প্রতিক্রিয়া

ভুল স্বীকার: শাহাদুজ্জামান ইনবক্সে, মেইলে, ফোনে চুপিচুপি করেন, প্রকাশ্যে করেন না

লীনা দিলরুবা | 22 Nov , 2018  

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে আমার লেখার প্রতিক্রিয়ায় শাহাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াটি নিয়ে দু’কথা বলার জন্য আবার কলম ধরতে হল। একজন অকিঞ্চিৎকর পাঠকের প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়া ও এ নিয়ে কলম ধরার জন্য শাহাদুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানাই। মনোযোগী পাঠকমাত্রই তাঁর এই প্রতিক্রিয়ায় একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম নাক-উঁচু মনোভাব হয়ত লক্ষ্ করবেন, সরল ইংরেজিতে যাকে ‘কনডিসেন্ডিং’বলা যায়। আমি সেদিকে যাব না। কেবল জনাব শাহাদুজ্জামানের বক্তব্যের সূত্রে আমার বক্তব্যগুলো সোজাসাপ্টাভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

শাহাদুজ্জামান লিখেছেন, ‘পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অনেক জীবনানন্দ-প্রেমী মানুষ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ফোনে, সামনাসামনি, ইমেইলে, ফেসবুক-মেসেজে যোগাযোগ করে তাদের মতামত, পরামর্শ জানিয়েছেন। আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গেই সেসব মতামত শুনেছি; আমার মতও তাদের জানিয়েছি।’” সেসব পারস্পরিক মতামত কী ছিল? ভুল-তথ্য-পরিবেশন-বিষয়ক তথ্য? তিনি লিখেছেন, “একজন কমলালেবু’ বইটির প্রাথমিক মুদ্রণে জীবনানন্দের কবিতা, গ্রন্থপঞ্জী ইত্যাদিতে বানান এবং যতিচিহ্নের বেশ কিছু ত্রুটি ছিলো। অগণিত পাঠক-পাঠিকা বইটির মুদ্রণত্রুটির কথা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ( মুলত ইমেইল এবং ফেসবুক মেসেঞ্জারে) আমাকে জানিয়েছিলেন। তার ভেতর লীনা দিলরুবাও ছিলেন। যেহেতু যোগাযোগ ব্যক্তিগত পরিসরে ছিল, তাই আমি লীনা-সহ সবাইকে অনলাইনের সেইসব ব্যক্তিগত পরিসরেই ধন্যবাদ জানিয়েছি। পরবর্তীতে আমরা লেখক-প্রকাশক যৌথভাবে চেষ্টা করে সেই ত্রুটিগুলোকে যথাসম্ভব শুধরে নিয়েছি।

যখন ভুল-ভ্রান্তি বের হলো তখন পাঠক আর লেখকের যোগাযোগ হলো, আর যখন বইটি ছাপা হয় তখন ‘কেবল’ লেখক আর প্রকাশকের সেই ভ্রান্তি জানার অধিকার রইলো, ‘অবহেলিত পাঠকরা’ সেই খবর জানলেন না। অথচ সেই ভুলের নির্দেশক ‘লেখক-প্রকাশক’ নন, বরং শুধুই ‘পাঠক’। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের কোনো একটি জায়গায় লেখক পাঠকদের অবগতির জন্য জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না যে, তিনি এই বইটির পুরোনো সংস্করণের কিছু তথ্য ঠিকঠাক করে নতুন একটি সংস্করণ বের করেছেন। আর, ‘একজন কমলালেবু’র তথ্যভ্রান্তির কথা যদি লেখক স্বীকার করে থাকেন সেটি ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। কারণ— তাঁর ভাষায়– ব্যক্তিগত পরিসর থেকে পাওয়া সংশোধনীগুলো তিনি প্রয়োগ করেছেন অব্যক্তিগত পরিসরে, অর্থাৎ বইয়ের মতো এক নৈর্বক্তিক পরিসরে। অতএব, পরবর্তী সংস্করণে বইটির এই পরিবর্তন সম্পর্কে পাঠকদেরকে অবহিত করাটা কি জরুরী নয়? কারণ ইতিমধ্যেই তিনি ভুল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠকদেরকে প্রতারিত করেছেন, দ্বিতীয়বার যাতে প্রতারণা না হয়– সে ব্যাপারে সতর্ক হয়েই তিনি সততার সাথেই বলতে পারতেন যে সর্বসাম্প্রতিক এই সংস্করণে তথ্যে সংশোধনী এসেছে। কারণ, যেসব পাঠক লেখকের ব্যক্তিগত পরিসরে জায়গা পাননি সেই বেচারা পাঠক যিনি এই বইটির প্রথম সংস্করণটি ক্রয় করেছিলেন তিনি যদি না জানেন, প্রথম সংস্করণের কোন কোন জায়গায় ভুল ছিল এবং দ্বিতীয় সংস্করণে সেখানে কীভাবে পরিবর্তন করা হলো, তাহলে কি সেই পাঠকের প্রতি অবিচার করা হলো না? লেখক প্রথম সংস্করণ থেকে দ্বিতীয় সংস্করণে এসে একটি জায়গায় জীবনানন্দের মুখের সংলাপই বদলে দিয়েছেন, এই বিষয়টি কি দ্বিতীয় সংস্করণে একটি ভূমিকা জুড়ে দিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল না? পাঠকের প্রতি লেখকের এইটুকু দায়বদ্ধতা কি শাহাদুজ্জামান স্বীকার করেন? কোনো গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের কোনো ভুল যদি পরবর্তী সংস্করণে লেখক কর্তৃক শুধরে দেবার ব্যাপার থাকে তাহলে সেটি সেই সংস্করণে ঘোষণা দিয়ে বলার ঘটনা পৃথিবীতে অসংখ্য রয়েছে, শাহাদুজ্জামান এসব উদাহরণ সম্পর্কে অবগত আছেন কি না আমার জানা নেই।

তিনি লিখেছেন, ‘তাছাড়া, অনেকেই আছেন, যারা ব্যক্তিগত পরিসরের এই উপকারকে জনপরিসরে স্বীকৃতি দিলে অস্বস্তি বোধ করবেন। লেখক-পাঠক-প্রকাশক মিলে মুদ্রণ-ত্রুটি শুধরে নেবার এই সমবায়িক প্রক্রিয়াটি উল্লেখিত পাঠিকার সম্ভবত জানা নেই ফলে তিনি সরল বিশ্বাসে ভেবে বসেছেন যে বইটির ত্রুটি শোধরানোর একক কৃতিত্ব হয়তো তার।‘ শাহাদুজ্জামান, আপনি আমার কথা ভুলে যান, আপনার স্বীকৃতির কাঙাল আমি নই। স্রেফ লেখক হিসেবে আপনার যে-দায়িত্ব পালন করা উচিৎ ছিল সেই দিকটা ভেবেই কি পরবর্তী সংস্করণে এসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্পর্কে (শুধুই) পাঠকদের অবহিত করা দরকার ছিল না? জীবনানন্দ দাশের মতো প্রবল জনপ্রিয় কবি নিয়ে যখন লিখছেন তখন এটা তো আপনার ধারণার মধ্যে থাকারই কথা যে এই কবি সম্পর্কে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত যে-কোনো পরিবর্তন নিয়ে তথ্য জানার অধিকার পাঠকের রয়েছে। দুঃখিত জনাব শাহাদুজ্জামান, এই বইটির তথ্যভ্রান্তি দূর করার ক্ষেত্রে কোনো একক কৃতিত্ব নেবার ইচ্ছে আমার নেই, এবং ছিলও না। আমি এটুকু জানি যে জীবনানন্দ এখন একটি ব্যক্তি-উত্তীর্ণ বিশ্ব-ব্যক্তিত্ব। আমি নিজের ব্যাপারে চিন্তিত নই, আমি চিন্তিত আপনার ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে।

আমার শুধু লক্ষ্য ছিল, আপনি যে-পাঠককে একটি ভুলে-ভরা বই উপহার দিয়েছেন অন্তত সেই দায়টি আপনি স্বীকার করছেন কি না সেটি দেখা। হায়! সেই উদারতা যদি আপনার থাকতো! আপনি বলতে চাইছেন, আমি সরল বিশ্বাসে ভেবে বসে আছি বইটির ত্রুটি শোধরানোর একক কৃতিত্ব হয়তো আমার। আমার লেখার কোথায় আমি এই কৃতিত্ব দাবী করেছি যদি দয়া করে একটু দেখিয়ে দিতেন! আপনি যদি আমাকে ‘সরলমতি’ পাঠক বলে সূক্ষ্ম খোঁচা দিতে চান দিতে পারেন, কিন্তু সরলমতি পাঠকের তথ্য গ্রহণ করে ডকুফিকশনের মডেল বদলে দেবার পর আমরা কী ধরে নেব, আমাদের মতো সরলমতি পাঠকদের মতামত আপনি ঠিকই গ্রহণ করেন, সেটি ফেসবুকের ইনবক্সে, মেইলে, ফোনে চুপিচুপি করেন। প্রকাশ্যে করেন না।

২.
‘একজন কমলালেবু’র প্রথম সংস্করণে লেখক শাহাদুজ্জামান ‘বনলতা সেন’ বিষয়ে আকবর আলি খানের পরিবেশিত একটি তথ্যকে ব্যবহার করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, বনলতা সেন আসলে বারবণিতা ছিলেন। যে কোনো বইতে তথ্য পরিবেশন আর রেফারেন্স ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলে আমি মনে করি। অবশ্য যদি লেখকের সেই সদিচ্ছা থাকে। কিন্তু ‘বনলতা সেন’ নিয়ে আকবর আলি খান পরিবেশিত উদ্ভট তথ্যটিই শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’র প্রথম সংস্করণে সন্নিবেশিত করেন। লেখায় কোন রেফারেন্স গ্রহণ করবো কোনটি বর্জন করবো এই বিবেচনাবোধ এবং রুচিটুকু একজন লেখকের কাছ থেকে পাঠকরা আশা করতেই পারেন। আমিও শাহাদুজ্জামানের কাছ থেকে সেই রুচি আর গ্রহণ বর্জনের বিবেচনাবোধ আশা করেছিলাম। এখন দেখতে পাচ্ছি, আমার আশাবাদ ভুল ছিল, শাহাদুজ্জামান রগ উঁচিয়ে নিজের অবস্থানে অটল আছেন। থাকুন। আমি আকবর আলি খানের দেয়া তথ্যকে অগ্রহণযোগ্য মনে করি। যারা ‘বনলতা সেন’ আসলে বারবণিতা ছিলেন-এই তথ্যটি বিশ্বাস করে বসে আছেন তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন, একজন বারবণিতার কাছে যদি তিনি যানও, সেটি নিয়ে এমন একটি কবিতা রচনা করা তাঁর মানস-গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না! ‘বনলতা সেন’ বিষয়ক আকবর আলি খানের এই বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেছি বলেই এই বিষয়টি নিয়ে ‘বিডিআর্টস’-এ ‘বনলতা সেন আসলে কে ছিলেন?’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম। সেই লেখায় আমি অশোক মিত্রের দেয়া তথ্যসূত্র ব্যবহার করে জীবনানন্দ ‘বনলতা সেন’ নামটি কোথায় পেয়েছিলেন সেটি বলার চেষ্টা করেছি। এই নতুন তথ্যটি যে শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’র দ্বিতীয় সংস্করণে গ্রহণ করেছেন সেটি কেন স্বীকার করলেন না? শাহাদুজ্জামান তাঁর লেখায় লিখলেন, ‘আমার বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পর এই বইটির খোঁজ পাই আমি একাধিক সূত্র থেকে।‘ এই গায়েবী একাধিক সূত্র কারা সেটি যদি লেখক একটু তথ্য প্রমাণসহ দিতেন উপকার হতো। আমি কিন্তু সবই তথ্য প্রমাণসহ দিচ্ছি এবং দিয়েছি। কথা হলো তার বইটি নিয়ে এই তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে আগে কিছুই বলেননি, কিন্তু যেইমাত্র এই বইটির তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে বিডিঅর্টস-এ প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হলো তখন তিনি এ বিষয়ে অভিমত জানাবার প্রয়োজন বোধ করলেন। প্রশ্ন হলো একটি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পর যখন তিনি নিজের লেখাটিতে সংশোধন করলেন তখন তার উচিৎ ছিল না কি এই পরিবর্তনের কারণ ও উৎস সম্পর্কে তার পাঠকদেরকে অবহিত করা?

৩.
জীবনানন্দের কবিতার উপর শেলি-কীটস-হুইটম্যান, ইয়েটস-রিলকে-এলিয়ট, ডিলান টমাস কবিদের প্রভাব নিয়ে সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং জীবনানন্দের কথোপকথন’এর যে বিষয়টির ভুল আমি ‘একজন কমলালেবু’র প্রথম সংস্করণ থেকে তুলে ধরেছিলাম সেটি লেখক দ্বিতীয় সংস্করণে ঠিকই ব্যবহার করেছেন, মজার ব্যাপার হল, এবারও তিনি দায় স্বীকার করলেন না, তিনি লিখেছেন, “ডকুফিকশনে সংলাপের প্রামাণ্যতা ব্যাপারটি ভিন্ন বিতর্ক। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সংকট মুলত পাঠের ভিন্নতা নিয়ে।” পাঠের ভিন্নতা যদি হয়, এবং আমার পয়েন্টটা যদি ভুল হয় তবে শাহাদুজ্জমান কেন দ্বিতীয় সংস্করণে জীবনানন্দের বলা কথাটি পালটে দিলেন? শাহাদুজ্জামানের চাতুর্য অামাকে সত্যিই বিস্মিত করেছে। তিনি শিল্পসাহিত্যের অাধুনিক ধারণা, আধুনিক নয়, বলা উচিৎ উত্তরাধুনিক, সেটা এই যে যে-কোনো সাহিত্য এক ধরনের পরিপূর্ণতা অর্জন করে পাঠের মাধ্যমে। পাঠক আসলে লেখকের থেকে ভিন্ন কোনো প্রজাতির নয়, যদিও তিনি সংশোধনীর মাধ্যমে পরোক্ষ সেটাই স্বীকার করে নিয়েছেন, কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে তার বিপরীতে অবস্থান করছেন। তিনি সাহিত্যের প্রাচীনপন্থা থেকে সেই বিশ্বাসে অবস্থান করছেন যেখানে লেখক কেবল লেখকেই সর্বময় বাণীর অধিকর্তা। চাতুর্যের মুখোশে লেখকের কর্তৃত্ব কোন স্তরে অবস্থান করছে তার একটা নমুনা দেখতে পাবেন নিচের এই উদাহরণে।
‘একজন কমলালেবু’র প্রথম সংস্করণে লেখা সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং জীবনানন্দের কথোপকথন’এর জায়গাটি আমি তুলে দিচ্ছি (২১১ পৃষ্ঠা, প্রথম সংস্করণ):

‘সঞ্জয় চেয়ার টেনে জীবনানন্দের সামনে এসে বসলেন এবং তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন জীবনানন্দ বাবু, এখন যারা কবিতা লিখছে এরা কেউ কবি নয়। কবি একমাত্র আপনি, এটা জেনে রাখবেন। আপনিই আমাদের দেশটাকে, এই সময়টাকে সবচেয়ে ভালো চিনেছেন, ধরেছেন। আপনি রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের সবচেয়ে গ্লোবাল রাইটার। হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট, ডিলান টমাসের সাথে আপনার আত্মীয়তা।’

জীবনানন্দ উসখুস করতে লাগলেন, তারপর বললেন, ‘না মানে, একজন কবির ওপর তার অগ্রজ আর সমসাময়িক কবিদের প্রভাব তো থাকতেই পারে, তাই না?

সঞ্জয় রেগে গেলেন, ‘আমি তো প্রভাবের কথা বলছি না জীবনানন্দ বাবু, বলছি আত্মীয়তার কথা। অন্য কবিদের প্রভাব থাকতে পারে, আপনার আছে আত্মীয়তা, আপনি এদের বংশধর, অন্যরা কেউ না…।”

ইটালিক করা অংশটি লেখক শাহাদুজ্জামান ‘একজন কমলালেবু’র দ্বিতীয় সংস্করণে পালটে দিয়েছেন (২১১ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় সংস্করণ):

“সঞ্জয় চেয়ার টেনে জীবনানন্দের সামনে এসে বসলেন এবং তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন জীবনানন্দ বাবু, এখন যারা কবিতা লিখছে এরা কেউ কবি নয়। কবি একমাত্র আপনি, এটা জেনে রাখবেন। আপনিই আমাদের দেশটাকে, এই সময়টাকে সবচেয়ে ভালো চিনেছেন, ধরেছেন। আপনি রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের সবচেয়ে গ্লোবাল রাইটার। হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট, ডিলান টমাসের সাথে আপনার আত্মীয়তা।’

জীবনানন্দ উসখুস করতে লাগলেন, তারপর বললেন, ‘একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবিত করতে পারেন?

সঞ্জয় রেগে গেলেন, ‘আমি তো প্রভাবের কথা বলছি না জীবনানন্দ বাবু, বলছি আত্মীয়তার কথা। অন্য কবিদের প্রভাব থাকতে পারে, আপনার আছে আত্মীয়তা, আপনি এদের বংশধর, অন্যরা কেউ না…।”

পরিশেষে লেখক লিখেছেন, ‘এই বইয়ের সুত্র ধরে জীবনানন্দ অনুরাগীরা যে তর্ক বিতর্ক অব্যাহত রেখেছেন তাতেই আনন্দ বোধ করি।’ জনাব শাহাদুজ্জামান, আমরা জীবনানন্দ অনুরাগীরা শুধু ‘একজন কমলালেবু’ পড়িনি, জীবনানন্দ বিষয়ক আরও অনেকের লেখা পড়েছি এবং পড়ছি। ক্রমাগত পড়ছি। জীবনানন্দ’র কবিতা এবং তাঁর সৃষ্টি নিয়ে বিবিধ লেখকের বিশ্লেষণ পড়ে তার তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছি। কারণ জীবনানন্দ এমন মাপের কবি, যার কবিতার ঘোর থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব নয়। শাহাদুজ্জামানের প্রতি অনুরোধ থাকবে, ভবিষ্যতে জীবনানন্দ অনুরাগীদের তর্ক বিতর্ক উপভোগ করার পাশাপাশি তাঁদের মতামতকেও একটু সম্মান করার চেষ্টা করবেন।
Flag Counter


5 Responses

  1. মোস্তাক says:

    অসাধারণ। শাহাদুজ্জামানকে অনুরোধ করবো লীনা দিলরুবার কথাগুলোর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে। আপনি বড় লেখক হতে পারেন, কিন্তু ‘একজন কমলালেবু’র প্রমাদ স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে যা ঘটালেন তাতে আপনার প্রতি খুব বেশি শ্রদ্ধাশীল হতে পারছি না। ‘সরলমতি’ পাঠকের এই অপারগতাটুকু ক্ষমা করবেন।

  2. Joti says:

    আপনার লেখায় ব্যক্তিগত আক্রমণ খুব স্পষ্ট।
    প্রথমত বনলতা সেন যদি বারবণিতাও হয় তাতে রুচির কি সমস্যা তা বুঝলাম না। কিন্তু সাহিত্য আপনাকে কতটা আলোকিত করেছে সে সম্পর্কে আমি সন্দিহান হয়ে পড়লাম।
    আর ডায়লগে যে পরিবর্তন তার দুটোই শাহাদুজ্জামানের লেখা।দুটো ডায়লগের মধ্যে খুব বিপ্লবী পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। আর সত্যিকারের ডায়লগ কি ছিল সে তথ্য কারোর পক্ষেই জানা সম্ভব নয়।
    তাছাড়া আপনি কি নিজের ভুল স্বিকার করেছেন? জীবনানন্দ সিটি কলেজের সে সময়ের সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক ছিল না বলে আপনার দাবী ছিল। কিন্তু এ তথ্যের পক্ষে তিনটা রেফারেন্স আছে যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। এ বিষয়ে আপনার একটু চিৎকার করে মাপ চাওয়া উচিত নয় কি?

    আপনি লিখতে থাকুন, তবে সেটা অন্যের পেছনে না লেগে। তথ্যসমৃদ্ধ বই হলে ভাল হত।

    • শরীফ says:

      ”প্রথমত বনলতা সেন যদি বারবণিতাও হয় তাতে রুচির কি সমস্যা তা বুঝলাম না। কিন্তু সাহিত্য আপনাকে কতটা আলোকিত করেছে সে সম্পর্কে আমি সন্দিহান হয়ে পড়লাম।” প্রথম বাক্যটির সঙ্গে দ্বিতীয় বাক্যটির সম্পর্ক কী? মাঝখানে আবার অর্থহীন একটা ‘কিন্তু’ ব্যবহার করে সম্পর্ক পাতানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ‘স্বীকার’ বানানটি হয়ে গেছে ‘স্বিকার’। একজনকে বলেছেন ‘আলোকিত’ হতে, আবার একইসঙ্গে বলছেন চিৎকার করে মাপ (মাফ? ক্ষমা?) চাইতে! এবং সবার শেষে বলেছেন ‘তথ্যসমৃদ্ধ বই হলে ভাল হত’। কোন বইয়ের কথা বলছেন? জনাব JOTI-র সমস্ত মন্তব্যই এমন খাপছাড়া। আরেকটু প্রস্তুতি নিন। তারপর নতুন করে আবার লিখুন। আলোকিত হোন।

  3. শাহাবুদ্দীন নাগরী says:

    শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ কোনো ডকুমেন্টারি বা জীবনীগ্রন্থ নয়। এটি একটি ফিকশন। ফিকশন বা গল্প-উপন্যাস লেখার সুবিধা এই যে, এখানে যা খুশি তা লেখা যায়। বানিয়ে বানিয়ে তথ্য দেয়া যায়। সেটি শুদ্ধ না ভুল তা নিয়ে মাথাব্যথা থাকে না। আপনারা সবাই অযথাই বিতর্ক করছেন। ছেড়ে দিন। যেতে দিন। আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশের প্রথম গবেষকদের একজন, জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা তাঁর ফিকশনগুলো পড়ুন, তথ্য কোথায় ভেসে গেছে।

  4. ঋতো আহমেদ says:

    পড়লাম। কেমন যেন শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছে লীনা দিলরুবার সমস্ত বক্তব্যকে ছাপিয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত আক্রোশ। আমার মনে হয় শাহাবুদ্দীন নাগরীর মন্তব্যটার দিকে নজর দিতে পারি আমরা। বেশ ভালো ও স্বস্তিকর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.