স্মরণ

দুঃখের মায়াবী শব্দ-রাখাল

পুলক হাসান | 26 Nov , 2018  


আধুনিক কবিতার স্বরূপ যদি শিল্পরুচিতে তবে তার মর্মগত প্রকাশ হৃদয়বৃত্তি। এটা খুবই প্রাসঙ্গিক বিষয়। যা কোনো যুক্তির ধার ধারে না। কারণ, সৃষ্টিশীল মানুষ যে স্বপ্নের জগৎ তৈরি করে তার মূলে প্রেম। প্রেমে পৃথিবী সুন্দর, বিরহ ও বেদনায় বিমূঢ়। সৃষ্টিশীল মানুষকে তাঁর সৃজনে দুইয়ের স্বাদই গ্রহণ করতে হয়।
কষ্ট ও বেদনা ছাড়া পূর্ণ হয় না শিল্পের অন্তর্গত সৌন্দর্য। কষ্ট ও বেদনার জন্যই মায়া ও মমতা। কারণ, সংশ্লেষী বলেই তা হৃদয়স্পর্শী। মনে করা হয় সৃষ্টির সার্থকতা ওখানেই। আর মানব জীবনে এই কষ্ট ও বেদনার আকুতি এক চিরন্তন অনুভূতি। এই অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করেছেন যিনি তাঁর সৃজন শুধু সম্মোহিতই করেনি, হয়েছে হৃদয়ে খোদাই। কী গানে কী কবিতায় যিনি এই জায়গাটায় স্পর্শ করেছেন তিনিই হয়েছেন স্মরণীয় এবং বরণীয়।স্বপ্ন ও বাসনার অতৃপ্তি থেকে, প্রেম ও বিরহের অনুরণন থেকে এই অনুভূতি জারিত, যা কমবেশি সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই সঞ্চারিত। রকমফের হয়তো আছে কিন্তু কষ্ট নেই এমন মানুষ বোধহয় নেই, প্রেমের মায়াবী হরিণের পিছনে ছোটেনি এমন মানুষও বোধহয় নেই। ফলে এসব প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ সৃজনের এক মৌলিক ইস্যু। প্রেম ও বিরহগাঁথার আবেদনময় উপস্থাপনার জন্যই অমর সংগীত শিল্পী মান্না দে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগ থেকে যুগান্তর কিংবদন্তী। সর্বোপরি সর্বশ্রেণির প্রেমিক সত্তার আদর্শ শিল্পী।
প্রেমে ব্যর্থতার স্বরলিপির জন্য ব্যান্ড সংগীত শিল্পী আইউব বাচ্চুও ঠাঁই করে নিয়েছেন তরুণ প্রাণের হৃদয়ে। তিনি যখন গেয়ে ওঠেন ‘আমি কষ্ট পেতে ভালবাসি/তাই তো তোমার কাছে ছুটে আসি’। তখন উঠতি প্রজন্মের তারুণ্যের মধ্যে খেলে যায় এক বাঁধভাঙ্গা উল্লাস।
কবিতায় উদিত দুঃখের দেশের এক দরদী সত্তা ষাটের দশকের অকাল প্রয়াত (মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে পরলোকগত) কবি আবুল হাসান। ফলে তাঁর কবিতা দুঃখ কষ্ট ও বেদনার অকুণ্ঠ প্রকাশ। আর দুঃখবোধ ছাড়া কি তৈরি হয় মানবিক পৃথিবী? কতটুকু দুঃখ কষ্ট ও বেদনা পোহালে একজন মানুষের মধ্যে মানবিক বোধ তৈরি হয় তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ আবুল হাসানের কবিতা। কবি আবুল হাসানের কবিতা সম্পর্কে তাই কবি ও সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামালের এই নির্ণয় যথার্থই বলবো। তিনি বলেছেন, ‘চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদে ওর (হাসানের) ভিতর মানুষের জন্য দুঃখবোধ আর মায়া-মমতা ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না’। অবশ্য নিজের কাব্য বিশ্বাসের এই সার্বভৌম সত্তার স্বীকারোক্তি কবি নিজেই দিয়ে গেছেন:
আমার শরীর খোঁড়ে, দুঃখময় আত্মার গাঁথুনী, দ্যাখো আমি ঠিকই
খ-িত ইটের মতো খুলে যাবো সহজেই, কিছুই থাকবো না!
মায়া ও মমতা ছাড়া, মানুষের দুঃখবোধ, ব্যথাবোধ ছাড়া আমি
কিছুই থাকবো না!

ভিতর বাহির/যে তুমি হরণ করো

কিংবা

দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর!

সেখানে বুনবো আমি তিন সারি শুভ্র হাসি, ধৃতিগঞ্চইন্দ্রিয়ের
সাক্ষাৎ আনন্দময়ী একগুচ্ছ নারী তারা কুয়াশার মতো ফের একপলক
তাকাবে এবং বোলবে, তুমি না হোমার? অন্ধ কবি ছিলে? তবে কেন হলে
চক্ষুষ্মান এমন কৃষক আজ? বলি কী সংবাদ হে মর্মাহত রাজা?

কালো কৃষকের গান/যে তুমি হরণ করো

নিজের ভেতর দুঃখ লালনের এমন স্পষ্ট ও দিলখোলা ঘোষণা বোধহয় আর কোনো কবি দেননি। অতি মানবিক হলেই কেবল এমন উক্তি সম্ভব যা আদপে তাঁর কবিতাকেই করে তুলেছে আবেদনময়। ফলে তাঁকে আমরা বলতেই পারি দুঃখবাদী, দুঃখের মায়াবী এক শব্দ রাখাল। আর এটাই তাঁর কবিতার প্রাণশক্তি, জীবন চেতনার সমূহ উদ্যাপন।


কবিতায় দুঃখ ও কষ্টের আকুতি শুধু আবুল হাসানই অকুণ্ঠচিত্তে প্রকাশ করেননি, করেছেন তাঁর সমসাময়িক প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজও। কবিতায় তাঁর উদাত্ত আহ্বান:
কষ্ট নেবে গো কষ্ট,…
লাল কষ্ট, নীল কষ্ট, হলুদ কষ্ট
অবশ্য হেলাল হাফিজ শেষ পর্যন্ত তাঁর এই কষ্ট ফেরি থেকে নিজেকে মেলে ধরেছেন সামাজিক অঙ্গীকারেও। তাঁর মধ্যে জন্ম হয় এক দ্রোহের। তিনি আমাদের সেই লক্ষ্যেই উপহার দেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। যা তাঁকে রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয়।
এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এই যে যৌবনকে সামাজিক বিবর্তনে উৎসর্গের আহ্বান এটাই কবির দ্রোহী সত্তার উন্মোচন। লালনের অমর পঙ্ক্তি ‘জলের মধ্যে আগুন জ্বলে’র রূপান্তর হেলাল হাফিজের সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাই হয়ে উঠে সামাজিক আন্দোলনের সঞ্জীবনী। এই একটি কাব্যগ্রন্থেই হেলাল হাফিজ অর্জন করেন তুমুল কবি খ্যাতি। পরে তাঁর আরেকটি কবিতাগ্রন্থ বের হলেও তা প্রথম গ্রন্থেরই সম্প্রসারণ। তার পরেই থেমে যান তিনি। যেন কবিতায় আর কিছু দেয়ার নেই তাঁর। নতুন কিছু দিতে না পারলে পুনরাবৃত্তি স্বাস্থ্যকর বিষয় নয় ভেবেই হয়তো তাঁর এই স্বেচ্ছাপ্রস্থান। হেলাল হাফিজ নিজে থেকে এ কথা না বললেও চল্লিশের দশকের নাগরিক কবি সমর সেন কবিতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এই বলে যে, ‘কবিতায় তাঁর আর নতুন কিছু দেয়ার নেই’।


কাব্যচিন্তায় আবুল হাসান ও হেলাল হাফিজ হয়তো একই ঘরানার কবি। তবে অপার সম্ভাবনা ও শক্তি নিয়ে এসেছিলেন আবুল হাসান। হেলাল হাফিজের মতো চটজলদি কবিতাকে ছুটি দিতে চাননি তিনি। মৃত্যুই তাঁকে থামিয়ে দেয়। আর হেলাল হাফিজ অত্যন্ত প্রস্তুতি নিয়ে পরিণত অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করেন। ততদিনে তাঁর অর্ধেকেরও কম বয়সে আবুল হাসান খ্যাতির তুঙ্গে। বাংলা কবিতাকে তাঁর অনেক কিছু দেয়ার ছিলো। পূর্ণ বিকাশের আগেই ঝরে গেলেন। কিন্তু স্বল্পায়ু জীবনে তিনটি অনন্য কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’, যে তুমি হরণ করো’ ও ‘পৃথক পালঙ্ক’ দিয়েই চিহ্নিত হয়েছিলেন স্বতন্ত্র এক কবি সত্তায়। তিনি ছিলেন মৌলিক ও শেকড়ের কবি। জীবন চেতনায় গভীর দুঃখ ও মমত্ববোধে এক মহৎ প্রাণের কবি। দুঃখ ও কষ্টে জীবন যতো ম্লান হোক কাব্য হয়ে ওঠে ততই দ্যুতিময়। উদ্বাস্তু উন্মুল জীবনের সেই দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে যখন তিনি পূর্ণতার দিকে যাত্রা করছিলেন তখনই মৃত্যুর আলিঙ্গন। কবি শামসুর রাহমান তাই যথার্থই বলেছেন, ‘আবুল হাসান কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কাব্য মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অধিকারী। তিনি ক্রমশই পরিণতির দিতে অগ্রসর হচ্ছিলেন। যার উজ্জ্বল স্বাক্ষর তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’। এই কাব্যগ্রন্থের জন্য পাঠক হৃদয়ে তিনি থাকবেন চির সমাসীন।
অধঃপতিত বহুরূপী সমাজ বাস্তবতায় আবুল হাসান যে নিজেকে ক্রমশ উজ্জ্বলতর করতে সচেষ্ট ছিলেন তাঁর কবিতার এই পঙ্ক্তি থেকেই তা স্পষ্ট।
ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সয়ে যাও
ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!

ঝিনুক নীরবে সহো/পৃথক পালঙ্ক

বাংলা কবিতায় মুক্তা ফলাতেই এসেছিলেন কবি আবুল হাসান। আর তাঁর কবিতার মূল সুরটা এখানেই। ত্যাগের মধ্যে জীবনের অমূল্য অর্জন। ফলে তাঁর কবিতা যদি প্রেমের তবে সেখানে নারীর চেয়ে বড় মানবিক বন্ধন, ব্যক্তির চেয়ে অধিক সামাজিক শান্তি ও স্থিতি। রক্তাক্ত হৃদপি- নিয়ে প্রেমিকার চোখে তাই খুঁজেছেন তিনি শিল্প ও শান্তির সহাবস্থান।
Flag Counter


1 Response

  1. চাণক্য পণ্ডিত says:

    চমৎকার লাগল লেখাটি। লেখক তার পাঠকের মনে এই বার্তা পৌঁছে দিলেন যে অকালপ্রয়াত এই কবিকে আবিষ্কার এবং পুনরাবিষ্কারের সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায় নি। সাধুবাদ জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.