চাকরিদাতাদের কোন মিথ্যাটা কীভাবে বললে তারা আমাকে চাকরির অফার দেবে সারাক্ষণ কেবল এসবই ভেবে চলেছি। বুদ্ধিগতভাবে এটা না বোঝার কোনো কারণ ছিল না যে, মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে এসব ভাবনা মানায় না। কিন্তু সেই বোঝা তো আর আমার অনুভূতিকে পাল্টে দিতে পারে না।
মা চেতন ছিল। বাবা নিজের দুই হাতে তার বাঁ হাতটা ধরে ছিল। নিচু হয়ে মায়ের কপালে চুমু খেল। তাকে বেশ দুর্বল ও বুড়ো লাগছিল যেটা আমাকে বেশ খানিকটা চমকে দিয়েছিল। সেইসময় আমার একটা উপলব্ধি হলো যে, মাকে আমি যত কম চিনি বাবাকেও ঠিক ততটাই কম চিনি।
মা বাবার দিকে তাকায়। হেসে বলে, “আমি ভাল আছি।”
এবার আমার দিকে তাকায় মা। হাসিটা তখনও মুখে লেগে আছে। “আমি জানি তোকে স্কুলে ফিরে যেতে হবে।” খুব দুর্বল স্বরে বলা কথাগুলো তার গায়ে লাগানো যন্ত্রপাতির গুঞ্জনের মধ্যে প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। “যা তুই। আমার জন্য ভাবিস না। আমার কিছু হয়নি। কেবল স্কুলে ভাল করিস।”
তার হাতটা ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়ালাম আমি। ওই সময় সেটাই করা উচিত বলে মনে হচ্ছিল। হাঁফ ছাড়লাম আমি। কারণ মাথায় তখন কেবলই ফিরতি ফ্লাইট আর রৌদ্রকরোজ্জ্বল ক্যালিফোর্নিয়ার ছবি ঘুরপাক খাচ্ছিল।
বাবার কানে কানে কিছু বলল মা। মাথা ঝুঁকিয়ে বাবা বেরিয়ে গেল।
“জ্যাক, শোন বাবা…” কাশির দমকে কথা বন্ধ হয়ে এল মায়ের। “এ যাত্রা যদি আর না বাঁচি, খুব বেশি দুঃখ পাস না। নিজের শরীরের যতœ নিস। জীবনের দিকে দৃষ্টি দে। কেবল একটা কাজ করিস, চিলেকোঠার বাক্সটা নিজের কাছে রাখিস সবসময়। আর ফি বছর কিংমিংএর সময় বাক্সটা বের করে আমার কথা ভাবিস। তাহলেই আমি সবসময় তোর সঙ্গে সঙ্গে থাকব।”
কিংমিং চীনাদের মৃতদের স্মরণ করার উৎসব। আমার খুব ছেলেবেলায়, কিংমিংএর দিন মা চীনে তার মৃত বাবা-মাকে একটা করে চিঠি লিখত। সেই চিঠিতে থাকত বিদায়ী বছরে তার আমেরিকার জীবনের সব ভাল ভাল ঘটনার কথা। চিঠিটা লিখে মা আমাকে জোরে জোরে পড়ে শোনাত। আমি যদি কিছু বলতাম তবে সেটাও সে লিখে দিত। চিঠিটা তারপর ভাঁজ করে বক তৈরি করা হতো। তারপর পশ্চিমদিকে মুখ করে উড়িয়ে দেওয়া হতো। আমরা বকটার উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওটা পাখা নেড়ে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে, চীনে মায়ের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে উড়ে যেত।
মায়ের সঙ্গে আমার এই যৌথ উদযাপনের পর বহু, বহু বছর পেরিয়ে গেছে।
আমি বললাম, “চাইনিজ ক্যালেন্ডারের কিছুই জানি না আমি। রেস্ট নাও মা…”
“তুই শুধু বাক্সটা তোর সঙ্গে রাখিস আর মাঝেমধ্যে খুলিস, তাহলেই হবে…” আবার কাশতে শুরু করে সে।
“ঠিক আছে মা,” তার হাতে হাত বুলিয়ে দেই। আমার হাতে রাজ্যের জড়তা।
“হাইজি, মামা আই নি…” কাশির দমক শুরু হয় আবার। বহু বছর আগের একটা ছবি স্মৃতিতে ঝলক দিয়ে যায়। “আই” বলে মা নিজের হৃৎপি-ের ওপর হাতটা রাখছে।
“ঠিক আছে মা। আর কথা বলো না,” আমি বলি।
বাবা ঘরে ঢোকে। আমি তাকে বলি যে আমার তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্টে যাওয়া দরকার। নয়ত ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে।
মা মারা গেল আমি যখন নেভাদার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি তখন।
#
মা মারা যাওয়ার পর বাবা দ্রুত বুড়ো হয়ে গেল। বাসাটা একজনের পক্ষে বেশি বড় হয়ে যাওয়াতে বেচে দিতে হলো। বান্ধবী সুজানকে সঙ্গে নিয়ে আমি তার গোছগাছ আর ঘর পরিষ্কারে সাহায্য করতে এলাম।
চিলেকোঠার সেই বাক্সটা সুজানই খুঁজে পেল। সেই কাগজের খেলনাগুলো, চিলেকোঠার ধুলোবালি আর ঠা-া-গরমের কবলে পড়ে কাগজগুলো ঝুরঝুরে হয়ে গেছে, গায়ের নকশাও ফিকে হয়ে এসেছে।
“এমন ওরিগ্যামি জীবনে দেখিনি আমি,” সুজান বলে ওঠে। “অসাধারণ শিল্পী ছিলেন তোমার মা।”
কাগজের জন্তুগুলো কোনো নড়াচড়া করছিল না। হয়ত ওদের মধ্যে যে জাদু ছিল তা মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে। অথবা আমিই ওদেরকে জীবন্ত কল্পনা করতাম। বাচ্চাদের স্মৃতিকে খুব একটা বিশ্বাস করা যায় না।
#
এপ্রিলের প্রথম সাপ্তাহিক ছুটি ছিল সেদিন। মায়ের মৃত্যুর দুই বছর পার হয়েছে। সুজান গেছে শহরের বাইরে। ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসাবে তাকে এমন অগণিতবার বাইরে যেতে হয়। আমি বাসাতেই ছিলাম। শুয়ে-বসে টেলিভিশনে চ্যানেল ভ্রমণ করছিলাম।
চোখটা আটকে গেল হাঙরের একটা প্রামাণ্যচিত্রে এসে। হঠাৎ আমার মাথায় বহু বছর আগে একদিন দেখা মায়ের হাতগুলো ঝলক দিয়ে গেল। কাগজের গায়ে একটার পর একটা ভাঁজ দিয়ে যাচ্ছে মা, তাতে হাঙরের অবয়বটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি আর লাওহু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।
খসখস সরসর আওয়াজ হলো ঘরের কোথাও। শব্দের উৎসের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখি বইয়ের তাকের পাশে মোড়কের কাগজের একটা বান্ডিল আর ছেঁড়াখোঁড়া টেপ। জঞ্জালটা ফেলে দেব বলে এগিয়ে গেলাম।
কিন্তু কাগজটা নড়তে শুরু করে, ভাঁজগুলো খুলে যায়, আর আমি লাওহুকে দেখতে পাই যার কথা আমার মন থেকে অনেক বছর আগে মুছে গেছে। “গরররর…” মৃদু ডাক দেয় সে। আমি ওকে ছেড়ে দেওয়ার পর মা নিশ্চয়ই ওকে আবার জোড়া দিয়েছিল।
আমার যেমনটা মনে আছে, লাওহুর আকার তার থেকে আরেকটু ছোট। অথবা ছেলেবেলায় আমার মুঠোগুলো অনেক ছোট ছিল। লাওহুকে তাই আকারে বড় লাগত।
সুজান কাগজের খেলনাগুলোকে ঘর সাজানোর জিনিস বানিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রেখেছিল। ও হয়ত ছেঁড়াখোঁড়া চেহারার লাওহুকে সুন্দর কোনো গুপ্ত কোনে রেখেছিল।
মেঝের ওপর বসে আঙুল বাড়িয়ে দিলাম। লেজে মোচড় দিল লাওহু, খেলাচ্ছলে ঝাঁপ দিল। হেসে উঠে ওর পিঠে হালকা চাপড় দিলাম। আমার হাতের নিচে লাওহু গরগর শব্দ করে উঠল।
“এদ্দিন কেমন ছিলে, বন্ধু?” লাওহুকে জিজ্ঞেস করি আমি।
খেলা থামিয়ে লাওহু উঠে দাঁড়াল। মার্জারের লাবণ্যময় এক লাফে আমার কোলে এসে উঠল। তারপর তার শরীরের ভাঁজগুলো যেন আপনাআপনি খুলতে শুরু করল।
অবশেষে আমার কোলের ওপর পড়ে রইল এক মোড়কের কাগজ। বর্গাকৃতির। সাদা দিকটা ওপরদিকে। ঘনবুনোটের চীনা অক্ষরে ভরা। কখনও চীনা ভাষায় পড়তে শিখিনি আমি। কিন্তু ‘বাবা’ শব্দটার চেহারার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। চিঠির ওপরে ওই শব্দটা ছিল। বোঝা যাচ্ছিল চিঠিটা আমাকেই লিখেছে মা। মায়ের বাচ্চাদের মতো এবড়োখেবড়ো লেখা চিনতে আমার ভুল হয়নি।
ইন্টারনেটে গিয়ে দেখলাম সেদিনটা কিংমিং উৎসবের দিন।
#
চিঠিটা নিয়ে শহরে গেলাম আমি। চীনা পর্যটকবাহী বাসগুলো থামার জায়গা আমার জানা ছিল। পর্যটকদের প্রত্যেককে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, “নিন হুই দু ঝোংওয়েন মা?” আপনি কি চীনা ভাষা পড়তে জানেন? বহুদিন চীনা ভাষায় কথা না বলার জড়তা আমার ঠোঁটে। জানি না ওরা আমার কথা বুঝতে পারছিল কিনা।
একটি তরুণী সাহায্য করতে রাজী হল অবশেষে। আমরা একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। মেয়েটি চিঠিটা পড়ে শোনাতে শুরু করে। যে ভাষা আমি বহু বছর ধরে কেবলই ভুলতে চেষ্টা করেছি আবারও তা ফিরে আসে। চিঠির প্রত্যেকটা কথা আমার ভেতরে কেটে কেটে বসতে থাকে। আমার চামড়া, হাড় সবকিছু ভেদ করে যায়, তারপর আমার হৃৎপি-কে ঘিরে জমাট বাঁধে।
#
বাবা আমার,
বহুদিন হলো আমাদের কথা হয়নি। যখন তোকে ছুঁতে যাই তখন এত রেগে উঠিস তুই যে ভয় লাগে আমার। বহুদিন ধরে সয়ে আসা সেই ব্যথা এখন অনেক গভীর, অসহনীয়।
তাই তোকে লিখব বলে ঠিক করেছি। চিঠিটা তোকে লিখব সেই কাগজের প্রাণীগুলোর ওপর যেগুলো তোর জন্য আমি বানাতাম। তোর খুব প্রিয় ছিল সেগুলো।
প্রাণীগুলোর নড়াচড়া বন্ধ হয়েছে আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু আমি যদি নিজের পুরোটা হৃদয় দিয়ে এই কাগজের ওপর তোর জন্য চিঠি লিখি তবে আমার কিছুটা এই কাগজের ভেতর বাহিত হবে। রয়ে যাবে ওদের মধ্যে। তুই যদি কিংমিংএর সময় আমার কথা মনে করিস, যখন পরিবারের সঙ্গে আত্মাদের দেখা হয়, তখন এই কাগজের মধ্যে ছেড়ে আসা আমার সত্তার অংশ প্রাণ ফিরে পাবে। প্রাণীগুলো তখন খেলবে, দৌড়াবে, ঝাঁপাবে, আর তখন হয়ত এই শব্দগুলোকে তুই দেখতে পাবি।
যেহেতু হৃদয় নিংড়ে তোকে লিখতে হবে তাই চীনা ভাষা ছাড়া উপায় নেই রে।
আমার অতীত জীবনের গল্প তোর কাছে কখনও করিনি। যখন ছোট্টটি ছিলি, সবসময় ভাবতাম তুই যখন বড় হবি তখন আমার জীবনের গল্পগুলো বলব। কারণ, তখন বুঝতে পারবি তুই। কিন্তু সেই সুযোগটা কখনও আর হয়ে উঠল না।
১৯৫৭তে আমার জন্ম। হেবেই প্রদেশে সিগুলু গ্রামে। তোর নানা-নানী খুব গরিব কৃষক ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনও খুব বেশি ছিল না তাঁদের। আমার জন্মের কয়েক বছর পরই চীনে সেই কুখ্যাত দুর্ভিক্ষ হানা দিল যার কথা সবাই জানে। সেই দুর্ভিক্ষে তিন কোটি মানুষের প্রাণ গেল। আমার প্রথম স্মৃতি হচ্ছে আমার মায়ের কাদামাটি খাওয়ার দৃশ্য। মা কাদামাটি খেয়ে আমার জন্য আটার শেষ কণাটুকু রেখেছিল।
পরিস্থিতি কিছুটা ভাল হলো তারপর। সিগুলু ‘ঝেঝি’ নামের কাগজের কাজের জন্য বিখ্যাত ছিল। আমার মা আমাকে কাগজের প্রাণী বানিয়ে তাতে প্রাণ দিতে শিখিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের জীবনে তা ছিল সত্যিকারের জাদু। আমরা কাগজের পাখি বানাতাম যেগুলো ক্ষেত থেকে ঘাসফড়িং তাড়াত। কাগজের বাঘ বানাতাম যেগুলো ক্ষেতের ইঁদুর খেয়ে ফেলত। চীনা নববর্ষে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে লাল রঙের ড্রাগন তৈরি করতাম। লাল লাল ছোট ড্রাগনগুলো সারা আকাশ জুড়ে বাজির দড়ি ধরে আছে আর নানা রঙে, নানা আওয়াজে অসংখ্য অগণিত বাজি ফুটে চলেছে – সেই দৃশ্য কখনও ভুলব না আমি। তুই যদি সেই দৃশ্য একবার দেখতে পেতি, কখনও ভুলতে পারতি না তুইও।
তারপর এল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সেটা ছিল ১৯৬৬ সালের কথা। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে লেগে গেল। ভাই গেল ভাইয়ের বিরুদ্ধে। এই সময় গ্রামের একজন মনে করিয়ে দিল আমাদের এক মামা ১৯৪৬ সালে হংকং চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ব্যবসা করতেন। লোকের মনে হলো হংকংয়ে আত্মীয় থাকার মানে আমরা গুপ্তচর আর সাধারণ মানুষের শত্রু। প্রতিটা দিন মানুষের এই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল আমাদের। কিন্তু তোর নানী আর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি একদিন কুয়োয় ঝাঁপ দিলেন। তারপর একদিন অল্পবয়সী এক ছেলের দল শিকারের দা হাতে নিয়ে তোর দাদাকে টানতে টানতে জঙ্গলে নিয়ে ঢোকাল। সেখান থেকে তিনি আর ফিরে এলেন না।
একেবারে এতিম হয়ে গেলাম আমি। মাত্র দশ বছর বয়স তখন আমার। আমার তখন আত্মীয় বলতে হংকংবাসী সেই মামা। এক রাতে চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে মালগাড়িতে চড়ে বসলাম। ওটা দক্ষিণে যাচ্ছিল।
কয়েকদিন পর গুয়াংডং প্রদেশে এক ক্ষেত থেকে খাবার চুরির সময় ধরা পড়লাম কয়েকটা লোকের হাতে। ওরা যখন শুনল আমি হংকং যাওয়ার জন্য বেরিয়েছি, হাসতে হাসতে বলল, “আজ তো তোর সৌভাগ্যের দিন রে! হংকংয়ে মেয়ে পাঠানোই তো আমাদের ব্যবসা।”
ওরা আমাকে একটা ট্রাকের পেছনে অন্য মেয়েদের সঙ্গে লুকিয়ে রাখল। আমি পাচার হয়ে গেলাম সীমান্তের ওপারে।
আমাদেরকে একটা বাড়ির বেজমেন্টে নেওয়া হলো। লোকগুলো বলল আমরা যেন কাস্টমারদের সামনে খুব বুদ্ধিমান আর স্বাস্থ্যবতীর ভঙ্গি করি। ওটা ছিল একটা বাচ্চাদের গুদামখানা। লোকজন ফি দিয়ে আমাদের দেখতে আসত। আমাদের নাকি ওরা “দত্তক” নেবে।
চীন পরিবারে আমার জায়গা হলো। আমার কাজ ছিল ওদের দুই ছেলেকে দেখাশোনা করা। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠতে হতো আমায়। নাস্তা বানাতাম সবার জন্য। তারপর ছেলেদুটোকে খাইয়ে গোসল করাতাম। কাপড় কাচতাম। ঘরও মুছতাম। বাচ্চাদুটোর পেছন পেছন থাকতে হতো আমায়। ওদের ফাইফরমাশ খাটতাম। রাতে রান্নাঘরের একটা আলমারিতে আমাকে তালাবন্ধ করে ঘুমাতে দেওয়া হতো। যদি কাজ একটু ধীরে করতাম বা কোনো ভুল হতো তাহলে মার খেতে হতো। বাচ্চারা কিছু ভুল করলে মার খেতে হতো। ইংরেজি শেখার চেষ্টা করলেও মার খেতাম।
“ইংলিশ শিখবার চাস?” বলতেন চীন সাহেব। “পুলিশে খবর দিবি, না? আমরাই পুলিশরে গিয়া কমু তুই চীন থিক্কা লুকায়া হংকংয়ে হান্দাইছস। হেরা তোরে কয়েদ করার লাইগা নাচতাছে!”
ছয় বছর এভাবেই কাটল। একদিন সকালের হাটে এক বুড়ি মানুষ আমাকে একধারে টেনে নিয়ে গেল। ওর কাছ থেকে মাছ কিনতাম আমি।
“তর লাহান বহু মাইয়া চিনি আমি। বয়স কত তর, ষুলো? একদিন আইব যেইদিন তর মালিক ব্যাডায় মদ খাইয়া নেশা করব। হেরপর তরে ধইরা দিব টান। তুই তো তারে আটকাইতে পারবি না। হের বউয়ে একদিন ঠিকই ধরব। হেরপর দোজখের আজাব শুরু হইব তর। এইহান থিকা বাইর হ তুই। যদি বাইর হইবার চাস এক ব্যাডা আছে তরে সাহাইয্য করব।”
বুড়ি আমাকে জানাল আমেরিকার লোকেরা নাকি এশিয়ার বৌ চায়। যদি আমি রান্না করি, ঘর পরিষ্কার করি, আর আমেরিকান স্বামীর যতœ করি তাহলে আমাকে আরামে রাখবে। আমার সামনে তখন সেটাই একমাত্র আশার আলো। এই হলো আমার ওই ক্যাটালগে ওঠা আর তোর বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার পেছনের কাহিনী। কোনো রোমান্টিক গল্প না, কিন্তু এটাই আমার গল্প।
কানেকটিকাটের শহরতলিতে আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। তোর বাবা আমার সঙ্গে দয়ালু ও নরম ব্যবহার করতেন। তাঁর কাছে খুব কৃতজ্ঞ ছিলাম আমি। কিন্তু আমাকে বোঝার মতো কেউ ছিল না, আমিও কিছু বুঝতাম না।
আর তারপর, তুই এলি! তোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে আমার মা, আমার বাবা আর আমার ছায়া দেখা যায়। কী যে খুশি লাগল আমার। আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছিলাম আমি, পুরো সিগুলুকে। যা কিছু আমি চিনতাম, যা কিছু ভালবাসতাম সব চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুই আসার পর বুঝলাম আমার অতীতের সেইসব জিনিস সত্যি সত্যি ছিল। আমার মিছে কল্পনা ছিল না সেসব।
এখন আমি কথা বলার জন্য কাউকে পেলাম। তোকে আমার ভাষা শেখাতে পারব, তোকে নিয়ে আবার গড়ে তুলতে পারব যা কিছু আমি ভালবাসতাম তার ছোট্ট একটু অংশ। তুই যখন চীনা ভাষায় প্রথম শব্দ উচ্চারণ করলি তা ছিল একেবারে আমার মা আর আমি যেভাবে বলি সেরকম। তোর মুখে সেই বোল শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেঁদেছিলাম। যখন আমি তোর জন্য প্রথম ঝেঝি প্রাণী তৈরি করলাম আর তা দেখে তুই একগাল হাসলি, আমার মনে হলো দুনিয়ায় আর কোনো চিন্তা নেই।
আরেকটু বড় হয়ে তোর বাবার সঙ্গে আমার কথাবার্তায় সাহায্য করতে শুরু করলি তুই। আমার তখন মনে হলো আমি যেন সত্যি সত্যি নিজের বাড়িতেই আছি। অবশেষে একটা ভাল জীবন আমার হলো। আমার মনে হতে লাগল, ইশ্, যদি বাবা-মা থাকত আমাদের বাসায়। আমি তাদের জন্য রান্না করতে পারতাম, একটা সুখের জীবন দিতে পারতাম তাদের। কিন্তু আমার বাবা-মা তো বেঁচে নেই। জানিস, চীনের মানুষ কোন জিনিসটাকে সবচেয়ে দুঃখের বলে ভাবে? সেই সময়টাকে যখন কোনো সন্তানের মধ্যে বাপ-মায়ের যতœ করার ইচ্ছা আর জ্ঞান তৈরি হয় কিন্তু সে তা করতে পারে না, কারণ, বাবা-মা তদ্দিনে দুনিয়া ছেড়েই চলে গেছে।
বাছা, আমি জানি তুই তোর চীনাদের মতো চোখগুলোকে ভালবাসিস না। আমি জানি নিজের চীনাদের মতো কালো চুলও তোর পছন্দ না। ওই চুল তো আমার। কিন্তু তুই কি জানিস, তোর জন্মটাই আমার জন্য কতটা আনন্দ বয়ে এনেছিল? তুই কি বুঝতে পেরেছিলি আমার কেমন লেগেছিল যখন তুই আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলি, আর আমাকে তোর সঙ্গে চীনা ভাষায় কথা বলা বন্ধ করতে হলো? আমার মনে হলো আমি আবার সবকিছু হারাতে বসেছি।
তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস না কেন, বাবা? এই ব্যথা লিখে বোঝানোর না।
#
পড়া শেষ করে তরুণীটি কাগজটা আমাকে ফিরিয়ে দেয়। ওর দিকে তাকাতে পারছিলাম না আমি।
ওর চোখের দিকে না তাকিয়ে ওকে বললাম চিঠিতে ‘আই’ শব্দটা দেখিয়ে দিতে। তারপর কলম দিয়ে চিঠির ওপর শব্দটা লিখতে লাগলাম। মায়ের দীর্ঘ চিঠির অসংখ্য শব্দের ভাঁজে আমার ‘আই’ জড়িয়ে গেল।
তরুণী মেয়েটা আমার কাঁধে হাত রাখল। তারপর নিঃশব্দে উঠে চলে গেল। পেছনে মায়ের সঙ্গে আমি একা বসে রইলাম।
মায়ের দেওয়া ভাঁজ অনুসরণ করে কাগজটাকে মুড়িয়ে নিলাম আমি। লাওহু ফিরে এল আবার। ওকে কোলে তুলে নিলাম। আমার কনুইয়ের ভাঁজে বসে সে গরগর আওয়াজ করে ওঠে। তারপর ওকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করি।
স্বত্ব: ২০১১ কেন লিউ, প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য ম্যাগাজিন অফ ফ্যান্টাসি অ্যান্ড সাইন্স ফিকশন, মার্চ-এপ্রিল ২০১১।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.