স্মরণ

শামসুর রাহমানের অনুবাদে হোর্হে লুইস বোর্হেসের দুটি কবিতা ও দুটি বই হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা

রাজু আলাউদ্দিন | 23 Oct , 2018  

ভূমিকা ও স্মৃতিচারণ: রাজু আলাউদ্দিন

১৯৯৫ বা ৯৬ সালের দিকে হোর্হে লুইস বোর্হেসের সব ধরনের লেখার একটি নির্বাচিত সংকলন করার জন্য আমি উঠেপড়ে লেগেছিলাম। ইচ্ছে ছিল এই যজ্ঞে সবাইকে নিমন্ত্রণ ও অন্তর্ভুক্ত করা। এ কারণে অগ্রগন্য কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে মনজুরে মাওলা, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখের কাছে অনুরোধ করেছিলাম বোর্হেসের কবিতা অনুবাদ করে দিতে। আমি সৌভাগ্যবান যে তারা প্রত্যেকেই এই উদ্যোগকে সাধুবাদতো জানিয়েই ছিলেন, এমনকি আমার অনুরোধে তারা কবিতাও অনুরোধ করে দিয়েছিলেন। কবি শামসুর রাহমানকে আমি এই উদ্যোগের কথা জানাতেই তিনি অনুবাদ করতে সম্মত হলেন, ‍কিন্তু দুতিনটের বেশি করার সময় পাবেন না, কারণ তাকে নানাবিধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে হচ্ছিল। আমি তাতেই খুশী বলে তাকে জানালাম। কী কী কবিতা করবেন তা জানতে চাইলে তিনি বললেন তার কাছে বোর্হেসের In Praise of Darkness বইটি আছে, আমি চাইলে সেটা থেকে দুটো কবিতা তিনি অনুবাদ করে দিতে পারেন। আমি তাতেই রাজি হয়ে বললাম, ঠিক আছে, আপনি আপনার পছন্দমতো বেছে নিয়ে আমাকে দুটো কবিতা অনুবাদ করে দিন। বোধহয় সপ্তা দুয়েক পরে তার সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বাসায় আসতে বললেন বা কাউকে পাঠাতে বললেন অনুবাদ দুটো নেয়ার জন্য। আমি তাকে বললাম, আমি নিজেই আসছি অনুবাদ দুটো নেয়ার জন্য। আমি পরেরদিন তার শ্যামলীর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম বিকেলবেলা। সাদা পৃষ্ঠায় তার হাতে লেখা অনুবাদ দুটো দেখে যে কী আনন্দ হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। আমাদের এত বড় একজন কবি, তার উপরে আমারই আরেক প্রিয় লেখকের লেখা অামার অনুরোধে অনুবাদ করে দিয়েছেন এবং অামার মতো এক গৌণজনের অনুরোধে– আনন্দের এই ত্রিস্তরিক অনুভূতি আামাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আমি তাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম অনুবাদ দুটোর জন্য। এরপর তার সাথে বোর্হেস নিয়ে বেশ খানিকটা আলাপ হলো। রাজনৈতিক অর্থে ব্যক্তি বোর্হেস অনেক ডানপন্থী মতামতের জন্য বহু লেখক ও পাঠকের নিন্দাভাজন হয়েছেন। লক্ষ্য করলাম রাহমান ভাই এসব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া সত্ত্বেও তিনি বোর্হেসকে ঠিকই পছন্দ করেন। তার গল্প এবং কবিতা দুটোই ছিল তার পছন্দের। অনুবাদ তো করে দিয়েই ছিলেন, আমাকে তিনি খুব উৎসাহও দিয়েছিলেন বোর্হেসের রচনার নির্বাচিত সংকলনটি প্রকাশে। এমনকি তিনি বইপত্র দিয়েও সাহায্য করতে কার্পণ্য করেননি এতটাই উৎসাহী ছিলেন বোর্হেসের ব্যাপারে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ওই সময় স্বল্প পরিচিত, এছাড়া সে যদি হয় লাতিন আমেরিকান কোন লেখক তাহলে ঢাকায় তাদের বইপত্র পাওয়া সহজ ছিল না। কেবলমাত্র দূর দেশ থেকে পরিচিত জনরা যদি নিয়ে আসতেন তাহলেই কেবল পাওয়া যেত। রাহমান ভাই যে বইটি থেকে কবিতাদুটি অনুবাদ করেছিলেন–দুর্ভাগ্যক্রমে–সেটি আমার তখনও সংগ্রহ করা হয়ে ওঠেনি। আমি তার কাছে বইটি দেখতে চাইলাম এক নজরের জন্য, তিনি কোন রকম অজুহাত ছাড়াই আমাকে দেখতে দিলেন। সম্ভবত বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছি বলেই তিনি আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বলে উঠলেন, বইটি যদি তোমার দরকার হয়ে তাহলে তোমাকে আমি ধার দিতে পারি কয়েকদিনের জন্য। আমিতো রীতিমত অবাক। হঠাৎ করে তিনি বললেন, দাঁড়াও আরেকটা বই আছে, তুমি দেখতে পার। ওটাও খুব ভালো একটা বই। তিনি উঠে গিয়ে পাশের শেলফ থেকে আমার জন্য খুঁজে বের করলেন Doris Meyer-এর সম্পাদিত Lives on the Line বইটি। আশ্চর্য এই বইটিও তো আমি আগে দেখিনি। এই বইটা ছিল লাতিন আমেরিকার লেখকদের স্মৃতিচারণ বা আত্মজৈবনিক ধরনের প্রবন্ধের এক সংকলন। সেই লাতিন আমেরিকান লেখকদের সংকলন বা বোর্হেসের যে-কোনো বই ছিল অামার কাছে সবেচেয়ে বেশি লোভনীয়। আমি তার কাছে সলজ্জ হয়ে বইদুটো ধার চাওয়ার আগেই তিনি ধার দেয়ার প্রস্তাব দেয়ায় অমাার অবস্থা মেঘ না চাইতেই জল! আমি তাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম তার এই উদার প্রস্তাবের জন্য। বলা নিষ্প্রয়োজন যে আমি বই দুটি নিয়ে এসেছিলাম। এরপর স্বদেশে বছর তিনেক থাকলেও বোর্হেসের সংকলনটি যেমন প্রকাশিত হয়নি, তেমনি রাহমান ভাইয়ের বই দুটিও আর ফেরৎ দেয়া হয়নি। সত্যি বলতে কি বই দুটি ফেরৎ দেয়ার ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আর রাহমান ভাইও এদুটোর ব্যাপারে কোনদিনই খোঁজ নেননি। ফলে বই দুটি মেরে দেয়ার আগ্রহ আর তার বিস্মৃতি–এই ‍দুই বিন্দু একত্র হয়ে আমাকে লাভবান করেছিল। আমার ধারণা বই দুটির কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তা ভুলিনি। আমার ইচ্ছে ছিল ওগুলো যেন তাকে কোনদিনই ফেরৎ দিতে না হয়। আজও আমার কাছে বই দুটি আছে। আর আছে একটিতে রাহমান ভাইয়ের স্বাক্ষর। অন্য বইটি তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন বিখ্যাত লেখক-দম্পতি পূরবী বসু ও জ্যোতিপ্রকাশ দত্তর কাছ থেকে। নিউ ইয়র্ক থেকে তারা পাঠিয়ে ছিলেন, তাদের স্বাক্ষর ও তারিখসহ( স১৯৯০) জায়গাটির কথা উল্লেখ আছে। সম্ভব তারা রাহমান ভাইয়ের জন্য কারোর মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। তার বই হাতিয়ে নেয়ার অনুক্ত ঘটনা আর তার অনুবাদে বোর্হেসের কবিতা ‍দুটো দিয়ে প্রিয় এই কবিকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

ম্যানুয়েল ফ্লোরেসের
মিলোঙ্গা

ম্যানুয়েল ফ্লোরেসকে মরতে হবে–
এ-তো জানা কথা
এটা সাধারণ জ্ঞান;
কেননা, মরে যাওয়া মানুষের
প্রচলিত রীতি।

অন্যদের জন্যে আছে জ্বর,
যন্ত্রণাকাতর কাল ঘাম;
যখন আকাশে দেখা দেবে প্রথম আলোরেখা,
তখন আমার জন্যে প্রতীক্ষারত চারটি বুলেট।

আগামীকাল আসছে বুলেট আর
তার সঙ্গে বিস্মরণ।
মহাজ্ঞানী মারলিন বলেছেন:
মরা মানেই জন্ম নেয়া।

তবু জীবনকে বিদায় জানাতে
ভারি কষ্ট হয় আমার
ব্যাপারটা এমন আর এত চেনা
এতেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

প্রত্যুষে আমি আমার হাতে নজর দিই,
আমার হাতে শিরাগুলো দেখতে পাই,
ওদের দিকে এমন বিস্মিত তাকিয়ে থাকি,
যেন ওরা আমার নয়।

পথ চলতে কত কিছুই দেখছে
আমার দু’চোখ। কে জানে যিশু খ্রিষ্ট
আমার বিচার করার পর
আরো কত কিছুই না দেখতে পাবে ওরা।

ম্যানুয়েল ফ্লোরেসকে মরতে হবে–
এ-তো জানা কথা;
কেননা মরে যাওয়া মানুষের
প্রচলিত রীতি।

লোককাহিনী

হাবিল আর কাবিলের আবার দেখা হলো হাবিলের মৃত্যুর পর।
ওরা হেঁটে যাচ্ছিল মরুভূমিতে এবং দু’জনই একে অন্যকে দূর থেকে,
চিনতে পারল, কারণ উভয়ে ছিল দীর্ঘকায় পুরুষ। দু’ভাই মাটিতে বসে
আগুন জ্বালল আর সেরে নিল আহার। কিছুক্ষণ ওরা কোনো কথা
বলেনি, যেমন খুব ক্লান্ত লোকেরা সারাদিন খাটুনির পর থাকে
নিশ্চুপ। কয়েকটি তারা, তখনো অনামি, আকাশে ফুটল। আগুনের
আলোয় কাবিল হাবিলের কপালে পাথরের চিহ্ন দেখতে পায়। মুখে
লোকমা তোলার আগেই ওর হাত থেকে খসে যায় খাবার আর সে
নিজের অপরাধের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী হয়।
‘আমার এখন আর মনে পড়ে না তুমি কি আমাকে হত্যা করেছিলে ?
নাকি আমিই তোমাকে খুন করেছিলাম’, হাবিল বলে, ‘আবার আমরা
দু’জন এখানে মিলিত হয়েছি আগেকার মতোই।’
‘এখন আমি নিশ্চিত তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ’, কাবিল বলে, ‘কারণ,
ভুলে যাওয়াই হচ্ছে ক্ষমা করে দেয়া। আমিও ভুলে যেতে সর্বাত্মক চেষ্টা
করব।’
‘হ্যাঁ,’ হাবিল আস্তে-সুস্থে বলে, ‘ঠিক বলেছ। যতক্ষণ অনুশোচনা হয়,
ততক্ষণই অপরাধবোধ থাকে।’

নরমান টমাস ডি জোভান্নির ইংরেজি তর্জমা
অবলম্বনে।
আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

উপেক্ষিত কাভাফির অর্জুন ও আমরা

পাবলো নেরুদার প্রাচ্যবাসের অভিজ্ঞতা ও দুটি কবিতা

রবি ঠাকুরের নিখিল জগৎ

শিল্পী মুর্তজা বশীরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

ফুকোর হাসি, একটি গ্রন্থের জন্ম এবং বোর্হেস

নিরবতার দোভাষী সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

গার্সিয়া মার্কেসের প্রবন্ধ: এন্থনি কুইনের বোকামি

‘কুইজদাতা’ শওকত ওসমানের দুটি উপহার

নগ্নপদ ইলিয়াড ও আসুয়েলার বিপ্লব

ভাষার বিকৃতি: হীনম্মন্যতায় ভোগা এক মানসিক ব্যাধি?

সাহিত্য মানুষকে পোকা হওয়া থেকে রক্ষা করতে চায়

রবীন্দ্রনাথ যে-কথা দিয়েও রাখেন নি

ভাষার প্রতিভা ও সৃষ্টির ডালপালা

চর্যাপদের সর্বজনীনতা, ড. শহীদুল্লাহ ও অক্তাবিও পাস

মারিয়ার নজরুল-অনুবাদ ও মূল্যায়ন

ব্রডওয়েতে যেভাবে অপেরার ভূত দেখতে পেলাম

Flag Counter


3 Responses

  1. সুন্দর, সুন্দর! স্পানঙল-এর সঙ্গে নৈকট্য কতটা সেটা লেখক বুঝবেন৷ কিন্তু “ভুলে যাওয়াই হচ্ছে ক্ষমা ক’রে দেওয়া” কথাটা যদি কবি শামসুর রহমান সঠিক বুঝে থাকেন, তাহলে এই প্রতিবেদনের লেখকও নিশ্চিত হতে পারেন যে তাঁর গ্রন্থতস্করবৃত্তি ক্ষমার যোগ্য বলেই বিবেচিত হয়েছে কবির “কোড অব কন্ডাক্ট”-এ৷

  2. রাজু আলাউদ্দিন says:

    দেবুদা,
    সত্যিই তো, কেন লক্ষ্য করিনি যে তার বইটি হাতিয়ে নেয়ার ঘটনার সাথে একটু কাব্যিক সংযোগ রয়েছে “ভুলে যাওয়াই হচ্ছে ক্ষমা ক’রে দেওয়া”–এই উক্তিটির সাথে! যাক আপনার ব্যাখ্যায় গ্রন্থ-লোপাটের ঘটনা একটা জোরালো বৈধতা পেল। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

  3. আমাদের সুন্দরতম কবি, তাঁর হাতের কবজিতে সময় হারিয়ে গেছে অস্পষ্টতায়, শুধু তার হাতের শিরাগুলোই স্পষ্ট আমাদের কাছে। তাই রাজুকে অভিবাদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.