সাক্ষাৎকার

জামাল আহমেদ: সবাই আর্ট বুঝলে তো আমি পায়রা আঁকতাম না

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | 24 Nov , 2018  


এ সময়ের খ্যাতনামা শিল্পী জামাল আহমেদ। আশির দশকের ফিগারেটিভ ছবিতে নতুন অভিব্যক্তি ও ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলেছেন দিলখোশ আড্ডাবাজ এই শিল্পী। নিটোল প্রকৃতিতে আলো ছায়ার লুকোচুরি, মানুষের উপস্থিতি— বহুভঙ্গিম উজ্জ্বল রঙে প্রতিবিম্বিত হয় জামালের ক্যানভাসে।

চারুকলায় পড়ার প্রতি আগ্রহ বালকবেলা থেকেই, ছিলো বাবামায়ের উৎসাহ, পরিবারের প্রেরণা। এসএসসি পাশ করে ভর্তি হয়েছিলেন চারুকলায়। ভালো লাগে আঁকতে এমন যা কিছু তার সবই তিনি ক্যানভাসে তুলে এনেছেন দীর্ঘ শিল্পীজীবনে। স্টিল লাইফ থেকে ল্যান্ডস্কেপ, পোর্ট্রেট বা ফিগার—পাখি-নদী-মেঘমালা। শিল্পী জামালের ব্রাশিং, টেক্সচার, স্ট্রোক ভীষণ স্বকীয় এবং স্পষ্ট। বিষয়, মাধ্যম ও রং নির্বাচনে স্বদেশের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ ছুঁয়ে যায় রসিকের হৃদয়।

“আজ চব্বিশে নভেম্বর শেষদিন জামাল আহমেদের প্রদর্শনী ‘ক্রনিকলস অফ চারকোল’-এর প্রদর্শনী চলছে গ্যালারী কায়ায়। উত্তরার চার নম্বর সেক্টরের ১৬ নাম্বার সড়কের ২০ নাম্বার বাড়ির নিচতলাজুড়ে এই গ্যালারী। শিল্পী জামাল আহমেদের এই প্রদর্শনীর পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে এডিএন গ্রুপ ও বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম।”

শিল্পী জামাল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে পোল্যান্ডের একাডেমি অব ফাইন আর্টস ও জাপানের সুকুবা ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাক্রিলিক ও তেলরঙের ওপর দীক্ষা নিয়েছেন এবং মাস্টার্স করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের অধ্যাপক, সম্প্রতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংস্থার সভাপতি।
ভূমিকা ও সাক্ষাৎকার: শিমুল সালাহ্উদ্দিন

গ্যালারি কায়ায় চলছে শিল্পী জামাল আহমেদের সমকালীন চিত্রকর্মের প্রদর্শনী ক্রনিকলস ইন চারকোল বা কাঠকয়লার ধারাবিবরণী। ১০ নভেম্বর এ প্রদর্শনী উদ্বোধন করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রদর্শনীতে জামাল আহমেদের তিন ধরনের শিল্পকর্ম জায়গা পেয়েছে,—কাঠপেনসিল, চারকোল ও প্যাস্টেল। এই তিন মাধ্যমের কোনো কোনো কাজে দ্রুতগতির রেখা ব্যবহার করা করেছে, কোনো কাজে শিল্পী ব্যবহার করেছেন গাঢ় রঙের কাগজের গায়ে শুধুমাত্র উজ্জ্বল রঙের রেখা। শিল্পচর্চার মাধ্যম হিসেবে চারকোল আর প্যাস্টেলকে সহজলভ্য মনে করা হলেও জামাল আহমেদের ক্যানভাস এই মাধ্যম দুটিকে অতি মূল্যবান মাধ্যম হিসেবে প্রকাশ করেছে। প্রদর্শনীর ছোট-বড় সব ছবিই দর্শকমনে নতুন চিন্তার জন্ম দিতে পারে। ২৪ নভেম্বর শেষ হতে যাওয়া ৬৫টি শিল্পকর্মের এ প্রদর্শনী দেখার পর জামাল আহমেদের বাসায় ১৯ নভেম্বর নেয়া হয়েছে এ সাক্ষাৎকার।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জামাল ভাই, বিভিন্ন প্রদর্শনীতে, আড্ডায় নানা সময়ে আপনার সাথে আলাপ হইছে। সেগুলোর প্রায় সবই আপনার সাম্প্রতিক বা তাৎক্ষণিক শিল্পকর্ম নিয়া। কিন্তু আপনার শিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠা, একটা বর্ণাঢ্য সময় অতিক্রম করা— এই সবকিছু নিয়ে আসলে আলাপ করতে চাই। আপনি যদি শুরু করেন ছেলেবেলা থেকে, ছেলেবেলায় আপনি প্রথমে কী আঁকলেন? কেন আঁকলেন? আঁকাআঁকির প্রতি ভালোবাসাটা তৈরি হল কিভাবে?
জামাল আহমেদ: একদম ছোটবেলা থেকেই শুরু আমার আঁকাআঁকি। যখন ওয়ানেও পড়ি না, ভর্তি হই নাই, তখন থেকেই আঁকতাম। যা দেখতাম তাই আঁকতাম। পেন্টিং-এর বই দেখতাম, দেখে দেখে নকল করতাম ছোটবেলা থেকেই। তারপর যখন একটু বুঝলাম, ওয়ান-টুতে ভর্তি হলাম, তখনো পড়ালেখার চেয়ে আঁকার প্রতি বেশি আগ্রহ ছিল। ভাল্লাগতো। তারপর ল্যাবরেটরিস স্কুলে ভর্তি হলাম, ওখানে তো ক্লাশ এইট পর্যন্ত ছবি আঁকার ক্লাশ। ওখানে থ্রিতে ভর্তি হলাম। দেখলাম যে, সব বিষয়ে পাশ করলেও বেশি নাম্বার পাই আর্টে। আর্টে একশতে প্রায় নিরানব্বই-নব্বই এইভাবে পাই। কিন্তু অন্যগুলিতে এত পাই না। তখন স্যাররাও বলল, তুই ছবিই আঁক। তখন তো এত মানুষ ছবি আঁকত না। এখন তো অনেকেই আঁকে। তখন সারা স্কুলে দুই-তিনজন ছবি আঁকত। তো ওরা অন্যদিকে চলে গেল, আমি চলে গেলাম চারুকলায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: চারুকলায় তো এসএসসি পাশ করার পর আসলেন। আপনার ছবি আঁকা নিয়ে বাড়ির লোকেদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
জামাল আহমেদ: না, বাসায় আমার কোনো অসুবিধা ছিল না। বাসায় আমাকে উৎসাহ দিত আমার আব্বা। আমার আম্মা আবার একটু আঁকাআঁকি করত। বালিশে ফুল তুলত। এইসব করত। আর্টিস্টিক ছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনারা কয় ভাইবোন ছিলেন? বাবা-মা কী করতেন?
জামাল আহমেদ: বাবার তো গভর্নমেন্ট চাকরি। মা হাউজ ওয়াইফ। আমরা মোট নয় ভাইবোন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কয় নাম্বার?
জামাল আহমেদ: আমি একদম মাঝখানে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার মা যেহেতু আর্টিস্টিক ছিলেন, বিভিন্ন চারু জিনিসপত্র তৈরি করতেন, ফলে মায়ের কাছ থেকে একটা ব্যাপার আপনি পেয়েছেন বলা যাবে!
জামাল আহমেদ: আমি শিওর না। তবে মনে হয়। পাইতে পারি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার অন্য ভাইবোনরা এই ব্যাপারটা কীভাবে দেখেছে?
জামাল আহমেদ: তারাও গানটান শুনত। আমাকে কেউ বাধা দেয়নি। তারা বলত তুই এইদিকে ভালো, তুই এইটাই কর। আমার আব্বাও বাধা দেন নাই। উৎসাহই দিছেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার জন্ম ১৯৫৫ তে!
জামাল আহমেদ: হ্যাঁ, ফিফটি ফাইভ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে আপনার এসএসসি যদি পনেরো বা ষোল বছরে হয় তাহলে আপনার এসএসসি একাত্তর-বাহাত্তরে।
জামাল আহমেদ: বাহাত্তরে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে চারুকলাতে আপনি তেহাত্তরে ভর্তি হলেন?
জামাল আহমেদ: তেহাত্তর কি চুহাত্তরে ভর্তি হই। জট-টট ছিল আর কি। সেশন জট, বা মুক্তিযুদ্ধের জন্য বন্ধ ছিলো ভর্তি বা পিছাইছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি ভর্তি হয়ে চারুকলাকে কী অবস্থায় দেখেছেন? তখন চারুকলার কী অবস্থা ছিল, এখন যেমন আছে এমন তো আর ছিলো না!

জামাল আহমেদ: চারুকলার সামনে যে স্কুল আছে, আমি ওয়ান থেকে সেই স্কুলে পড়তাম। শাহাবুদ্দিনও পড়ত। আমাকে নিয়ে যেত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওটার নাম জয়নুল শিশুস্বর্গ বা এই ধরনের কী যেন নাম ছিল। ওটাতে আপনারা দুজন একসাথে পড়তেন?
জামাল আহমেদ: শাহাবুদ্দিন সিনিয়র ছিল। শাহাবুদ্দিন আমার পাঁচ বছরের সিনিয়র। শাহাবুদ্দিন যখন টেনে পড়ত আমি তখন ফাইভে পড়তাম। তখন কলাবাগান থেকে শাহাবুদ্দিন আমাকে নিয়ে যেত। তখন কলাবাগান কাছে ছিল। তেরছাভাবে হাঁটা দিলে তো কাছে। এখন তেরছাভাবে হাঁটা যায় না। বাসা-বাড়ি হয়ে গেছে। রাস্তা ঘুরে আসতে হয়। আসলে কলাবাগন তো কাছে। চারুকলা থেকে যদি কাঞ্চি মেরে যাই, তাহলে কলাবাগান তো একদম কাছে। তখন দুই-তিন মিনিট লাগত। তখন স্কুলে আমাকে নিয়ে যেত শাহাবুদ্দিন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেই স্কুলে আপনাদের মাস্টার কারা ছিল?
জামাল আহমেদ: প্রথমে মহসিন নামে এক ভদ্রলোক ছিল। শফিকুল আমিন ছিল। এঁরা খুব যত্ন নিয়ে শেখাতেন। তখন তো এত আঁকিয়ে ছিলেন না। তখন হয়তো ভর্তি পরীক্ষা একশোজন দিত। নিতো বিশ-ত্রিশজন। এখন নয় হাজার পরীক্ষা দেয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা বিশাল চেইঞ্জ। কিন্তু জামাল ভাই, আপনি যখন চারুকলায় ভর্তি হলেন, মানে জয়নুল শিশুস্বর্গের পাঠ তো অন্য ব্যাপার, সেই ছোটবেলায় বাড়িতে শিল্পবান্ধব পরিবেশ ছিলো, আপনার শিক্ষকরা উৎসাহ দিয়েছেন, মনে হইছে যে আঁকবেন; কিন্তু সিরিয়াসলি যে আঁকবেন মনে করলেন….
জামাল আহমেদ: সেভেন-এইটে থাকতেই বাসায় সবাই বলত, তুই মেট্রিক পাশটা কর কোনোরকম। মেট্রিক পাশ করলেই তোরে চারুকলায় দেব। সেই আমলে বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই বাবা-মা চাইত না ছেলে আর্টিস্ট হোক। আর্টিস্ট হলে তো ভাতে মরবে। সব দেশেই। সবারই তো না খেয়ে মরার দশা। ভ্যান গগ ট্যান গগ সবারই। পরে সারা পৃথিবীই জেগে উঠল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পকলার দাম তৈরি হলো। চারুকলায় ভর্তি হয়ে আপনি কাদেরকে প্রথম মাস্টার হিসেবে পেলেন?
জামাল আহমেদ: শহীদ কবির, মাহমুদুল হক, আমিন স্যার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শফিকুল আমিন?
জামাল আহমেদ: না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমিনুল ইসলাম?
জামাল আহমেদ: না। আরেকজন আমিন ছিলেন। মাহবুবুল আমিন। উনি আমাদেরকে খুব যত্ন করে আর্ট শেখাতেন। কবির স্যারও যত্ন করতেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আবেদিন স্যারকে খুব কম দিনের জন্য পেয়েছেন, না?
জামাল আহমেদ: উনি একবার আমাদের ক্লাশে আসছিলেন। ভিজিটর হিসেবে আসছিলেন। কী বলেছিলেন ভুলে গেছি। দেখেছিলাম এই হলো আবেদিন স্যার। অনেক কথা বলেছিলেন। কিন্তু মনে নাই এখন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আসলে মুগ্ধতার চোটেই ভুলে যাওয়ার কথা!
জামাল আহমেদ: এইটা ভালো বলছো, খুব সিগারেট খাইতেন দেখতাম। ক্লাশেও সিগারেট খাইতেন। উনি ঢুকলে কেমন একটা ভাব লাগত। সিগারেট, গন্ধ সবকিছু মিলা একটা মাদকতাময় অবস্থা হইতো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: চারুকলা আপনার আঁকাআঁকিতে কী অবদান রেখেছে? এখন আপনি চারুকলায় মাস্টারি করেন দীর্ঘদিন ধরে। পোলাপানকে শেখান। আপনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। কিন্তু চারুকলার ওই পিরিয়ডটা যদি আপনি মনে করেন, সেই সময়টা আপনার শিল্পী-জীবনে কী প্রভাব রাখছে কোন?

জামাল আহমেদ: তখন খালি চিন্তা করতাম আবেদিন স্যারের মতোন ছবি আঁকুম। আবার শাহাবুদ্দিনকে ফলো করতাম। তখন আমরা অনেক ছবি আঁকছি। তখন এত ট্রান্সপোর্ট ছিল না, ফ্যাশন ছিল না, পার্টি ছিল না। এখন কত পার্টি হয়!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পীদের অনেক জায়গায় জয়েন করতে হয়।
জামাল আহমেদ: এখন তো প্রত্যেক শিল্পী নেপালে যায় ছবি আঁকতে। এখন হেলিকপ্টারেও যায়। তখন তো এগুলো ছিল না। এত পয়সাও ছিল না। এক শার্ট, এক প্যান্ট। বকুলতলায় বোর্ড আর পেন্সিল দিয়ে আঁকতাম। ওয়াটার কালার দিয়ে ছবি আঁকতাম। তখন হাতেগোনা দু-একটা বড়লোক ছিল। ওরা এসে গাড়িতে নামত। আসত দেখতাম। হাতেগোনা। সারা ঢাকা শহরে তখন একশ দেড়শো গাড়ি ছিল। মানুষের তখন এত চাহিদা ছিল না। মানুষেরা চাইত না এত। আমাদের একটা ডিম দিলেই খুশি। একটা ফান্টা, দু’জন মিলে খেতাম। কোক। এতেই খুশি দেখে কে! আজকে ফান্টা খাইছি। এখন তো লোকে মুরগির রানও খায় না। তখন এক মুরগি আট ভাইবোন ভাগ করে খাইছি। তখন আমাদের আম্মারা খুব স্মার্ট ছিলেন। তারা কেমনে যে এক মুরগি আর আলু দিয়া খাওয়াইছে আমাদের! মায়েরা তেমন লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু দারুণ স্মার্ট ছিলেন। ইলিশের মাছের পেটি মা ছোট করত। বলতাম, এত ছোট করছো ক্যাঁ? বলত, আরে ছোট করলে ভেতরে লবণ যায়। চালাকি করত। পরে বুঝছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সবাইকে তো খাওয়াতে হবে।
জামাল আহমেদ: ইনকাম কম। ঘুষ-টুস নাই। তখন মানুষ ঘুষ এত খাইতও না। এখন তো সবার ধান্ধা কেমনে আমি আগে বড়লোক হমু। কেমনে আমি ওরে ধাক্কা মেরে আগে বাড়ুম। ছবিতেও অনেকে চালাকি করে। ছবি তো চালাকির জিনিস না। তাক লাগায়ে একবার পুরস্কার পাইলা। ওই যে গিয়াস কবির, তাকতুক লাগায়া কেমনে পুরস্কার পাইছে। সেই গিয়াস কবির গেল কই এখন!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে আপনি বলছেন চমক কোনো ব্যাপার না? কন্টিনিউটি ব্যাপার?
জামাল আহমেদ: ক্ষণিকের জন্য চমক ভালো লাগতে পারে। অরজিনাল জিনিস আস্তে আস্তে ঠিকই বাইর হয়ে আইব। আবার অনেকে বলে যে গড গিফটেড। এটা আমার মনে হয় না। গড গিফটেড— শখ আছে, গানটান গায়, মা গাইত, তুমিও গাও ঠিক আছে; কিন্তু প্রাকটিসটা আসল। আগ্রহ আর প্রাকটিস। আর ছবি আঁকতে গেলে তো খালি ছবি আঁকলে হবে না। গাধার মতো সারাদিন ছবি আঁকলে তো হবে না। ছবির সাথে অন্যকিছুর রিলেশন আছে। গান শুনতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ভালো ছবি আঁকতে হলে আর কী করতে হবে?
জামাল আহমেদ: সিনেমা দেখতে হবে। ধুমধাম গান শুনলে হবে না। যখন আমি আমার জন্য ছবি আঁকি, তখন তো আমি ধুমধাম গান শুনি না। তখন ঠিকই রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি। কিংবা অতুলপ্রসাদ শুনি। আর যখন অর্ডারের কাজ করি, পয়সার জন্য করি, করি তো অনেক সময়, তখন বলি লাগা একটা গান। যেটা দিবি সেটা শুনব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহা। আপনি খুবই স্পষ্টভাবে বললেন পুরা ব্যপারটা। জামাল ভাই, আমার প্রশ্নটা ছিল, চারুকলার যে শিক্ষা-ব্যবস্থা, আপনারা যাদেরকে পাইছেন, চারুকলা আপনাকে কী দিল?
জামাল আহমেদ: চারুকলা তো নিশ্চয় শিখাইছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবশ্যই। আমি সেইটাই জানতে চাচ্ছি। আপনি সিগনিফাই করতে পারেন কি না, আমি আগে এরকম আঁকতাম, চারুকলা আমাকে এই এই জিনিসগুলো দিছে।
জামাল আহমেদ: চারুকলায় ঢুকে প্রথমে আমরা ববিতা রাজ্জাক আঁকতাম। ফার্স্ট ইয়ারে। মনে করতাম না জানি কত কী আঁইকা ফালাইছি। তখন তো নায়িকা ছিল ববিতা। আবার লেলিনকে আঁকছি। ভাবতাম, আরে শালা, চেহারা মিলে গেছে! আমার মতো আর্টিস্ট আর কে আছে! কিন্তু বলা হলো, প্রথমে যা শিখছো তা ভুলতে হবে। না ভুললে তোমাকে নতুন করে শেখানো মুশকিল। যে জানে না তারে শিখাইতে সুবিধা। আমাদের সেই অবস্থা হইছিল। একজন আসছিলো ময়মনসিংহ থেকে। তার ড্রয়িং দেখে তো ভয় লাগত। সিলভার টোন মারত। কিন্তু সে গেল কই? কোনো খবর নাই। খালি ছবি আঁকছে। গান শোনে নাই। সিনেমা দেখে নাই। মানুষের সাথে মিশে নাই। আড্ডা মারে নাই। বুঝব কেমনে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে সামগ্রিক ব্যাপার দরকার?
জামাল আহমেদ: হ্যাঁ। একা একা কিচ্ছু হবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জামাল ভাই, আপনি বললেন, চারুকলা আপনাকে শিখাইছে। ভুলায়ে দিয়ে নতুন করে শিখাইছে। চারুকলায় আপনার সব থেকে প্রিয় শিক্ষক কে ছিল? কার কাছে আপনি নির্দ্বিধায় সবকিছু বলতে পারতেন?
জামাল আহমেদ: কবির স্যার ছিল। শহীদ কবির। মাহবুবুল আমিন। কাজী গিয়াসও ভালো শিখাইত। গিয়াস স্যারকে কম পাইছি। উনি ওয়াটার কালার শিখাতেন। কবির স্যার খুব ভালো টিচার ছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবির স্যারের প্রভাব কি আপনার উপর আছে?
জামাল আহমেদ: কিছুদিন ছিল। তারপর আমি জাপানে চলে গেলাম। জাপানে গিয়ে আমি নিজেরটা খুঁজে পেলাম। স্টাইল দাঁড় করালাম। কবির স্যারের প্রভাব ছিল না ঠিক, তিনি ভালো বলতেন। অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকতেন। লালন আঁকতেন। সেগুলো আমার সাথে মিল নেই। কিন্তু তিনি বলতেন ভালো। শিখাতেন ভালো। ধরায়ে দিতে পারতেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবির স্যার এখন রিয়েলিস্টিক কাজ করছেন। তিনি প্রথম দিকে অন্য ধরনের কাজ করতেন, ওইটা কি আপনাকে কোনোভাবে… যেমন আপনার সুপার রিয়েলিস্টিক কাজ, যেমন আমার সব থেকে ভালো লাগে, আপনি সমুদ্র নিয়ে একটা সিরিজ করছিলেন। সমুদ্রের মধ্যে অনেক লেয়ার দিয়ে দিয়ে…. ওইটার মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে আমাদের ফাতেমা। একদিকে মডেল যেমন আছে, আরেক দিকে সুপার রিয়েলিস্টিক স্বপ্নের জগৎ তৈরি করা— এই ব্যাপারগুলো আপনার মধ্যে আছে।
জামাল আহমেদ: ওটা আমি টেকনিক দিয়ে কাজ করছি। সাবজেক্টটা ধরো একদম নরমাল। কিন্তু স্টাইলটা মডার্ন। আমাদের তো অনেক টেকনিক শিখাইছে। ওইগুলো আমি নিজে নিজে প্রয়োগ করছি। এখন আবার দেখা যায় কবির স্যার আমার মতোই কাজ করে। আমার থেকেই নেয়া।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এইটা কিন্তু খুব মজার।
জামাল আহমেদ: কবির স্যার তার মতো করে না এখন। সে এখন আমার মতো করে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা নিয়ে আপনাদের নিজেদের মধ্যে কথা হইছে কখনো?
জামাল আহমেদ: এটা তো কবির স্যার কখনো স্বীকার যাবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্বীকার না যাক। স্বীকার যাওয়ার ব্যাপার না।
জামাল আহমেদ: প্রথম দিকে আমি ফাতেমারে নিয়ে কাজ করছি। অনেক আগে। সে পরে ফাতেমারে নিয়ে কাজ করছে। পাগলারে নিয়ে কাজ করছে। আমি করছি, সেও করছে। তারটা অন্যরকম। কিন্তু সাবজেক্টটা আমার থেকে নেয়া। কিন্তু এটা তো কেউ কইব না। কইলে মাইর হইব, মাইর।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহা। যাই হোক। এই প্রদর্শনীতে আমি দেখলাম যে প্রচুর পোট্রেট আপনি দিছেন। নজরুলের পোট্রেট ইত্যাদি। তার সাথে আবার আপনার সিলেক্টিভ পায়রা বা আপনার কবুতর, সমুদ্রতটে ফাতেমা–এই কাজগুলোও আছে।
জামাল আহমেদ: একই সাবজেক্ট, কিন্তু মিডিয়াটা ভিন্ন। সাবজেক্ট অলমোস্ট একই। এবার অবশ্য নতুন সাবজেক্ট ঢুকাইছি– ঘোড়া। হর্স।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই প্রদর্শনী নিয়ে আপনার প্লান কতদিনের ছিল?
জামাল আহমেদ: বেশিদিনের না। এক বছর আগের থেকে প্লান ছিল। এতে গৌতমের কৃতিত্ব বলতে হবে। ও-ই বলছে আপানাকে কিছু করতে হবে।

>
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পায়রার ভেতর আপনার লাইটের যে কাজগুলা–এটা কি আপনার নিজের আবিষ্কৃত টেকনিক নাকি বিভিন্ন জায়গা থেকে এবজর্ভ করা?
জামাল আহমেদ:টেকনিক তো অটোমেটিক হয়ে যায়। টেকনিক কেমনে হয়ে যায় কইতে পারি না। যেমন এবার ঘোড়া করলাম। ঘোড়া করার সময় ধূলা দিমু কেমনে? তো চারকোণা ডাস্ট বানাইছি। তারপর স্প্রে করছি। স্প্রে করার সঙ্গে সঙ্গে তো শুকায় না। দশ মিনিট পরে শুকায়। দশ মিনিটের ভেতর গুড়াগুলো ছিটায়ে দিছি। তো এই টেকনিক অটোমেটিক পা(ই)য়্যা গেছি। আঁকতে আঁকতে হয়ে গেছে। এটা কাউকে শিখাতে হয় না। নিজে নিজে হয়ে যায়। যেমন গুড়া করে কেউ ছবি আঁকে নাকি! এটা তো কেউ করবে না। গুড়া কি থাকে নাকি ছবির উপর! কিন্তু গুড়া থাকবে, যদি আমি স্প্রে করে দিই তাহলে গুড়া থাকবে। ঘোড়ার পায়ের কাছে স্প্রে করছি পায়ের কাছে থাকছে। অন্য জায়গায় করিনি সেখানে থাকেনি। এই টেকনিকটা অটোমেটিক পাইলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা তো খুব মজার নিশ্চয়। নিজে যখন কিছু আবিষ্কার করা হয়, শিল্পীর নিশ্চয় তার থেকে মজার কিছু হতে পারে না। এটা খুব আনন্দ দেয়। আপনার কি মনে আছে, প্রথমে কোন টেকনিক আপনি নিজের থেকে আবিষ্কার করছিলেন?
জামাল আহমেদ: হ্যাঁ প্রথমে একটা করছিলাম। ব্রাশ ধোয়ার পরে বালতির নিচে যে তলানি থাকে, তলানিতে অনেক রং মিশ্রিত হয়ে থাকে। ওইটা যখন আমি দিলাম ল্যান্ডের ভেতরে, মানে নদীর কিনারে দিলাম, মনে হইল সত্যিই কাদা। এই কাদা তো আমি বানাইতে পারতাম না রং দিয়ে। ওটা অটোমেটিক হয়ে গেছে। চারপাঁচ দিন ধরে ব্রাশ ধুই। ওটা সবাই ফেলে দেয়। কিন্তু ওটার ভেতর কেমন বালি বালি ভাব। যেন ঝোল। গরুর ঘন ঝোল, পাতলা ঝোল। তো এই রকম ঝোল দিয়ে দিলাম নদীর কিনারে। তারপর এদিক সেদিক কাইত করলে ওইটা একটা ফেটে ফেটে সুন্দর এফেক্ট আসে। এটা এখন অনেকেই করে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যখন জাপান গেলেন, জাপানের শিল্পকর্মের যে ধরন, আমার যেটা মনে হয়, ওরা প্রচুর স্পেস ছাড়ে, ওটার মধ্যে একটা শান্তি আছে। আপনার কাজের মধ্যেও স্পেস ছাড়ার ব্যাপার আছে। এই জিনিসগুলি কি ওদের কাছ থেকে নেয়া? এটা কি আপনি নিছেন নাকি অটো আসছে?

জামাল আহমেদ: জাপান থেকে আমি টেকনিকটা বেশি শিখছি। ওরা তো প্রচুর ম্যাটেরিয়ালস দিয়ে কাজ করে। আমি ওদের মতো করতে চাইনি। আমার মনে হইছে, জাপানিরা টেবিল-চেয়ারের মতো কেমন যেন ছবিটা তৈরি করে। বানায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আবেগহীন প্রাণহীন?
জামাল আহমেদ: হ্যাঁ। সারা পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখি, আমরা জাপানিজ কোনো আর্টিস্টের নাম জানি না। স্প্যানিশ আর্টিস্ট আছে, আমেরিকান আর্টিস্ট আছে, ইতালিতে হাজার হাজার আর্টিস্ট আছে; কিন্তু তুমি দু-একটা জাপানিজ আর্টিস্ট বলো তো?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বলাটা কঠিন।
জামাল আহমেদ: কঠিন। ফট করে বলতে পারবা না। চিন্তা ভাবনা করে দেখতে হবে। গুগলে দেখতে হবে। কারণ কী? এত মেটেরিয়ালস থাকতেও কেন কিছু হচ্ছে না? নিশ্চয় কোনো সমস্যা আছে। কী সমস্যা সেটা বলতে পারব না। সম্ভবত টেকনিকটা নিয়ে ওরা বেশি চিন্তা করে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা একটা সমস্যা।
জামাল আহমেদ: এটা আমাদের জন্য সুবিধা। আমরা টেকনিক শিখে এসে আমাদের ইমোশন দিয়ে কাজ করি। যেমন কিবরিয়া স্যার। তিনি জাপান থেকে শিখে আসছেন। এখন তার মতো করে আঁকছে। দুইটা মিলে একটা হচ্ছে। বাংলাদেশের লোকজন চাইনিজ খায়। বেঙ্গলিস্ট চাইনিজ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে বাংলাদেশে আমরা যেসব চাইনিজ খাই, এগুলো তো আসলে আমাদের মতো করে তেল মশলা দিয়ে খাই।
জামাল আহমেদ: তো আমরা আমাদের মতো করব। টেকনিকটা ওদের থেকে নিছি। তাতে সমস্যা কী। এর ফলে জিনিসটা অন্য রকম লাগে। যেমন মোহাম্মদ ইউনুস, ইকবাল— এরা তো জাপান থেকে শিখে আইছে; জাপান স্টাইলে কাজ করে না কিন্তু। বাংলাদেশের থিম দিয়ে, বাংলাদেশের ইমোশন দিয়ে কাজ করছে। যার ফলে দুজনের ছবিই কিন্তু খুব ভালো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি এদেরকে পছন্দ করেন, বুঝতেছি। এরা ছাড়া আপনার পছন্দের শিল্পী আসলে কারা?
জামাল আহমেদ: ইয়াংদের মধ্যে এই দুজন আছে। তারপর চিটাগাঙের নাজলী আছে। খুব ভালো আঁকে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নাজলী নায়লা মনসুর?

জামাল আহমেদ: হ্যাঁ। খুব ভালো কাজ করে। আমার ভালো লাগে। তারপর শহীদ কবির, রফিকুন্নবী; বশির স্যারের কাজ ভালো ছিল। কিন্তু যতই ভালো লাগুক না কেন, নিজেকে নিজের মতো করতে হবে। যতই ভালো লাগুক, ওঁদের মতো এঁকে তো লাভ নাই। পিকাসোর থেকে তুমি ভালো করতে পারবা? কারণ, পিকাসো মেটেরিয়ালস পাইত না। এখন মেটেরিয়ালস অনেক উন্নতমানের। কিন্তু পিকাসোর মতো করে তার থেকে ভালো আঁকছি বললে তো হবে না। পিকাসো তো আগেই ওটা কইরা ফেলছে। নতুন কাজ করতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কাজের যে ধরন, আপনার কাজের যে নতুনত্ব, এটাকে আপনি কীভাবে উদযাপন করেন? আপনি কী এঁকে আনন্দ পান? কখন আনন্দ পান?
জামাল আহমেদ: আমি বলি, তুমি যদি কিছু রান্না করো, তুমি নিজে যদি খায়া মজা না পাও, তাহলে আরেকজন খায়া মজা পাবে কীভাবে? তুমি মেহমানকে খাওয়াইলা। সে কি মজা পাবে? তুমি নিজেই তো মজা পাও নাই। লবণ বেশি হইছে কিংবা ঝাল বেশি হইছে। তো এটা তো মানুষের সামনে দিয়ে লাভ নাই। ছবি আঁইকা আমি নিজেই যদি মজা না পাই তাইলে আরেকজন দেখে তো মজা পাবে না। বহু ধ্রুপদী ছবি আছে, ক্ল্যাসিক্যাল গানের মতো, ওইটাও তো ভালো হইতে হবে। ওটা খুবই ভালো হতে হবে। তাহলে আরেকজনের ভালো লাগবে। সাবজেক্ট না দিয়ে দর্শক টানা চাট্টিখানি কথা না। খালি বাঁশি বাজালে তো ভালো লাগবে না। সুর হলে সেই না ভালো! কোকিলের ডাক তো আমরা বুঝি না। কিন্তু ভাল্লাগে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খুব সুন্দর বলছেন। আপনি এখন যে ধরনের কাজ করতেছেন, এই কাজগুলিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? ধরেন এইগুলা আপনি আঁকেন নাই। এই কাজগুলো অন্য শিল্পী আঁকছে। আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জামাল আহমেদ: কোনটা ভালো হইছে খারাপ হইছে আমি নিজেই তো বুঝি। কিন্তু সব সময় মানুষকে তো ভালো ছবি দেয়া যায় না। কিছু না দিলেও পারতাম, কিন্তু দিছি। কারণ, সাধারণ মানুষ তো আমারটা বুঝবে না। খাইবে না। সত্যি করে বলি, শিল্প দরকার আছে আবার পয়সারও দরকার আছে। কিছু ছবি আঁকতে হয় মানুষ পছন্দ করবে কি না এমন চিন্তাভাবনা করে আঁকি। আবার কিছু তো নিজের জন্য আঁকি। সব যদি নিজের জন্য আঁকতে পারতাম, ভাল্লাগত। কিন্তু উপায় নাই তো। মানুষ তো বোঝে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কি এখনো টাকার জন্য ছবি আঁকেন? মানে আমি বলতে চাইতেছি যে, আমাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের একজন আপনি….

জামাল আহমেদ: আমি বলি। আমার বন্ধুদের একজন ডাক্তার জাহাঙ্গীর। ও বিশ লাখ টাকা বেতন পায়। ওর টাকার দরকার কি! কিন্তু প্রতিদিন তো ছয়টা করে অপারেশন করে। আমি বলি, ওই মিয়া তুমি বিশ লাখ টাকা বেতন পাও, তোমার টাকা তো লাগেই না। তাও এত কাজ করো কেন? সে বলে, আরে ভাই টাকার জন্য তো কাজ করি না। মানুষ আমার কাছে আসে। আমার কাছে আইসা অপারেশনটা করতে চায়। একটা মায়ার বন্ধনে পড়ে যাই। ওরা বলে, তোমারে ছাড়া করব না। তো আমি তো আঁকতে চাই না। অনেকে এসে বলে এটা আঁইকে দেন। প্লিজ একটা পায়রা আঁইকে দেন। পায়রা আঁকতে কি এখন আর ভালো লাগে! আমি তো অনেক পায়রা আঁকছি। কিন্তু মাঝে মাঝে আঁকতে হয়। পয়সার জন্য না; ওই যে চাইতেছে! দেন ভাই দেন ভাই। অনুরোধ করতেছে ভক্তরা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু অনুরোধে ঢেঁকি গিললে কি কাজ ভালো হয়?
জামাল আহমেদ: যে সব পায়রা আঁকি ওসব তো আমি এমনি আঁকতেছি। সিরিয়াস ছবি আমার। এগুলো কারো জন্য আঁকি না। অনুরোধে সব আর্টিস্টরাই কাজ করে। নবী স্যারও করে। মুখে বলে তো লাভ নাই–আমি আমার জন্য আঁকি। এই চাপা মাইরা লাভ নাই। এই চাপা শুনতে শুনতে আমার বড় হইছি। নবী স্যারেরও এখন টাকার দরকার নাই। কিন্তু তারপরেও লোকে এসে বলে, ভাই একটা ছবি দেন। স্যার একটা ছবি দেন। পিকাসোও এমন আঁকছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আঁকতে তো আপত্তি নেই। আঁকতেই পারে। আপনি দেশের বাইরে প্রচুর এক্সিবিশন করছেন; ইউরোপে করছেন, আমেরিকায় করছেন। আমাদের পূর্বদিকেও করছেন। তাদের যে এপ্রিসিয়েশন, তার মধ্যে কোন এপ্রিসিয়েশন আপনাকে সবথেকে বেশি মুগ্ধ করে? যা দেখে আপনার মনে হইছে, না, সারা জীবন যে আঁকছি, আঁকার প্রতি একনিষ্ঠ ছিলাম, আমি বঞ্চিত হইনি, আমি আনন্দিত?
জামাল আহমেদ: আমার ছবি নিয়ে আমি খুশি। আমি যেগুলো আঁকছি। এর জন্য আমি কারো কথা চিন্তা করে থাকিনি। কাকে দিমু, না দিমু না, সে বুঝবে কি বুঝবে না— এগুলো চিন্তা করিনি। কখনো আবার চিন্তা করতে হয়। আচ্ছা ঠিক আছে, সে চাইছে, করে দিমুনে। কারণ, আঁকাআঁকিতে তো পয়সা লাগে। বাইরের আর্টিস্ট যারা, ওদেরকে তো গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ দেয়। তারা নিশ্চিন্তে আঁকতেই আছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমাদের এখানে এই জিনিটা ডেভেলপ করল না কেন? একজন শিল্পী হিসেবে আপনি কী মনে করেন? একজন শিল্পীর জন্য রাষ্ট্রীয় যে পৃষ্ঠপোষকতা, এটা কি যথেষ্ট?
জামাল আহমেদ: অনেক সমস্যা। তুমি যদি খাইতেই না পারো বাড়ি করে লাভ আছে? কত সমস্যা দেশে। লেখাপড়া হচ্ছে না। বস্তিতে কত মানুষ বাস করছে। টাকা পয়সা নাই। বন্যা। এত এত প্রবলেম। এরমধ্যেও আমরা আর্টিস্টরা তো খারাপ নেই। ভালোই আছি। এই গভর্নমেন্ট যথেষ্ট করছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ব্যক্তি জামাল আহমেদ যেমন ড্যাশিং, বিভিন্ন আড্ডায় আপনাকে যে রকম দেখি, সেটা খুব মজার। আপনি সব সময় হুল্লোড়ের মধ্যে থাকেন, মজার মধ্যে থাকেন। প্রেম আসলে আপনাকে কতটুকু ইনস্পায়ার করে? মানে আপনার কাজের মধ্যে তো প্রচুর প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে।
জামাল আহমেদ: তুমি ধরো কাউরে ভালোবাসলে, তারে একেবারে জাইত্যা ধরলে, দম বন্ধ হয়ে মরে গেল, এই রকম ভালোবেসে তো লাভ নাই। তোমাকে তো দম ছাড়তে হবে কিছুটা। ভালোবাসার মানুষকে জড়ায় ধরলা, সে দম নিতে পারল না, এটা তো বেশি হয়ে গেল। প্রেম তো থাকতেই হবে। যখন ছবি আঁকবা একদম ভেতর থেকে আঁকবা। হাত দিয়ে আঁকলে তো হবে না। এই জন্য বলা হয়, জাপানিজরা ক্রাফটস করে বেশি। তৈরি করে। বানাই মনে হয় আমার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে আর্টস এবং ক্রাফট্সের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটার কথা বলছেন আপনি?
জামাল আহমেদ: সেটার কথা বলছি। ভেতর থেকে না আসলে তো হবে না। গানের মতো। অনেকে আছে, না শিখেও ভালো গান গায়। যেমন আমি দেখছি মরমী গান রাস্তায় দাঁড়ায়ে কেউ গাচ্ছে, মানুষ ঝরঝর করে কানতেছে। এটা কি কম নাকি মিয়া!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি বিভিন্ন রকম মানুষের অবয়ব, মুখ, শরীর পেইন্টিং-এ নিয়ে আসছেন। এবং এটা এক ধরনের ক্লাসলেস পিপলের রিপ্রেজেন্টেশন। যেমন ধরেন ফাতেমারে দিয়ে আপনি যে কাজগুলা করছেন, পাগলারে দিয়ে যে কাজগুলা করছেন— এই দুজনকে নিয়ে আপনি প্রচুর কাজ করছেন। মডেল হিসেবে এদেরকে বেছে নেয়ার কারণটা কী?
জামাল আহমেদ: মডেল তো পাওয়া মুশকিল। সব সময় পাওয়া যায় না। পাগলা আমার কাছে থাকত। ওর একটা ক্যারেক্টার ছিল। তুমি যখনই কোনো মডেলের ছবি আঁকবা, সেই মডেলের সাথে তো ফ্রেন্ডশিপ হতে হবে। কোনো মডেল আইল, খাড়াইল, তুমি আঁকলা, এমনে করে তো হয় না। এভাবে একাডেমিক স্টাডি করা যায়। কিন্তু তাকে যখন পেইন্টিং-এ আনব, তখন তার সাথে মিশতে হবে— এ্যাই সকালে তুই কী খাইছিস? কখন খাবি? কখন ঘুমাবি?— ওর সঙ্গে মিশতে হবে। মেশার পরে আঁকো, তখন বেশি ভালো হবে। যেমন আমার পাগলার কাজগুলো বেশি ভালো। কারণ, ওর সাথে আমি মিশতাম। ফাতেমাও তাই। ও দুঃখের কথা বলত। আমার বিয়ে হয় না। বলতাম, তুই আমার মডেল দে তোর বিয়া ঠিক করতাছি। ও দাঁড়ায়ে থাকে। চোখে পানি টলমল করে। তখন বড় পোর্ট্রেট করি। ছয় ফিট। চার ফিট। ও আমার সামনে দাঁড়ায়ে ছিল। চোখের পানি টলটল করছে। বিয়ে হয় না, বিয়ে ভেঙে যায়, সেই দুঃখে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে এই কাজটা, এটা কি সরাসরি মডেল দিয়ে করা? ফাতেমা, কানের ফুল, সামনে আবার পায়রার সাজেশন…
জামাল আহমেদ: ফাতেমা সরাসরি মডেল করে। কিন্তু এইটা মডেল দিয়ে করা না। ছবি দিয়ে করা। আমি সব আর্টিস্টকে বলি, মডেল তুমি ছবি দিয়ে করতে পারো; কিন্তু ছবিটা তোমাকে নিজে তৈরি করতে হবে। সেটা সরাসরি দেখতে হবে। আরেকজনের তোলা ছবি দেখে তুমি আঁকবা ওইটা ভালো হবে না। যেমন, ছবি থেকে ছবি প্রিন্ট করলে যেমন ছবি ভালো হয় না, তেমন। সবাই অরিজিনাল কপি চায়। তবে ছবি থেকে ছবি ভালো হয় যদি তুমি ছবির ভেতর অনেক কাজ করো। তুমি যদি নিজের চোখ দিয়ে ডাইরেক্ট কিছু দেখ, ছবি তোলো, সেটা বেশি ভালো হবে। আরেকজন তুলে দিলো, দেখি তোর ফটোটা, একটু আঁকি— ওইটা ভালো হবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জামাল ভাই, প্রচুর পুরস্কার পাইছেন আপনি। সবচে বেশি আপনি কোন পুরস্কাররে গুরুত্ব দেন?
জামাল আহমেদ: পয়সা দিয়া অনেকে এক্সিবিশনে পার্টিসিপেট করে, তারপর পুরস্কার পায়। পুরস্কাররে আমি গোণায় ধরি না। যেমন একটা গ্রুপরে পুরস্কার দিল, আর গ্রুপ তো নাই। সারা পৃথিবীর গ্রুপ তো আসে নাই। ওই পুরস্কারে লাভ কি! পিকাসো তো সারা জীবনে কোনো পুরস্কারই পায়নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তা ঠিক। এটা একটা ব্যাপার। এ পর্যন্ত আপনার সলো একজিবিশন হইছে কতগুলা?
জামাল আহমেদ: এইটা গোণা নাই। পঞ্চাশের ওপরে হবে। ষাট বা তার কাছাকাছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কোনো একটা একজিবিশন সফল হলো কি না এটা আপনি কীভাবে মাপেন?
জামাল আহমেদ: ছবি ভালো হইলে সফল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ছবি ভালো হওয়া কি বিক্রির উপর নির্ভর করে?
জামাল আহমেদ: অনেক ভালো ছবি বিক্রিই হয় না। বোঝেই না লোকজন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা একটা সমস্যা। আমাদের এখানে কি আর্ট এপ্রিসিয়েশন দাঁড়াইছে জামাল ভাই?
জামাল আহমেদ: না। খুব কম। একজনই লেখে ভালো। সে হলো মঈনুদ্দীন খালেদ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাকির ভাইও ভালো লেখে।
জামাল আহমেদ: তাকির ইদানীং লেখতেছে। আমি আগের কথা বলতেছি। এই দুজনই ভালো লেখে। আর লেখালেখি নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই সঙ্কটটা দূর করা যায় কেমনে আসলে? উপায় কি আছে? আপনাদের চারুকলায় তো বিভাগ আছে।
জামাল আহমেদ: সমস্যা হলো, যারা পড়তে যায় বাইরে, ওরা এসে এটা করতে পারে। কিন্তু ওরা তো বাইরে গিয়ে ওখানেই চাকরি করে। দেশে আসে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি অফিশিয়ালি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনার পরিবার, আপনার প্রেম, আপনার ওয়াইফ— প্রেমরে আপনি কীভাবে দেখেন? একজন শিল্পীর তো ইনস্পিরেশন লাগে। সেই ইনস্পিরেশনটা আপনি কীভাবে অর্জন করেন?
জামাল আহমেদ: কে আমারে ভালোবাসতেছে এটা আমি বুঝি তো। মুখে তো বলতে হয় না। চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। আমি আমার মাকে, বউকে যদি কিছু দিই, তারা তো আমাকে থ্যাংক ইউ দেবে না। কিন্তু যে হাসিটা দিল, চোখের একটা ঝিলিক দিল, ওতেই বোঝা যায় খুব খুশি হইছে। ওইটেই ভালোবাসা। মুখে তোমাকে ভালোবাসি বলে তো লাভ নেই। এটা তো ফেইক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার জীবনে প্রথম অরিজিনাল লাভ কবে আসল?
জামাল আহমেদ: কী লাভ?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রেম।

জামাল আহমেদ: চারুকলায় আমি আর তুলি একসাথে পড়তাম। ওর সাথেই আমার অরিজিনাল বলো আর নকল বলো,সব প্রেম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: উদ্যোক্তা কে প্রথমে? আপনে না তুলি আপা?
জামাল আহমেদ: ভুলে গেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এ্যাই জামাল ভাই, বলতেছেন না আপনে…
জামাল আহমেদ: সত্যিই ভুলে গেছি। আসলে অটোমেটিক হয়ে গেছে। অটো হয়ে গেছে। তখন তো এখনকার মতো ছিল না। কঠিনও ছিলো, ইজিও ছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই একজিবিশনে প্রমাণ আছে আপনি এখন কী ধরনের কাজ করতেছেন। কিন্তু সামনে আপনার কোনো পরিকল্পনা কি আছে? এমন কিছু কি ভাবতেছেন যে এই ধরনের কাজ আপনি করবেন, যেটা একদমই নিজের জন্য কাজ?
জামাল আহমেদ: কিছু কাজ করব। চিন্তা ভাবনা করতেছি। আসলে ক্যানভাসের সামনে না বসলে মুখে বলা যায় না। প্রাকটিক্যালি যখন করি, তখন বলা যায়। এবার কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছি। যেমন ঘোড়া, ওম্যান। এই ধরনের কিছু কাজ আরো করব। আর আমি তো সহজ ছবি আঁকি। যা দেখি তাই আঁকি। বেশি কঠিন কিছু আঁকতে চাই না। বাংলাদেশের মানুষ যেগুলো বোঝে না, কী আঁকলাম বোঝায়ে দেয়া লাগে, সেগুলো আঁইকা লাভ কী?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই সঙ্কটটা আপনার মধ্যে কবে থেকে কাজ করতে শুরু করছে— মানুষ যদি না বোঝে আমার আঁইকা লাভ কী?
জামাল আহমেদ: একবার একটা সিনেমা দেখতে গেছিলাম। হাই থট সিনেমা। আর্টফিল্ম বলে ওটাকে। তো প্রথম দিন হাউজফুল, দ্বিতীয় দিন একটা মানুষও নাই। আমার ফ্রেন্ডের একটা হল ছিল। এখনো আছে। শ্যামলী হল। যাইতাম, আড্ডা মারতাম। সিনেমা দেখতাম। তো আর্টফিল্মগুলো এক সপ্তায় আটজন দশজন করে মানুষ দেখত। আরেকদিন গেলাম। কী রে আজ এত ভীড় কেন! ও বলল সুজন সখী সিনেমা। ওটা এক মাস চলছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে কি আপনি পপুলার, সবাই বুঝবে সেটা করতে চান?
জামাল আহমেদ: আমি সেটা করতে চাই। সহজ করতে চাই। আমি কিছু আঁকলাম, কেউ বুঝল না, কী আঁকলাম বোঝায়ে দেয়া লাগল, এসব আঁইকা লাভ আছে? গাছের কান্না, মাছের কান্না দিয়ে ছবি আঁকলাম, আন্দাজে এসব করে তো লাভ নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জামাল ভাই, আপনার দীর্ঘ শিল্পী জীবন, সব শিল্পীরা আপনাকে পছন্দ করে, প্রচুর ভক্ত আছে আপনার, অনেকে আপনার প্রেমে পড়ে, সুন্দর সংসার আপনার, আপনি প্রচুর আঁকেন, সারাক্ষণ মগ্ন থাকেন। এত প্রাপ্তির মধ্যে কোনো অপ্রাপ্তি আছে আপনার?
জামাল আহমেদ: আমি আরো ভালো কাজ করতে চাই–এটা আমার অপ্রাপ্তি। আমি যদি আরো ভালো কাজ করতে পারতাম! আমি যদি বড় বড় কাজ করতে পারতাম! আরো যদি ড্রইং করতে পারতাম! স্প্যানিশ একজন আর্টিস্ট ছিল— লোপেস। বাড়ি করার জন্য ট্রাক আসত। বাড়ি আঁকত না। ইটাবালির সামনে ট্রাক চলে যাওয়াতে যে রাস্তাটা তৈরি হতো, ওটা আঁকত। এই রকম যদি আঁকতে পারতাম! আমাদের দেশের রিকশাওয়ালারা বড় বড় লাইন ধরে বসে থাকে। এদের যদি আঁকতে পারতাম! গার্মেন্টসের মেয়েরা বোরখা পরে যায়, বেশিরভাগই হিজাব পরা, কারো হাতে টিফিন বাটি, কারো আবার বয়ফ্রেন্ড হাত ধরে রাখছে, যাইতেছে লাইন ধরে— ওইটা যদি আঁকতে পারতাম লাইফ সাইজে! করা যায় কিন্তু কঠিন কাজ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার অতৃপ্তির কথা জানলাম। আপনার অতৃপ্তি আপনার কাজ নিয়ে। আপনার তৃপ্তি কী? আপনার যে অর্জন আছে, এরমধ্যে আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় কী? চারুকলার সময়টা আনন্দ দেয় নাকি যখন আঁকতে বসেন তখন আনন্দ পান?
জামাল আহমেদ: আঁকার কাজটা ভালো হলে আনন্দ পাই। আড্ডা দিয়ে আনন্দ পাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার আড্ডার প্রিয় সঙ্গী কারা? কাদের সাথে আপনি আড্ডা দিতে পছন্দ করেন?
জামাল আহমেদ: যারা আমাকে পছন্দ করে তারাই আমার প্রিয় আড্ডার সঙ্গী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহা। আপনে নাম বলেন।

জামাল আহমেদ: আড্ডার সঙ্গীরা কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যায়। প্রিয় মানুষ চেঞ্জ হয়। ছোটবেলার বন্ধুরা কিন্তু এখন থাকে না। তবে এখনো কয়েকজন আছে। চারপাঁচজন আছে। বেশিরভাগই নেই। আবার চারুকলায় আগে যারা ছিল, তারা কিন্তু এখন নাই। হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে, জেলাস হতে পারে। একই সাথে পড়লেই আবার ফ্রেন্ড হয় না কিন্তু। সিনিয়রদের সাথে বন্ধুত্ব হয়, জুনিয়রদের সাথে বন্ধুত্ব হয়। ভক্তবৃন্দ আমার কিন্তু জুনিয়র বেশি। আবার সিনিয়রও বেশি। বন্ধুদের মধ্যে আমার কোনো ভক্ত নেই। তবে ইউনুস আমার খুব ভক্ত। ও আমার খুব প্রশংসা করে। আমি ওর ভক্ত, ও আমার ভক্ত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নতুন আর্টিস্টদের জন্য কী বলতে চান? একটু যদি বলেন।
জামাল আহমেদ: নতুন আর্টিস্টরা বেশি বেশি কাজ করবে। বেশি বেশি ড্রইং করবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি ক্লাশে স্টুডেন্টদের কী বলেন?
জামাল আহমেদ: আমি বলি, বেশি করে কাজ করো, ভালো করে দেখ। ভেতর থেকে কাজ করো। ড্রইং করো বেশি। মোবাইল নিয়ে টিপাটিপি করো না, ছবি নিয়ে টিপাটিপি করো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হাহাহাহা।
জামাল আহমেদ: মোবাইলের জন্য ওদের গার্লফ্রেন্ড ইজি হয়ে যায়। আমাদের সময়ে গার্লফ্রেন্ড পাওয়া বড় মুশকিল ছিল। ওরা তো প্রেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমি যা চোখের সামনে দেখি। ফট করে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। ফট করে খাইতে যাচ্ছে। আমরা তো ফট করে যাইতে পারতাম না। পয়সাই নেই, কোত্থেকে যাব! ছবি নিয়ে থাকতাম। এই জন্য বড়লোকের ছেলেমেয়েরা আর্টিস্ট হয় না কিন্তু। মিডলক্লাশ থেকে আসলে নামকরা আর্টিস্ট হয়। তুমি দেখাও, একটা বড়লোকের ছেলে আর্টিস্ট হইছে কি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা তো শুধু আর্টিস্টদের ক্ষেত্রে সত্য না, কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও সত্য।

জামাল আহমেদ: বড়লোকের ছেলেমেয়ারা ব্যারিস্টার ইঞ্জিনিয়ার হয়। আর্টিস্টরা সব মিডলক্লাশ থেকে হয়। বড়লোকের ছেলেমেয়রা আসে ফ্যাশন করতে। আর্টকলেজে পড়ি, এই ফ্যাশন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শুরুতে বলছিলাম, আপনার ফ্যামিলি আপনাকে উৎসাহ দিয়েছে। জামাল ভাই, আপনার বাবা কখনো আপনার শিল্পকর্মে প্রশংসা করছে?
জামাল আহমেদ: প্রশংসা করছে কখনো দেখিনি। তবে সে উৎসাহ দিয়েছে। আমাকে ভর্তি করাইতে নিয়ে গেছে রিকশা করে, আর্ট স্কুলে, হাতে ধরে। বাবারা যেমন নিয়ে যায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার বাকি ভাইবোনরা কে কোথায় কী করছে?
জামাল আহমেদ: এক ভাই ডাক্তার। এক ভাই ব্যবসা করে। এক ভাই চাকরি করে। এক ভাই প্রফেসর ছিল, মারা গেছে। এই তো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বোনেরা?
জামাল আহমেদ: বোনরা হাউজ ওয়াইফ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তারা আপনার কাজকর্ম দেখে? এক্সিবিশন হলে আসে?
জামাল আহমেদ: সবাই আসে না। কেউ কেউ আসে। বাসায় তো আসে, দেখে। দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ধরেন আপনি একটা ভালো কাজ করলেন। এই কাজটা আপনি সবার আগে কারে দেখাইতে চান?
জামাল আহমেদ: আমার কলিগ যারা বাসায় আসে, তাদের দেখাই। দেখ তো কেমন হইছে কাজটা? সিনিয়র হইলে দেখেন তো কেমন হইছে? চলবে নাকি? মানুষ পছন্দ করবে কি না, মানুষের ভেতর ঢুকবে কি না?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের সাথে আপনার অন্য রকম একটা সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কের মধ্যে কী কী আছে? শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের প্রতি আপনার কোনো জেলাসি আছে?
জামাল আহমেদ: জেলাসি আছে বাট পজেটিভ। শাহাবুদ্দিনের মতো আঁকুম, তার মতো নাম করব— এই রকম আছে। কিন্তু তার জন্য তো শাহাবুদ্দিন ভাইকে কখনো অশ্রদ্ধা করব না। তিনি গুরুর মতো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু আপনার কি কখনো মনে হয় না শাহাবুদ্দিন ভাই সম্প্রতি যে কাজগুলো করছে, সেগুলো আগের কাজের রিপিটেশন?

জামাল আহমেদ: রিপিটেশনের কাজগুলো তো মানুষ চায়, তাই দেয়। কিন্তু তার সিরিয়াস কাজ তো আমি দেখছি। তার অনেক সিরিয়াস কাজ দেখেছি। আমি তো জানি সে কেমন কাজ করে। একটা আঁইকা দিল সেটা দিয়ে তো বিচার না। তার আসল কাজ দেখতে হবে। অনেক ভালো ভালো কাজ আছে। কম বয়সে বঙ্গবন্ধুর কী সুন্দর ছবি আঁকছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের প্যারালাল যদি আপনি আপনার নিজের কাজ বিবেচনা করেন, আপনি কি ঊনিশ-বিশ নাম্বার দেন নাকি দশ-বিশ নাম্বার দেন?
জামাল আহমেদ: আরে শাহাবুদ্দিন তো অনেক ভালো কাজ করে। শাহাবুদ্দিনের সাথে তুলনা করি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওয়ার্ল্ডক্লাশ যে কাজগুলো এখন হচ্ছে, পৃথিবীর সেরা কাজ, তার তুলনায় আমাদের দেশের পেইন্টিং আসলে কই আছে?
জামাল আহমেদ: সমান সমান তো নাই-ই। পেইন্টিং ওরা যদি দশে দশ পায়, আমরা দশে তিন-চার। আমাদের কালচার তো অমন না। আলাদা। মুসলিমদের জন্য ছবি আঁকা তো পাপ। মূর্তি বানানো তো আরো পাপ। ছবি বা পেইন্টিং-এ কিছুটা সহজ। আর বাইরে তো কম্পিটিশন বেশি। আমাদের কম্পিটিশন নেই। আর্টিস্ট কম তো! তিনজন ছাত্রছাত্রী থাকলে যে থার্ড হয়, সে বলে আমি থার্ড হইছি। তারপর জিগানো হয় ছাত্রছাত্রী কয়জন? তো বলে যে তিনজন। এই হলো অবস্থা। আর্টিস্ট তো বেশি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এর থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় কী আসলে?
জামাল আহমেদ: দেশকে আরো শিক্ষিত হতে হবে। সবাইকে ছবি বুঝতে হবে। সবাই বুঝলে তো আমি পায়রা আঁকতাম না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঠিক আছে জামাল ভাই। আপনাকে ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিপি: সাব্বির জাদিদ
Flag Counter


8 Responses

  1. আবুল মোমেন says:

    খুবই স্বতস্ফূর্ত আলাপ। ভালো লাগলো সাক্ষাৎকারটি। এ ধরনের কাজ প্রায় করেনই না এখন সাংবাদিকরা। বিডিনিউজকে ধন্যবাদ আমাদের একজন অগ্রগণ্য শিল্পীর প্রদর্শনী নিয়ে এমন আয়োজনের জন্য। শিল্পরুচি নির্মানে আর্টসের ভূমিকা এসব কাজে প্রতিষ্ঠিত হয়।

    সেসময় এসময়ের চারুকলা, শিল্পচর্চা, শিল্পীদের ভাবনা জানা গেলো। জামাল আহমেদদের সমসাময়িক বা একটু আগের শহীদ কবির, নিসার হোসেন, আবুল বারক আলভী, রোকেয়া সুলতানা, শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, নাজলী নায়লা মনসুর, অলক রায়দের পোট্রে করা এখন সময়ের দাবি। আশা করি শিমুল সালাহউদ্দিন তাদের সাথেও আলাপ করবেন।

    শিল্পীর প্রদর্শনী ও সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবার জন্য আর্টস বা বিডিনিউজকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

  2. Mahbub Kabir says:

    আলাপটা অসাধারণ লাগল, শিমুল!

  3. সাক্ষাৎকারটি খুব ভালো লাগলো । এমন আয়োজনের জন্য বিডিনিউজকে Thanks.

  4. আহমাদ মোস্তফা কামাল says:

    দুর্দান্ত একটা সাক্ষাৎকার। দারুণ স্বতঃস্ফূর্ত, ভান-ভনিতাহীন, খোলামেলা, উদ্দাম, উচ্ছল…

    ধন্যবাদ শিমুল। ধন্যবাদ বিডিআর্টস।

  5. আফজাল হৃদয় says:

    খুবই সাবলীল আলাপ। জামাল আহমেদ মনেপ্রাণে শিল্পী, একজন বড় শিল্পী, অকপট ভণিতাহীন শিল্পী তা বোঝা গেলো। রোমান্টিক মনের একজনের পক্ষেই এতো সুন্দর আঁকা সম্ভব। অভিনন্দন সংশ্লিষ্ট সবাইকে। বহুদিন পর কোন ইন্টারভিউ একটানে পড়ে ফেললাম। মাঝখানে বিরক্তি আসে নাই।

  6. দীপঙ্কর চৌধুরী says:

    পশ্চিমবঙ্গে এমনকী দেশ পত্রিকা বা বইয়ের দেশ-এও এমন অকপট, ঋদ্ধ আলাপচারিতা দেখা যায় না। এই আলাপের সূত্র ধরে আরো কয়েকটি ইন্টারভিউ পড়লাম আর্টসে। রাজু আলাউদ্দিন ও শিমুল সালাহউদ্দিন এর ইন্টারভিউগুলো খুবই আলাদা মহিমায় উজ্জ্বল।আপনাদের অনুরোধ করছি, পশ্চিমবঙ্গের এ সময়ের চারু ও কারুশিল্পীদের সাথে আলাপচারিতা প্রকাশ করবেন প্লিজ। কলকাতায়ও অনেক নিরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে।

  7. ভীষণ ভাল লাগলো সাক্ষাৎকারটি। কি সরল স্বীকারোক্তি! কোন ভাবভনিতা নেই। শিল্পী যেন একজন শিশুর মতো প্রানবন্তভাবে কথা বলে যাচ্ছেন নিজের কাজ নিয়ে, অন্যদের নিয়ে। এর আগে কোন কারুশিল্পীদের এভাবে কথা বলতে দেখিনি।

  8. ফয়সাল তিতুমীর says:

    জামাল আহমেদের এতো ভালো সাক্ষাৎকার আগে পড়িনি, শিল্পীর উচিত শিমুলকে একটা বড় উপহার দেয়া। পড়তে পড়তে মনে হল একজন বড় শিল্পীর সাথে সময় কাটালাম। অভিনন্দন শিল্পী জামাল আহমেদকে। এমনি স্বতস্ফূর্ত থাকুন, জামাল ভাই। শিমুল, দুর্দান্ত একটি কাজ করেছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.