প্রবন্ধ

পূর্ণতা কিংবা সৌন্দর্য শুধু কাল ও স্থানমাত্রার গণ্ডীতেই বাঁধা

দেবব্রত চক্রবর্তী | 19 Nov , 2018  


জাঁ ককতো একবার শিল্পী নীরদ মজুমদারকে বলেছিলেন, অর্ফিউস ও ইউরিডাইক-ভিত্তিক তাঁর অর্ফি (Orphée) নামের যে চলচ্চিত্র, তা ভারতীয়রা বুঝবে না তা হয় না, কারণ তারা অলৌকিকে বিশ্বাস করে৷ গ্যুন্টার গ্রাসের প্রসঙ্গ এলেও তেমনি দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে পুরাণ, কুসংস্কার, অতিরঞ্জন যা তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য, তা ভারতীয়েরাও বুঝবে, কারণ এসবের সঙ্গে আমাদের বিলক্ষণ পরিচয় আছে৷
ভারতবর্ষের বাঙালীদের সঙ্গেও গ্রাসের পরিচয় বেশ নিবিড়৷ আমরা সবাই জানি এই দেশের প্রতি তাঁর একটা প্রচ্ছন্ন ভালবাসা আছেই৷ ১৯৮৬-৮৭-তে প্রায ছমাস কলকাতা ও তার শহরতলীতে কাটিয়ে গেছেন তিনি, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লিখেছেন ৎসুঙে ৎসাইগেন নামক ভ্রমণ কথা, যেটা জিভ কাটো লজ্জায় নাম দিয়ে আমি অনুবাদ করি৷
এম.সি.সরকার অ্যান্ড সন্স ওই বাংলা অনুবাদটি ছাপান ১৯৯০-এ৷ সম্ভবত আমার আগের একটি কাজ দেখেই খ্যাতনামা চিত্র ও নাট্যসমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের কাছে আমাকে দিয়ে কাজ করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ ১৯৮৯-র গোড়ার দিকে কাজটা আমার হাতে এলে আমি বলতে কি একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম৷ গ্রাসের ব্যবহৃত শব্দ বা বাক্যাবলী যে আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল তা নয়, কিন্তু তাঁর পেশকারীটা আমার কাছে বেশ অন্যরকম লেগেছিল এবং তাকে বাংলায় ফুটিয়ে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য বলে মনে হয়েছিল আমার, কারণ গ্রাস নিজের বিভিন্ন অন্তর্দিগন্তকে লেখার মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন, তাতে আমার বারবার মনে হচ্ছিল যে তিনি শুধু লেখক নন, তিনি কবি, গ্রাফিক শিল্পী, ভাস্কর, এবং মাঝে মধ্যেই আলোকচিত্রী, এবং কি আশ্চর্যের কথা, বইটিতে কখনও কখনও একটি রেসিং-কার-ও চালিয়েছেন তিনি৷

বই পড়তে পড়তে এইসব কথাই মনে হচ্ছিল আর ভাবছিলাম একে শব্দে শব্দে বাক্যে বাক্যে স্থানান্তরিত ক’রে দিয়ে চলে আসব, কাজটা অত সোজা না৷ মেজাজ আর গতি, এই নিয়ে লেখক যেভাবে একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে ছুটে সরে সরে যাচ্ছেন, সেইটাকে অনুসরণ করতে পারলে তবেই আমার কাজ সার্থক! গ্রাস কলকাতাকে দেখেছেন একটা শিল্পীর চোখ দিয়ে আর তাঁর অভিব্যক্তিকেও ভাষার মোড়কে খানিকটা খানিকটা ক’রে নিয়ন্ত্রিত করেছে তাঁর চিত্রশিল্পী ও ভাস্করের সত্তা৷ সুতরাং তাঁকে অনুবাদ করা মানে তাঁর অভিপ্রায়কে বুঝে নেওয়া৷ কান পেতে শুনতে চেষ্টা করেছি তাঁর গদ্যের ছন্দ, মাঝে মাঝে উচ্চারণ ক’রে পড়েছি তাঁর জার্মান গদ্য ও পাশাপাশি আমার অনুবাদ, একটা তুল্যমূল্য করতে চেষ্টা করেছি তাঁর ছন্দ ও শব্দের ধ্বনিময়তার৷


জিভ কাটো লজ্জায়-এর প্রথম অনুচ্ছেদের “চ্যালেঞ্জ”-টাই তো সেরকম৷ বারবার অনুবাদ করছি আর বারবার হাত থেকে তা পিছলে যাচ্ছে৷ তিনবার করেছি, তবুও তুষ্ট হতে পারছি না৷ শেষে হাল ছেড়ে দিলাম, এগিয়ে গেলাম, চলছি আর বারবার ফিরে ফিরে আসছি, দেখছি এবার পারি কিনা, অন্যত্র গেলেও মাথার মধ্যে ওই অপারগতার কথাটাই ঘুরঘুর করছে৷ একদিন ট্রামে বাড়ি ফিরছি, শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় এল, হঠাৎ মাথায় বিদ্যুতের মত খেলে গেল যে গ্যোয়েটে ইনস্টিটিউট-এর জার্মান শিক্ষক হান্স-ইয়ুর্গেন গিয়ারলিশ তাঁর শ্রেণীকক্ষে ড্যোয়বলিন-এর “বেয়ার্লিন আলেকসান্ডারপ্লাৎস”-এর একটা অনুচ্ছেদ কিভাবে পাঠ ক’রে দেখাচ্ছিলেন, বোঝাচ্ছিলেন গদ্যের চাল-টা কিরকম, অভিনয় ক’রে দেখাচ্ছিলেন, যেন এখনও কানে বাজছে তাঁর ব্যারিটোন-কন্ঠস্বর, তাঁর পাঠ ঘোড়ার একটা কদমচাল, একটা বিশেষ তাল অনুসরণ করছিল, একটা নাটকীয়তা ছিল তার মর্মে৷

ওই ছন্দটাই আমার মাথায় চেপে বসল৷ কল্পনা এসে সামনে হাজির ক’রে এনে দিল একটা অনুরূপতা (analogy) আর অন্তরের পর্দায় ফুটে উঠল বাংলা অনুবাদের সেই অব্যর্থ পঙক্তিমালা, যা আমি প্রকাশ করেছি৷ তখন আমি পুড়ছি, কখন সেই বাক্যগুলি লিখে রাখব, বাড়ি কাছে এসে গিয়েছিল, আমি দ্রুতপায়ে বাড়িতে এসে আর কোনও বাক্যব্যয় না ক’রে বাক্যগুলি লিখে ফেললাম খাতায়৷
পাঠকেরা দেখতে পারেন যে প্রথম অনুচ্ছেদের অংশটা আসলে একটা চলচ্চিত্র গ্রহণের তৎপরতার মধ্যে দেখা শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের ঘোড়সওয়ার নেতাজীর মূর্তি৷ ক্যামেরা উঠছে, প্যান করছে, জুম করছে, ট্রলি চলছে জোর কদমে, গদ্যের চালটা যেন তার গভীরতার মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে৷

তাঁর গদ্যের চেহারার কথা ভাবতে গিয়ে কখনও কখনও আমাদের বাংলার লেখকদের গদ্যের সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজতে চেষ্টা করেছি৷ আমার অভিজ্ঞতায় তো এমন কাউকে দেখতে পাইনি যাঁর সঙ্গে গ্রাসের সুররিয়ালিজম বা তাঁর বারক-রীতির ভাষা তুলনীয় হতে পারে৷ তবে কারও কারও গদ্যের স্পন্দনে গ্রাসের গদ্য যে সাড়া দেবে না তা নয়৷ সেটা আংশিকভাবে বিষয়বস্তুর দিক থেকে হোক কিংবা ভাষার দিক থেকে হোক৷ যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে এমন একটা জগতকে আবাহন ক’রে আনেন, যার নাম শৈশব, তার একটা অনুরণন গ্রাসের টিন ড্রাম-এর মধ্যেও দেখতে পাই৷ দেখি গ্রাস-এর নায়ক ওস্কার বারবার চাইছে একটা স্থায়ী শৈশবের মধ্যে জীবনযাপন করতে৷ আবার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও কিছু কিছু সুররিয়ালিজম-এর চিহ্ন ফেলে রেখে যান তাঁর উপন্যাসে যা গ্রাসের সঙ্গে তুলনীয়৷ কমলকুমার মজুমদারের একখানা উপন্যাসকে তো বেশ ভাল মতই তুলনা করা যায় তাঁর টিন ড্রাম উপন্যাসের বারক ভাষার সঙ্গে, যেটার নাম অন্তর্জলী যাত্রা৷ তাঁর বারক-লীরিক-এর মৃদু প্রতিধ্বনি পাওয়া যেতে পারে শঙ্করনাথ চক্রবর্তীর কবিতায়, পুরাণ-সুররিয়াল গদ্যে কখনও মধুময় পালের রচনায়৷ এই বিষয়বস্তু ভি্ত্তিক ও ভাষানির্ভর মিলের চিহ্নমালা শুধু একটা সত্যকেই উন্মোচন করে, আর তা হল : মানুষের প্রকৃতি সারা পৃথিবীতেই সমানধর্মা৷ সকলের মননের সঙ্গেই সকলের অজানিতে একটা দুর্মর আত্মীয়তা ক্রমবহমান৷

বাংলা ভাষা স্বভাবে খুব শান্ত৷ পড়তে গেলে তার উচ্চারণ রীতিও উচ্চাবচতা সয় না, সমতালে চলে৷ সে তুলনায় জার্মান ভাষার স্বরায়নের মধ্যে বড়ই ওঠাপড়া (highly accentuated), আর তার ওপর গ্রাসের ভাষার লম্ফ ঝম্প তারও এক কাঠি বাড়া৷ সেটা যে শুধু জিভ কাটো লজ্জায় রচনায় লভ্য তাই নয়, সেটা তাঁর প্রথম উপন্যাস টিন ড্রাম-এও সকলে লক্ষ করেছেন৷ যুদ্ধ চলাকালীন এবং তার পরবর্তী আবহের এই উপন্যাসে সময়ের অস্থিরতাটাকে গ্রাস নিখুঁতভাবে ধরতে চেষ্টা করছেন ব’লেই তাঁর গদ্যের চাঞ্চল্যটাও খুব বেশী, অশান্তিটা অনিবার্য এবং গতির ওঠাপড়াটা সাংঘাতিক৷ অনুবাদের সময় এই দুটি ভাষার স্বভাবজ ভিন্নতা ও সাহিত্যের উজ্জ্বল পার্থক্য আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল, এছাড়া দুই সমাজের যে জোরালো একটা সাংস্কৃতিক তফাত, সেটা সম্পর্কেও সচেতন ক’রে দিচ্ছিল৷ সুতরাং বাঙালী পাঠক যদি বাংলা সাহিত্যপাঠে একটা শান্তশিষ্ট গদ্যপ্রবাহের অংশীদার হন, তাহলে আমার মনে হয় যে অনুবাদ করতে গিয়ে গোটা গ্রাস-কেই আমি তাঁর গদ্যের গতি, তাঁর “অ্যাটিটিউড” ও কালৌচিত্য-বিধানের মধ্য দিয়েই আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেছি এবং সেক্ষেত্রে একটুও ভুল করিনি৷

এই কথাগুলির মধ্য দিয়েই হয়তো বোঝাতে পেরেছি যে গ্রাসকে বাংলায় আনতে গিয়ে আমি বাংলাভাষার স্বভাববহির্ভূত একটি গদ্যরীতি তৈরি করতে চেষ্টা করেছি যেটা বাংলা ভাষায় ছিল না এবং যেটা গ্রাস-অনুসারী৷ গ্রাসকে মূল জার্মানে পড়তে গেলে যে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসটা পাওয়া যাবে, বাংলায় পড়তে গেলে এখানেও আমাদের ষড়চক্রে সেইরকমই একটি বায়ু বহমান হবে এবং সকলে জানবেন যে বাংলাভাষা এত ঐশ্বর্যশালী বলেই সেটা সম্ভব হল (মানে তাঁদেরই ভাবনার বিপরীতে যাঁরা বলেন বাংলার আছেটা কি)৷ আমি যদি মাত্র এইটুকু ব’লে ছেড়ে দিই তাহলেই সকলে বুঝতে পারবেন বাংলা ভাষার জোর আর জোশ কতখানি৷

১৯৮৮-তে মূল জার্মান বই ৎসুঙে ৎসাইগেন প্রকাশের সময় জার্মানিতে যে ঝড় উঠেছিল, সেটা স্তিমিত হয়ে গেলেও বাংলা অনুবাদ জিভ কাটো লজ্জায় যখন ১৯৯০-এ কলকাতায় প্রকাশিত হল, তখন সেটা নতুন ক’রে এখানে আবার ফিরে এল৷ আমি তখন কয়েকজন কেউকেটা ভারতীয় ও জার্মানকে বলতে শুনেছিলাম যে এই বইটাতে গ্রাস কলকাতা সম্পর্কে এমন সব খারাপ খারাপ কথা লিখেছেন যে এর অনুবাদই বন্ধ ক’রে দেওয়া উচিত৷ একজন ভারতীয়-বাঙালী কবি, যিনি বইটি জার্মান ভাষায় পড়েছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, গ্রাস পশ্চিমবঙ্গের কম্যুনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নামে যা তা বলছেন, এ বইয়ের অনুবাদ আপনার প্রত্যাখ্যান করা উচিত৷ পীড়াপীড়িই করেছিলেন৷ এর পর তিনি আবার প্রকাশকের কাছে গিয়ে ভয় দেখিয়ে এসেছিলেন, বলেছিলেন আপনি বই প্রকাশ করবেন না, করলে সরকার আপনাকে গ্রেপ্তার করবে৷ কিন্তু প্রকাশক খুব একগুঁয়ে লোক ছিলেন, তিনি অত সহজে হাল ছাড়বার মানুষ ছিলেন না৷ পরে জানা গিয়েছিল বইটা তিনিই অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সফল না হওয়ায় তাঁকে রাজনীতি করতে হয়েছিল৷


পশ্চিমবঙ্গের প্রিন্টমিডিয়ার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নানান ওঠাপড়া ছিল৷ কেউ কেউ বলছিলেন যে গ্রাস কলকাতাকে এমনভাবে বিচার করেছেন যে যেন এটা তাঁর পিতৃশহর৷ কেউ আবার ছিলেন তাঁর আঁকা কলকাতার ছবির কঠোর সমালোচক৷ কারও কাছে তাঁর দৃষ্টিকোণ ছিল বিদ্রূপের৷ রমাপদ চৌধুরী বিখ্যাত সাহিত্যপত্র দেশ-এর পাতায় এই অনুবাদকে পণ্ডশ্রম বলেছিলেন৷ যদিও অনুবাদককে তিনি প্রশংসাই করেছিলেন, কিন্তু কলকাতা সম্পর্কে গ্রাসের দৃষ্টিভঙ্গীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ক’রে তিনি গ্রাসকেই আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন এই বইটির জন্য লজ্জায় তাঁর নিজেরই জিভ কাটা উচিত৷ কেউ গ্যুন্টার গ্রাসকে কুন্ঠার গ্রাসে পতিত দেখতে পেয়েছিলেন, আবার একজন বিজ্ঞ জার্মান রাগরঞ্জিত কন্ঠে আমাকে বলেছিলেন গ্রাস-এর প্রতিবেদন জার্মানদের ভারতচিত্রটাকে চুরমার ক’রে দিয়েছে৷ ১৯৯৮-এ ল্যুইবেক-এ গেলে গ্রাস আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ৎসুঙে ৎসাইগেন সম্পর্কে আমার মত কী৷ আমি বলেছিলুম এটা কলকাতার প্রতি তাঁর ভালবাসার ভাষ্য৷ আপাত অবমূল্যায়নের নিচে এক গভীর স্বরায়ন৷ শহরের অভিভাবকদের শাণিত সমালোচনা শহরের প্রতি তাঁর ভালবাসাকেই স্পষ্ট ক’রে তুলেছে৷ এর পরের বছর গ্রাস নোবেল পুরস্কার পান৷ তখন পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ পালটে যায়৷ জিভ কাটো লজ্জায় বইটির বিক্রী যেভাবে ব্যাহত হয়েছিল, কয়েকদিনের মধ্যেই সব কপি নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং যাঁরা ১৯৯০-এ তাঁর কঠোর সমালোচক ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে তাঁর পদবন্দনায় মুখর হয়ে ওঠেন, তাঁকে নিয়ে বই লেখার প্রতিযোগিতা শুরু হয়৷ উদ্দেশ্য এইভাবে তাঁর গায়ে গা ঘষে যদি নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে নিজেদের দূরত্বটা কমিয়ে ফেলা যায়৷

গ্রাসের অন্য যে বইটা আমি অনুবাদ করি সেটা তাঁর জীবনের প্রথম লেখা উপন্যাস, টিন ড্রামজিভ কাটো লজ্জায় যদি নদী হয় তাহলে টিন ড্রাম একটা সমুদ্র৷
একটা বই অনুবাদ করবার আগে আমার অভ্যেস হল বইটা শুধু একটু পড়ে নেওয়া নয়, সঙ্গে সঙ্গে নোট নেওয়া, গবেষণামূলক অনুসন্ধান চালানো, পশ্চাৎপট ভাল ক’রে খুঁটিয়ে বিচার বিবেচনা করা, অজস্র প্রশ্নের উত্তর-সন্ধানে আত্মনিয়োগ করা, বাংলা ও জার্মান সাহিত্যের পার্থক্য ও মিলনবিন্দুগুলি পর্যালোচনা করা৷ এর অভিজ্ঞান হিসাবে আপনারা দেখবেন, আমি বিস্তৃত টীকা টিপ্পনী দিতে কার্পণ্য করি না৷ পুরো বিষয়টাকে আমি তাই ভাগ ভাগ ক’রে দেখি না, দেখি একসঙ্গে, সমবেতভাবে, ঐক্য ও বৈচিত্র্য সম্বন্ধে যথাসম্ভব সজাগ থেকে, সহিষ্ণুতার একটা ধারা বজায় রেখে৷ আসলে সাহিত্যের অনুবাদে আমাদের সবসময় একটা দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়, সময়ের দুই পাড়ে দুটি সমাজের, দুটি সংস্কৃতির যে আপাত বৈচিত্র্য আছে তাকে আত্মস্থ ক’রে নিতে হয়, আর টিন ড্রাম তো সেই অর্থে সত্যিই কোনও ব্যতিক্রম নয়৷

পড়তে গিয়ে টিন ড্রাম উপন্যাস তো গোড়া থেকেই আমার মনের মধ্যে গেড়ে বসে গিয়েছিল৷ তার পুরাণকথায় কী টান! উপন্যাসের বহু মুহূর্তই এত অনুপুঙ্খ, তার অন্তর্গত পুরাণকথাগুলি এত বাস্তব প্রকারে উপন্যাসের পরতে পরতে ঢুকে গিয়েছে যে সেগুলিকে যেমন উপন্যাস থেকে বার ক’রে ফেললে উপন্যাসের হানি হয়, তেমনি অটুট ক্যানভাসটা দেখেও একটা ধাঁধায় পড়ে যান পাঠকবৃন্দ৷ আমার নিজের কাছে যেন মনে হয় যে সেই কথা ও কাহিনীগুলি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের সত্তাকে গভীরভাবে নাড়া দিতে থাকে৷

ওস্কার-এর দিদিমা আনা কালিয়াইচেক-এর কথাই ধরা যাক৷ তাঁকে দিয়েই তো গ্রাস-এর এই পৌরাণিক সফর শুরু! চরিত্রটি আমার সঙ্গে আঠার মত লেগে ছিল গোড়া থেকেই৷ আমি তাঁকে দেখেছি মায়ের একটা “আর্কিটাইপ” হিসাবে, তিনি শক্তিরূপিনী, ধরিত্রী মায়ের বিগ্রহ প্রমাণ এবং মানবজাতির সমবেত অবচেতনের অংশও তিনি, যা কার্যত সারা পৃথিবীতে অসংখ্য পুরাণকথার গভীরে প্রোথিত রয়েছে৷ তাঁর আদি নারীশক্তি, সৃষ্টি, স্থিতি ও ধ্বংসের তেজঃপুঞ্জ এই উপন্যাসের পিছনে একটা মহাশক্তি হিসাবে লীলায়িত হয়েছে৷

পশ্চিমবাংলায় একজন দেবী বিশেষভাবে পুজিত হন, যিনি হয়তো সেরকম গণ্যমান্য নন, তবু তাঁর কথা আমার এখানে খুব মনে হয়৷ তিনি মাতৃরূপেণ সংস্থিতা, উর্বরতার দেবী মা ষষ্ঠী, ঘরে ঘরে যিনি প্রতিটি গর্ভিনী নারীর প্রসব যন্ত্রণা লাঘব ক’রে নবজাতকের জন্ম নিশ্চিত ও সুরক্ষিত রাখেন৷ বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়ায় মা ষষ্ঠীর একটা ছোট্ট মাটির মূর্তি ওরা তৈরি করে, “মনোক্রোম” এই মূর্তিটির মুখখানা বেড়ালের৷ গ্যুন্টার গ্রাস এই পাঁচমুড়াতে গিয়েছিলেনও৷ আমি মনে মনে আনা কালিয়াইচেক-কে এই মায়ের সঙ্গে তুলনা করি, তাঁর চেহারার সঙ্গে নয়, তাঁর পৌরাণিক দিকটির কথা বিবেচনা ক’রে৷


এই পৌরাণিক সূত্রের পাঠ ও অন্তর্তদন্ত আমার সঙ্গে হিন্দুধর্মীয় শক্তির অসংখ্য লৌকিক রূপের একটা সম্পর্ক তৈরি ক’রে দেয়৷ হিন্দুধর্মে এমন অনেক জানা ও অজানা দেবীই রয়েছেন যাঁরা মাতৃশক্তির রূপ৷ আমার বড় মনে পড়ে অথর্ববেদের ভূমিসূক্ত বা পৃথ্বীসূক্তের কথা যেখানে পৃথিবীর চারটি দিক এই মৃৎমাতৃকার মধ্যে বিরাজ করে বলা হয়েছে৷ শুধু তাই নয়৷ আমাদের জীবনের মূল উপকরণ বায়ু, মাটি, আগুন, জল এই চারটিও কি দিদিমার স্ফীত ঘাঘরার সঙ্গে তুলনীয় নয়? চারটি ঘাঘরা মিলেই যেন সমগ্র সৃষ্টির একটা সঙ্কেত৷ ওই ঘাঘরার নিচ থেকে জীবন প্রস্ফুরিত হচ্ছে, “ওখানে বহু স্রোত এসে মিলেছে, ওখানেই আছে বিভিন্ন জলের সীমারেখা৷ ওখানে অন্য এক বায়ু বহমান, কিংবা বাতাসই হয়তো ওখানে স্তব্ধ, ওখানে বৃষ্টি পড়ার শব্দ আছে অথচ শুকনো জায়গার অভাব নেই, ওখানে জাহাজ স্থাণুবৎ, কিংবা নোঙর তুলে ভাসছে৷ ওখানে ওস্কার-এর পাশে প্রিয় ঈশ্বর এসে বসেছেন, উষ্ণতায় ভরিয়ে দিয়েছেন, ওখানে শয়তান তার দূরবীণ পরিষ্কার করছে, ছোট ছোট দেবদূতেরা অন্ধ গরুর খেলায় মত্ত হয়ে উঠেছে, আর আমার দিদিমার ঘাঘরার নিচে চিরনিদাঘ — — ক্রিসমাস ট্রী যতই পুড়ছে, ঈস্টার-এর ডিম যতই খোঁজা হচ্ছে, সাধুসন্তের তিথি যতই পালন করা হচ্ছে, ওখানে কিন্তু একটানা সেই এক ও অদ্বিতীয় ঋতু৷ ক্যালেন্ডারের কোনও পাতায় আমি শান্তি খুঁজে পাইনি, যেটা পেয়েছি দিদিমার ওই ঘাঘরার নিচে৷” (টিন ড্রাম, ২০১৫ পৃ ১৪৪-১৪৫)

জানি, অনুবাদকের সংগ্রামটা কিরকম৷ সেই পুরোনো বস্তাপচা কথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভুতের হাত দিয়ে তার দিকে তাক করা হচ্ছে অবিরাম, বলা হচ্ছে অনুবাদ ব্যাপারটাই অসম্ভব৷ অনুবাদ হাতে নিলেই তাই আমার কেমন যেন ভয়ে বুকটা শুকিয়ে যায়: মূলের যে সঙ্গীতময়তা, যে গভীর কন্ঠস্বর রয়েছে — কতখানি আনতে পারব তাকে এই স্থানান্তরে? কিন্তু অনুবাদের প্রকৃতিটাই যে এইরকম! একটা মহাকাব্য, লীরিক কবিতা, কাব্যনাট্য, কি গদ্যরচনা বা উপন্যাসের চিন্তা, অনুভব, শৈলী, আকৃতি তাদের পরম সামগ্রিকতায় সবটাই চেঁছে মুছে কি কখনও পাঠানো যায় ভাষান্তরের দেশে? অথচ তার মানে তো এই নয় যে অনুবাদশিল্পকে দুনিয়া থেকে মুছে দিতে হবে? ভাল হোক, মন্দ হোক, এইভাবেই আস্তে আস্তে আমরা এক একটা দেশের সাহিত্যের শঙ্খধ্বনি শুনতে পেয়েছি, এইভাবেই সেই দেশগুলির নাগরিকতা অর্জন করেছি আমরা৷ অন্য ভাষাভাষীর সঙ্গে এইভাবেই একসঙ্গে একপাত্রে খেয়েছি, তাদের অভিজ্ঞতা ও আবেগের অংশীদার হয়েছি, সদর্থকভাবেই প্রভাবিত হয়েছি তাদের সাহিত্যের ছটায় এবং তাদের সঙ্গে ভালবাসার ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলেছি৷ যে কোনও দেশের মানুষ অন্য দেশের সাহিত্যের স্বাদ নিতে চাইলে এই অনুবাদককে ছাড়া আর গতি নেই৷ যে যত বিতর্কই জুড়ে দিক, অনুবাদকের ভূমিকা অপ্রতিরোধ্য৷ তবে এটাও ঠিক যে কোনও অনুবাদই পূর্ণ নয়, কারণ পূর্ণতা কিংবা সৌন্দর্য শুধু কাল ও স্থানমাত্রার গণ্ডীতেই বাঁধা৷

(গ্যুন্টার গ্রাসের ২০১৪-র জন্মদিনে জার্মানীর কীল শহর থেকে লিটেরা বোরেয়ালিস গ্রাস-কে উৎসর্গ ক’রে তাদের পত্রিকার যে উৎসর্গ-সংখ্যা প্রকাশ করেছিল, সেখানে আমন্ত্রিত লেখক হিসাবে গ্রাসের বাংলা অনুবাদক দেবব্রত চক্রবর্তী জার্মান ভাষায় একটি রচনা লিখেছিলেন৷ সেটিকেই কিঞ্চিৎ বদল ক’রে এখানে বাংলায় প্রকাশ করা হল৷)
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.