কবিতা

তারিক সুজাত: পা বাড়াই প্রাণের পথে

তারিক সুজাত | 28 Oct , 2018  


১.

প্রাণের মেলা
চাইছে এখন
খেলার আয়োজনে
আসবে নিমন্ত্রণে
সান্ত্রি এসে
শাসায় কেবল
মেলাশেষে
বিদায় আয়োজনে!

২.

ডানা মেলে একটি পাখি
ও চিঠি, ও পাখি
তুমি না উড়েছিলে
সে কোন্ কালে!
কানে কানে বলেছিলে
যাও মন বলো তারে
‘সে যেন ভোলে না মোরে’

৩.

এখানে সন্ধ্যা নামে
মৃদু পায়ে পায়ে,
তোমার শাড়ির পাড় ছুঁয়ে আছে
প্রাণের পুকুর,
শান বাঁধানো ঘাটে
জলের আঙুল
তোমার পায়ের পাতায় বিলি কাটে;
সেই দূরের দুপুর
সেই সোনালি দিনের চাবি
খুলে দিলো অনন্ত অধীর পথ
যুগল-পায়ের পাতা
ডানা মেলে ওড়ে

৪.

ছায়ার খেলা প্রাণের পাতায়
রোদ ছুঁই ছুঁই কার্নিশে,
লক্ষ্মীবিড়াল মৃদু পায়ে হাঁটে
পুরনো দিনের গন্ধ মাখানো
সোফার হাতলে,
বুকসেল্ফ
আর
হারমোনিয়ামের বার্নিশে,
আমিও হাঁটি সেই পথ ধরে
যে পথে হেঁটেছে তৃষ্ণার ঠোঁট
চঞ্চল আঙুল আলুথালু চুল
রৌদ্র-মাখানো অলস দুপুরে।

৫.

ত্রিভুবনে
তিনটি দিন
ক্রুশবিদ্ধ
কালের কফিন,
তিনটি খাম
ত্রিশূলবিদ্ধ
ত্রিকালের স্বরলিপি,
তিনটি হরফ
তলোয়ারবিদ্ধ
বেদনার বর্ণমালা,
দিনরাত্রি প্রহরে প্রহরে
পোশাক বদল করে
প্র কৃ তি
অভাজনের নেই কোনো
সু কৃ তি
তবু সে রঙ বদলায় না।

৬.

পুড়েছি নীরবে
অবিরত
নিরুত্তর প্রতিটি প্রহর
করেছে প্রহার
ক্ষত-বিক্ষত
ক্ষমা করো
ক্ষরণে, ক্ষণমরণে
আয়নায়
কাটছি সাঁতার
নই আমি অবতার
ক্ষমা করো,
ক্ষমা!

৭.

মনের ভিতর
বেঁধেছি মঞ্চ
শূন্য চেয়ার
সম্মুখে সারি সারি
সুরে পূরবীতে
পয়ারে অক্ষরে
কতো রাত্রি এলো
দিন ফুরালো
আমি ভরে আছি
সোনার ফসলে
যতো খুশি নাও
বিলাও ও বন্ধু
বাঁধো বিস্তারে
খোলো অন্তরে অন্তরে …

৮.

তার বেদনা খুলে রাখি–
যেমন করে ভেজা কাপড়
মৃদু হাওয়ায় ছন্দ তোলে
রোদ ঝলমল আলোর স্নানে
হৃদয়-তারে;
তুমি আমার জলের ধারা
সবুজ পালে হিমেল হাওয়া
অসীম নীল আকাশজুড়ে
শৈশবের স্বপ্নঘুড়ি
উদার মাঠ, ডাংগুলি আর গোল্লাছুট …
তুমি আমার
অতল প্রাণে
স্রোতস্বিনী!

৯.

আমি তো অধীর
শ্রাবণধারায়
এসেছি তোমার দ্বারে
না যদি দাও
হৃদয়পাত্র
কোথা ফিরি
অনাদরে!

১০.

কী সুরে বেঁধেছি তারে!
যেই বীণা বেজেছিলো
বিপুল বিস্তারে
আজও তার সেই সুর
সেই ঝংকারে
বাজছে নিপুণ–
সমান্তরাল তারের ওপর
কোমল স্পর্শে
হাঁটছে আঙুল…
কে কাঁদে, কে কার বুকে বাঁধে ঘর
সুদূরের মিতা– তার কাছে আজও তুমি
প্রথম সকাল
নও তুমি বিস্মৃতা– বিস্ময়ে
আমাকে জাগাও
এসো এক সুরে বাজি!

১১.

এই আকাশে
এই বাতাসে
ভাসিও তুমি
সুরের দেশে
বৃষ্টিমাখা
পত্রখানি-
গানে গানে
প্রাণে প্রাণে
সন্ধ্যা সাজুক
রানির বেশে!

১২.

সারাপথ জুড়ে
কাছে ও দূরে
আধখানা চাঁদ
হয়েছে সঙ্গী
বাকি আধখানা
হৃদয়ে ভাসছে
জ্যোৎস্নায় ডুবি
ভাসি প্রিয়ার
সারা অঙ্গে!

১৩.

আদিম পৃথিবী
এসেছে অন্যরূপে
শীতল রাত্রি
সিক্ত হয়েছে ঘামে।

১৪.

এখানে আলো
ব্যাপ্ত চরাচরে
চঞ্চল মন
চলিষ্ণু মেঘে মেঘে
বিরহানলে জলে-জঙ্গলে
বৃষ্টি হয়ে নামি
তুমি দাবানলে
নিয়েছো আলিঙ্গনে
নিত্য তোমার বুকে
ধিকি ধিকি জ্বলি …

১৫.

বিদ্ধ আমি তিরে
হৃদয় আমার এফোঁড় ওফোঁড়
ভাঙা মন্দিরে
আমি কুয়াশায় ঢাকা
শান্ত একটি গ্রাম
তোমার সুরে
সাহসে শহরে আসি
লুকিয়ে তোমার সাথে
বুনবো গানের কাঁথা;
এই বুকে- পিঁপড়ের মতো
হাঁটছে সোনার সুই
প্রহরে প্রহর গেঁথে
রক্তের অক্ষরে লিখি
নতুন দিনের গাথা–
এই নিষ্ঠুর নগরীতে
আমার গ্রামটি জাগিয়ে রাখো!

১৬.

কেউ নয়
সে তোমারই নির্মাণ
তোমারই হৃদয় থেকে
জেগে ওঠা চঞ্চল চর
তোমার পায়ের পাতা
নখ-রঞ্জিত আঙুল
পায়ে পা–
পা ধা নি সা খুনশুটি
অজন্তা-ইলোরা-কোনারক
কালের কথকতা
খুলেছে দুয়ার
‘আধো জাগরিত
তন্দ্রারও ঘোরে’
সে তোমারই নির্মাণ!

১৭.

পথ ভুলে যে পথে পথে
অথৈ অবিরত
ঢেউ তুলেছে
নতুন পথে নবীন মেঘে
ঝরছে জন্মাবধি–
সিক্ত পথে রিক্ত পথে
শূন্য আলোয় স্নান করছে
পথভোলা মন-মুসাফির।

১৮.

কী করো প্রবাসবন্ধু
দেশের কথা লিখো মনে;
মনের কথা মনে বুনে
পড়ছি কেবল মনে মনে
শব্দগুলো একটুখানি টলোমলো
হেলে গেলে জাপটে ধরিস!
এবার তবে লিখবো তোকে
নীল আকাশের চূড়ায় বসে,
যদি আমার শব্দ-টব্দ
ক্ষতহৃদয় পা ফসকে গড়িয়ে পড়ে …
পড়তে
পড়তে
পড়তে
পড়তে
মেঘের বুকে হাত বাড়ালাম–
চোখটি খুলে দেখি আমি
মেঘবাহন হাতটি ধরে
নীল আকাশে ভেসে আছি!

১৯.

অক্ষরের আঙুলে
বিলি কাটি স্বপ্নের সুরে–
আঁধারের চুল
ছুঁয়েছে আঙুল
বিলি কাটি সুরে সুরে
ঘুম ঘুম অক্ষরে …

২০.

যে সুরের নাগাল পাইনি আজও
তাকে আমি কোন্ আঁধারে
কোন্ আলোতে বাঁধি?

তুমি যখন আছো, ছিলে, থাকবে না
এ বাতাসে বাঁধবে না
সুনীল-শ্যামল সুরের বীণা!

যে সুধায় পূর্ণ করো তুমি
যে সুরেতে বাজবে তুমি
অন্য ভূমে অন্য ধামে
আমায় তুমি সঙ্গে নিও,
এই ছিদ্র-ছিন্ন
বাঁশির বুকের নীরব হাওয়া
সঙ্গে নিও,
সঙ্গে নিও বেহাল দিনের বেহালাটি
আরও তুমি সঙ্গে নিও
মন-খারাপের মন্দিরা …
পথে পথে ব্যাকুল হয়ে
উড়বে আমার
পদ্য লেখার ছিন্ন পাতা
সুরের বুকে কাচের দেয়াল যদি ওঠে
তবে মেঘের নখে নীল আকাশে
কাটবে আঁচড় আহত অক্ষর …

নিদ্রাহারা রাতের বাঁশি
দিনেও বাজে ক্ষণে ক্ষণে
তুমি যখন আছো প্রাণে
বাজবে সুরে কাছে দূরে;
এমন দিন না-ই আসুক
যখন তুমি থাকবে না।

২১.

কাছে এসেও দেখা পাচ্ছি না
দূরেও বেঁধেছিলে
নিকটের উষ্ণতায়
উ দ্বো ধ নে
এসো কাছে
নৈকট্যের দূরত্ব
ভে ঙে
ডাক দাও
ডাকঘর!

২২.

কঠিন তুমি–
এবার তোমায়
মনে রেখে
মারবো … !

২৩.

.
ক্লাস মিস্ করতে করতে
শেষ মুহূর্তে
ঘণ্টাটা ধরলাম–
যাতে ছুটি না হয়!

.
কোথায় পালাবে
অরণ্যেও এখন
অনেক ভিড়,
জনারণ্যে পালানো বরং সহজ!
চারিদিকে
নানা রঙের মুখোশ–
‘অনেক মুখের ভিড়ে আমি
নিজের মুখটা হারিয়ে ফেলি’

২৪.

আনন্দে তুমি
ব্যথায়ও তুমি
সাথি
চাঁদের চুমোয়
জোয়ার-ভাটায়
নিত্য তুমি আলো-আশায়
তুমি প্রিয়া
পৃথ্বী তুমিই

২৫.

তীব্র তোমার তির
দারুণ লক্ষ্যভেদী
জ্যোৎস্নার ডানা ছিঁড়ে
পাখি ঝরে পড়ে টুপ টাপ

নিষ্প্রাণ দেহে তার
স্বপ্নে ওড়ার স্মৃতি
যদি মনে পড়ে
সেই চোখ
দু’ফোঁটা অশ্রু দিও …

২৬.

ও আমার
সুরের নদী
তোমার চুলে
সাঁতার কাটি
জলের উচ্ছ্বাসে

তুমি যখন
পাড়ের কাছে
দাঁড়াও
ভিজে চুলে
আঁচলটাকে মুড়ে
চুলের আকাশ
ঝাড়ো
আমি তখন
ফোঁটায় ফোঁটায়
মুক্তো হয়ে
ঝরি …

২৭.

দেবী আমার
জলে ভাসে
মনে ভাসে
শূন্যে ভাসে
পদ্মাসনে
আমি ভাসি
বৃষ্টি-ফোঁটায়
টাপুর টুপুর
স্মৃতির বনে

২৮.

এসো তারা
সবহারাদের দেশে
তুমিই নতুন পথ!

২৯.

তোর প্রাণ খুঁড়েছি
মন খুঁড়েছি
অগোচরে–
খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে
নিত্য খোঁড়াখুঁড়ি
নিজের মনে
ঘুরে ঘুরে
তোর প্রাণের কথা পড়ি
অন্তরে অন্তরে
পা বাড়াই প্রাণের পথে
‘যে কথা রয় প্রাণের ভিতর’
তার গভীরে গানে গানে
প্রাণের কথা প্রাণে রেখে
নিশ্বাসে করি চুরি
আমার মনময়ূরী

৩০.

যতো দূরেই রাখো
ঢেউ হয়ে ফিরি
আঁকি অশ্রুজলে
আপন সমাধি-
যখন আমায়
মুছবে আলোয় অস্তরাগে
ফিরবো আমি আঁধাররাতে
তিমির তারায় রিক্ত হাতে
আমায় তুমি
আকাশ দিও
সাগর দিও
দিও তোমার সুরের তরু
তার পাতাতেই মৃদুমন্দ
বসন্তেরই বাতাসটুকু
আসবে যাবে
হাওয়ার কুহক
অনন্তের এপিটাফে।

Flag Counter


6 Responses

  1. হাবীবুল্লাহ সিরাজী says:

    তারিক সুজাতের কবিতাপাঠ অন্য এক আনন্দের। সরল যাপনের ভেতর মোহময় আন্দোলন।

  2. কাকলী আহমেদ says:

    চমৎকা। যেন শব্দের হাত ধরে অনেক পথ হাঁটিয়ে আনলো কবি।

  3. মঈনুল আহসান সাবের says:

    খুব পছন্দ হলো। খুব আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।

  4. Asad Mannan. says:

    চিরকালীন বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্রস্বরের প্রকৃত কবির অপূর্ব সংযোজন এ কবিতা।। সকল পাঠকের কবিতা। অভিনন্দন। যতবার পড়া হবে ততবারই একটি নতুন কবিতার স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে।

  5. Muyeenuddin Siddiqi says:

    তারেক সুজাত সাহেবের কবিতাগুচ্ছ পড়ে, কবি ও কবিতা সম্পর্কে অনেক দিন আগে আমার নিজের লিখা একটি ইংরেজি কবিতা মনে পড়ে গেল বিধায় নিম্নে কবি ও কবিতা সম্পর্কে ইংরেজি কবিতাটির অংশ বিশেষ উল্লেখ করলাম :-
    WHO WHAT WHICH
    Who is a poet ?
    Who creates something new.
    What is a poetry ?
    Which drops something dew.
    এমন প্রাণবন্ত কবিতা সৃষ্টি করে আমাদেরকে উপহার দেয়ার জন্য বরেণ্য কবি তারেক সুজাত সাহেবকে ধন্যবাদ মোবারকবাদ

  6. Tushar Das says:

    Shohoj kore gobhir kotha bolar proyash tor ei kobitagulote, jokhon premtao songot korche shei shathe. Bhalo laglo
    Bhalo thak. Bhalo rakh. Tusharda

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.