অনুবাদ গল্প

হোর্হে লুইস বোর্হেস: ঈশ্বরের লিপি

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী | 6 Dec , 2018  

ভাষান্তর: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

কয়েদখানাটি গভীর আর প্রস্তরনির্মিত; আকৃতি প্রায়-সম্পূর্ণ একটি গোলার্ধের, যদিও মেঝেটি (তা-ও পাথরের) একটা বিশাল বৃত্তের চেয়ে খানিক কম, এমন একটা ব্যাপার যে কিভাবে যেন তা পীড়নের আর বিশালত্বের অনুভূতিকে আরো শোচনীয় করে তোলে। বিভাজক দেয়ালটি গেছে ঠিক মাঝখান দিয়ে; এই দেয়াল, যদিও খুব উঁচু তবু খিলানের ওপরের অংশ অবধি পৌঁছায়নি; একটি প্রকোষ্ঠে আমি, ৎজিনাকান, কাহোলোমের পিরামিডের পুরোহিত, যে-পিরামিড আগুন দিয়ে ধ্বংস করেছিল প্রেদো দে আলভারাদো; পাশেরটিতে আছে এক জাগুরার, যে গোপন ও নিয়মিত পদক্ষেপে বন্দিত্বের স্থান-কাল পরিমাপ করছে। মেঝের সমতলে গরাদঅলা একটি দীর্ঘ জানালা মধ্যবর্তী দেয়ালটিকে বিভক্ত করেছে। ছায়াহীন মুহূর্তে (দ্বিপ্রহরে) অনেক উঁচুতে ছাদে একটা ঝুলন্ত দরজা খুলে যায় এবং এক কারারক্ষী, সময় যাকে ক্রমশ গৌন করে তুলেছে, একটি লোহার দন্ড নাড়ায়, এবং একটি দড়ির শেষ প্রান্তে করে পানির জগ আর মাংসের টুকরো নিয়ে আমাদের দিকে নেমে আসে। আলো ঢুকে পড়ে পাতালকুঠুরির ভিতরে, তৎক্ষনাৎ আমি জাগুয়ারটিকে দেখতে পাই।

কত বছর আমি এই অন্ধকারে পড়ে আছি সে হিসেব হারিয়ে ফেলেছি; যে-আমি একদিন যুবক ছিলাম আর এ কয়েদখানা জুড়ে ঘুরে বেড়াতে পারতাম সেই আমি আজ মৃত্যুদশায় এমন হয়েছি যে অপেক্ষা করতেও অক্ষম; মৃত্যুর অপেক্ষা, মৃত্যু, দেবতাদের হাতে নির্ধারিত আমার নিয়তি। গভীর আগ্নেয়শিলার চাকু দিয়ে আমি শিকারদের বুক ফেঁড়ে উম্মোচন করেছি আর এখন, যাদু ছাড়া আমি নিজেকে ধুলো থেকে তুলতে পারছি না। পিরামিডটি পুড়ে যাবার প্রাগমুহূর্তে যে লোকগুলো মিনার সদৃশ অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে এসেছিল, তারা আমার মুখ থেকে এক গুপ্তধনের কথা বের করার জন্য আগুনে তাতানো গনগনে ধাতুর অস্ত্র দিয়ে আমাকে তারা নির্যাতন করেছিল। আমার চোখের সামনেই তারা দেবতার মুর্তি আছড়ে ফেলে দিয়েছিল, কিন্তু তিনি আমাকে ত্যাগ করে চলে যান নি, আর আমি নিরবে সব নির্যাতন সহ্য করেছিলাম। তারা আমাকে চষে ফেলেছিল, তারা আমাকে মুচড়ে ভেঙ্গে ফেলেছিল; বিকৃত করে ফেলেছিল; তারপর আমি এই কয়েদখানায় জেগে উঠি, যেখান থেকে ইহজীবনে আর কখনো বের হবো না।

কিছু একটা করার মারাত্মক প্রবৃত্তিবশে, কোনোভাবে সময় গুনবার প্রণোদনায়, আমি আমার অন্ধকারে বসে চেষ্টা করি তাদের সবাইকে স্মরণ করতে যাদের আমি জানতাম। পাথরে খোদাইকরা সাপেদের বিন্যাস আর সংখ্যা, বা একটা বনৌষধি বৃক্ষের বিশেষ আকৃতি স্মরণ করতে অগণন রাত্রি আমি উৎসর্গ করি। এইভাবে, ক্রমে ক্রমে, প্রবহমান বছরগুলিকে আমি প্রশমিত করি; ক্রমশ এইভাবে আমি এমন কিছু অর্জন করি যা ইতিমধ্যে, আমার হয়ে গিয়েছিল। এক রাত্রে টের পাই আমি এক অন্তরঙ্গ স্মৃতির সূচনাবিন্দুটির কাছাকাছি এসে পরেছি; তখন সমুদ্র দেখার আগেই পর্যটক তার রক্তের মধ্যে ছুটোছুটি অনুভব করে। ঘন্টা কয়েক পরে আমি স্মৃতিটির সীমারেখা দেখতে শুরু করি। সেটি ছিল ঈশ্বরের এক ঐতিহ্য। সময়ের শেষে ধ্বংস যার বিপর্যয় নেমে আসবে একথা আগেভাগেই বুঝতে পেরে ঈশ্বর সৃষ্টির প্রথম দিনে এমন একটি মন্তব্যবাক্য রচনা করেন যার ক্ষমতা রয়েছে ধ্বংস আর বিপর্যয়কে প্রতিহত করার। তিনি এমনভাবে বাক্যটি লিখেছিলেন যেন তা সবচেয়ে দূরবর্তী প্রজন্মদের কাছে পৌঁছায় এবং যেন তার কখনো কোনোরকম পরিবর্তন না ঘটে। কেউ জানে না বাক্যটি কোথায় লেখা হয়েছিল, বা কীই তার বৈশিষ্টাবলী; কিন্তু নিশ্চিত যে বাক্যটি আছে, গোপনে এবং নির্বাচিত একজন ব্যক্তি সেটি পাঠ করবে। আমি ভাবলাম, যেমনটা সমসময়ই করা হয়ে থাকে, যে, আমরা এখন সময়ের শেষ প্রান্তে আছি, আর ঈশ্বরের সর্বশেষ উপাধ্যায় হিসেবে আমাকে দান করবো। বস্তুত আমাকে বন্দি ক’রে রেখেছে বলে কয়েদখানাটি আমাকে আশা করতে বারণ করেনি; সম্ভবত কাহোলাম-এর লিপিটি আমি হাজারবার দেখেছি, প্রয়োজন শুধু সেটির গভীরে পৌঁছানো।

এই অনুধ্যান আমাকে উৎসাহিত করে, তারপর, তা আমার মধ্যে এক ধরনের ঝিমঝিম ভাব সঞ্চারিত করে। পৃথিবী জুড়ে প্রাচীন অনেক আকৃতি আছে, আকৃতিগুলি অবিকার্য ও শাশ্বত; যে-প্রতীকটির অন্বেষণ করছিলাম সেটি ঐ আকৃতিগুলির যে-কোনো একটা হতে পারে। একটি পাহাড় হতে পারে ঈশ্বরের সেই বাণী, অথবা একটি নদী, বা সাম্রাজ্য, অথবা তারাদের বিন্যাস। কিন্তু বহু শতাব্দীর প্রক্রিয়ায় পাহাড় সমতল হয়ে যায়, নদীর গতিপথ বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়, সাম্রাজ্য রূপান্তরিত ও ধ্বংস হয়, আর তারাদের বিন্যাস বদলে যায়। পাহাড় ও নক্ষত্র একেক স্বতন্ত্র বস্তু, আর স্বতন্ত্র বস্তুসমূহ ধ্বংস হয়। আমি খুঁজছিলাম আরো সংহত, টেকসই কিছু, আরো অনাক্রম, অবোধ্য কিছু। আমি শস্যের ঘামেদের, পাখিদের, মানুষের প্রজন্মগুলির কথা চিন্তা করে দেখলাম। সম্ভবত জাদু লেখা রয়েছে আমার চেহারায়, সম্ভবত আমিই আমার অন্বেষনের শেষ প্রান্ত। এই দুশ্চিন্তা আমাকে গ্রাস করে ছিল যখন আমার মনে পড়ে যায় যে জাগুয়ারটি ঈশ্বরের প্রতীকসমূহের অন্যতম।
তারপর আমার আত্মা করুণায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সময়ের প্রথম প্রভাতটি আমি কল্পনা করি; কল্পনা করি, আমার ঈশ্বর তাঁর বানীটি জাগুয়ারদের জীবন্ত চামড়ার নিচে লুকিয়ে রাখছেন, যে জাগুয়াররা অনিঃশেষে ভালোবাসাবাসি করবে আর জন্ম দিয়ে চলবে, গুহায়, বাঁশ বনে, ইক্ষুক্ষেতে, দ্বীপে-দ্বীপান্তরে, যাতে সর্বশেষ মানুষটি তা গ্রহণ করতে পারে। একটি নকশাকে চিরস্থায়ী করার জন্য আমি কল্পনা করি বাঘেদের জাল, তাদের অজস্র গোলকধাঁধা, কল্পনা করি তৃণভূমি আর পশুপালের ওপর নেমে আসা বিভীষিকার দৃশ্য। পাশের সেলটিতে ছিল এক জাগুয়ার; তার নৈকট্যে থেকে আমি আমার অনুমানের একটা পাকাপাকি স্বীকৃতি ও এক গোপন অনুগ্রহ অনুভব করি।

চিহ্নাবলীর নিয়ম ও বিন্যাস শেখার পেছনে আমি অনেক বছর ব্যয় করেছি। অন্ধকারের প্রতিটি কালে একটা আলো-মুহূর্ত আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল, আর এভাবে আমি হলুদ লোমের ওপর কালো কালো আকৃতি আমার মনের ভিতরে গেঁথে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেগুলির কিছু কিছুতে ছিল, বিন্দু, অন্যগুলি পায়ের ভিতরের দিকে এঁকেছিল আড়াআড়ি রেখা, অন্যগুলি, বলয়াকৃতিগুলি ছিল ছিল পুনঃপুন। সম্ভবত সেগুলি ছিল একই রকম ধ্বনি বা একই রকম শব্দ। সেগুলির অনেকগুলির ছিল লাল প্রান্ত।
আমি আমার কঠোর মেহনতের কষ্টগুলোর ফিরিস্তি দেব না। একাধিকবার আমি কয়েদখানার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেছি যে এই লিপির পাঠোদ্ধার অসম্ভব। যে নির্দিষ্ট রহস্যটির পিছনে আমি খেটে মরছিলাম তার কষ্ট ক্রমশ ঈশ্বরের লিখিত একটি বাক্যের প্রকারগত বিভ্রান্তির চেয়ে কমে আসে। একটি পরম মন কী ধরনের বাক্য নির্মান করবে (আমি নিজেকে প্রশ্ন করি)? আমার মনে হয় এমন কি মানুষের ভাষাগুলিতেও এমন কোনো উক্তি নেই যা সমগ্র ব্রক্ষ্রান্ডকে ইঙ্গিত করে না; বাঘটি বলার অর্থ সেইসব বাঘের কথা বলা যারা তাকে জন্ম দিয়েছে, সেইসব হরিণ আর কচ্ছপদের কথা বলা যাদেরকে সে গলাধঃকরণ করেছে, ঘাসেদের কথা বলা যা খেয়ে হরিণেরা বেঁচে ছিল, ধরনীর কথা বলা যে ধরনী ঘাসেদের মা ছিল, স্বর্গের কথা বলা যে-স্বর্গ ধরনীর জন্ম দিয়েছিল। আমার বিবেচনা, একজন দেবতার ভাষায় প্রত্যেকটি শব্দ অসীম ঘটনারাজির পরম্পরা ব্যাখ্যা করবে, আর তা করবে ইশারা-ইঙ্গিতে নিহিত কোনো উপায়ে নয়, পরিষ্কারভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে এবং আনুক্রমিকভাবে নয়, তাৎক্ষনিকভাবে। এক সময় একটা ঐশ্বরিক বাক্যের ভাবনাটিকে বালসুলভ বা ঈশ্বরের প্রতি কটাক্ষমূলক মনে হয়। আমি চিন্তা করে দেখি একজন দেবতার উচিত শুধুমাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করা এবং ঐ একটি মাত্র শব্দের মধ্যেই প্রকাশিত হবে পরম সম্পূর্ণতা। তাঁর উচ্চারিত কোনো শব্দ ব্রহ্মান্ডের চেয়ে কম বা সময়ের যোগফলের চেয়ে কম হতে পারে না। ‘সব’ ‘পৃথিবিী’ ‘ব্রহ্মান্ড’-এই সব নগন্য, উচ্চাকাংখী মানবিক শব্দ একটি ভাষা এবং যা কিছু সে ভাষার দ্বারা প্রকাশিত হয় তার সবকিছুর সমার্থক সেই একটি শব্দের ছায়া আর প্রতিমূর্তি।
একদিন অথবা এক রাতে- এখানে আমার দিন আর রাতের মধ্যে কী পার্থক্য থাকতে পারে? আমি স্বপ্ন দেখি কয়েদকখানায় মেঝেতে একটি বালুর দানা পড়ে আছে। ভ্রূক্ষেপ না করে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি আমি জেগে উঠেছি এবং মেঝেতে বালুর দানা এখন দুটি। আবার ঘুমিয়ে যাই আমি। স্বপ্নে দেখি বালুর দানা তিনটি হয়েছে। এভাবে বালুর দানার সংখ্যা বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে কয়েদখানা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর বালুর সেই গোলার্ধের নিচে আমি মরে যাচ্ছি। তখন আমি বুঝতে পারি যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম; প্রবল চেষ্টায় আমি নিজেকে টেনে তুলি এবং জেগে উঠি। জেগে ওঠা ছিল অর্থহীন; অসংখ্য বালুরাশি আমার শ্বাস রুদ্ধ করে দিচ্ছিল। তখন কে একজন আমাকে বললে তুমি জেগে উঠছো, কিন্তু জাগরনে আসোনি, একটা পূর্ববর্তী স্বপ্নের মধ্যে এসে পড়েছো। তোমার এই স্বপ্নটির চারপাশে আরো একটি স্বপ্নের দেয়াল, আরেকটি স্বপ্নের মধ্যে তোমার এই স্বপ্ন, আর এমনভাবে তা আছে অসীম সংখ্যক স্বপ্নের মধ্যে যে সংখ্যাটি হলো ঐ বালুর দানাগুলির সংখ্যা। যে পথটি তোমাকে আবার খুঁজে পেতে হবে তা অর্থহীন, আর তুমি সত্যি সত্যি কখনো জেগে উঠবার আগেই মারা যাবে।
আমার দিশেহারা বোধ হয়। বালুরাশিতে আমার মুখ ডুবে যেতে থাকে তবু আমি চিৎকার করে উঠি; স্বপ্নের বালু আমাকে মেরে ফেলতে পারে না; আর স্বপ্নের ভিতরে কোনো স্বপ্ন থাকেও না। একটি জ্বলন্ত আলোশিখা আমাকে জাগিয়ে তোলে। উপরের অন্ধকারে একটি আলোকচক্র দেখা যায়। আমি কারারক্ষীর মুখ, হাত, লৌহদন্ড, রশি, মাংস ও জলের পত্রগুলি দেখতে পাই।

মানুষ তার নিয়তির রূপ সম্পর্কে ক্রমশ সাদৃশ্য বোধ করতে থাকে; সামগ্রিকভাবে, একজন মানুষ হচ্ছে তার পারিপার্শ্বিকতা। কারারুদ্ধ আমি
পাঠোদ্ধারকারী বা প্রতিশোধকামীর চেয়ে বেশি, আমি ঈশ্বরে পুরুতের অধিক। যেন আমি আমার ঘরে ফিরে যাচ্ছি, এইভাবে স্বপ্ন আর স্বপ্নের অতল গোলকধাঁধা থেকে আমি ফিরে আসি কর্কশ কয়েদখানায়। কয়েদকখানার স্যাঁতসেতে পরিবেশের তারিফ করি, সেখানকার বাঘটিকে আর্শিবাদ করি, আলোর ফালিটুকুকে আশির্বাদ করি, আমার পুরাতন, পীড়িত দেহটিকে আশির্বাদ করি, কারাগারের অন্ধকার আর পাথরকে আশির্বাদ করি।

তারপর যা ঘটেছিল তা আমি না পারি ভুলতে না পারি বুঝতে। ঘটেছিল দেবতার সঙ্গে মিলন, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সঙ্গে মিলন (জানি না এই শব্দগুলির অর্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না)। তুরীয়ানন্দ একই প্রতীককে দুবার ব্যবহার করে না; একটি আলোকছটার ভিতরে ঈশ্বরকে দেখা গেছে, একটি তরবারির মধ্যে, অথবা একটি গোলাপের বৃত্তাকার দলমন্ডলির ভিতরে দেখা গেছে তাঁকে। আমি একটি অতিরিক্তি রকমের উঁচু চাকা দেখেছিলাম, সেটা আমার চোখের সম্মুখে ছিল না বা আমার পিছনেও ছিল না, পাশেও ছিল না, বরং একসঙ্গে তা সবখানে রিরাজ করছিল। চাকাটি ছিল জলের তৈরী, আবার আগুনেরও আর তা ছিল সীমাহীন, যদি সেটির কিনারা দেখা যাচ্ছিল না। যা কিছু আছে, ছিল এবং থাকবে তার সব মিলে মিশে চাকাটি তৈরী হয়েছে, আমি ঐ সমগ্র কাঠামোটির একটি তন্তু আর যে পেদ্রো দে আলভারাদো আমাকে নির্যাতন করেছিল সে ছিল আরেকটি তন্তু। সেখানে উম্মোচিত ছিল কারণ ও ফলাফলগুলি, আর সেগুলি আমার পক্ষে চাকাটিকে এমনভাবে দেখার জন্য যথেষ্ট ছিল যাতে আমি তার সব কিছুকে সীমাহীনভাবে বুঝতে পারি। আহ্ উপলব্ধির আনন্দ কল্পনা বা অনুভবের আনন্দের চেয়ে বেশি। আমি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে দেখলাম, আমি ব্রহ্মান্ডের প্রগাঢ় নকশাগুলি দেখলাম। ‘বুক অব পিপল’কথিত উৎসগুলো দেখলাম। আমি জলের গভীর হতে উঠে আসা পাহাড় পর্বত দেখলাম, আমি জঙ্গলের প্রথম মানব দেখলাম, দেখলাম পানির পাত্রগুলো মানুষের বিপরীতে গিয়ে দাড়ালো, দেখলাম কুকুরগুলো তাদের চেহারাকে ক্ষতবিক্ষত করলো।* অন্যান্য দেবতার পিছনে লুকানো অবয়বহীন ঈশ্বরকে আমি দেখেছি। যে অসীম প্রক্রিয়ারাশি মিলে একটি মাত্র পরম ভঙ্গি তৈরী হয়েছে আমি তা দেখেছি, আর সবকিছু বুঝতে পেরে আমি বাঘটির লিপিটিও বুঝতে সক্ষম হয়েছি।
১৪টি এলোমেলো শব্দ নিয়ে (সেগুলি দেখতে এলোমেলো মনে হয়) এটি একটি সূত্র, আর উচ্চস্বরে তা উচ্চারণ করাই আমার সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট। এই পাথরের কয়েদখানা নিশ্চিহ্ন করার জন্য, আমার রাত্রির মধ্যে দিবালোকের উজ্জলতা পাবার জন্য, আবার যুবক হবার জন্য অমর হবার জন্য, জাগুয়ারের চোয়ালে আলভারাদোকে পিষ্ট করার জন্য, স্প্যানিয়ার্ডদের বুকের ভিতরে পবিত্র চাকুটি বসিয়ে দেবার জন্য পিরামিডটি আবার নির্মান করবার জন্য, সাম্রাজ্য পূর্ণগঠনের জন্য সূত্রটি শুধু মুখে বলাই যথেষ্ট, ৪০টি ধ্বনি, ১৪টি শব্দ, ব্যাস্! আমি, ৎজিনাকান, মোকতেজুমা যে সব রাজ্য শাসন করে গেছে সেসবের শাসক হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু আমি জানি আমি কখনো, কোনোদিন সেই শব্দগুলি বলবো না, কারন ৎজিনাকানকে আর আমার মনে পড়ে না।
জাগুয়ারদের গায়ে লেখা রহস্যটি আমার সঙ্গে সঙ্গে মরে যাক। যে-ব্যক্তি ব্রহ্মান্ড দেখেছে, ব্রহ্মান্ডের অগ্নিময় নকশাগুলো লক্ষ করেছে সে একজন মানুষের জন্য চিন্তা করতে পারে না, মানুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ সুখ দুঃখের বিচারে ভাবিতে পারে না; সে সেই লোকটি হলেও, পারে না। সেই লোকটি সে ছিল, আর এখন তার কাছে তার কোনো মূল্য নেই। তার কাছে ঐ অপর ব্যক্তির জীবনের কী অর্থ? যদি এখন সে ‘কেউ নয়’ হয়ে থাকে তাহলে তার কাছে অপর ব্যক্তিটির জাতিত্বের কী অর্থ থাকতে পারে?

এ কারণেই আমি সূত্রটি উচ্চারণ করছি না, একারণেই এই অন্ধকারে শুয়ে থেকে আমি চাই দিনগুলি আমাকে ভুলে যাক।

(এন্ড্রু হার্লিকৃত ইংরেজী অনুবাদ অবলম্বনে)

*‘বুক অব পিপল’কথিত উৎসগুলো দেখলাম। আমি জলের গভীর হতে উঠে আসা পাহাড় পর্বত দেখলাম, আমি জঙ্গলের প্রথম মানব দেখলাম, দেখলাম পানির পাত্রগুলো মানুষের বিপরীতে গিয়ে দাড়ালো, দেখলাম কুকুরগুলো তাদের চেহারাকে ক্ষতবিক্ষত করলো।— মায়াদের পবিত্র গ্রন্থ Popul Vuh-এ বর্ণিত পৃথিবী সৃষ্টির গল্পের কথা স্মরণ করছে গল্পের পুরোহিত।
Flag Counter


2 Responses

  1. আশরাফ জুয়েল says:

    আমার সকালটা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মনের মধ্যে দলা হয়ে জমে থাকা অস্বাস্থ্যকর ঘৃণাগুলো পরিনত হলো সুপেয় সুরায়। ভালো স্যার। এমন একটি অসাধারণ গল্প অনুবাদ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

  2. Ajitkumer Roy says:

    বোর্হেস কঠিন জিনিস। কত কঠিন? অনুবাদ আড়ষ্ট মনে হওয়ায় মূল খুঁজলাম ইন্টারনেটে। সার্চ করে পাওয়া গেল God’s Script। ভাবলাম, যাক এবার সুরাহা হবে। হলো না, ইংরেজী অনুবাদেও তেমন কিছু উন্নতি হলো না অবস্থার। যে তিমিরে ছিলাম সে তিমিরেই থেকে যেতে হলো। এরকম অস্পষ্ট, এত প্রতীকী কথাসাহিত্য জীবনে দেখিনি। বোর্হেস যখন লিখেছেন তখন এটাও গল্পের একটা নতুন ফর্ম মেনে নিয়ে পুনর্বার বাংলা পড়ে হতাশ হয়ে মন্তব্য লিখতে বসে গেলাম। এ রকম গল্প লেখার কি মানে, পড়ারই বা কি মানে। আর অনুবাদ করার কষ্ট করাই বা কেন। হয়তো পাঠকেরই ব্যর্থতা। বড় লেখকে দোষ দিলে আমাকেই দুষবে সবাই। – অজিতকুমার রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.