স্মৃতি

বরিশালের জীবনানন্দ দাশ

লীনা দিলরুবা | 22 Oct , 2018  


ছবি:জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দের আদি পিতৃপুরুষের নাম বলরাম দাসগুপ্ত। পিতামহ সর্বানন্দ দাসগুপ্তের নিবাস ছিল মুন্সিগঞ্জের গাউপাড়া গ্রামে, সর্বানন্দ বরিশালে কলেক্টরি দপ্তরে চাকরির সুবাদে সেখানেই ভাড়াবাড়িতে থিতু হন। পরিবারে তিনিই প্রথম সস্ত্রীক ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। সর্বানন্দ’র পুত্ররা প্রতিষ্ঠিত হলে বরিশালের বগুড়া রোডে প্রায় ছয় বিঘা জমির উপর নিজেদের বসত গড়ে তোলেন, ১৯০৭ সালে পিতার নামানুসারে এর নাম দেন- ‘সর্বানন্দভবন।’ জীবনানন্দের জন্মসাল ১৮৯৯, নিজের আটবছর বয়স থেকে এই বাড়িতেই বসবাস করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। দেশবিভাগের সময় পরিবারটি কলকাতায় চলে যায়। ১৯৬০ সালে জীবনানন্দ দাশ-এর পিতামহের নামাঙ্কিত পারিবারিক বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়, জনৈক আবদুর রাজ্জাক এটি কিনে নেন; পরে কবির সম্মানে এর নামকরণ করা হয় ‘ধানসিড়ি’। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার আবদুর রাজ্জাকের পরিবারের কাছ থেকে কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে ‘জীবনানন্দ স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করে, এর আগে, আবদুর রাজ্জাক ছয় বিঘা জমির কিছু জমি অন্যত্র বিক্রিও করেছেন। মধ্যখানে ধানসিড়ি, ডানে স্মৃতিপাঠাগার, আর বাঁয়ে আরেকজন মালিকের বাড়ি। আমরা যেদিন বগুড়া রোডে ভ্রমণ করেছিলাম সেদিন সৌভাগ্যবশত বর্তমান মালিক আবদুর রাজ্জাকের পুত্রবধু বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলে’র শিক্ষিকা হাসিনা বেগমকে পেয়ে যাই। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, ‘সর্বানন্দভবনে’র কিছুই আর অক্ষত নেই, যে বাড়িটিতে জীবনানন্দের পরিবার বসবাস করতেন বাড়ির সেই পুরোনো কাঠামোর জায়গায় এখন নতুন বাড়ি। নতুন কাঠামো। জীবনানন্দ তাঁদের আদি বাড়ির অনেক প্রসঙ্গই তাঁর নানান লেখায়, গল্প-উপন্যাসে লিখেছেন। একটি গল্পে লিখেছিলেন, ‘চার বিঘে জমি নিয়ে বাড়িতে দু’খানা ঘর-পশ্চিম পোতায় আর দক্ষিণ পোতায়, ইলেক্ট্রিক কানেকশন আসেনি। দক্ষিণ পোতার বাড়িটা পাকা নয়, মেঝেটা মাটির মেঝে, শাল সুন্দরী গরাণের খুঁটি, আসাম থেকে আনানো হয়েছিল, এক কাকা এনেছিলেন-প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়নি তখন।’ জীবনানন্দের ছাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন লিখেছিলেন, “বাংলো ধরণের বাড়ি-উপরে শনের চাল। বেড়া আধেক ইট আর আধেক বাঁশের।কিন্তু ভিতরে সাহিত্য-পাঠকের কাছে আশ্চর্য এক জগৎ। বই আর বই।”


ছবি:বামে ধানসিড়ি নদী, উপরে ধানসিড়ি নদীতে যাবার মেঠোপথ, নীচে নদীর উপর ছোট ব্রীজ, অদূরে খোলা প্রান্তর

বরিশাল ছিল তাঁর নাড়ির বাঁধনে বাঁধা স্থান। বরিশালের ভূ-প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁকে বিভোর করে রেখেছিল; সেই বরিশাল ছেড়ে যাবার বেদনা তাঁর মনে স্থায়ী ছিল আমৃত্যু। জীবনানন্দের লেখার অনেকখানি জুড়ে তাঁর জীবন ঢুকে পড়েছে। ভূমেন্দ্র গুহ’র বরাতে একটি বক্তব্য তুলে ধরি, ‘তিনি তাঁর জীবনের শেষের দিকে অনেককে, অন্তত সঞ্জয় ভট্টাচার্য’কে বলেছেন, একটু সুযোগ-সুবিধে পেলেই, শরীর-স্বাস্থ্য-পরিবেশ আর একটু স্বাচ্ছন্দ্যকর হলেই, তিনি আত্মজীবনী লিখবেন, যেন তাঁর কবিতায়-গল্পে-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক লেখা লিখতে বাকি রেখেছেন কিছু!’ ভূমেন্দ্র গুহ’র কথার সূত্র ধরে বলা যায়, যদিও তিনি নিজের আত্মজীবনী লিখে রেখে যাননি, কিন্তু তাঁর কবিতা, গল্প-উপন্যাস যেন মালার মতো তাঁর জীবনের গল্প বুনে গেছে। আমরা জানি, জীবদ্দশায় জীবনানন্দ তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাসগুলো প্রকাশ করেননি, প্রায় দু’হাজারের মতো কবিতা লিখে শ’দুয়েক ছাপিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর পরই অপ্রকাশিত লেখাগুলো প্রকাশ পায়। সবমিলিয়ে তাঁকে পড়া হলে তাঁর লেখার মধ্যে আমরা তাঁর জীবনের গল্প খুঁজে পাবার চেষ্টা করতে পারি।

‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের ‘বলিল অশ্বথ সেই’ কবিতাটিতে বরিশালের বাড়ি ছেড়ে যাবার বেদনা ফুটে উঠেছে।

বলিল অশ্বত্থ ধীরে: ‘কোন দিকে যাবে বলো-
তোমরা কোথায় যেতে চাও?
এত দিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে:
ম্লান খোড়ো ঘরগুলো-আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে;
এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন দিকে কোন পথে ফের
তোমরা যেতেছ চ’লে পাই নাক’ টের!
বোঁচকা বেঁধেছ ঢের-ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটা ঘটিটাও;

আবার কোথায় যেতে চাও?

পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নি ক-এই-তো সে-দিন
তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়
-আজও, আহা, তাহাদের কথা মনে হয়!-
এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে
এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে
জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাঙ্ক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ;
দাঁড়ায়ে-দাঁড়ায়ে সব দেখেছি-যে,-মনে হয় যেন সেই দিন!
এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চ’লে তবে কোন পথে?
সেই পথে আরও শান্তি- আরও বুঝি সাধ?
আরও বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?
তোমরা সেখানে গিয়ে তাই বুঝি বেঁধে র’বে আকাঙ্ক্ষার ঘর!..
যেখানেই যাও চ’লে, হয় নাক’ জীবনের কোনো রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধূসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্ক্ষার ঘর!
বলিল অশ্বত্থ সেই ন’ড়ে-ন’ড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।

জীবনানন্দের শ্রাদ্ধবাসরে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন তাঁর অনুজ অশোকানন্দ দাশ, সেখানে তিনি লেখেন, ‘যাঁরা বরিশালে গিয়েছেন, তাঁরা জানেন বরিশালের নদীর তীর কী অপূর্ব সুন্দর। যেখানে স্টিমার জেটিতে বাঁধা আছে, সেই অংশটি পার হয়ে গেলেই রাস্তার ধার দিয়ে ঝাউয়ের সারি চলে গিয়েছে। … শ্মশানভূমি ছাড়িয়ে লাশকাটা ঘর অতিক্রম করে, যেখানে কয়েকটা রবার গাছ আছে, তাও ছাড়িয়ে আরও দূরে চলে যান, দেখতে পাবেন ভাঙা মন্দির, ভাঙা-অট্টালিকা।”


ছবি:ধানসিড়ির নিকটবর্তী প্রমত্তা গাবখান

বরিশালের ভূ-প্রকৃতির বর্ণনা আর এর নদ-নদী নিয়ে জীবনানন্দের লেখা কবিতা আমরা পড়েছি। নিজের বাড়ির কাছের কীর্তনখোলা নয়, বরং ‘ধানসিড়ি’ ছিল তাঁর প্রিয়তর নদীর নাম। তার সেই প্রিয় নদীটির অবস্থান ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলায়। ঝালকাঠি একসময় বৃহত্তর বরিশালের মহকুমা ছিল, বর্তমানে এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা। বরিশাল থেকে রাজাপুরের দূরত্ব চৌত্রিশ কিলোমিটারের কাছাকাছি। সড়কপথে ঘণ্টাখানেকের রাস্তা। ঝালকাঠি পুরোটাই জলমগ্ন এলাকা। পুকুর-দীঘি, নদী-নালা, খাল-বিল, ছোট-বড় নদীর এখানে কোনো অভাব নেই। নদীগুলো অপেক্ষাকৃত শান্ত, মায়াময়। অন্যদিকে মন উতলা করে দেবার মতো সুন্দর। শহরের যে দিকে হাঁটা হয় সেদিকে পুকুর, একটু বেশি হাঁটলে- নদী। শহরের বুকের ভেতর চুপচাপ শুয়ে আছে সুগন্ধা। সুগন্ধার জল নীলাভ। সুগন্ধা নদীতে একজায়গায় পুকুরের মতো ঘাট করে দেয়া হয়েছে। লোকজন সেই ঘাটে বসে থাকে। ঘাট থেকে নৌকার সওয়ারি হয়। নদীর পাড়ে সুন্দর একটা পার্কও আছে। সন্ধ্যায় খোলা হাওয়ায় পার্কে বসে থাকলে নদীর কিনারাটাকে রহস্যময় মনে হয়। আরো মনে হয়; নদী বাস্তব, নদীর পাড় অবাস্তব আর অশরীরী। ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশের নির্বাচন পরিদর্শনে এলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বরিশাল-ঝালকাঠি অঞ্চল নিয়ে একটি চমৎকার ভ্রমণ কাহিনী লিখেছিলেন। লেখক ইমদাদুল হক মিলন তখন তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। সে ভ্রমণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘ধানসিড়ি’ নদীটি আবিষ্কারের অভিপ্রায়ে দল বলসহ বরিশাল থেকে ঝালকাঠিও গিয়েছিলেন। ‘ধানসিড়ি’ দেখার পর সুনীল লেখেন-

‘কথা বন্ধ করে আমি সতৃষ্ণ নয়নে নদীর দু’দিকে চেয়ে থাকি। এককালে হয়তো একধারে ধানখেত ছিল।জীবনানন্দ কি কোনোদিন সত্যিই এই নদীর বুকে নৌকোয় ঘুরেছেন? কিংবা শহরের অন্যলোকদের মুখে শুধু নামই শুনেছেন।

নদীগুলো খুব বদলে যায়। ধানসিড়ি এখন একটি অতি অকিঞ্চিৎকর ছোটনদী। আমি কপোতাক্ষ নদীতেও নৌকো চেপেছি, তার জল এখন কোনো মৃতপাখির চোখে মতন বিবর্ণ।’

‘ধানসিড়ি’ নিয়ে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলাই বাহুল্য খুবই উত্তেজনাকর ছিল। বস্তুত পক্ষে বাস্তবের একটি নদীকে নিজের মত করে কল্পনায় সাজিয়ে-সাজিয়ে ধানসিড়ির বর্ণনায় জীবনানন্দ যে মোহনীয় পরিবেশ তৈরি করেছেন, কবিতা পড়তে গেলে পাঠকও যেন এক ধরণের আচ্ছন্নতার নিমজ্জিত হয়। অদূরে প্রমত্তা গাবখান, তার উদরে যেন টুপ করে ঢুকে পড়েছে ধানসিড়ি। গাবখানের উপর হাল আমলে তৈরি হয়েছে একটি সেতু; সেতুর উপর দাঁড়ালে দেখা যায়, আদিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। সেই বিস্তৃতির সঙ্গে ধানসিড়ির কোনো রাগ-অনুরাগ নেই। ধানসিড়ি তার নিজের মতো করে বয়ে চলেছে শান্ত-ধীর লয়ে। আগেই বলেছি, নদী বিষয়ক তাঁর ভাবনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধানসিড়ি’র কল্পনায় জারিত হয়েছে। ধানসিড়ি আমাদের আবিষ্কারে একটি সরু নদী, যেন নদী নয়, নদীর রেখা। রাজাপুরের মূল সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে ‘রূপসী বাংলার’ কবিতার জাবর কেটে দিব্বি পৌছে যাওয়া যায় ধানসিড়ির কাছে। চারপাশে তখন দেখা যাবে- ‘হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ।’ ইংরেজ কবি সিসিল ডে ল্যুইস চিত্রকল্পকে, ‘আ পিকচার মেড আউট অব ওয়ার্ডস’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় শব্দকে ছবির মতো ছড়িয়ে দিতে জানতেন। ল্যুইসের বর্ণিত শব্দ দিয়ে নির্মিত ছবিই যদি ইমেজ হয়, তবে জীবনানন্দের কবিতায় এর অসংখ্য উদাহরণ টানা যায়। পূর্ণেন্দু পত্রী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বললেন, চিত্ররূপময়। বুদ্ধদেব বসু চিনিয়ে দিলেন, তাঁর কাব্য বর্ণনাবহুল, তাঁর বর্ণনা চিত্রবহুল, তাঁর চিত্র বর্ণবহুল। অতঃপর জীবনানন্দের কবিতাকে আমরা চিনতে শিখলাম চিত্র হিসেবেও অনেকখানি। তাঁর কবিতার কোন পর্বটুকুর সঙ্গেই কেবল রবীন্দ্রনাথের পরিচয়, আর ঠিক তেমনি, কোন পর্ব থেকে বুদ্ধদেব বসু আর ততখানি শ্রদ্ধাবান নন তাঁর কবিতা সম্পর্কে, সেসব হিসেব-নিকেশ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে আমরা অভিভূত হয়ে থাকতে চাই এই আবিষ্কারের উন্মাদক উল্লাসে যে, কবি জীবনানন্দ একজন চিত্রকরও।’ এই চিত্রকর লিখেছেন বলেই শীত রাতে গাছের পাতা নড়লে তাকে ‘মড়ার হাতের সাদা হাড়ে’র মতন মনে হয় বলে আমরা জেনেছি, আলো অন্ধকারে গেলে মাথার ভেতর যেটি কাজ করে তাকে ‘বোধ’ বলে এ-ও জেনেছিলাম!


ছবি:বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশন স্কুলের শিক্ষয়িত্রী হাসিনারা বেগম। ১৯৬০ সালে কবি জীবনানন্দ দাশ-এর পরিবারের কাছ থেকে তাঁর শ্বশুর আবদুর রাজ্জাক “সর্বানন্দ ভবন” কিনে নেন। পরে এর নাম কবির সম্মানে ‘ধানসিড়ি’ রাখা হয়। হাসিনা বেগমের পেছনে যে বাড়িটি দেখা যাচ্ছে সেটি বর্তমানের ‘ধানসিড়ি’।

‘নদী’ নামে জীবনানন্দের একটি কবিতা রয়েছে। ‘ধানসিড়ি’র সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে অন্তর্ভুক্ত এই কবিতাটি লেখার অনুপ্রেরণার মূলে ছিল এই নদীটি। সেখানে লেখা, ‘রাইসর্ষের খেতের পাশে নদী।’ ধানসিড়ির পাশে আসলেই একটি ফসলের মাঠ রয়েছে। একদম লাগোয়া। দিগন্ত ছাড়িয়ে সেই খোলামাঠ চলে গিয়েছে দূরের গ্রামের দিকে। কবিতায় বর্ণিত সেই চিত্রকল্প শব্দের সঙ্গে ছবির সাদৃশ্য তৈরি করেছে, অতঃপর কবিতা পাঠের পর এই আবিষ্কার জীবনানন্দের কবিতার পাঠক হিসেবে মনে যে বিচিত্র অনুভব জাগিয়ে তুলে সেই তুরীয় আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাওয়াই মুশকিল!

কবিতাটির কিছু অংশ-

রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হ’ল— দুপুরে বিবর্ণ হয়ে গেল
তারই পাশে নদী;
নদী, তুমি কোন কথা কও?
অশথের ডালপালা তোমার বুকের ‘পরে পড়েছে-যে,
জামের ছায়ায় তুমি নীল হলে,
আরও দুরে চ’লে যাই
সেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে;
নদী না কি?

নদী, তুমি কোন কথা কও?

‘নদী’ কবিতাই শুধু নয়, ধানসিড়ি নিয়ে জীবনানন্দ আরও অনেক কবিতা লিখেছেন, তিনি লিখেছেন-

সময়ের অবিরল সাদা আর কালো
বুনোনির ফাঁক থেকে এসে
মাছ আর মন মাছরাঙাদের ভালোবেসে
ঢের আগে নারী এক -তবু চোখ-ঝলসানো আলো
ভালোবেসে ষোলো-আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হত ধানসিড়ি নদী।

শটিবন, শশালতা, শিরীষ, শিউলি, হিঁজল, হেলেঞ্চা, হরীতকী, হোগলা, পরথুপী, বাসকলতা, মধুকুপী, বঁইচি ইত্যাদি নিয়ে জীবনানন্দ মেতে ছিলেন। তাঁর কবিতায় ‘এখানে প্রশান্ত মনে খেলা করে উঁচু উঁচু গাছ’ পড়লে নিমিষে চোখের সামনে অমন একটি ঝাঁকড়া গাছ দাঁড়িয়ে যায়। আমের কুঁড়ি, বাবলা ফুল, মধুমালতী কি আমরা দেখিনি? জীবনানন্দ যখন আলগোছে এগুলোকে কবিতার বিষয় করেন তখন যেন আমাদের অনুভব অনুভূতি সরব হয়ে ওঠে।

জীবনানন্দ যেন প্রকৃতি নিংড়ে আলোয় নিয়ে এসে খেলা করেন। ধানসিড়ির পাড়ে বসে থেকে আকাশের দিকে তাকালে দেখি- ‘স্নিগ্ধ একখানা মেঘ’, মাঠের দিকে দৃষ্টিপাতে অবলোকন করি- ‘চারি দিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল’, গাঁয়ের পথে হাঁটলে নাকে আসে-‘পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপশালী-ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ।’


ছবি: জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’ ঝালকাঠির জলমগ্ন এলাকায় এরকম দৃশ্য চোখে পড়ে।

বরিশালের, রূপসী বাংলার কবির স্মরণে কবির ছোটবোন সুচরিতা দাশ অসাধারণ একটি রচনা লিখেছেন। সেখানে তিনি লেখেন, “সবকিছুই আগের মত থাকবে শুধু একজন যাঁর আরো অনেকদিন এখানে থাকার কথা ছিল, পৃথিবীকে ভালোবাসার কথা ছিল, কথা ছিল বাংলার ত্রস্ত নীলিমার শান্তিতে মগ্ন থাকার, ‘সত্য আলো’র বেদনায় দীর্ণ হবার, সেই শুধু রইল না কেন? ধানসিড়ি নদীটি তেমনি প্রাণকল্লোলে বয়ে চলবে, সবুজ প্রান্তর মরকতের মত উজ্জ্বল হবে, অর্জুন ঝাউয়ের বনে বাতাস তেমনি করেই বইবে, সোনালি রোদ ডানায় মেখে শঙ্খচিল উড়ে যাবে, গোধূলির রঙ লেগে অশ্বথ বটের পাতা নরম হবে, খয়েরি শালিক খেলবে বাতাবী গাছে, কিন্তু সেই একজন, সেই একটি প্রাণময় সত্তা যে এই বিচিত্র রূপরাজ্যের পথে পথে হারিয়ে হারিয়ে গেছে, ‘সত্য আলো’র বিস্ময়ে বেদনায় ভেঙ্গে-ভেঙ্গে গেছে তাকেই শুধু খুঁজে নেওয়া যাবে না এদের মাঝে। এই শিশিরঝরা ধানের গন্ধে ভরা হেমন্ত রাতে- গাছের পাতারা যখন হলুদ হয়ে এসেছে, জোনাকির আলোয় দূরের মাঠ বন যখন ঝিলমিল, তখন নতুন করে সেই পুরোনো গল্পের পাণ্ডুলিপির আয়োজন চলছে আজ। সেই গল্প। আজ আর আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই গল্পের নায়ক নন, নন তাঁরা জ্যোৎস্না-মোছা রাতে শিশিরে ধানের দুধে ভিজে ভিজে হাওয়ার শরীরে স্বপ্নময় পরীদের হস্তগত। আজ যিনি, তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না শিশির ঝলমল সোনার ধানক্ষেতের পাশে ভোরের আলোয়। পৃথিবীর ভালোবাসায় চিরতরে যতি টেনে স্বপ্নের পরীদের হাতে নিঃশেষে তুলে দিলেন নিজেকে, তাঁর শয্যায় কাঁচা লবঙ্গ এলাচ দারুচিনি থাকবে না ছড়ানো, থাকবে তাঁর কাব্যে দূরতর সায়াহ্নের সমীপবর্তী সবুজার্দ্র দ্বীপের দারুচিনি লবঙ্গ এলাচের বনের রহস্যময় ধূসর ইশারা। নিজে তিনি নিদ্রার নির্জনে চিরপ্রিয় স্বপ্নের বলয়ে নিমগ্ন হয়ে থাকবেন- হয়তো :

চাহিয়াছে অন্তর যে ভাষা
যেই ইচ্ছে যেই ভালোবাসা
খুঁজিয়াছে পৃথিবীর পারে পারে গিয়া
স্বপ্নে তাহা সত্য হয়ে উঠেছে ফলিয়া।

জীবনানন্দ লিখেছিলেন,

‘ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে-পউষের রাতে।
কোনদিন জাগব না জেনে-
কোনোদিন জাগব না আমি-
কোনোদিন আর।’

প্রকৃতির সঙ্গে নিজের আত্মা সম্পূর্ণ মিশিয়ে ফেললেই হয়ত এরকম পংক্তি লেখা সম্ভব। বরিশালের সন্তান জীবনানন্দ দাশের কল্পনার হাত ধরে পউষের রাতে ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমাদেরও শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, কোনোদিন আর না জাগার স্বপ্ন বুকে নিয়ে…।

জীবনানন্দ দাশের ছবিটা ছাড়া বাকি সবগুলো লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ ।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.