চলচ্চিত্র

নীল আর্মস্ট্রং-এর প্রথম স্ত্রী জ্যানেট এবং একটি সিনেমা

হোমায়রা আদিবা | 10 Nov , 2018  


সাম্প্রতিক মুক্তি পাওয়া ‘first man’ সিনেমাটি বানানো হয়েছে নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং-এর বায়োগ্রাফি First Man: The life of Neil A. Armstrong-এর আলোকে। যদিও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে সিনেমাটির অনেক অংশই নাটকীয়ভাবে সাজানো হয়েছে তবুও পরিচালনার দিক থেকে সিনেমাটি প্রশংসার যোগ্য। তাই স্পইলার যে থাকবে না এই লেখায়, তার কথা দিতে পারছি না।

নীল আর্মস্ট্রংকে আমরা একনামে সবাই চিনি। চন্দ্রপৃষ্ঠে পদচারণকারী প্রথম মানব। ‘অ্যাপোলো ১১’-এর মিশনে চাঁদে পা রেখে আর্মস্ট্রং শুধু তার মিশনই সফল করেননি, মানবজাতির ইতিহাসে খুলেছেন এক নতুন অধ্যায়। মানুষের জন্যে এর আগে যা ছিল কল্পনাই মাত্র, ১৯৬৯ সালের ১৬ই জুলাইয়ের পর তা রূপ নেয় বাস্তবে। মানুষ জানতে পারে, তার গণ্ডি হয়তো শুধু পৃথিবীই নয়, তা ছাড়িয়ে মহাবিশ্বে। বর্তমানে আমরা যে গ্রহে গ্রহে জীবন খুঁজে বেড়াই, পৃথিবীর বাইরেও বসতি স্থাপনের স্বপ্ন দেখি, এ সব চিন্তার সূত্রপাত একদিক থেকে বলা চলে ‘অ্যাপোলো ১১’-এর সাফল্যের কারণেই। আর এর দরুন আর্মস্ট্রং হয়ে ওঠেন পৃথিবীর মানুষের কাছে সুপারহিরো। তাঁর পোস্টার, তাঁর বক্তব্য টেলিকাস্ট হয় সর্বত্র, সব দেশে। তাঁর অটোগ্রাফ বিক্রি হয় চড়া দামে। আমরা ছোটবেলায় স্কুলের পাঠ্যবই থেকেই চিনি নীল আর্মস্ট্রংকে! এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ নভোচারীকে নিয়ে বানানো ‘ফার্স্ট ম্যান’ সিনেমাটি দেখতে যাই মহাকাশ, বিজ্ঞান, ইতিহাস আর আর্মস্ট্রংকে নিয়ে আগ্রহ থাকার কারণে। কিন্তু সিনেমাটি দেখার পর আমার সবচেয়ে বেশি জানতে ইচ্ছে করে নীল আর্মস্ট্রং-এর প্রথম স্ত্রী জ্যানেট আর্মস্ট্রং কে নিয়ে, যাকে নিয়ে আমার আগে কোন ধারণাই ছিল না। কিন্তু সিনেমাটি দেখে মনে হলে, নীল আর্মস্ট্রং-এর জীবনে এবং মুন মিশনে এই নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বলা হয়,
‘Behind every great man, there’s always a great woman’
‘সকল মহান পুরুষের পিছে আছে এক মহান নারী।’
এই প্রবাদবাক্যটির কথা যেন বারবার মনে হতে থাকে। ডক্টরের মেয়ে জ্যানেট শেরন তাঁর পড়াশোনা শেষ করেছিল হোম ইকনমিক্স নিয়ে, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সাঁতারু (synchronized swimmer), কথা সত্য যে তাঁর অসামান্য ডুব দেবার ক্ষমতা দেখেই নীল আর্মস্ট্রং তাঁর প্রেমে পড়ে! ১৯৫৬ সালে তারা বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ী অঞ্চলে জীবন শুরু করে।

জুনিপার হিলের সেই বাড়ি থেকে জ্যানেট নীল-এর পরীক্ষামূলক উড়াল প্রায়ই দেখতে পেত। মুন মিশনের সফলতার জন্যে অনেকগুলো পরীক্ষামূলক মিশন করা হয়, প্রতি মিশনই ছিল কম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। জ্যানেটকে এই সত্য নিয়ে প্রতিদিনই বাঁচতে হত যে তাঁর জীবনসঙ্গী নীল আজ হয়তো বাড়ি ফিরে নাও আসতে পারে।


পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় যখন তাঁদের একমাত্র কন্যা (দ্বিতীয় সন্তান) ক্যারেন মাত্র তিন বছর বয়সে ব্রেইন টিউমারে মারা যায় ঠিক তাঁদের বিবাহবার্ষিকীর দিনে। তাঁদের প্রথম সন্তান মার্ক নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেন ‘এর পর আর এ দিনটি তারা কখনো উদযাপন করেনি’। নীল আর জ্যানেটের সংসারে ক্যারেনের মৃত্যু একটা ছেদ সৃষ্টি করে। নীল যে কিনা ক্যারেনকে আদর করে ‘মাফি’ (muffie) বলে ডাকত সে ক্যারেনের মৃত্যু সহজভাবে নিতে পারেনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে খুব চুপচাপ স্বভাবের থাকার কারণে নীল ক্যারেনের মৃত্যুর কষ্ট কারো সাথে ভাগ করেননি। এমনকি জ্যানেট-এর সাথেও না। কখনো মেয়ের কোন প্রসঙ্গও নীল আনতেন না। যেন তাঁদের জীবনে কখনো ক্যারেন ছিলই না। নীল আসলে ক্যারেনের চলে যাবার কষ্ট বুকে চেপে চন্দ্রাভিজানকে তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন করে। এতে করে ধীরে ধীরে নীল সরে আসে সংসার থেকে।

অপরদিকে জ্যানেটের সংসারের প্রতি দায়িত্বটা বেড়ে যায় দ্বিগুণ। চন্দ্রাভিজানের প্রস্তুতিতে প্রায়ই যখন নীল ঘরের বাইরে থাকতো, জ্যানেট একাই তাঁদের দুই ছেলে মার্ক আর এরিকের দেখভাল করত। তাঁদের বড় ছেলে মার্কের ভাষায় ‘She was the real power behind the throne’ সেই ছিলেন সিংহাসনের আসল শক্তি।

দেখতে দেখতে ‘জেমিনাই ৮’ (gemini 8) এর সময় চলে আসে। ‘অ্যাপোলো ১১’-এর সফলতার পেছনে এই মিশনটি অন্যতম ভূমিকা পালন করে। মিশনটি মহাকাশে দুটি মহাকাশযানের প্রথম ডকিং পরিচালনা করে। ১৯৬৬ সালের জেমিনাই ৮ মিশনে নীল আর্মস্ট্রং নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু এই মিশনের প্রথম মহাকাশযানের সিস্টেমে অসঙ্গতির কারণে মহাকাশচারীদের জীবন অনেকটা হুমকির মুখে পড়েছিল। যার কারণে অবিলম্বে এই মিশন অবসানের প্রয়োজন ছিল।

সিনেমায় দেখা যায় নাসা স্পেস স্টেশান থেকে দেয়া একটা রেডিওর সাহায্যে ঘরে বসেই জ্যানেট এই মিশনের খবরাখবর রাখছিল। কিন্তু সিস্টেমের অসঙ্গতি হবার পরপরই জ্যানেটের ঘরের রেডিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। সাথে সাথেই ক্ষিপ্ত জ্যানেট ছুটে যায় স্পেস স্টেশানে নিলের খবর জানতে।

জ্যানেট একজন শক্ত মনের নারী ছিলেন। একাকী ছেলেদের সামলালেও নীলের প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। নীলকে চন্দ্রাভিজানের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও জ্যানেট তাকে বোঝার চেষ্টা করেন, সংসারের প্রতি উদাসীন হবার জন্যে নীলকে দোষারোপ না করে বরং তাঁর পাশে থাকেন একজন আদর্শ সঙ্গীর মত। নীলের বার বারের উড়ালে জ্যানেট যদি ভয়ও পেত তাও সে প্রকাশ করত না, সে শুধুই চাইতো পাখি আকাশে উড়ুক, রকেট পৃথিবী পাড়ি দিক, নীল তাঁর মুন বুট দিয়ে চাঁদে পা রাখুক।

১৯৬৯ সন, ‘ অ্যাপোলো ১১’। সিনেমায় দেখা যায় জ্যানেট নীলকে জানায়, এখন সময় হয়েছে তাঁর ছেলেদের সাথে কথা বলার। নীল যে চন্দ্রাভিযানে যাচ্ছে এবং মিশন ব্যর্থ হলে যে সে ফিরে নাও আসতে পারে এ ব্যাপারে তাঁর ছেলেদের সাথে স্পষ্টভাবে কথা বলা দরকার। এমন এক সত্য সন্তানদের বলা কঠিন, কিন্তু নীল জ্যানেটের কথা শুনে, ছেলেদের সাথে বসে তাঁদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে বিদায় নেয়।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই, মানুষ প্রথমবারের মত চাঁদে পা রাখে। চাঁদে পদার্পণকারী সেই প্রথম মানুষটি নীল আর্মস্ট্রং। এর পরে অনেকে চাঁদে পা রেখেছেন কিন্তু প্রথমের খাতায় নাম লিখিয়েছেন নীল। তাঁর সাথে সহচারী ছিলেন মাইকেল কলিন্স এবং এডউইন আল্ড্রিন। সারাবিশ্বে চাঁদে পদার্পণের এই ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। মানবজাতি আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। সকল দেশে উদযাপন করা হয় এ দিনটি! মানবজাতির জন্যে এ ছিল এক বিশাল অর্জন! আর নীল আর্মস্ট্রং হয়ে যায় সর্বকালের অন্যতম নভোচারী। একজন রকস্টার! মানুষের মুখে মুখে ছিল আর্মস্ট্রং এর নাম।

কিন্তু খ্যাতি আর্মস্ট্রং পরিবারের পছন্দ ছিল না । তাই তারা ওহায়োতে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যায় তাঁদের ছেলেদের বড় করার জন্যে।


জ্যানেটের অসামান্য সাহস এবং স্পেস মিশনে তাঁর অবদানের কারণে তিনি পৃথিবীব্যাপী পুরস্কৃত হন। কিন্তু নীলের খ্যাতি তাঁকে মানুষ হিসেবে পরিবর্তন করেনি। ১৯৬৯ সালে লাইফ ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্যানেট বলেন:
‘আমি কোন নভোচারীকে বিয়ে করিনি, আমি বিয়ে করেছি নীল আর্মস্ট্রংকে। আমি জানতাম তিনি চাঁদে যেতে চান, কোনভাবে, কিন্তু এটা আমার জীবনকে কোনভাবেই পরিবর্তন করেনি। আমার জন্যে সে সবসময় নীল আর্মস্ট্রং, আমার ছেলেদের পিতা।’

কিন্তু নীল আর জ্যানেটের সম্পর্কে যেন ধীরে ধীরে অনেকখানি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল ততদিনে! ১৯৯৪ সালে এই দম্পতি নীরবে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটায়। একই বছর নীল ক্যারল নাইট নামে তাঁর চেয়ে ১৫ বছরের ছোট একজন নারীকে বিয়ে করেন। তবে নীল ও জ্যানেট সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
জ্যানেট এর কথায় ‘নীরবতাই নীল আর্মস্ট্রং এর উত্তর, ‘না’ তাঁর কাছে তর্ক। মানুষ হিসেবে সে নির্জন (চুপচাপ প্রকৃতির)’।

বিচ্ছেদের পর জ্যানেট উতাহ(utah)তে এল লাগো অ্যাকুয়ানটস নামক (El Lago Aquanauts)একটি সাঁতারের প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, এবং সাঁতার প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁর পরবর্তী জীবন কাটান। এছাড়াও নভোচারীদের স্ত্রীদের জন্যে উনি কিট(KIT-Keep in Touch) নামক একটি সংগঠন করেন। এই সংগঠনের কিছু নারী তাঁদের জীবনসঙ্গীকে হারিয়েছেন বিভিন্ন স্পেস মিশনের দরুন। তাঁদের জন্যে সবসময় সহমর্মিতা দেখিয়েছেন জ্যানেট, এবং এ সংগঠনটা যেন ছিল তাঁদের আস্থার এক জায়গা। এতকিছুর মধ্যেও জ্যানেট তাঁর পরিবারের প্রতি ছিলেন দায়িত্বশীল।

তিনি ছিলেন একজন ধৈর্যশীল স্ত্রী, অসামান্য মা, সহানুভূতিশীল বন্ধু, স্নেহময়ী দাদীমা। লাঙ ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করে এবছরের (২০১৮) জুনের ২১ তারিখ জ্যানেট মৃত্যুবরণ করেন। জ্যানেট শারন আর্মস্ট্রং, যিনি ভালোবাসা এবং ধৈর্য নিয়ে নীল আর্মস্ট্রং-এর পাশে ছিলেন, আগলে রেখেছিলেন তাঁদের শিশুদের। যার ভালোবাসা ছাড়া হয়তো নীল চাঁদে পদার্পণ করতে পারতো না!

উৎস: https://www.legacy.com/obituaries/houstonchronicle/obituary.aspx?n=janet-armstrong&pid=189396827

https://www.yourtango.com/2018318014/what-happened-neil-armstrong-wife-now-janet-first-man-movie

https://www.bustle.com/p/the-real-janet-armstrong-was-so-much-more-than-just-a-wife-says-first-man-star-claire-foy-12260105

https://www.gettyimages.com/photos/janet-armstrong?mediatype=photography&phrase=janet%20armstrong&sort=mostpopular

https://www.thedailybeast.com/moon-men-the-private-lives-of-neil-armstrong-and-pals-in-togethersville

Neil Armstrong’s Wife Janet: Real Story Behind First Man

https://www.mirror.co.uk/film/true-story-behind-first-man-13406654

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.