অনুবাদ কবিতা

ভ্যান গগকে নিয়ে পাঁচ কবির কবিতা

মুম রহমান | 12 Nov , 2018  

অনুবাদ ও ভূমিকা: মুম রহমান

৩০ মার্চ ১৮৫৩ সালে বেলজিয়াম সীমান্তবর্তী ছোট এক ডাচ গ্রামে গ্রোট জুনডার্টে ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগের জন্ম। ভ্যান গগের জন্মের এক বছর আগে থেকেই তার পরিবারে বিষাদঘন পরিবেশ বিরাজ করছিল। পাদ্রি থিওডর ভ্যান গগ ও তার স্ত্রী কর্নেলিয়ার প্রথম সন্তান মৃত হয়েই জন্মায়। এই দুঃখজনক ঘটনার ঠিক এক বছর পর একই দিনে জন্ম নেন ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। কিন্তু ভিনসেন্টের জন্মতেও তারা পূর্বের মৃত সন্তানের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তাই মৃত ছেলের নামেই ভিনসেন্টের নামকরণ করা হয়।
মৃত ভাইয়ের নাম নিয়ে জীবন কাটালেও আজ ভ্যান গগ এক কিংবদন্তীর নাম। জীবিতকালে দুচারটা ছবি বিক্রি হয়েছে, অবর্ণনীয় বেদনাদায়ক জীবন যাপন করেছেন। কিন্তু আজ ভ্যান গগ বিশ্বের সেরা একজন শিল্পী। তাঁর নামে লেখা হয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা। তাকে নিয়ে হয়েছে চলচ্চিত্র, উপন্যাস। ভ্যান গগকে নিয়ে কয়েকটি কবিতা পাঠ করা যাক।

ওয়াকিং আউট – একটি ভ্যান গগ কবিতা
চার্লস বকস্কি

ভ্যান গগ তার কান কেটে
সেটা দিয়েছিলো
এক বেশ্যাকে
যে এটি ছুঁড়ে ফেলেছিলো
ভয়াবহ
ঘৃণায়।
ভ্যান,
বেশ্যারা চায় না
কর্ণ যুগল
তারা চায়
টাকা।
আমি মনে করি সেই কারণেই তুমি ছিলে
দারূণ মহান
চিত্রকর : তুমি
বুঝতে পারনি
এর বেশি
কিছু।

তারা ভরা রাত
টুপাক শাকুর

এক সৃষ্টিশীল হৃদয়, আবিষ্ট হয়ে আছে সন্তুষ্ট করতে
এই ঘুমন্ত আর পাত্তাহীন সমাজকে
তুমি তাদেরকে দিয়েছিলে রাত্রির তারামালা
এবং তুমি তাদেরকে দিয়েছিলে
বুনো সূর্যমুখীর তোড়া
কিন্তু তোমার জন্য কেবল ছিলো অবজ্ঞা
এবং তবুও তুমি নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলে খ্যাতিতে
আর সেটা দারূণ গর্বিত ভঙ্গিতে পৃথিবীকেই দিয়েছিলে
কিন্তু তারা গ্রহণ করতে পারেনি তোমার শ্রেষ্ঠ শিল্পকে
হৃদয় থেকে।
তাই সেই তারা ভরা রাতেই তুমি আমাদের দিলে
এবং তুমিই আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিলে
এমন এক জিনিস যার স্বীকৃতি আমরা দেইনি কোনদিন
তোমার জীবনে।

আত্মপ্রতিকৃতি
ডেরেক ওয়ালকট

ভ্যান গঘের নিঃসঙ্গতা।
ভ্যান গঘের নম্রতা।
ভ্যান গঘের শঙ্কা।
তিনি আয়নার দিকে তাকালেন
এবং নিজেকে আঁকতে শুরু করলেন।

তিনি আবিষ্কার করলেন সেখানে কেউ নেই
কেবল, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।
তা তো যথেষ্ট নয়।
তিনি একটা কান কেটে ফেললেন।
তিনি আয়নায় তাকালেন :
ওই তো ওখানে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ
একটা ব্যান্ডেজ মোড়ানো কান।

এটা তার প্রতিকৃতির অনুরূপ
তিনি রয়ে যাওয়ার প্রয়াস করলেন,
প্রথমত, তাকে অবশ্যই বিলীন হতে হবে,
তারপর তাকে ফিরে আসতে হবে প্রশমিত হয়ে
আর সকল শঙ্কার উর্ব্ধে
একটি নিঃসঙ্গ প্রক্রিয়ায়,

যখন আয়না দাবী করবে না
কোন বেদনা কিংবা খ্যাতি নয়
কোন হ্যাঁ বা না নয়
কিংবা হয়তো বা, অথবা একদা, অথবা
না। সেখানে কেউ নেই,
ভিনসেন্ট ভ্যান গগ নন,
নম্র, ভীত আর একাকী,
কেবলই একটি গল্প।
একটি সত্তা।

ভ্যান গগের প্রার্থনা
য়াানুস পিলিন্সকি

গমখেতে একটি যুদ্ধের পরাজয়
আর আকাশে এলো বিজয়।
পাখি, সূর্য আবার পাখি।
রাত্রিরে, আমার জন্য কী অবশিষ্ট রইলো?

রাত্রি, কেবল এক সারি বাতি,
হলুদ রঙের এক জ্বলজ্বলে দেয়াল,
আর নিচে বাগানে, গাছগুলোর মাঝে
মোমের সরির মতো, জানালার শার্সি;

সেথায় একদা বাস করেছিলাম, বাস করি না আর–
আমি বাঁচতে পারি না এখন যেখানে একসময় বেঁচেছিলাম, যদিও
সে ছাদ আমাকে ঢেকে রাখতো
প্রভূ, তুমি আমাকে ঢেকে রেখেছো অনেক আগেই।

তারাভরা রাত
অ্যান স্যাক্সটন

সেটা আমাকে আটকে রাখে না ভয়াবহ প্রয়োজনীয়তায়–আমার কী শব্দটি বলা উচিত–ধর্মের। তারপর আমি বাইরে যাই রাত্রিতে তারাদের ছবি আঁকতে। –ভিনসেন্ট ভ্যান গঁগ, ভাইকে লেখা চিঠি

শহরটির অস্তিত্ব নেই
কেবল যেখানে এক কালো-চুলের বৃক্ষ হারায়
এক ডুবন্ত নারীর মতো উষ্ণ আকাশে।
শহরটি স্তব্ধ। রাত্রি তপ্ত হয় এগারোটি
নক্ষত্র নিয়ে।
ও তারাভরা রাত! এইভাবেই
আমি মরতে চাই।

সে নড়ে ওঠে। তারা সবাই জীবিত।
এমনকি গোলাকার চাঁদ স্ফীত হয় তার কমলা নিগড়ে
শিশুদের আলোড়িত করে, দেবতার মতো, তার চোখ দিয়ে।
বৃদ্ধ অদেখা সাপ গিলে ফেলে তারাদের।
ও তারা, তারাভরা রাত! এইভাবেই
আমি মরতে চাই।

রাত্রির ধাবমান পশুর মতো,
সেই বিশাল ড্রাগন শুয়ে নেয়, ফালি করে
আমার জীবন কোন পতাকা নাই,
উদর নাই,
ক্রন্দন নাই।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.