প্রবন্ধ

উপেক্ষিত অনুবাদের পক্ষে

আনিসুর রহমান | 25 Nov , 2018  


পৃথিবীতে অনুবাদের ইতিহাস মোটামুটি সাড়ে চার হাজার বছরের। অনুবাদের শুরু হয়েছিল মতবাদ প্রচারের প্রয়োজনে। আধুনিক জীবনে অনুবাদের গুরুত্ব নানাবিধ কারণে। ব্যবসা, ধর্ম, রাজনীতি অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রশাসন, সকল স্তরে অনুবাদের প্রয়োজন কম আর বেশি। তবে অনুবাদের মোক্ষম গুরুত্বের জায়গা হচ্ছে সাহিত্য বা এক ভাষাগোষ্ঠীর ভাবনা ও কল্পনার সঙ্গে অন্যবিধ ভাষাগোষ্ঠীর ভাব আদান প্রদানের উপায় হচ্ছে অনুবাদ। পৃথিবীর ভাষা বৈচিত্র্যের বিকাশের নিমিত্তে অনুবাদের বিকল্প আর কি আছে? আমার জানা নাই।
অনুবাদ নিয়ে এত কথা বলার কারণ হচ্ছে সম্প্রতি বাংলা একাডেমীতে একটি কর্পোরেট উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা আন্তর্জাতিক অনুবাদ উৎসব নামে দিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠান হয়ে গেল। খোঁজ খবর নিয়ে যতদূর জেনেছি আয়োজনটা মোটামুটি অসফল হয়েছে। তবে এরকম উদ্যোগ সাধুবাদ পেতেই পারে, সেটা কর্পোরেট পরিমণ্ডল থেকেই হোক আর প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকেই হোক।

লেখার শুরুতেই একটা কথা বলে নেই– অনুবাদের দোহাই দিয়ে আমরা কি ইংরেজির গ্রাসে এবং ইংরেজিজীবী পণ্ডিতিদের করায়ত্তেই থেকে যাব? আমাদের দেশে অনুবাদ নিয়ে যৎসামান্য কথাবার্তা যা হয় তা প্রায় পুরোটা ইংরেজি বলয়ের মধ্য থেকেই। এমনকি অসফল এই অনুবাদ উৎসবের ওয়েবসাইটের যাবতীয় উপাত্ত ইংরেজিতে। আমার প্রশ্ন আমরা যদি অনুবাদের উৎসবই করব তাহলে আমাদের যাবতীয় বিবৃতি ইংরেজির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাতে কেন নয়? এর সঙ্গে জড়িত কর্তা উপদেষ্টা মিলে ওয়েবসাইটে যাদের নাম ছাপা হয়েছে তাদের সকলেই বাংলাদেশ এবং ভারতের এবং তাদের নাম দেখে ধারণা করা যায় তাদের খুব সম্ভব সকলেই বাংলা ভাষাটা জানেন। তারপরও আমাদের উৎসবের নামে ইংরেজি ফুটানি দেখাতে হবে কেন? এই অনুবাদ উৎসব নিয়ে আমার কথা এইটুকুই। এবার আলোকপাত করতে চাই অনুবাদ শিক্ষা নিয়ে।

একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। আমাদের দেশ অনুবাদ নিয়ে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে কোনো ইতিহাস বা দৃষ্টান্ত আছে কি? যতদূর জানা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক অনুবাদ ব্যুরো নামে একটা কেন্দ্র চালু করা হয়। খোঁজ খবর নিয়ে যতদূর জানতে পারলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) পদাধিকার বলে এর চেয়ারম্যান। এর আর কোন ইতিবৃত্ত জানা সম্ভব হয় নি। প্রায় অর্ধশতকে এই অনুবাদ ব্যুরো কোন কার্যক্রম কারো চোখে পড়ে নি। এই যদি হয় দেশের প্রধান এবং প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুবাদ ব্যুরোর চিত্র তাহলে দেশের বাকি পরিম-লে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অনুবাদ শিক্ষা চর্চার কি অবস্থা তা আল্লা মালুম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুবাদ ব্যুরো নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে এটাকে সংস্কার ও পুনর্গঠন করে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটরে অধীনে এনে একটা স্বতন্ত্র বোর্ড করে এর কার্যক্রম ও পরিধি যুগোপযোগী করা সম্ভব। এই সাংগঠনিক কাঠামোতে সম্ভাব্য ও বিদ্যমান বিদেশি ভাষা যেমন আরবী, ফার্সি, ফরাসী, স্প্যানিশ, জাপানী, চীনা, রাশিয়ান, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, জার্মানি, কোরিয়ানসহ বাংলা এবং আমাদের দেশের আদিবাসী ভাষাভাষীদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার। এই ব্যুরোর কাজ হবে অনুবাদ শিক্ষা, চর্চা ও অনুশীলন। একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রসার ঘটানো।

অন্যদিকে বাংলা একাডেমী অনুবাদের জন্যে নানা উদ্যোগের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। আর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য অনুবাদের জন্যে প্রকল্প গ্রহণ ও বিদেশী বইমেলায় অংশগ্রহণের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে। প্রকাশক সমিতি এ বিষয়ে গ্রন্থকেন্দ্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে পারে। আর বিদেশি সাহিত্য অনুবাদের বিষয়টা ঢাকাস্থ বিদেশের বিভিন্ন সংস্কৃতিক কেন্দ্র ও দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্যতা যাচাই করে নেয়া যেতে পারে।
বাংলা একাডেমী অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুবাদ ব্যুরো তরুণ লেখক প্রকল্পের আদলে তরুণ অনুবাদ প্রকল্প হাতে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা যেন প্রথাগতভাবে ইংরেজির করায়ত্তে ঢুকে না যাই।

একই সঙ্গে অনুবাদকে যদি আমরা তরুণদের জন্যে কর্মসংস্থানের বিষয় হিসেবে দেখতে চাই, সেক্ষেত্রেও একটা অনুবাদ নীতিও থাকা দরকার বিশেষ করে অনুবাদের জন্যে প্রণোদনা ও সম্মানী বা পারিশ্রমকি নির্ধারণের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে সরল সহজ একটা আদর্শ চুক্তির নমুনাও থাকা দরকার। তাহলে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যে ঝামেলা এড়ানো সম্ভব হবে।
আমাদের দেশে প্রতিবছর শত শত অনুবাদের বইও বের হয়; তা গুণগত মানে ভাল হোক আর মন্দ হোক। আদতে আমাদের শতশত অনুবাদকও রয়েছে। এই কারণে আমাদের দেশে একটা জাতীয় অনুবাদক পরিষদ অথবা জাতীয় অনুবাদক ইউনিয়নও করা সম্ভব।
যে প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে আসি ঢাকা অনুবাদ উৎসব। এ ধরনের উৎসব যদি কর্পোরেট উদ্যোগের পরিবর্তে পেশাদার অণুবাদকদের পরিষদ বা ইউনিয়ন থেকে আসে তা ব্যার্থ হবার সম্ভাবনা থাকে না এবং তা লাগসই করা সম্ভব। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে অনুবাদকদের স্বতন্ত্র ইউনিয়ন রয়েছে। প্রায় ৫০ লক্ষ লোকের দেশ নরওয়েতে অনুবাদকদের জন্যে যদি আলাদা ইউনিয়ন থাকতে পারে, তাহলে ষোল কোটির লোকের আমাদের দেশে নয় কেন?
Flag Counter


3 Responses

  1. Rashed Uzzaman says:

    ঢাকা ট্রান্সলেশেন ফেস্ট ২০১৮ নিয়ে প্রবন্ধ লেখায় প্রথমেই লেখক আনিসুর রহমানকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু লেখক যে অনুষ্ঠানটিতে অংশ নেন নি, বা যথেষ্ট তথ্য যোগাড় করেন নি, তা লেখা থেকেই স্পষ্ট হলো। এর ফলও যা-হবার-তাই গোছের হলো। ভুল তথ্যে ও বিশ্লেষণে বিভ্রান্তি বাড়ানো হলো শুধু। আমি ফেস্টিভালে গিয়েছিলাম এবং সে-অভিজ্ঞতা থেকে লেখকের কিছু ভ্রান্তির অপনোদন করা যেতে পারে:
    ১. ঢাকা ট্রান্সলেশেন ফেস্ট ২০১৮ কর্পোরেট উদ্যোগে হয় নি এবং কর্পোরেট উদ্যোগের অংশও নয় এটি। এর আয়োজন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল। এর পেছনে-সামনে সর্বত্র ছিলেন কয়েকজন কবি ও প্রথিতযশা অনুবাদক। নাম করা যায়, যেমন: অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ফখরুল আলম, কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত, সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক, শামসাদ মুর্তজা প্রমুখ।
    ২. এ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত অনুবাদক ও একাডেমিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সবার মাতৃভাষা বাংলা নয় এবং সবাই বাংলা বোঝেনও না।
    ৩. অনুবাদ উৎসবে স্বভাবতই একটি মাল্টি-লিঙ্গুয়াল পরিবেশ ছিল, যেখানে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় উপায় ছিল কি?
    ৪. এ ধরনের উদ্যোগ, যতোটা জানি, বাংলাদেশে প্রথম। এই অনুবাদকেন্দ্রিক উৎসবের আয়োজন কি অসফল? সাফল্য কোন নিক্তিতে মাপব? সংখ্যায়? মিডিয়ার প্রবল আলোড়নে? নাকি অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহের মধ্য দিয়ে? অনুষ্ঠানে গিয়ে বুঝেছি সব মানদণ্ডের ভিত্তিতে সাফল্য আয়োজকরা চান নি। তবু কিছু অর্জন তো আছেই। আরও বড় আয়তনের আয়োজন করার শক্তি এরা একসময় নিশ্চয়ই অর্জন করবেন। বর্তমানের আয়োজন তার প্রথম ধাপ হিসেবেই দেখতে পারি।
    এছাড়া অনুবাদ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে আনিসুর রহমান যা বলেছেন, সেসব জরুরি ও ভাববার মতো। লেখকের এই ভাবনাগুলোকেও আলোড়িত করতে পেরেছে এই ʻঅসফলʼ অনুবাদ উৎসব, এখানেই তার সাফল্য ও সান্ত্বনা।

  2. Ajitkumer Roy says:

    আনিসুর রহমানের হয়তো জানা নেই বাঙলা একাডেমি এক সময় উচ্চ পর্যায়ের একাডেমিক বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করেছে। সেগুলোর অধিকাংশ বাজারে কাটেনি, পোকায় কেটেছে। – বাংলাদেশের ছাত্রেরা বাংলা ভাষায় উচ্চ শিক্ষা চায় না। তাই অনুবাদও হয় না। এটা সরল অর্থনীতির বিষয়। চাহিদা নেই, তাই সরবরাহও নেই। Say’s Law খাটিয়ে ফলোদয় হবে মনে করি না। – অজিতকুমার রায়, ঢাকা।

  3. ঢাকা ট্রান্সলেশন ফেস্ট ২০১৮: ‘গোড়াতেই গলদ’

    এই আয়োজনটার গোড়াতেই গলদ| এর নামটাও নেওয়া হয়েছে বিতর্কিত ঢাকা লিস্ট ফেস্টের আদলে: ঢাকা ট্রান্সলেশন ফেস্ট|মাতৃভাষা বাংলাকে অবজ্ঞা কেন? বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি আসতে আপত্তি নেই| কিন্তু বাংলাকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠানের নামে ইংরেজি আদিখেতার দরকার কি?
    এই আয়োজনের গলদ জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক লেখায় কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে; http://web.dailyjanakantha.com/details/article/381274/%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A4/

    কিছুটা তথ্যের ঘটতি থাকতে পারে, তাই কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করলাম:
    আয়োজকরা একদিকে প্রচার করছেন ’ In partner with Rubric Publishing’.
    ভারতের এই প্রকাশনা কোম্পানীর সঙ্গে এরকম আয়োজনের উদ্দেশ্য কি?
    যে সকল দানশীল ব্যাক্তির বদান্যতায় এই আয়োজন, ওনারা কারা?
    যাঁকে এই আয়োজন থেকে পুরস্কৃত করা হল, তিনিও তো আয়োজকদের একজন|
    আয়োজকরা কি তাহলে নিজেদের পুরস্কৃত করার জন্যে এরকম উদ্যোগ নিলেন?
    যিনি পুরস্কার নিলেন তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্ম কি?
    এই পুরস্কারের মূল্যমান কত? এর বিচারক কারা ছিলেন? পুরস্কারের অর্থ কে দিলেন?
    পেছনে-সামনে সর্বত্র যে সকল প্রতিথযশাদের কথা বলা হল তাদের কয়েকজন যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিলেন সেখানকার অনুবাদ ব্যুরোকে কার্যকর করার জন্যে দৃশ্যত ওনারা কোন অবদান রাখতে পারেন নি ! এখন এই বয়সে জীবনের পড়ন্ত বেলায় নিজেরা নিজেদেরকে পুরস্কৃত করে সাহিত্যের কোন ইতিহাস সৃষ্টি করতে চান?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.