কবিতা

তুষার গায়েন: স্পর্শের সান্ধ্যরেখা, নারীঝড় ও অন্যান্য

tusar_gayen | 16 Nov , 2018  


স্পর্শের সান্ধ্যরেখা

নরোম কবোষ্ণ রেখা দেখে জনান্তিকে জ্বলে ওঠে পুরুষের চোখ!
আগুন ছড়িয়ে পড়ে অবরুদ্ধ দেহকোষে তার ─
টান টান ধনুকের ছিলা ─ কেমন সৃষ্টির লীলা এই নারীদেহ
সমান্তরাল স্রোতকে দেখে উত্থিত গর্জন রাখে চেপে ─
রাখাটাই রীতি পুরুষের; বহুকাল সভ্যতার পথে হেঁটে যদি না আগুন
নিয়ন্ত্রিত করতলে তার, তবে সে কেমন পুরুষ যে ভেঙে পড়ে দেখে
কমনীয় বৃত্তচাপ, ফলবৃন্তের নিঃশ্বাস ─
কীভাবে স্বতন্ত্র হয় নারী যার হতে আগমন পুরুষের
এই দেহনৌকা নিয়ে দেবে সেই স্রোতস্বিনী পাড়ি ─
এতটা নিকটে থেকে এতটা ভঙ্গুর, সহসাই কীভাবে শ্বাপদ হয়ে যায়
সেই জিজ্ঞাসায় অনন্তর বিস্মিত, বিক্ষুব্ধ নারী !
তবে কী পুরুষ নয় এখনো মানুষ, বিবর্তনের প্রদোষ রেখা ধরে
এখনো অনেক বাকী তার হয়ে উঠবার ─ গোঙায় যে ধর্ষিতা নারী

জাপ্টে ধরার মূহুর্ত আগে জানে নাই কীভাবে অচেনা হয়ে যায়
বহুকাল-দৃষ্ট প্রিয় পুরুষের মুখ, ধ্বস্তাধস্তি, এত অনুনয় যায় বৃথা
ঘাড়ের উপর ঘন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ─ নখের আঁচড়ে কাটে
ত্বকের উপর গাঢ় রক্তদাগ, দাঁতে ছিন্নভিন্ন উত্তলাবতল পরিসর
সব প্রতিরোধ চুরমার করে দেহের ভিতরে শ্বাপদ-দেহের অভিঘাত !

না, না, না, না আকাশে গোঙানি কান্না ─ স্তব্ধ চরাচর মোচড়ানো ব্যথায় ;
স্খলনের পর অবসাদে উঠে আসা পুরুষের গ্লানি ও আত্মধিক্কার ─
কীভাবে সম্বিৎ হারাল সে আলকাতরায় জেগে ওঠা বিস্মৃত সত্তার
কখন পেরিয়ে যায় দেহ তার মানব সীমানা জ্যান্তব ক্ষুধায়
তবু সে পশুর মতো প্রাকৃতিক নয় ─ যে সাড়া বাঘ ও বাঘিনী
পরস্পর পেয়ে থাকে বিরোধবিহীন … প্রেম ও বলাৎকারের মাঝে

এক সান্ধ্যরেখা আছে যে পথে পশুরা হাঁটে নিরাপদ।

নারীঝড়

উপকূলে আছড়ে পড়ে ঝড়, বহুকাল ধরে গোঙানি লজ্জার
চাপাপড়া ক্ষুব্ধস্বর সজোরে উপড়ে আনে সম্মানিত দীর্ঘ বৃক্ষের প্রতাপ !
“আমিও পড়েছিলাম তার কামনার কলে” ব’লে এক মেয়ে তীর ছুঁড়ে দেয়
বাণিজ্য-সফল এক পুরুষের দিকে ─ তাতেই ঘুলিয়ে ওঠে বিশ্ব-চরাচর
যতটা হালকা হয়ে যায় মেয়েটি বলার পর, তত দ্রুত বাড়ে হৃৎকম্পন
সিংহ-পুরুষের যার অরণ্যে অবাধ অধিকার।

শব্দ ব্রহ্ম আদি সৃজনের চরাচরে, প্রকৃতি ও পুরুষের মিলন সম্ভোগে
সাঙ্গীতিক ভারসাম্য মেনে কথামালা মৃদু-মধুর গর্জনে যেভাবে আবেশে
চক্ষু মুদে দেয় ─ অন্যথায় ছন্দভঙ্গ পুরুষের রতিশব্দাদেশে, অপমানে
নারীর রক্তিম মুখ বহু শতাব্দীর নির্জনতা ভেঙে বলে, “আমিও পড়েছিলাম
তার কামনার কলে !”

আর তাতে ভেঙে পড়ে সব কল, প্রোথিত মাটির নিচে ভিত্তি বহুতল
ভবনের, গর্বিত শিশ্নের চূড়া আকাশ সীমায়। এখনও কান পেতে
শোনা যায় আদি ব্রহ্মনাদ ভারসাম্যের দোলায় আর তাকে ভেদ করে
কখনো কখনো ছন্দভঙ্গ পুরুষের রতিশব্দাদেশ, নারীর চিৎকার।

সম্ভাবনা তরঙ্গময়

সুপ্ত হয়ে আছে সেই সম্ভাবনা অগ্নিময় তরঙ্গের মতো
দপ করে জ্বলে ওঠে চোখ নির্ণিমেষ চোখের আভায়
তারপর ম্লান ছায়া ঘনায় শ্রাবণ মেঘ, মনপবনের চেয়ে
ছুটে যায় দ্রুত ভূগোল-সময়, কণ্ঠরোধ ক’রে আসা ধ্বনিগুলো
ফুল হতে চেয়ে ঝরে পড়ে শুকনো পাতায়, আসা-যাওয়া
চলন্ত সিঁড়ির ধাপে, অনন্তর মেট্রো রেলের গুহায়
দ্রুতগামী ট্রেন এসে তুলে নেয় গিজগিজ মানুষের দল ─
সাবান ফেনার স্পর্শে নিমিষেই মুছে যাওয়া বহুবর্ণ দাগ …

ট্রেনের প্রস্থান শেষে হুইসেল ─ এসে যায় আরেকটি ট্রেন,
সম্ভাবনাগুলো বেজে ওঠে হাওয়ায়, হাওয়ায়
তরঙ্গ কী পাবে ডানা বাক-বাকুম পায়রার, জানে সেই
চেতনার পরিসরে বেঁকে যাওয়া ভূগোল-সময়।

ইতিপূর্বে আর্টস বিভাগে প্রকাশিত তুষার গায়েনের অন্যান্য লেখা:

জঙ্গীদেশে সরস্বতী
যে কান্না কংক্রিট ভেদ করে যায়
যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়: কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্মরণ
তুষার গায়েনের দুটি কবিতা
কবিতাগুচ্ছ
তুষার গায়েনের কবিতা: তরঙ্গ

Flag Counter


4 Responses

  1. মানিক বৈরাগী says:

    me too
    আন্দোলনকে লিখা কবিতা
    সময়ের দর্পনে মুখোশ মানুষের প্রতিফলন।

  2. আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ says:

    ভালো লাগলো কবিতাগুলো। পাওয়া গেলো তুষারিয় নিমগ্ন দ্রোহী কন্ঠ ও কবিতার মায়াজাল। ট্যাগ করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ কবিকে।

  3. ফেরদৌস নাহার says:

    তিনটি কবিতাই সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক।
    মানবতাবোধ ও নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে কলম তুলেছেন একজন প্রকৃত কবি,
    সেজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই কবি তুষার গায়েনকে।

  4. তুষার গায়েন says:

    আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানবেন কবিত্রয়ী — ফেরদৌস নাহার, আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ এবং মানিক বৈরাগী। আপনাদের পাঠ প্রতিক্রিয়ার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.