অনুবাদ, রোজনামচা

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ৪)

hossain_m | 3 Jan , 2009  

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩

genet_book2.jpg ফরাসি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট জঁ জনের মরক্কো বাসের সময় সেদেশের লেখক মোহামেদ চউক্‌রির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জঁ জনে ইন তানজিয়ের (Jean Genet in Tanger, ১৯৯৩) বইটি ডায়েরির আকারে লিখিত চউক্‌রির সে সব দিনের স্মৃতিকথা। এখানে চউক্‌রি জনেকে দেখেছেন অনেক কাছ থেকে।

৮০ পৃষ্ঠার বইটি মোট ৪ কিস্তিতে প্রকাশিত হলো। এটি লেখার শেষ কিস্তি। পল ফ্রেডরিক বৌলস্-এর ইংরেজি থেকে লেখাটি অনুবাদ করা হয়েছে। বি. স.

কিস্তি ৪

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)
paul-bowles4.jpg
১৯৬১ সালে মরক্কোতে পল বৌলস্‌।

২২/১০/৬৯
লাপাসেদের সাথে দেখা করি। জনে তার দুপুরের সিয়েস্তা দিতে চলে গেছে। আমরা মারিয়ার রেস্টুরেন্টে আসি। লাপাসেদ আমাকে বলেন: আমার কাছে মনে হচ্ছে জনে ফুরিয়ে গেছেন। কোথায় অ্যাডভাঞ্চেরার জনে, কোথায় বারসেলোনা, তিউনিশিয়া আর গ্রীসের জনে?

আমারও মনে হয় লাপাসেদ সঠিক। জনে তার অতীতের যৎসামান্যই বলেছে। যখনই আমি তাকে তার কোনো বই নিয়ে কথা তুলেছি, তিনি উত্তর দিয়েছেন: তাই, আমি তো ওটা বছর খানিক আগে লিখেছিলাম। এক দুপুর বেলায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করি: আজ আপনাকে তেমন ভাল দেখাচ্ছে না। তিনি আমার দিকে মরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলেন: তুমি ঠিকই ধরেছো। আজ আমি খুবই বিষণ্ন।

পরে ফ্রান্স বারে বসে জনে আমাকে ফিসফিস করে জানতে যায় ওয়াকরিম, যে আমাদের সাথেই টেবিলে বসে ছিল তাকে উদ্দেশ্য করে, সে আমার কাছে কোনো প্রাপ্তি আশা করে কি?

আমি প্রশ্নটা ওয়াকরিমের কাছেই উত্থাপন করি।

না, মঁসিয়ে জনে, সে বলে। তারপর সে আরবিতে চালিয়ে যায়। আমরা বন্ধুমানুষ। কিন্তু আপনি হয়তো আমাকে অন্যভাবে সাহায্য করতে পারেন। এমন কিছু যার প্রতি আমার আগ্রহ আছে।

portraits-of-famous-people.jpg
পিটার অরলোভস্কি, উইলিয়াম বারোজ, অ্যালেন গিনসবার্গ, অ্যালান আনসেন, গ্রেগরি করসো, পল বৌলস, আয়ান সামারভিল। ১৯৬১ তে বিখ্যাত সব লেখক জড়ো হয়েছিলেন তানজিয়েরে।

জনে তাকে বলে তোমাকে আমি যে কোনো উপায়ে সাহায্য করতে তৈরি আছি।

আমি যা চাই, ওয়াকরিম বলে, তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কারুর কাছে লেখা একটা পত্র যে কি না আমাকে সেখানকার কোনো নাচের স্কুলে ঢুকিয়ে দিতে পারবে।

জনে জানায় সে তাকে একটা পত্র লিখে দিবে। আমরা মিনযাহ পর্যন্ত হেঁটে আসি এবং একটা সেলুনে বসলে জনে উপরে তার রুমে ঠিকানার বইখানি খুঁজতে চলে যান। ওয়াকরিম বলে জনের পরিচয় দিয়ে লেখা যে কোনো পত্রের দাম মিলিয়ন ফ্র্যাঙ্ক।

আমি স্বীকার করি যে টাকা নেয়া মানেই বন্ধুত্বে চির ধরা। জনে ফিরে এসে বসে দুটো চিঠি লেখেন, একটা বারনি রোসেট এবং অন্যটা রিচার্ড সিভার-এর কাছে, দু’জনাই নিউইয়র্কের গ্রৌভ প্রেসের লোক। আমার পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না একটা চিঠিতে লেখা লাইন যার ফ্রেইজ টা এরকম: Et puis, j’aime tellement les dollars americains! (অতঃপর, আমেরিকান ডলার আমি সবচে’ বেশি পছন্দ করি!)

২৩/১০/৬৯
মোহাম্মেদ যেরার্ড আজ তার পাসপোর্ট পেয়েছে। লারবি ইয়াকুবী এই ব্যাপারটাকে উদযাপন করার লক্ষে একটা ন্যওয়া (Gnoua) পার্টির এন্তেজাম করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। যা শুরু হয় আটটার দিকে। মরোক্কীয়, মুসলমান এবং ইহুদী দুপক্ষই থাকে। থাকে ফরাসী, ইংরাজ এবং আমেরিকানরা। ন্যওয়ার যে চীফ, কয়লার মত দেখতে যে কালো, জনের সাথে আসরের প্রথম পর্বে বেশ বন্ধু আচরণ করে। অবশ্যই মিউজিক হচ্ছে সুদানি এবং নাচ হচ্ছে সাধারণ আবেগপ্রসুত।

আমার পাশে যে ছেলেটা বসে ছিল সে মাঝেমধ্যে ঝাপিয়ে পড়ে উন্মত্ত নাচে অংশগ্রহণ করে। সময়ে সময়ে সে গানের টেক্সটের ভাঙা ভাঙা অংশ বামবাড়া থেকে মাগরেবীতে অনুবাদ করে। আমি আবার অনুবাদ করে জনেকে শুনাই।

জনে জানতে চান চীফের বয়স কতো। বুড়ো লোকটা তাকে এসে বলে: ঠিক বলতে পারবো না, তবে দ্বিতীয় কায়সান উইলহেম ১৯০৫-এ তানজিয়ার আসে তখন কেবল আমি হাঁটতে শুরু করেছি।

জনে আমার দিকে ফিরে বলেন: লোকটা হ্যান্ডসাম তাই না, খুবই হ্যান্ডসাম। দেখ! সে কিফ সেবন করছে যেন
বিশ বছরের যুবক!

গর্বাদের মধ্যে একজন ফটোগ্রাফার উঠে একটার পর একটা ছবি তুলতে শুরু করে। আমি লক্ষ্য করলাম জনে ন্যওয়া শিল্পীদের মধ্যে ছবি উঠাতে পেরে বেশ পুলকিত কিন্তু কোনো ইউরোপিয়ানের সাথে কথা চলাকালে সেই ছবি তুললে বেশ বিরক্ত হচ্ছিলেন। এই প্রথম তার আচরণে আমি টাসকি খাই। আমার মনে হয় ব্যাপারটা দেখানো এবং মেনে নেই এই বলে যে এটাই তো তার ব্যক্তিত্ব।

লাপাসেদ একনাগারে কিফ সেবন করে চলেন, এবং মাঝে মাঝে সুদানীয় তালের সাথে মাথা নাড়েন। প্রায় রাত সাড়ে দুটো পর্যন্ত পার্টি চলে। লক্ষ্য করি জনে ইউরোপিয়ানদের উপস্থিতি অসহ্য মনে করছেন। তাকে বারবার জায়গা বদলাতে দেখি।

artist-colony-at-asilah.jpg
মরক্কোর আশিলা‌য় আর্টিস্ট কলোনি। পল বৌলস্‌, ট্রুমান কাপোটে, টেনেসি উইলিয়ামসরা একটা সময় এখানে থাকতেন।

যখন আমার ফিরে আসি, তিনি একগাদা ব্যাংকনোট বের করে চীফের হাতে ঠেঁসে দেন। (মিউজিসিয়ানদের আগেই পয়সা দেয়া হয়েছিল)। জনে যখন চীফকে টাকা প্রদান করেন তখন তাদের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য চাওয়াচাওয়ি হয়। কালো লোকটাকে তিনি বলেন — শান্তি বর্ষিত হোক আপনার উপর, লোকটিও একই ভাবে হেসে প্রতিউত্তর করেন।
রাস্তায় নেমে জনে বলেন — চমৎকার লোকজন ওই ন্যওয়ারা, তাই না?

জ্বি। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমি ন্যওয়া পার্টি পছন্দ করি না।

কিন্তু কেন না?

তারা প্রিমিটিভ। প্রিমিটিভ যা কিছুই আমি ঘেন্না করি।

তাহলে তুমি কোন ধরনের মিউজিক পছন্দ করো?

ওহ্, মোৎসার্ট, বিটোভেন, চাইকোভস্কি, বারলিয়োজ এদেরকে আর কি।

আমার তো মনে হচ্ছে তুমি ওয়েস্টার্নাইজড হয়ে গেছো।

হতে পারে।

বেশ, আমি তার তুলনায় আজ যে ন্যওয়া শুনলাম ওটাকেই পছন্দ করি। আমি নিজেকে ওদের মতই মনে করি। ওরা অসাধারণ।

লাপাসেদ আমাকে পেয়ে বসে। তুমি স্রেফ তাদের মূল্যটা অনুধাবন করতে পারছো না।

জনে লাপাসেদকে উদ্দেশ্য করে বলেন: ওকে একা থাকতে দাও। সে কি পছন্দ করবে এ ব্যাপারে সে স্বাধীন।

আমরা যখন হোটেল মিনজা’র কাছে চলে আসি, লাপাসেদ আমকে বলে: আমি জোকে চিকোর দিকে যাচ্ছি, তুমি কি আমাদের সাথে চা খেতে যাবে?

না, একটু রাগের স্বরেই বলি। না ধন্যবাদ। আমি শুতে যেতে চাই।

আমি জনেকে শুভরাত্রি জানিয়ে আমার পথে রওনা হই।

২৫/১০/৬৯
এসপানা এভিন্যূতে আমি আর জনে নিজেদের মধ্যে ফেয়ারওয়েল জানাই। তার সঙ্গে ছিল লাপাসেদ আর একদল ফরাসী শিক্ষক যারা হলিডে কাটাতে এসেছেন রাবাত থেকে। জনে এবং তার বন্ধু মোহাম্মেদ জেরার্ড স্পেন হয়ে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন।

আমি তাকে বলি ন্যওয়া পার্টিতে তোলা বেশ কিছু ছবি আমি তার হোটেলে রেখে এসেছি। সে জানায় ছবিগুলো তাকে দেয়া হয় নি। কিন্তু সে আমাকে এর জন্যে ধন্যবাদ জানায়। আমি আমার মতো চলে আসি।

২/১১/৭০
জোকে ফুয়েরাতে আসি মোহাম্মেদ জেরার্ড-এর সাক্ষাতে। আমারা কোনো আলাপের আগেই দু’জনা দু’জনাকে দেখে হাসিতে ফেটে পড়ি। সে বেশ স্ফূর্তিতেই আছে দেখা যায়। আমি জানতে চাই জনে কোথায়। সে জানায় যে সে জানে না, কারণ সে মাস কয়েক ধরে জিব্রাল্টায় কাজ করছে।

আমি তার কাছে জানতে চাই স্পেন হয়ে যাওয়া তাদের ট্রিপ স¤পর্কে। সে বলে বিমানবন্দরে পত্রিকার একদল লোক, সাথে ফটোগ্রাফাররা আসেন যাদের অনেককেই জনে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, এবং তাদের সাথে ঠাট্টা মস্করাও করেন পুরোনো ইয়ারদোস্তির মত। তারপর তারা জনেকে প্রশ্ন করেন এবং উত্তর লিখে নেন। আমি জানতে চাই তাকেও কেউ কোনো প্রশ্ন করেছিল কিনা। সে জানায় তাকেও প্রশ্ন করা হয়েছিল, কিন্তু সে যেহেতু কার্যত কোনো স্প্যানিশ ভাষা জানে না তাই স্রেফ বলেছে যে সে তার বন্ধুমানুষ। তারপরে তাদের কোনো একজনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা মহা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে যতদিন তারা মাদ্রিদে থাকে। কিন্তু তারা যখন প্যারিসে আসে তখন কেউই তাদের কোনো পাত্তাই রাখে না, এটা তাকে অবাক করেছে। তারপর তারা একটা বিরাট বিল্ডিং-এ আসে যার পুরোটাই বইপুস্তকে ঠাঁসা এবং জনে তাকে বলেন: এখানেই তিনি বাস করেন।

জনে ডেস্কে বসে থাকা লোকজনদের সাথে জেরার্ডকে পরিচয় করে দেন। তারপর একটা মেয়েকে ডেকে বলেন তার এই মরোক্কীয় বন্ধুটিকে গাড়িতে করে শহরটা ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে নাকি। প্যারিস খুবই সুন্দর শহর জেরার্ড বলে, কিšত্ত সেখানে হারিয়ে যাওয়াটাও খুবই সহজ। ঘণ্টাখানেক ধরে আমি মেয়েটার সুন্দর গাড়িতে করে শহরটা ঘুরে বেড়াই — জেরার্ড জানায় — গাড়িটা যেন একটা কবুতর, এবং মেয়েটাও আরেকটা কবুতরের মত। একটা কবুতর যেন চালাচ্ছে আরেক কবুতর!

আমি জানতে চাই তারা কীভাবে তাদের মধ্যে যোগাযোগ করেছে।

স্রেফ হাসি দিয়ে। আর মাঝে মধ্যে সংকেতে। মেয়েটা খুব উচ্চশিক্ষিত। এরকম মেয়ের সাথে তোমার কথা বলতে হয় না। সে যখন বইয়ের বাড়িতে ফিরে আসে জনে তাকে ছোট্ট একটা হোটেলে নিয়ে একটা রুম ভাড়া করে দেন।

মনে হয় এরপরে জনে একজন ফরাসী ছাত্রের সাথে জেরার্ডকে পরিচয় করে দেন, যে ছাত্রটির লেখপড়ার খরচ জনে চালান। তারা দু’জনাই একসাথে বাইরে যেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে; বিশেষ করে জনে যখন ব্যস্ততার কারণে তাদের দু’জনার কারুর সাথেই দেখা করতে পারেন না। ছাত্রটি জেরার্ড যে হোটেলে উঠেছে সেই হোটেলেই থাকে।

একদিন জনে এসে জেরার্ডকে কিছু টাকা দিয়ে বলেন তিনি এখান থেকে মেলা দূরে একটা জায়গায় তার নাটকের প্রোডাকশন দেখতে যাচ্ছেন। কিন্তু যেই না জনে চলে যান অমনি সেই ছাত্রটি তার রুমে এসে উঠে পড়ে। জেরার্ড তাকে বুঝাতে চেষ্টা করে যে একটা মাত্র বেড, কিন্তু ছেলেটা তাকে বুঝিয়েই চলে এটা অনেক শস্তা হবে।

ছাত্রটা জেরার্ডকে প্যারিসে যেখানে যায় সেখানেই নিয়ে যায়। জেরার্ড বলে আমি সবসময় মহা ভয়ে ভয়ে থাকতাম কখন না আমরা আলাদা হয়ে যাই। শহরের বিশালতা আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতো। সে জানায় তরুণ ফরাসী প্রথম তিন দিন বেশ ভালই ছিল, তারপর হঠাৎ করে সে পাল্টে যায়। ছাত্রটি দোকনে দোকানে যেতে শুরু করে এবং জিনিসপত্র কিনতে থাকে আর জেরার্ডকে সেটা পরিশোধ করতে হয়।

hotel-continental.jpg
তানজিয়েরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, এখন।

জেরার্ড বলে তার পকেট থেকে টাকা হাওয়া হয়ে যেতে থাকে! কিন্তু সে তো আর জনে না। যে কিনা যে কোনো জায়গার থেকে টাকা নিতে পারে। আমি ধান্দায় থাকি যেটুকু আমি বাঁচাতে পারি তা নিয়ে সটকে পড়ার। আমি রাস্তায় বেড়িয়েই হারিয়ে যেতে থাকি আর টাকার জন্যে হাত পাততে থাকি। ফলে আমি তানজিয়ের ফিরে আমার বউকে যে কয়টা টাকা হাতে জমা ছিল সেটা দিয়ে তারপর জিব্রাল্টায় চলে আসি এবং প্রথম সপ্তাহে কাজ পেয়ে যাই।

আমি বলি ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর। তারপর আমি জিজ্ঞেস করি জনে সম্পর্কে সে কী ভাবে।

সে খুবই ভাল মানুষ, কিন্তু আমি তাকে বুঝতে পারি না — জেরার্ড বলে। যাই হোক সে আমার জন্যে অনেক করেছে আমি যা ভুলতে পারবো না। সে যদি না থাকতো তাহলে হয়তো এখনো আমাকে এখানে দিনে পাঁচ বা ছয় দিরহাম কামাতে হতো। তাও যদি আমার কাজ থাকতো তা হলে। সেটাও তুমি বলতে পারো না।

(শেষ)

hossian_mofazzal@ymail.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.