প্রবন্ধ

বাংলাদেশে বিহারি ডায়াসপোরা সাহিত্য

মোজাফ্ফর হোসেন | 14 Nov , 2018  


ডায়াসপোরা কি?
ডায়াসপোরা শব্দটি গ্রিক। dia মানে দূরে, ‘speirein’ অর্থ ছড়িয়ে পড়া। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ফসলের বীজ ছড়িয়ে পড়া হলেও শব্দটির অন্য ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ শতাব্দীর দিকে। ইসরাইল থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঐ সময় আলেক্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিতরা হিব্রু বাইবেল বা ‘তোরাহ’র প্রথম ৫টি বই গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করেন। এই অনুবাদে গৃহহীন ইহুদিদের জন্য ক্রিয়াপদ ‘diaspeirein’ এবং বিশেষ্যপদ ‘diasporá’-এর ব্যবহার করা হয়। এই শব্দ দ্বারা ইহুদিদের জন্মভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভেতর যে আধ্যাত্মিক এবং মানসিক কষ্ট তৈরি হয়, সেটা প্রকাশিত হয়। উনবিংশ শতকে এসে, বিশেষ করে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ থেকে নানা-কারণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের বোঝাতে ডায়াসপোরা শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। এখন সম্প্রসারিত অর্থে, কেবল বহিষ্কৃতরা না, জীবিকার জন্য স্বেচ্ছায় দেশান্তরী হয়ে বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়েছেন এমন লোকদেরও ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ভিনয় লাল বহিষ্কৃতদের বলছেন ‘diaspora of labour’ এবং স্বেচ্ছায় দেশত্যাগীদের বলছেন ‘diaspora of longing’।

বাংলাদেশে বিহারি/উর্দু ডায়াসপোরা সাহিত্য
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর ভেতর অভ্যন্তরীণ ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। ভারত থেকে হাজার হাজার মুসলমান ভিটেমাটি ছেড়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আসে। অনুরূপভাবে এই অঞ্চলের হাজার হাজার হিন্দু ভারতে গেছে। অনেকে চলে গেছে ইউরোপ-আমেরিকাতে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও দেশভাগের সূত্র ধরে ভারতের বিহার প্রদেশসহ উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও কলকাতা থেকে যে সকল অবাঙালি বাংলাদেশে এসেছে তারা এখানে বিহারি হিসেবে চিহ্নিত। ষাটের দশকের শেষাংশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে পূর্ব পাকিস্তানে ২০ লক্ষ উর্দুভাষী আসেন। তারা আসেন আজকের বাংলাদেশে নয়, অবিভক্ত পাকিস্তানে। তারা পাকিস্তানের নাগরিক হতে চেয়েছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বিহারি বাঙালি নিধন ও নির্যাতনে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গ দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও তাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশ-বিরোধিতা যায় নি। পাকিস্তান তাদের গ্রহণ করেনি বলে বাধ্য হয়ে এখানে থেকে গেছে। শরীরটা এখানে থাকলেও মনটা পড়ে আছে পাকিস্তানে। বাংলাদেশি বিহারিরা পিতৃমাতৃভূমি বিহার বা ভারত ছেড়ে আসার জন্য অনুশোচনা ও নস্টালজিয়ায় ভোগেনি, তারা তারা পাকিস্তানের জন্য হাহাকার করেছে যে রাষ্ট্রটি কখনোই তাদের ছিল না। ফলে অন্যান্য ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর চেয়ে তাদের অবস্থান হয়ে উঠেছে আরও জটিল। তাদের জন্মভূমি বা পিতৃমাতৃভূমি ভারত এখন ভিনদেশ। ওখানে তাদের অতীত পড়ে আছে, যে অতীতকে তারা আর স্বীকার করে না। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পড়ে আছে পাকিস্তানে, যে পাকিস্তান তাদের গ্রহণ করেনি। বর্তমান আবাস-দেশ বাংলাদেশকে নিজের করে নিতে না পারার কারণ তাদের সামনে রয়ে গেছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বায়বীয় অস্তিত্ব। বাঙালিরাও যে বিহারিদের আপন করে নিতে পারেনি এর কারণ, পূর্বেই বলেছি, বিহারিরা তাদের আদিভূমি ভারত ছেড়ে এসেছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হতে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তাদের স্বপ্নভূমি হিসেবে সেই পাকিস্তান এখনো রয়ে গেছে। সৈয়দপুর শহরে হাতিখানা ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘ভারতে দাঙ্গা শুরু হলে আমরা এপারে চলে আসি। আমরা ছিলাম মুসলমান, উর্দু আমাদের ভাষা। পাকিস্তানকে নিজের দেশ মনে করে চলে আসি এইখানে। আমরা সব সময় পাকিস্তানেই যেতে চেয়েছি।’ [উর্দুভাষীরা কেন বাংলাদেশের মূল সমাজে মিশতে পারেনি?, ফারহানা পারভিন, বিবিসি বাংলা] বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটা বিহারি ক্যাম্পে পাকিস্তানি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জনপ্রিয়। ক্রিকেটে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মুখোমুখি হলে এসব ক্যাম্পে পতাকা ওড়ে পাকিস্তানের। অন্যান্য সময়ও পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখা যায়। পাকিস্তানের নামে বিভিন্ন সংগঠনও আছে।

ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ভেতর পিতৃমাতৃভূমির টান আমরা সবখানেই লক্ষ্য করি। যে কারণে ভিএস নাইপল ত্রিনিনাদে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও তার সাহিত্যের কেন্দ্রে কখনোই ত্রিনিদাদ নয়, ভারত, আরেকটি পরিস্কার করে বললে ট্রিনিদাদে যে ভারতীয়রা বাস করে তারা। ব্রিটিশ-জাপানি নোবেলজয়ী লেখক ইশিগুরো শিশুবয়সে জাপান ছেড়েছেন, জাপানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রক্ষা করেননি, কিন্তু তার উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছেন সেই জাপানকেই। একই কাজ করেছেন ঝুম্পা লাহিড়ি, ভারতী মুখার্জী, এমি তান, রোহিন্তন মিস্ত্রির মতো ডায়াসপোরা লেখকরা। কিন্তু বিহারি-বাংলাদেশিদের সাথে তাদের পার্থক্য হলো, বিহারি বাংলাদেশি উর্দুভাষী লেখকরা তাদের মতো হোস্টল্যান্ডের ভাষায় অর্থাৎ বিহারিদের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় লিখছেন না। তার চেয়ে বড় পার্থক্য হলো তাদের সাহিত্যের কেন্দ্রে বিহার বা ভারত নয়– কারও কারও কেন্দ্রে বাংলাদেশ, কারও কারও কেন্দ্রে পাকিস্তান, কারও কোনো কেন্দ্র নেই অর্থাৎ আত্মপরিচয়ের জায়গাটা এখনো চিহ্নিত করতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হলো যে সকল প্রগতিশীল বিহারি বাংলাদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকেই বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে ছিলেন। বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলেছেন। মোটকথা বাংলাদেশি হিসেবেই নিজের আত্মপরিচয় নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন, তারাও কি সম্পূর্ণ বিদ্বেষমুক্ত হতে পেরেছেন? ‘সন্দেহ’র আসন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছেন? একটা দগদগে ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে যে সমস্টিক চেতনা গড়ে উঠেঠে তার শিকার যে তাদের কাউকে কাউকে হতে হয়নি সেটা বলা যাবে না। বিহারি পরিচয়টা একটা একটা মোটা ফ্রেমে বন্দি হওয়ার কারণে আজ বাংলাদেশি-ব্রিটিশ বা বাংলাদেশি-কানাডীয় অথবা বাংলাদেশি-আমেরিকান হাইফেনেটেড পরিচয়টা যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেভাবে বিহারি-বাংলাদেশি বা বিহারি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি পরিচয়টা মর্যাদার সাথে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়নি। এর আরও একটা কারণ ভাষা। উর্দু ছিল তৎতকালীন পূর্বপাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ভাষা। এই ভাষাকে বাঙালির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের প্রাণও দিতে হয়েছে। ফলে পাকিস্তান বিরোধিতার সঙ্গে সঙ্গে অলিখিতভাবে যেন উর্দুভাষাবিরোধী চেতনাও কাজ করে। অথচ পরিস্কারভাবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইটি উর্দুভাষাবিরোধী আন্দোলন ছিল না। উর্দু পাকিস্তানের মেজোরিটির ভাষা নয়, যেভাবে বাংলা বাংলাদেশের ভাষা। আমাদের ভাষা আন্দোলন যে কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তাদের মাতৃভাষাকে ভালোবাসার চেতনাকে সম্মান জানায়। ফলে বাংলাদেশে বিহারিরা তাদের মাতৃভাষা হিসেবে উর্দুভাষায় কথা বলবে, সাহিত্যচর্চা করবে এটা আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনাবিরোধী বিষয় নয়। ফলে শামীম জামানভী যখন তার কবিতায় লেখেন:
Take all my possessions, but don’t take away my language.
My language is the legacy of my culture.
My language is my heritage.
My language is for my people
It’s identity.
[ইংরেজিতে অনুবাদ : ফরহাত বিভিজি]
তখন আমরা তার এই অধিকারবোধকে অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু এই নাগরিক বোধ দিয়ে পুরো জাতি পরিচালিত নয়। ফলে উর্দুভাষী কবিরা, তাদের অনেকেই এখন চেতনা ও পরিচয়ে বাংলাদেশি হলেও বাংলাদেশের মূলস্রোতে মিশতে পারেননি। ইংরেজি ভাষায় লিখে যেভাবে সম্মানের সাথে বাংলাদেশি লেখক হওয়া যায়, উর্দুভাষায় লিখে সেভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই ধরনের ভাষিক সংকটের ভেতর দিয়ে বিশ্বে আর কোনো ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীকে যেতে হয়নি। এই অবস্থায় একটা সংকটের জবাব দিতে পারেন বাংলাদেশি উর্দুভাষার লেখকরা। তারা বলে থাকেন উর্দু-সাহিত্য। অর্থাৎ তাদের সৃষ্টিকর্মকে কি তারা উর্দুসাহিত্যের সম্পদ বলে মন করছেন? উর্দুভাষায় এখানে একসময় সাহিত্যচর্চা হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে যেহেতু কোনো উর্দু সাহিত্যের ঐতিহ্য নেই, ফলে সেটা মোটাদাগে পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্যের অংশ হয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ উর্দু পাকিস্তান নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ভাষা। দ্বিতীয় কারণ বাংলাদেশি উর্দু লেখকদের অনেক লেখা পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ফলে রাজনৈতিক কারণে এই লেখকেরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সংস্কৃতিগত ভাবধারাকে তাদের গল্প-কবিতার বিষয় না করে বৈশ্বিক বা সর্বজনীন জায়গা থেকে সাহিত্যরচনা করেন, যা পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্যের অংশ হয়ে উঠতে বাধা থাকে না। উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম নিশ্চয় আছে, যেমন কবি-গল্পকার কাশিম আনিসের লেখার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে ক্যাম্পের জীবন। এর বাইরে তিনি বাংলাদেশের সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন। আহমেদ ইলিয়াস তার জেনেভা ক্যাম্পের জীবন নিয়ে লিখেছেন :
Why do I feel fear and shame
When I venture into this filth ridden place
Why do I not like these crying, whimpering children
Why do I like tall buildings
Why do shabby huts feel like hell? [খুদকুশি, উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদ : রুখসানা চৌধুরী, A Search for the ‘Self’: Trials and Tribulations of Urdu Writers in Bangladesh]

বাংলাদেশি উর্দুভাষী লেখকদের লেখায় তাদের এই স্বতন্ত্রবোধ ও অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তার একটা আলাদা পরিচিতি দরকার। সেটাকে ‘উর্দুসাহিত্য’ না বলে ‘উর্দুভাষার বাংলাদেশি সাহিত্য’ বা ‘বাংলাদেশি উর্দুসাহিত্য’ বললে বাংলাদেশে উর্দুভাষার সাহিত্যের একটা নিজস্ব ঐতিহ্য তৈরি হবে। উর্দুভাষার বাংলাদেশি লেখক আহমেদ ইলিয়াস যেমন তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছেন ‘বিহারি বাংলাদেশি ভারতীয় অধিবাসী’, সেই সূত্রে আমি কবি শামীম জামানভীকে প্রশ্ন করেছিলাম বিহারিদের উর্দুভাষার লিখিত সাহিত্যকে ‘উর্দুসাহিত্য’ না বলে কেন ‘বিহারি সাহিত্য’ বলা হচ্ছে না? তিনি জানান যে, তারা এখন বলছেন বাংলাদেশি উর্দুসাহিত্য। বিহারি সাহিত্য বলতে চান না এই কারণে যে, বাংলাদেশে উর্দুভাষী যারা আছেন, সকলে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আসেনি। তাই সকলে বিহারি না। তাছাড়া শামীম জামানভী নিজেকে বিহারি হিসেবে পরিচিতি দেন না, তিনি নিজেকে উর্দুভাষী বাংলাদেশি মনে করেন। তার ভাষ্যে অনেক কবি-লেখকই আর নিজেদের ‘বিহারি’ পরিচয়ে সচ্ছন্দবোধ করেন না। এতে কথিত বিহারি কমিউনিটিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতার কোনো সমস্যা হয় কিনা আমি জানতে চাইলে তিনি জানান, একসময় হয়েছে। বিহারি ক্যাম্পে তাদের নানারকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিহারিদের ভেতর অনেকে তাদের ‘বাংলাদেশি’ হয়ে ওঠাকে গ্রহণ করতে পারেননি। তবে এখন আর সেই সমস্যা হচ্ছে না বলে তিনি আমাকে জানান।
বিষয়টি আমি উত্থাপন করেছি এই কারণে যে, উর্দুভাষী-বাংলাদেশিদের জন্য সাহিত্যের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের উর্দুভাষী লেখকরা আরও বেশি আঞ্চলিক বা নেটিভ জায়গা থেকে গল্প-কবিতা লেখার সাহস দেখাতে পারবেন। তারা উর্দুসাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের ফিউশন ঘটিয়ে নতুনধারার সাহিত্যসৃষ্টি করতে পারবেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে তেরোটা ভিন্ন-ভিন্ন অঞ্চলের ১১৬টা ক্যাম্পে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখের মতো উর্দুভাষী মানুষ বসবাস করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকার উর্দুভাষীদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিহারিদের মধ্য এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বিহারিরা এখনো তাদের সন্দেহমুক্ত করতে পারেনি। বিহারিদের কেউ কেউ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে, তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করে বলে অভিযোগ আছে। বহুজাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র বাংলাদেশ, এখানে বিহারিদের বাঙালি হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু মনেপ্রাণে বাংলাদেশি হওয়ার প্রয়োজন আছে। কবি আহমেদ ইলিয়াস যেমনটি করতে পেরেছেন। তিনি কবিতায় ঘোষণা দেন:
Chabbees March
Apni pehchan ko hai bhulane ka din
Apni pehchan phir se banana ka din
Ghar ujadney ka din, ghar basaney ka din. [Jukhm Shaakh-e-Hijr ka]

কিন্তু ইলিয়াসের মতো অধিকাংশ বিহারি স্বাধীন বাংলাদেশকে নিজের গৃহ হিসেবে হিসেবে ভাবতে পারেননি। ইলিয়াসের মতো কবিদের যে কারণে বাঙালিরা বিহারিদের গ্রোত্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে ভাবতে পারেননি। এখনো অধিকাংশ বিহারি যতটা না বাংলাদেশি, তার চেয়েও বেশি পাকিস্তানি। ফলে এই ডায়াসপোরা অবস্থানে বিহারি কবিদের ভেতরও অন্যরূপে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে। একদিকে তাদের নিজেদের লোকজনের সঙ্গে সবসময় মতে-আচরণে মিলছে না, অন্যদিক থেকে স্থানীয় জনগণের কাছেও সবসময় নিজেকে ‘প্রমাণ’ করে যেতে হচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ বাংলা ভাষাতে কবিতা লিখছেন। আত্মপরিচয় নির্মাণের রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা গৃহ এবং জন্মভূমি বলতে বাংলাদেশকেই বোঝেন। তেমনই একজন কবি হাসান ইবনে ইসমাইল। ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পে থাকেন তিনি। হাসান মনে করেন নিজের গৃহের তার প্রতি আগন্তুকের মতো আচরণ করা হয়। ‘বিহারি’ শব্দের ভেতর দিয়ে তাকে আলাদা করে তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন। কবিতার মধ্য দিয়ে হাসান নতুন প্রজন্মের বিহারিদের জন্য বাংলাদেশি হিসেবে আত্মপরিচয় দাড় করাতে চান। আশা-হতাশার মাঝখানে আটকে থেকে হাসান লেখেন:
When my hearth and home is set ablaze
Surely, tears will quench the fire

Life will become unbearable, I had no clue
Truth will be punished, I had no clue

Strange faces everywhere
Surely, my identity will be revealed

Reality is harsh, this is the truth Hasan
Some will give life and some, death [সূত্র ও অনুবাদ: রুখসানা চৌধুরী, A Search for the ‘Self’: Trials and Tribulations of Urdu Writers in Bangladesh]

বাংলা-উর্দু সাহিত্য ফাউন্ডেশন আছে। এর সভাপতি হিসেবে আছেন খ্যাতিমান বাঙালি কবি আসাদ চৌধুরী। আসাদ চৌধুরীর উদ্যোগে এবং কামাল লোহানীসহ আরো অনেকের সহযোগিতায় ২০০৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আসাদ চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’ শিরোনামে একটি বাংলাদেশি উর্দুকবিতার বাংলা অনুবাদ-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমার ধারণা এই ফাউন্ডেশনের সদস্য উর্দু কবিরা বাংলাদেশি পরিচয় ধারণ করেই কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ যদি নাও থাকে তাঁরা যেহেতু উর্দুভাষায় কবিতা লেখেন যার কিছুটা পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়, বর্তমানে কেউ কেউ ফেসবুককেও অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তারা কথাও বলেন উর্দুভাষায়, ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা যেভাবে যোগাযোগ ছিন্ন করেছি, সেটা তাঁদের অনেকে করতে পারেননি। অনেকে ভিন্ন ভাষাভাষী দেশে থাকলে দুটি ভাষা রপ্ত করেন– মাতৃভাষা এবং আশ্রিত দেশের ভাষা; দুটি ভাষায় লেখালেখিও করেন কেউ কেউ। বিহারি বাংলাদেশি লেখকরা সেটা খুব একটা করেননি। আমি কয়েকজন কবির ফেসবুক পেইজ/ওয়ালে দেখেছি উর্দুভাষায় স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, লিংক শেয়ার দিচ্ছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের যেভাবে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে, বাংলাদেশি বাঙালিদের সঙ্গে সেভাবে হচ্ছে না। কেউ কেউ হয়ত ইংরেজি ভাষায় লিখছেন কিন্তু তাদের স্ট্যাটাসের বিষয় হয় আন্তর্জাতিক নয়ত পাকিস্তানী। দ্বৈতভাষার চর্চাটা করলে বাংলাদেশে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চয় বাড়ত। আমরা বলতে পারি, নাইপল-রুশদি থেকে ঝুম্পা লাহিড়ি, ভারতী মুখার্জী, রোহিনটন মিস্ত্রির মতো ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখকরা কিংবা হানিফ কুরাইশী, মহসিন হামিদের মতো পাকিস্তানী ডায়াসপোরা লেখকরা ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা না করে যদি মাতৃভাষা হিন্দি কিংবা উর্দুভাষায় সাহিত্যচর্চা করতেন তাহলে ইউরোপ আমেরিকায় তাদের আজকের মতো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতো না। খ্যাতিমান ডায়াসপোরা লেখকরা সবসময় বসবাসরত দেশের (হোস্ট ক্যান্ট্রি) ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করেছেন। নিজের আত্মপরিচয় সম্পূর্ণ বিলিয়ে না দিয়েও যে সেটি করা যায়, তা তাঁরা দেখিয়েছেন। ভারতী মুখার্জী যেমন বলেছেন, আমি আমেরিকান হতে চাই কিন্তু ভারতীয় পরিচয়কে অটুট রেখেই। বিহারি-বাংলাদেশি লেখকরা এত দৃঢ়ভাবে দ্বৈতপরিচয়কে আত্মস্থ করতে পারেননি বলে আমার কয়েকজন বিহারি বাংলাদেশি কবিদের কবিতা পড়ে মনে হয়েছে। তবে যে অল্প কজন পেরেছেন, যারা বাংলাদেশি হয়ে উঠেছেন মন ও মননে, তাদের কয়েকজনকে নিয়ে এ পর্যায়ে আমি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই।
বাংলাদেশের খ্যাতিমান উর্দু কবিদের একজন আহমেদ ইলিয়াস। জন্ম ১৯৩৮ সনে কলকাতায়। দেশভাগের পর পাকাপাকি ঢাকায় এসে পড়েন ১৯৫৩ সালে। তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে নিবন্ধ লিখেছেন। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হলে তিনি কলম ধরেছিলেন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ১৯৭২ সালে দিল্লিতে যে বিশ্ব-উর্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে একমাত্র সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের উর্দুসাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করেন আহমেদ ইলিয়াস। ফলে সেদিন দিল্লির সেই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। ঢাকা, করাচি, কোলকাতা, লাহোরের খ্যাতনামা পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয় নিয়মিত। এখন পর্যন্ত ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশী উর্দুভাষীদের নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-গ্রন্থ ‘Bihari : Indian Emegrees in Bangladesh’। বাংলায় উর্দুভাষায় সাহিত্যচর্চা নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হচ্ছে। আহমেদ ইলিয়াসের কবিতায় গৃহহীন হওয়ার যন্ত্রণা ও স্মৃতিরোমন্থনের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। তিনি লেখেন :
‘Separation did not enable me to live alone
The very walls are crowded with memories
Faint traces appear every moment
Scenes of the past are still there in my eyes [উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদ : রুখসানা চৌধুরী, A Search for the ‘Self’: Trials and Tribulations of Urdu Writers in Bangladesh]

তিনি আরেকটি কবিতায় লেখেন:
The townspeople have divided the earth amongst them
The village has no home for me now
Even the sky has rejected us
They say that this land is not trustworthy anymore
In sleep, spent the whole night in travel
When awake, found no signs of the journey anywhere. [উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদ : রুখসানা চৌধুরী, A Search for the ‘Self’: Trials and Tribulations of Urdu Writers in Bangladesh]

নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়ার বেদনাটি আবার আরেকভাবে প্রকাশিত হয়েছে সলিমুল্লাহ ফাহমির কবিতায়:
meri zindagi hai woh zindagi
ke khushi ka jis me asr nahi
mere saath shaam hi shaam hai
mere raaste me sehar nahi.

বাংলাদেশে থেকে যাওয়া আরেক উর্দুভাষী লেখক হলেন জয়নাল আবেদীন। জন্মেছেন ভারতে। তখন ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান তিনটি দেশ ছিল অভিন্ন। উর্দু কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং উর্দু-বাংলা চলচ্চিত্রে স্ক্রিপ্ট লেখক জয়নালের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে। এখানেই তার আদি বাড়ি। ১৯৪৭ সালে পরিবারটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সৈয়দপুরে পিতৃকর্মস্থল বিহার থেকে চলে আসেন। সৈয়দপুর থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর চলে আসেন ঢাকায়। মূলত গল্প লিখতেন। প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতো। পাকিস্তানের দৈনিক ডন পত্রিকা বলছে, তার লিখিত গল্পের সংখ্যা ১০০ থেকে ১২৫। তার একটি বিখ্যাত গল্পের নাম ছিল, ‘সাত ভাই চম্পা’। তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলে কোঠার সেপাই’ উর্দুতে অনুবাদ করে গেছেন। যা প্রকাশিত হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তার বাড়িটি উর্দুভাষী হওয়ার কারণে দখল হয়েছিল। এর কিছুদিন পর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন। জয়নালকে দেখে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোর কি চাই’? জয়নাল বলেন, ‘একটি পাসপোর্ট’। তিনদিনের মধ্যে তিনি পেয়ে যান পাসপোর্ট। ঠিকানা ছিল ১৮, তোপখানা বা জাতীয় প্রেস ক্লাব। জয়নাল আবেদীন ঢাকায় নির্মিত জনপ্রিয় ‘চকোরী’সহ অন্তত পাঁচটি উর্দু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। বাংলা ছায়াছবির চিত্রনাট্য ও গান রচনা করেন। ঢাকার প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’র সংলাপ ও সঙ্গীত রচয়িতা তিনি। বাংলা ছায়াছবি ‘জনতা এক্সপ্রেস’র সংলাপও তিনি রচনা করেন। [তথ্যসূত্র : মননে মুক্ত, জীবনে একা, প্রকৃতিতে উদার : একজন জয়নাল আবেদীন/ কাজিম রেজা, যুগান্তর সাহিত্য সাময়িকী]
বাংলাদেশের প্রধানতম উর্দু কবিদের আরেকজন হলেন নওশাদ নূরীর। ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ ভারতে বিহারে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহেরুর ওয়াশিংটন সফরের প্রতিবাদে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও লেখক সমিতি পাটনায় একটি বিশাল জনসভা আয়োজন করে। এ সমাবেশে নওশাদ নূরী তাঁর বিখ্যাত ‘ভিখারি‘ কবিতাটি পাঠ করেন। বিহার কর্তৃপক্ষ ‘ভিখারি‘ আবৃত্তির অভিযোগে নওশাদ নূরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেফতার এড়াতে ১৯৫১ সালে ঢাকায় চলে আসেন। সামরিক অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট বিভাগে চাকরি হয় তার। পোস্টিং হয় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায়। ১৯৫২ সালে লিখিত ‘মহেনজোদারো’ কবিতায় বাঙালিদের উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানানোয় তাকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তিনি চাকরি ছেড়ে ১৯৬০ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় ফিরে নওশাদ নূরী একটি বই দোকান খুলেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত উর্দু সাপ্তাহিক ‘রুদাদ’-এর সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬৭-১৯৭১ সালে প্রকাশিত অন্য একটি উর্দু সাপ্তাহিক ‘জারিদা’ -এর সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন তিনি। [তথ্যসূত্র : নওশাদ নূরী! বিস্মৃতির বদ্বীপে ভিনভাষী কবি/ আশরাফ সিদ্দিকী, পরিবর্তন.কম]

নওশাদ নূরীর দুটি কবিতা উপস্থাপন করা হলো:

আঙুলগুলো সব ক্ষত বিক্ষত, কবিতা লিখি কীভাবে?
ঘা খাওয়া আক্রান্ত কলম আমার, কেমন করে লিখব স্তুতিবাক্য?
পাথরের তলায় দ-িত এই হাত,
লক্ষ্যভেদ হয়েছে যখনই
পালিয়ে ছুটেছে এটা ওটা নানান ছুতোয়
মৃত্যুদ-ে দ-িত হয়েছে সে কদাচিৎ।

চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে
পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর মতন।
গভীর সমুদ্রর সন্ধানে উদ্বেল
অলক্ষ্যে অতিক্রম করে যায় প্রান্ত থেকে প্রান্ত;
অশ্রুজলের সমুদ্র কোথায়?
নদীর স্রোত যেখানে বিলীন হবে উদ্যত তরঙ্গে ।

আহত আঙুল থেকে ছুটে আসে রক্তের তরঙ্গরাজি
আক্রান্ত কলমের ক্ষত থেকে রক্তের তরঙ্গ উপচে পড়ে
এই প্রবল প্রস্রবণের সব গন্তব্যই যে অভিন্ন
জোয়ার ভাটার দোলায় এই বিশ্বের শেকড় গাঁথা,
বিশাল সমুদ্দুর তাকিয়ে থাকে কার দিকে? [চাঁদ আর সমুদ্দুর, নওশাদ নূরী, অনুবাদ: মিজারুল কায়েস]

কোনো ভোরের আশা যদি জাগে নিদ্রায়
তখন ঊষার আলোর জন্ম হয় স্বপ্নে
যদি কোনো বসন্তের আগমনের আবির্ভাব ঘটে মনে
উন্মাদনার তীব্রবেগের উৎপত্তি তখন পাতাঝরা মৌসুমে
কোনো বন্য হরিণের সন্ধান যদি জাগে মনে
নোঙর ফেলি সমুদ্র তীরে, খুঁজি চাঁদের তরঙ্গে ।

ভোর, বসন্ত, মৃগ, সৈকত, জ্যোৎস্নাভরা রাত
প্রতিটি জিনিষ রয়েছে আমার নাগালের বাইরে
আমার চেতনা, আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, আমার ভাবনা
মনের ভীরে এই অধিবাসীদের বসবাস
কিন্তু সবই আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে
আমার বোধশক্তি বন্দি, উন্মাদনা কয়েদি, দৃঢ়সঙ্কল্প হাতকড়া পরিহিত
শুধু কারারুদ্ধতার অনুভূতি রয়েছে কারাগারের বাইরে। [কারারুদ্ধ, অনুবাদ, হাইকেল হাশমী, কবিপুত্র]

৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বরণ নিয়ে লিখেন ‘উত্থান-উৎস’ কবিতা। কবিতায় বলেছেন….
… সে আছে, সে আছে-
সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে
সে আছে, সে আছে
সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার। [অনুবাদ: আসাদ চৌধুরী]

৭৫-এর ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর দাফনের পর লেখেন ‘টুঙ্গিপাড়া’ নামক কবিতা। কবিতায় বলেন….
তোমরা কি জানো? তোমরা কী জানো?
পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,
পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে। [অনুবাদ: আসাদ চৌধুরী]

বাংলা সাহিত্যের অনুরক্ত ও সেবক হিসেবে আমরা পাই বিহারি বাংলাদেশি কবি আহমেদ সাদিকে। সাদি ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। থাকতেন সৈয়দপুরে। বাংলা সাহিত্যে সাদির অনুপম অবদান হলো তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নির্বাচিত কবিতা উর্দুতে অনুবাদ করেছেন। Kazi Nazrul Islam Ki Muntakhab Nazme O Geet নামে সেগুলো গ্রন্থাকারে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে, তার মৃত্যুর তিন বছর পর। এর আগে তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদ করেন দিল্লি থেকে প্রকাশিত একটি উর্দু ম্যাগাজিনের জন্য। এছাড়াও তিনি আলাউদ্দিন আল আজাদ, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দিন. শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হকের লেখা অনুবাদ করেন। পরিবারসূত্রে জানা যায় তিনি বিমল করের কড়ি দিয়ে কিনলাম অনুবাদ করেন। তার অনেক অনূদিত পা-ুলিপি মুক্তিযুদ্ধের সময় হারিয়ে যায়। [তথ্যসূত্র : Ahmed Saadi: Bangladesh’s Urdu poet, E. A. M Asaduzzaman ডেইলি স্টার]
এছাড়াও সলিমুল্লাহ ফাহমি (১৯০৫-১৯৭৫, আহসান আহমেদ আশক (১৯১৪-১৯৯৩), শাহ মোহাম্মদ শফি ফিরদৌসি (১৮৭৮-১৯৫০), সৈয়দ ইউসুফ হাসান (১৯২৪-১৯৯৫),নওশা নূরী (১৯২৬-২০০০), জামাল মাশরাকি (১৯৪২-১৯৯৭), মাহের ফরিদি (১৯৩৪-১৯৯১)-সহ সমকালীন লেখকদের ভেতর উল্লেখযোগ্য হলেন: ঢাকা থেকে কাশিম আনিস, কামরুজ্জামান তালেব কবির, আরমান শামসি, এনায়েতুল্লাহ সিদ্দিকী, জামিল আখতার, শামিম জামানভী, সৈয়দ আফজাল হোসেন, সৈয়দা ফাতিমা ইসলাম রোজি; চট্টগ্রাম থেকে আনোয়ারুল হক, নজর নিয়াজি, সালাউদ্দীন আমির, মৌলানা আশরাফ বিহারি; খুলনা থেকে চিশতি তালিব হাসান তালিব, আফজাল হোসেন, কুরবান আলী; রংপুর থেকে মোহাম্মদ মুস্তাফা আনসারি; সৈয়দপুর থেকে আশরাফুল হক সাগর, রিয়াজ রিয়াজ রফিক, শওকত নূর, রাকিব আকবর; কুমিল্লা থেকে মামুন সিদ্দিকী এবং যশোর থেকে জাখমি-সহ আরও অনেকে। [তথ্যসূত্র: Inside Bihari Camps: A Study of the Urdu Literature Produced in Dhaka Mohammad Kasifur Rahman]
বিহারি জাতিগোষ্ঠীর উদ্বাস্তু বা ডায়াসপোরা জীবন নিয়ে ‘বৃদ্ধা বিহারি’ শিরোনামে তানভীর মোকাম্মেল চমৎকার একটি কবিতা লিখেছেন। ভারত বিভাগের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে কবিতাটি তিনি লেখেন। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আমি এখানে তুলে ধরছি।

লিখেন সাম্বাদিক সাব আমি বিহারি
পাটনা জেলায় ক্ষেতি ছিল হামাদের
আব্বাজান রেলওয়ের গুমটিগার্ড
সোয়ামিও রেলে লাইনম্যান
হামাদের চমন পুড়ে নতুন পতাকা হলো
যখন এলাম প্রথম পাকিস্তান মালগাড়িতে দিন গুজরান
আজও কানে বাজে শান্টিং ইঞ্জিন
এ কলোনি ও কলোনি
কেটে গেলো জিন্দেগির দিন;

তারপর কী ঘটল মুলুকে বাঙাল
সেবারে পুড়েছিল ঘর এবারে কপাল
স্বামী শান্তাহারে খুন হলো মেয়ে-জামাই ময়মনসিংয়ে
দিনাজপুরে ছেলেকে ডেকে নিল মিটিং বলে
৩৬ বছর পার হলো সে মিটিং আজও শেষ হলো না!

লিখেন এনজিও আপা আমি বিহারি

মেজ ছেলে অনেক তকলিপ করে পালিয়েছে পাকিস্তান
আরেক মেয়েও করাচি রঙ্গি টাউন
বাইশ বছর ওদের সুরত দেখি না
আর ছোট ছেলেটা গুল্লু
ভিসার অপেক্ষায়
দারু খায় আর কী কী যেন খায় জোয়ান ছেলেরা
ক্যাম্পে তো আসমান নেই ফেরেশতারা তাই দেখতে পান না!

লিখেন বিদেশি স্যার আমি বিহারি

কিতনা জেনারেল আয়া গ্যায়া
লেকিন ম্যায় আজ ভী ইন্তেজার মে হুঁ
কব যায়েঙ্গে পাকিস্তান
ইয়া কবরিস্থান!
চোখে হামার ছানি এখন ভালো দেখি না
শুধু ইয়াদ হয় পাটনায় আমাদের ক্ষেতির কথা

আর ভালো লাগে ঝরঝর বর্ষা বাংলার
যেন তা সমান আমার কান্নার আর
রাতের খোয়াব দেখি পাকিস্তানের পাহাড়

লেকিন আপসোস খোদাকা এতনা বড়া দুনিয়ায়
কোনো মুলুকেই মাকান নেই হামার;

ইয়ে সাম্বাদিক সাব, ইয়ে এনজিও আপা, ইয়ে বিদেশি স্যার
আপা জারা জিন্নাহ সাব সে পুঁছিয়ে না
মেরা ওয়াতান কিধার?

জি, লিখ লিজিয়ে…ম্যায় বিহারি হুঁ! [‘বৃদ্ধা বিহারি’, তানভীর মোকাম্মেল, দৈনিক প্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকী]
Flag Counter


6 Responses

  1. গীতা দাস says:

    লেখাটি মূল্যবান এবং ব্যতিক্রমী । একটি জটিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য বিষয়কে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন। নওশাদ নূরীর কথা খুব ভালো লাগলো। নওশাদ নূরীর মতো লোকের এখন বড় অভাব।

  2. Mojaffor says:

    Thank You

  3. পড়লাম! খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবহুল লেখা। লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এসব বিষয় জানা ছিল না। আরও অনেক লেখা পেতে চাই আপনার কাছে।

  4. হতভাগ্য মানব গোষ্ঠী।যাদের অধিকাংশই উচ্চ মানষিকতার মানুষ। এরা উপমহাদেশিক রাজনীতির বলি।সৈয়দপুরে অনেক বিহারী আমার শুভাকাংখী ছিল।

  5. Mahbubur Rahman Linkon says:

    Excellent writing.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.