আর্টস

ভুল স্বীকারের অপারগতা এবং ‘একজন কমলালেবু’

লীনা দিলরুবা | 17 Nov , 2018  


কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান-এর লেখা জীবনানন্দ দাশ-এর জীবনীভিত্তিক উপন্যাস একজন কমলালেবু ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘প্রথমা’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর এটি নিয়ে তাৎক্ষণিক একটি রিভিউ লিখেছিলাম। রিভিউটি ফেসবুকে প্রকাশ করি। এর পর বইটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে থাকি এবং লক্ষ করি, এতে গুরুতর সব তথ্যগত ত্রুটি রয়েছে। এসব ত্রুটি নিয়ে তখন ফেসবুকে পর পর বেশ কয়েকটি পোস্ট দিয়েছিলাম। লেখকের ফেসবুক একাউন্টে গিয়ে ত্রুটিগুলো নিয়ে মন্তব্য করি এবং আমার লেখা পোস্টগুলোতে লেখককে ট্যাগ করি। কিন্তু বইটির প্রকাশ-পরবর্তী সময়কালের কোনো লেখায় বা সাক্ষাৎকারে তিনি আমার সমালোচনার পয়েন্টগুলো নিয়ে কোনো স্বীকারোক্তি দেননি, বরং এই বইটি যে তাঁর স্বপ্নের একটি প্রয়াস সেটিই প্রকাশ এবং প্রচার করতে থাকেন। তখন বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছিল, আমি ক্রমাগত বইটির ত্রুটি ধরে কথা বলছিলাম আর তাঁর ভক্তকুল আমাকে শাহাদুজ্জামান হেটার হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, প্রশ্রয়টা তারা লেখকের পক্ষ থেকেই পাচ্ছিলেন কারণ লেখক এসব ত্রুটি স্বীকার করে নিতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, বরং তিনি তখন মনোযোগ দিয়েছিলেন ত্রুটিপূর্ণ বইটির একের পর এক মুদ্রণ প্রকাশের খবর প্রচারের দিকে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ‘প্রথমা প্রকাশনী’ থেকে একজন কমলালেবুর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি বইটি সংগ্রহ করে লক্ষ করলাম, বইটির প্রথম সংস্করণের যে ত্রুটিগুলি নিয়ে আমি কথা বলেছিলাম, শাহাদুজ্জামান বই এর সেই জায়গাগুলোর কয়েকটি নতুন করে লিখেছেন অর্থাৎ, একটি পরিমার্জিত রূপে একজন কমলালেবু পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি আবিষ্কার করার পর আমার মধ্যে যে প্রতিক্রিয়াটি হলো তা হল- আমি একজন কমলালেবু উপন্যাসের যে ত্রুটিগুলো নিয়ে কথা বলেছিলাম সেটি ঠিক ছিল, কারণ লেখক তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং বই এর তথ্যভ্রান্তি দূর করেছেন। একইসঙ্গে খারাপ লাগলো এটি দেখে, লেখক দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা বা ফ্ল্যাপে বইতে যে তিনি পুরোনো সংস্করণের কিছু তথ্য সংযোজন-বিয়োজন করেছেন সে সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা দেননি।

এবার দেখা যাক একজন কমলালেবুর কোন কোন ত্রুটির কথা আমি বলেছিলাম।

এক.
“সঞ্জয় চেয়ার টেনে জীবনানন্দের সামনে এসে বসলেন এবং তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন জীবনানন্দ বাবু, এখন যারা কবিতা লিখছে এরা কেউ কবি নয়। কবি একমাত্র আপনি, এটা জেনে রাখবেন। আপনিই আমাদের দেশটাকে, এই সময়টাকে সবচেয়ে ভালো চিনেছেন, ধরেছেন। আপনি রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের সবচেয়ে গ্লোবাল রাইটার। হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট, ডিলান টমাসের সাথে আপনার আত্মীয়তা।’
জীবনানন্দ উসখুস করতে লাগলেন, তারপর বললেন, ‘না মানে, একজন কবির ওপর তার অগ্রজ আর সমসাময়িক কবিদের প্রভাব তো থাকতেই পারে, তাই না?
সঞ্জয় রেগে গেলেন, ‘আমি তো প্রভাবের কথা বলছি না জীবনানন্দ বাবু, বলছি আত্মীয়তার কথা। অন্য কবিদের প্রভাব থাকতে পারে, আপনার আছে আত্মীয়তা, আপনি এদের বংশধর, অন্যরা কেউ না…।”
একজন কমলালেবু/শাহাদুজ্জামান, পৃষ্ঠা-২১১

“একদিন জীবনানন্দ ছিলেন। ঘরে ঢুকেই দেখি জীবনানন্দ চেয়ারে আসীন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁর হলুদ চাদরে ঢাকা জানালার পাশের খাটে। ঘরে রোদ এসে পড়েছে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য আবেগে উত্তপ্ত হয়ে আছেন। তিনি জীবনানন্দর কাছে জীবনানন্দর কবিতা ব্যাখ্যা করছেন। প্রসঙ্গটা: তাঁর কাব্যের সঙ্গে শেলি-কীটস-হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস-রিলকে-এলিয়ট পেরিয়ে ডিলান টমাস পর্যন্ত কবিদের কবিতার আত্মীয়তা।
সাত কথাতে জীবনানন্দের একটি কথা নেই। তিনি শুনতেই ভালবাসেন। তাঁর চোখের কৌতুকাভাসিত একাগ্রতায় তা তিনি বুঝিয়ে দিতে থাকলেন। তো একবার সামান্য উসখুস করে উঠে ক্ষীণ বললেন, একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবান্বিত করতে পারেন?
সঞ্জয় ভট্টাচার্য দারুণ রেগে গেলেন। তাঁর পুরু চশমার আড়ালে তাঁর বড় চোখ দুটি আরও ধক-ধক করে উঠল, মনে হল, দু চোখের সাদা বলয় দুটি এক্ষুনি ছিটকে পড়বে। প্রভাব? প্রভাবের কথা আমি বলেছি কি? আপনি ঠিক ধরেন নি জীবনবাবু। আমি আত্মীয়তার কথা বোঝাতে চেয়েছি। আমি কি এদের আত্মীয়? না। অন্য অনেকেই কি এঁদের আত্মীয়? না। আপনি এঁদের বংশপরস্পরার, এঁরা আপনার, আমি তাই বলতে চাইছি।”

জীবনানন্দের কবিতার ওপর অগ্রজদের প্রভাব নিয়ে সে-দিনের কথাগুলো শাহাদুজ্জামান-এর উপন্যাসে যেভাবে দেখা যায়, বিষয়টি সেরকম ছিল না, সেদিনকার সেই মুহূর্তগুলোর বর্ণনা ভূমেন্দ্র গুহ’র ভাষ্যে দেখা যাচ্ছে, সঞ্জয়ের দাবীর মুখে জীবনানন্দ তাঁর স্বাভাবিক মৃদুভাষ্যে দাবীটা অস্বীকার করে বলছেন, “একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবান্বিত করতে পারেন?”
আলেখ্য : জীবনানন্দ/ভূমেন্দ্র গুহ, পৃষ্ঠা-১৯

জীবনানন্দ কতটা সচেতন কবি ছিলেন সেটি তাঁর কবিতার অনুরাগী পাঠকমাত্রই জানেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন তিনি সঞ্জয়ের কথায় বিভ্রান্ত না-হয়ে নতস্বরে নিজের অবস্থানটি জানিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ শাহাদুজ্জামান জীবনানন্দের মুখ দিয়ে কবুল করিয়ে নিলেন তিনি অগ্রজদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। একটি ‘না’ উত্তরকে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থে রূপান্তরিত করে শাহাদুজ্জামান মূলত কী বোঝাতে চাইলেন?
জানালেন, একজন কমলালেবু উপন্যাসে তিনি মনোযোগ দিয়ে জীবনানন্দের অবয়বটা দাঁড় করান নি। ব্যক্তি জীবনানন্দ যখন তাঁর নিজের কবিতায় অগ্রজদের প্রভাব নিয়ে বলেন, ‘একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবান্বিত করতে পারেন?’
সেখানে শাহাদুজ্জামান লেখেন, ‘না মানে, একজন কবির ওপর তার অগ্রজ আর সমসাময়িক কবিদের প্রভাব তো থাকতেই পারে, তাই না?’
কল্পনা যদি বাস্তবকে আমূল পালটে দেয়, ব্যক্তির আসল ব্যক্তিত্বটাই চাপা পড়ে যায় তখন, কল্পনার সে-দৌরাত্ম্য সহ্য করা যায় না। বিরক্তিকর মনে হয়।

একজন কমলালেবুর নতুন সংস্করণে এই অংশটুকুর যেখানে আমি ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছিলাম সেখানে ঠিক করে দেয়া হয়েছে। অংশটা নীচে হুবহু তুলে দিলাম।

“সঞ্জয় চেয়ার টেনে জীবনানন্দের সামনে এসে বসলেন এবং তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘শুনুন জীবনানন্দ বাবু, এখন যারা কবিতা লিখছে এরা কেউ কবি নয়। কবি একমাত্র আপনি, এটা জেনে রাখবেন। আপনিই আমাদের দেশটাকে, এই সময়টাকে সবচেয়ে ভালো চিনেছেন, ধরেছেন। আপনি রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের সবচেয়ে গ্লোবাল রাইটার। হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট, ডিলান টমাসের সাথে আপনার আত্মীয়তা।’
জীবনানন্দ উসখুস করতে লাগলেন, তারপর বললেন, ‘একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে প্রভাবিত করতে পারেন?’
সঞ্জয় রেগে গেলেন, ‘আমি তো প্রভাবের কথা বলছি না জীবনানন্দ বাবু, বলছি আত্মীয়তার কথা। অন্য কবিদের প্রভাব থাকতে পারে, আপনার আছে আত্মীয়তা, আপনি এদের বংশধর, অন্যরা কেউ না…।”
একজন কমলালেবু/শাহাদুজ্জামান, পৃষ্ঠা-২১১

দুই.

শাহাদুজ্জামান একজন কমলালেবুর পেছনে যে-গ্রন্থপঞ্জির তালিকা দিয়েছিলেন সেখানে কিছু ভুল ছিল।

১২ নম্বর সিরিয়ালের–
“জীবনানন্দ দাশ, প্রভাতকুমার দাশ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি”
প্রভাতকুমার তাঁর নামের ‘দাস’ টাইটেল এভাবে লেখেন, ‘দাশ’ নয়। আর প্রকাশনাটি “পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি” নয়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি।

১৪ নম্বর সিরিয়ালের–
আপনি ক্লিন্টন বি সিলির প্রথমা প্রকাশিত বইটার নাম লিখেছেন: “অনন্য জীবনানন্দ দাশ- ক্লিনটন বি সিলি”, প্রকৃত অর্থে বইটার নাম: “অনন্য জীবনানন্দ- ক্লিন্টন বি সিলি”।

১৬ নম্বর সিরিয়ালের–
জীবনানন্দ: জীবন আর সৃষ্টি: সুব্রত রুদ্রের সম্পাদিত বইটির প্রকাশক “নাথ ব্রাদার্স” নয় “নাথ পাবলিশিং”।

১৭ নম্বর সিরিয়ালের: “জন্মশতবর্ষে জীবনানন্দ” বইটির প্রকাশক আপনি লিখেছেন-“সাহিত্য একাডেমী”: এটা হবে “সাহিত্য অকাদেমি”।
নতুন সংস্করণে ১৬ নম্বর সিরিয়ালের ‘নাথ ব্রাদার্স’ ঠিক করা হয়নি। বাকী সবগুলো ত্রুটি নতুন সংস্করণে ঠিক করা হয়েছে।


তিন.
জীবনানন্দের কবিতার ‘বনলতা সেন’ নিয়ে একজন কমলালেবু গ্রন্থে শাহাদুজ্জামান আকবর আলি খানের লেখার সূত্র ধরে যে তথ্যটি প্রচলিত সেটি লেখেন। অর্থাৎ, বনলতা একজন বারবণিতা ছিলেন। ‘বিডি আর্টস’-এ আমার লেখা ‘বনলতা সেন আসলে কে ছিলেন?’ এ বনলতা সেন নিয়ে লেখক অশোক মিত্রের একটি অনুসন্ধানের খবর লেখার পর শাহাদুজ্জমান তাঁর উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণের অশোক মিত্রের দেয়া তথ্যটি সংযোজন করেন। তথ্যটি ছিল:
‘এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এল; সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, না কি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনও জবাব পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন, সে-সমস্ত খবর বেরোত। হয়তো ১৯৩২ সাল হবে, নয়তো তার পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহি জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহি থেকে নাটোর তো একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাকস্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহোত্তর পর্বে অন্য পদবি ব্যবহার করতেন, তাঁর সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কি না। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে ঢেকে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়। (পৃ:-৫, বনলতা সেন/বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক/অশোক মিত্র)
‘একজন কমলালেবু’র ১২৬ নম্বর পৃষ্ঠাটি লেখক শাহাদুজ্জামান নতুন সংস্করণে নতুন করে লিখেছেন, তাতে ‘বনলতা সেন’কে নিয়ে অশোক মিত্রের দেয়া তথ্যটি জুড়ে দেয়া হয়েছে।

তবে বইটির আরো কিছু ত্রুটি এই নতুন সংস্করণেও রয়ে গেছে। যেমন:

প্রেক্ষাপট: জীবনানন্দ দাশ ১৯২২ সালে ব্রাহ্ম এডুকেশন সোসাইটি-পরিচালিত কলকাতার সিটি কলেজে কনিষ্ঠ শিক্ষকের চাকরি পান। এই চাকরিটি ১৯২৮ সালে চলে যায় একটি বিশেষ কারণে, সেটি ছিল, সরস্বতী পূজা উৎযাপনকে কেন্দ্র করে হিন্দু ছাত্রদের প্রতি কলেজ কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি, যখন পূজা করা যাবে না এই মর্মে কর্তৃপক্ষ অবস্থান নিলে দলে দলে হিন্দু ছাত্র কলেজ ছেড়ে দেয়। কলেজটি আর্থিক সঙ্কটে পড়লে কয়েকজন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়, এর মধ্যে একজন ছিলেন জীবনানন্দ।

এই ঘটনাটি দুটো গ্রন্থে কী-রূপে বর্ণিত হচ্ছে দেখা যাক:

‘ছাঁটাই করা সেই শিক্ষকদের দলে পড়লেন জীবনানন্দও। জীবনানন্দ ছিলেন ওই কলেজের সবচেয়ে জুনিয়র শিক্ষক। উপরন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে খবর ছিল যে ওই গণ্ডগোলের সময় জীবনানন্দ কর্তৃপক্ষের বদলে ছাত্রদের পক্ষ নিয়েছিলেন। ফলে চাকরি ছাঁটাইয়ের তালিকায় যে তাঁর নাম থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক।”
একজন কমলালেবু/শাহাদুজ্জামান/পৃষ্ঠা: ৪০

“দলে দলে হিন্দু ছাত্র সিটি কলেজ ছেড়ে চ’লে গেল; কলেজ আর্থিক সঙ্কটে পড়ল। জীবনানন্দ অন্তত পক্ষে পাঁচ-ছ’ বছরের পুরোনো শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু এক গুচ্ছ নতুন শিক্ষকের সঙ্গে তিনি বরখাস্ত হলেন। তাঁর বরখাস্ত হওয়ার পক্ষে কলেজের আর্থিক সঙ্কটটা একটা ছুতো-মাত্র ছিল; ব্রাহ্ম এডুকেশন সোসাইটির কর্তাব্যক্তিদের কাছে, বিশেষত হেরম্ব মৈত্র’র কাছে, জীবনানন্দ-যে যথেষ্ট ব্রাহ্ম নন তা নিরূপিত হয়েছিল, কারণ তাঁর লেখা বাংলা ভাষা উপযুক্ত পরিমাণে ‘শালীন’ ও ঈশ্বর-অনুগ্রহের কাঙাল ছিল না; ব্রাহ্ম আদর্শানুয়ায়ী শিক্ষা দানের অনুপযুক্ত বিবেচিত হয়েছিলেন তিনি। সিটি কলেজে’এর আর্থিক সঙ্কট কেটেছিল, কেউ-কেউ পুনর্বহাল হয়েছিলেন; প্রতিশ্রুতি দেওয়া থাকলেও জীবনানন্দর জুতোর ঢের সুকতলা ক্ষ’য়ে গেলেও, তিনি চাকরিটা ফিরে পান নি।”
দিনলিপি: উদ্ধার ও বিশ্লেষণ: ভূমেন্দ্র গুহ, সহযোগিতা: গৌতম মিত্র/পৃষ্ঠা: ৫৩

সিটি কলেজের চাকরিটা যখন চলে যায় তখন, ‘একজন কমলালেবু’ অনুযায়ী, “জীবনানন্দ ছিলেন ওই কলেজের সবচেয়ে জুনিয়র শিক্ষক” আর ‘দিনলিপি’ পড়ে আমরা জানছি, “জীবনানন্দ অন্তত পক্ষে পাঁচ-ছ’ বছরের পুরোনো শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু এক গুচ্ছ নতুন শিক্ষকের সঙ্গে তিনি বরখাস্ত হলেন।”

বইতে জীবনানন্দের কবিতাগুলো ত্রুটিপূর্ণভাবে ছাপানো হয়েছে। কবি যেভাবে লিখেছেন, সেভাবে ছাপানো হয়নি। যতিচিহ্ন ব্যবহারে প্রচুর ভুল রয়েছে। এই বিষয়টিও আমি বই প্রকাশের পরই লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখেছিলাম। নতুন সংস্করণে ভুলগুলো সংশোধন করা হয়নি। আশা করি তৃতীয় সংস্করণে এগুলো ঠিক করে দেয়া হবে।


4 Responses

  1. অজিতকুমার রায় says:

    লীনা দিলরুবার অনুসন্ধানী দৃষ্টি প্রশংসার্হ। তবে শাহাদুজ্জামান-এর লেখা জীবনানন্দ দাশ-এর জীবনীভিত্তিক উপাখ্যান ‘কমলালেবু’ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার প্রয়োজন দেখি না। উপন্যাস যাকে বলে এটি তা নয়, অন্যদিকে এটি বিশ্বস্ত জীবনীও নয়। জীবনানন্দ দাশের সামগ্রিক জীবনী লেখার মতো উপযুক্ত প্রস্তুতি হয়তো কারো কারো আছে বা ছিল যেমন ভারতের ভূমেন্দ্র গুহরায়, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার দাস, বাংলাদেশের আবদুল মান্নান সৈয়দ, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বা হরিশংকর জলদাস;- কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ-ই আশার কথা শোনান নি। অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে, নতুন নতুন তথ্য এখনও পাওয়া যাচ্ছে। প্রভাতকুমার দাস কাজ করে যাচ্ছেন, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী করছেন। কিন্তু সমন্বিত করে একটি জীবনী লেখার প্রতিশ্রুতি কোথায়? – অজিতকুমার রায়, ঢাকা।

  2. ভুল করা মানুষের স্বভাবের মধ্যেই নিহিত৷ ভুল করা দোষের নয়৷ কিন্তু ভুল করেছে জানতে পারলে কেউ যদি সেটা স্বীকার না করে, কিংবা ভুল শুধরে নিয়ে যদি সে ভুল দেখিয়ে দেওয়া মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে তাহলে তাকে “আহাম্মক” বলা হয়৷ এই সব আহাম্মক ব্যক্তিতে সমাজ এখন ভরপুর৷
    কিন্তু লীনা দিলরুবা এই যে সঠিক তথ্যগুলি দিয়ে আমাদের সচেতন ক’রে তুললেন এতে সমাজের উপকারই হবে৷ এই কমলালেবুটি যে টক এবং সুস্বাদু হতে গেলে গাছটার জন্য যে এখন অনেক জৈব সার ব্যবহার করতে হবে, সেকথা সকলে জানলেন এবং যাঁরা সত্যি সত্যি ভাল জিনিসটা চান তাঁরা এই বইটিকে বর্জন করবেন৷
    লেখকের দুর্নাম হয়ে গেলে এরপর তাঁর বই প্রকাশকরা ছাপাতে চাইবেন না৷ আর যাঁরা মন্তব্যের কলমে তবুও লীনা দিলরুবার কি করা উচিত ছিল এবং কি করা উচিত হয়নি বলে ধারাভাষ্য দেবেন, তাদের নিরপেক্ষ পাঠকেরা ঠিক চিনে নেবেন৷

  3. Mustaque Mohammad Siddiqui says:

    good

  4. Professor Mahmuda Khatun, University of Dhaka says:

    I have a simple request to make to Dr. Shahaduz Zaman . I would rather request him to read (had it been mistakenly not read) one more book on Jibananda Das which will allow him to go delve into poet’s life for future use. Here is the reference:

    Clinton B. Sealy. 1999. A Poet Apart: A Literary Biography of the Bengali Poet Jibananda Das (1899-1954). Calcutta: Ranidra Bharati University.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.