অনুবাদ গল্প

হোর্হে লুইস বোর্হেসের প্যারাবোল : পেদ্রো সালবাদোরেস

রাজিয়া সুলতানা | 3 Mar , 2019  

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাজিয়া সুলতানা

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচে’ উদ্ভট, আজব এবং ভয়ংকর ঘটনাগুলোর(সম্ভবতঃ ঘটনাটা লিপিবদ্ধ করে রেখে যাওয়ার এটাই প্রথম প্রচেষ্টা।) মধ্যে একটি আমি তা লিখে রেখে যেতে চাই। কাহিনির বর্ণনায় যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত মুগ্ধতা, অনুমান বা ধারণা থেকে বিরত থাকতে চাই। মনে হচ্ছে, এটাই একমাত্র উপায়।

এক লোক, তার স্ত্রী আর এক মহা প্রতাপশালী স্বৈরাচারী – এই তিনজনই হচ্ছে ঘটনার চরিত্র। লোকটার নাম পেদ্রো সালবাদোরেস; কাসেরোসের যুদ্ধে স্বৈরশাসকের পতনের কয়েক দিন কি কয়েক সপ্তাহ পরে তার সঙ্গে আমার দাদা আসেভেদোরের দেখা হয়েছিল। পেদ্রো হয়তো অন্য কারও থেকে আলাদা ছিল না। কিন্তু কতগুলো বছর আর ভাগ্য তার জীবনকে অন্যদিকে টেনে নিয়ে যায়। সেই সময়ে অন্যান্য বিশিষ্ট ভদ্রলোকের মতোই সে ছিল একজন। সে ছিল (ধরা যাক) দেশে বিশাল একটা খামারের মালিক এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সে ছিল ইউনিটারিয়ান দলের পক্ষে। প্লানেস বংশের এক মেয়ে ছিল তার স্ত্রী; তারা থাকতো টেম্পলের কাছাকাছি এক কিনারে সুইপাচা স্ট্রিটে যা এখন বুয়েনোস আইরেসের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। যে বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে, সেটা ছিল যে কোনো সাধারণ বাড়ির মতই একটা বাড়ি। বাড়িতে ঢোকার তোরণ, ধনুকের মত বাঁকা খিলানে ঢাকা করিডোর, ভেতরের প্রবেশপথে গ্রিলের কাজ, রুমগুলোর সঙ্গে লাগোয়া দুই তিন সারি প্রাঙ্গণ ছিল। স্বৈরশাসকের নাম ছিল রোসাস।
সেটা ছিল আঠারো শ’ বেয়াল্লিশ সালের এক রাত, সালবাদোরেস আর তার স্ত্রী বাইরে কাঁচারাস্তায় ঘোড়ার খুরের চাপা একটা আওয়াজ শুনতে পেল। আরোহীদের শোরগোল, চিৎকার, চেঁচামেচি – ক্রমে আরও জোরে শোনা যাচ্ছিল। এই দলটার নাম ভুট্টা; এরা রোসাসের কট্টর অনুসারী ছিল না। দরজায় যখন জোরে জোরে বারি পড়ছিল, আর তীব্র ভাষায় গালাগাল করছিল, সালবাদোরেস তখন উপায় না বুঝে ডাইনিং রুমের টেবিল একপাশে সরিয়ে, কার্পেট তুলে নিচে কুঠরিতে লুকালো। তার স্ত্রী টেবিলটা টেনে আগের জায়গায় এনে রাখলো। অবশেষে, দলটি দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল। ওরা সালবাদোরেসকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে। সালবাদোরেসের স্ত্রী বলল তার স্বামী মন্তেবিদেওএ পালিয়ে গেছে। লোকগুলো ওর কথা বিশ্বাস করল না। অনেক অপমানজনক কথাবার্তা বলে গালি দিল, মারধোর করল। নীল একেশ্বরবাদীদের প্রতীকী রঙ। ঘরে নীলরঙের চীনা বাসনকোসন দেখে সেগুলো মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেললো ভুট্টা বাহিনি। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কিন্তু কার্পেটটা উঠিয়ে দেখার কথা একবারও মনে হলো না। অবশেষে খুঁজে না পেয়ে মধ্যরাতের দিকে আবার আসবে বলে শপথ করে চলে গেল।
পেদ্রো সালবাদোরেসের গল্পের আসল শুরুটা আসলে এখানে – নয়টা বছর সে সেই কুঠুরিতে কাটিয়ে দিয়েছিল। আমরা মনে মনে ভাবতে পারি-নয় বছরে এতগুলো দিন, ঘন্টা – এই লম্বা সময়ের কোনো হিসেব হয়? নাকি চলে? তার চেয়েও বড় কথা ব্যাপারটা ভয়াবহ এক বাস্তবতা। ধরা যাক, নিরুপায় হয়ে কোনোওভাবে সেই অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল সে। কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা কিংবা ভাবনা ছিল না। এমনকি এই যে বিপদ – সে বিষয়েও আর ঘৃণা বা তিক্ততা ছিল না মনে। সেই কুঠুরিতে জীবন তার। মাথার ওপরে পৃথিবীর সব কোলাহল, ধ্বনি- প্রতিধ্বনি থেকে বিচ্ছিন্ন, বঞ্চিত সে। শুধু এক স্ত্রীর হাঁটাচলার শব্দ, কুয়োর ঘেরে বালতি ঝুলিয়ে রাখার ঝনঝন, আর বহিঃপ্রাঙ্গণে বৃষ্টির তুমুল শব্দ -প্রতিদিনের বন্দীজীবনে তার এইটুকু পাওয়া। শুধু ভাবনা, হয়তো বা আজই শেষ দিন- যে কোনো সময় ধরা পড়ে যাবে সে।
তার স্ত্রী চাকর-বাকর বিদেয় করে দিয়েছে ভয়ে, পাছে ওদের কেউ ওর স্বামীর লুকিয়ে থাকার স্থানটা জেনে যায়, তারপর ওদের বলে দেয়। সে আত্মীয়-স্বজনদেরও বলত সালবাদোরেস এখন উরুগুয়েতে থাকে। সংসার চালানোর জন্য সে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ইউনিফর্ম সেলাই করে অর্থ উপার্জন করছে। এরি মধ্যে দুটো বাচ্চাও হয়েছে ওদের। ওর প্রেমিক আছে-এই ভেবে ওর আত্মীয়-স্বজন ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বৈরশাসকের পতনের পর ওরা ওদের পায়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেছে।
পেদ্রো সালবাদোরেস কী করতো? কে ছিল সে? বুয়েনোস আইরেস এর অদৃশ্য উপস্থিতি নাকি অভ্যেস পেয়ে বসেছিল তাকে? পরিনামের ভয়ে একি ভয়, নাকি ঘোর? তার স্ত্রী স্বামীকে কাছে রাখার জন্য তাকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলত নতুন চক্রান্তের আর গুজব শোনাত জয়ের। হতে পারে সে কাপুরুষ ছিল। স্ত্রী তা জেনেও আনুগত্যের সঙ্গে তা গোপন করে যেত। আমি মনের চোখ দিয়ে দেখতাম মোমের আলোহীন, বইপত্রহীন একটা কুঠরিতে অন্ধকার-ঘুমের গভীরে নিমজ্জিত একজন মানুষ। কুঠরির বাইরে আসার স্বপ্ন দেখত সে – যা তার জন্য আসলে একটা দুঃস্বপ্ন ছিল –যেন হঠাৎ এক রাত্রি। সমতলে, রাস্তাঘাটে, আনাচে-কানাচে সবখানে তাকে খোঁজা হচ্ছে – ক্রমেই মৃত্যু তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার গলায় ছুরি – এই এক দুঃস্বপ্নের ঘোরে অন্ধকার কুঠরিতে তার সময় কাটে। সময় বয়ে যায়। ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নকে অতিক্রম করতে ব্যর্থ সে । দুঃস্বপ্ন তাকে ছাড়ে না। স্বপ্নগুলো কুঠরির ভেতরে গুমরে কেঁদে মরছে। প্রথমে মনে হতে পারে, বিপদগ্রস্ত একজন মানুষ, তাকে খোঁজা হচ্ছে ধরার জন্য; আসলে এর কিছুই আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, হতে পারে একটা জন্তু গর্তে শান্তিতে বাস করছে অথবা অস্পষ্ট, ঝাপসা কোনো দেবতা সে।
আঠারো শ’ বায়ান্নোর সেই গ্রীষ্মে যখন রোসাস দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল, তার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা চলছিল সালবাদোরেসের। এর পরপরই এই গোপন লোকটি দিনের আলোতে বের হয়ে এলো; আমার দাদার সঙ্গে কথা হলো তার। থলথলে চর্বিওয়ালা, মোটাসোটা সালবাদোরেসের গায়ের রঙ দেখতে হয়েছিল মোমের মত । নিচু স্বরে মিনমিন করে কথা বলত সে। গলায় আওয়াজ উঠতো না। তার বাজেয়াপ্ত জমাজমির কিছুই সে ফেরত পায় নি; আমার বিশ্বাস, সে দারিদ্র্যের কষাঘাতে ধুকে ধুকে মারা গেছে।
পেদ্রো সালবাদোরেসের জীবনে এতো যে ঘটনা, বিশৃঙ্খলা আর কষ্ট, আমাদের কাছে মনে হতে পারে প্রতীকী একটা কিছু, তার জীবন কোনো কিছুর ইঙ্গিত বহন করে হয়ত বা। বোঝার চেষ্টা করব কিছু একটা – আসলে যা কোনোদিনও বুঝে ওঠা সম্ভব নয়।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.