কবিতা

তানভীর মাহমুদের কবিতা: বিলয়নিরিখে

তানভীর মাহমুদ | 4 Nov , 2018  


ইমেইজের সঙ্গীত
যারা সহজের মাঝে জগতের মৌল প্রত্যয়গুলো খুঁজে পান তারা জানেন কত অল্পে কত বিশালতা সুপ্ত থাকে; আপনি ধ্যানে তাকে খুঁজে নেবেন বলে। রেখা ও রং তেমন সহজ হতে চায় কারও কারও হাতে। সহজ হয়ে ওঠা রেখা ছন্দ ও গভীরতা অভিসারী। একেকটি রেখা একেকটি স্বতন্ত্র জগত। আপনি রেখা সমূহকে নিজের মানসের ছাঁচে বা ফর্মে গড়ে নেবেন। দৃশ্য গড়ে তোলার বাইরে রেখা নিয়ে শিল্পীর ধ্যান থাকে। মনে রাখতে হবে রেখাগুলো এমনিতেই ফলে ওঠে না। এখানে যে বিনিময় ও সঙ্গম ঘটে তা দ্বিমুখী। শিল্পী ও রেখা উভয়েই উভয়কে গড়েন। শিল্পীর মানস তার রেখাকে রূপ দেয়, আর রেখা নিজের মাধ্যমের আখরে হয়ে ওঠে। শিল্পীর মানসে বিশ্ব যেভাবে ধরা দেয় – কারও কারও বাচ্যে – তার বিমূর্ত রূপায়ন ঘটে ঐ একেকটি রেখায়।
অনিয়ত আকারসমূহের নিজস্ব সঙ্গীত থাকে। সেসব সঙ্গীত একত্রিত হয়ে অর্কেস্ট্রা গড়ে তোলে। তবে আমি একেকটি অনিয়ত গড়নের নিজস্ব সঙ্গীতের অণুবিশ্বের প্রতি আগ্রহী। বৃহৎ পটে হোক চাই স্বল্প বিস্তারের, রেখায় আপনার নিজের জগত জেগে উঠলে দুই একটি রেখাই হয় সাংগীতিক ও ভাষাময়। শিল্পগুরু মনিরুল ইসলামের কথা মন পড়ে। রেখা ও পরিসরকে নির্ভার করে দিয়ে সাংগীতিক ও রহস্যময় ধরনের মরমী করে তুলেছেন তিনি। মনে পড়ে সি ওয়াই ট্যোমলির কাজ। ছোপ ছোপ বিক্ষেপের মতো রঙ ও রেখার বিন্যাস ও আধ্যাত্মিকতা। ট্যোমলির শিল্প অবশ্য মানসের অভিক্ষেপও রাখে সময়ের প্রেক্ষিতে। ইমেজের সঙ্গীত নিয়ে অল্প কথা বলা গেল তবে।
যত অবয়ব – বস্তু ও প্রাণ, প্রাণবস্তু, বস্তুপ্রাণ ও বাস্তব। জ্যামিতিক নিখুঁত সব আকার আমার অনুভূতি ও আত্মায় জমে থাকে মমতায়, গৌরবে।
সেই কিউব। যে সমাহিত। সে বুদ্ধ। তিনি গুম।
গহ্বর – যাকে আমি খুঁড়ে তুলেছি বলে সে নিজেকে আবিষ্কার করলো আজ – তার গর্ভনিদ্রায় পড়া আলো নিজের অন্তরের খোঁজ পায়। আলো ও গহ্বর একে অন্যকে আবিষ্কার করে। আদর্শ সেসব নিয়ত আকারের প্রতি আমি যখন প্রণতি জানিয়েও নিজের প্রবণতার খোঁজ পাই নদীর বাঁকের মতো, ভাঙ্গনের মতো সব অনিয়ত প্রাণের, ধ্বনির ও আকারের – অনন্যোপায় হই।

বস্তুর অনির্বচনীয় ধারা
মৌল প্রাণ ও সত্তাসমূহের ভাষায়, বচনের ধারাপূর্ব অবস্থার দিকে যেতে চায় আমার শিল্প।
বাস্তবগুলো একে অন্যের মাঝে আপাত জটিল বুনটে জড়িয়ে থাকে। একই পরিসর থেকে বিবিধ ভাষা ধ্বনিত হয়। এমনকি ধ্বনির বাস্তবও হয়ে ওঠে ভিন্ন। জগতসমূহের বিভিন্নতা থেকে স্বাতন্ত্র্য, তথা ভাষা, রূপ পায়। কাব্য বা শিল্প মাধ্যম পরের আলোচ্য। প্রথম কথা হচ্ছে প্রত্নমানসে ধরা দেয়া বাস্তবগুলোর বুণট আপনাকে কেমন করে গ্রহন করে, এবং আপনার ছাঁচে আপনি তাদের কেমন করে রূপ দেন। এইই তো ভাষার অন্তর্জগত ও দেহ।

এ দেহ ঘনক
বহমান রশ্মিকে নিজের ভেতর গোপন রাখে শীলা, কংক্রীট। ছেনীর সাথে বিনিময় হয় ঘন পরিসরের বেদনা। একেকটি স্তম্ভ তার ভেতরের আন্দোলনকে কিকরে নিজের মাঝে লীন করে তার আভাস ধরতে হয়। শিল্পী এর ছাপ রেখে দিতে চান স্তম্ভ হয়ে ওঠা অস্তিত্বের ওপরিতলে। খিলানের ত্বকে স্পন্দন জেগে থাকে খসখসে হয়ে – নীরব ও বাঙময়।
…মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীত এক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পায়। এই স্পন্দনগুলোকে সহজে ফুটিয়ে তুলতে সঙ্গীতের ভাষা সবচেয়ে সফল। মূল ঐকতানের মাঝেও তাই স্বরের বিক্ষেপ থাকে স্মিত হলেও।
স্তম্ভের খিলানের নিরেট ভর
জেগে থাকে দেহে তার শিল্পীর আত্মা দন্দ্বমুখর

সেনশুয়ালিটি
ছুঁয়ে দেখা। বিঁধে দেখা। বিমূর্তকে ত্বকে অনুভব করা। স্তম্ভ যেভাবে বাড়ে নিজের অস্তিত্বকে এভাবে প্রত্যক্ষের সামনে ঘটিয়ে তোলা।
সঙ্গীত থেক স্তম্ভ। মৌল স্রোতের ও এনার্জির অভিঘাতকে জমাট দীর্ঘ রূপ দিয়ে এ স্তম্ভ জেগে ওঠে।
কেউ যখন বলবেন আপনি অ্যাবস্ট্রাকশনের বা বিমূর্তায়নের চতুর্থ বা পঞ্চম স্তরে পৌঁছেছেন, তাকে বলুন এ তবে আর বিমূর্ত নেইই একেবারে। এইই গ্রাহ্য বাস্তব।

কনফর্মিজম পৌরুষ নির্দিষ্টতা
যা কিছু ঘটে গেছে তা সত্য বলে জানি যেমন, অস্বীকারও করি। এর কারণ এই নয় যে কেবল অস্বীকার করাই প্রচল। বরং আমি তার সাথে কনফর্ম করি না, সেই প্রচলে চলি না আমি। যা আমার নয় তার সাথে তাল মেলাই না, মেনে নিইনা।
নব ধারাটি আপনার মনমতো সুনিশ্চিত ও স্থির নয় হয়ত, আপনার রুচি ও ভাবনাকে ঐ দেশ গ্রাহ্য করেনা, আপনি তাকে গুনে নেন, মেনে নেন না। কেননা আপনি যাকে দেখে এসেছেন সেসবের মতো এই দেশখানি নয়। সময়কে ধরা যদি শিল্পের আরাধ্য হয় তবে আমি সময়কে অস্বীকার করতে চাইব অথবা সময়কে বদলে দিয়ে বা সময়কে নতুন সংগঠনে হাজির করব। সময়কে কুঁদে বের করব। সে সময় একান্তই আমার।
যে বাস্তব আপনি প্রত্যক্ষ করছেন তা সাংবাদিক নিত্যই দেখায়। আমি তার গভীরের সংগঠন বা কাঠামো দেখতে চাইতে পারি, অথবা ভিন্ন বাস্তব দেখতে চাইব। সে বাস্তব আমার নিজের। যখন সম্পাদক আমাকে বলেন জীবন ঘনিষ্ঠ লেখা লিখতে আমি এই কথাই বলি। আমি কনফর্ম করব না বলেই লিখি। লিখি বলেই জীবিত থাকি। সবাই যা গ্রহন করবে তা লিখব বলে আসিনি এখানে। স্রোতের বাইরে নিজের ভিন্নতাই আমার দ্রোহের স্বাক্ষর।
নতুন করে পথ করে নেয়াকে কেউ বলেন সাহস, কেউ পৌরুষ বলেন। দুইই বলি আমি। যে ছন্দ ও সৌষ্ঠব আমার নয় তা আমার ভাষার অংশ নয়। ভেঙে চুড়েই নতুন কোণ ও স্থাপত্য গড়ে নেব আমি। সে স্থাপত্য দৃষ্টিসুখকর নাও হতে পারে। কিন্তু তা আমারই। আপনার শূণ্যে জায়গা করে নেয় সে। নিজের সীমানা-কন্তুর চিহ্নিত করে; যেভাবে তামার পাতে দাগ কাটেন ছাপচিত্রী। বিমূর্তায়নও এভাবেই ঘটে।
যদি চেনা সুরে গান বাঁধিই তবে তাতে চেনা কথা ও স্বর থাকবেনা আমি এটা নিশ্চয় করেই বলব। স্বরের দেহের কারণে তা কেবল নতুন মাত্রা আনবে না, নতুন সঙ্গীত হয়ে উঠবে। কবি এমনই চান। এমন পৌরুষের যাত্রা তার। আপনি যতকিছুতে অভ্যস্ত তাকে ভেঙে ফেলেই আমার স্বর যাত্রা করবে। যারা বড়ে গুলাম আলী খাঁ সাহেব, গোলাম মোস্তফা খাঁ সাহেবের কন্ঠ শুনেছেন তারাই জানেন মিষ্টতা ও শ্রুতিমধুরতাই সঙ্গীত নয়। অমসৃণ তলে আলো ভালো খেলে। এ. কানন, আমির খাঁ ও গোলাম মোস্তফা খাঁ এর কন্ঠে রাগ হংসধ্বনি ভিন্ন ভাষার হয়ে ওঠে।
কবিতায় আমি অনির্দিষ্টতা দেখতে চাই না। যা দেখাই চোখের সামনে ধরে দেখাই। স্বৈরতান্ত্রিকতা আছে আমার, মৌলবাদীতাও। কোন ও যেন বলে কিছু নেই আমার ভাষায়। যা আছে তা এখানেই আছে। ব্রুড কফির তিন স্তর টেকশ্চার ও ঘ্রাণের মাঝে স্নায়ু জেগে ওঠে।

স্মৃতি এর পরিসর স্মৃতি গড়া অস্তিত্ব
যখন সোনারং তিমি কবিতাটি লিখি এক কবি তাতে পরিসর গড়ে তোলা দেখেছিলেন। আবার স্মৃতির দরোজাহীনতার আলাপ হয়েছিল কবি তারিক ঈমামের সাথে দেড় দশকের বেশী আগে। তিনি এই ধ্যানকে ফলিয়ে তুলেছিলেন। আমরা আসলে স্বতন্ত্র সব পরিসর ও স্মৃতিই গড়ি। মোজাইকের মতো স্মৃতি গড়ে ওঠে। একেকটি পরিসর। তিমিও তেমন পরিসর। তিমিও তেমন স্মৃতি। আবার সে স্মৃতির শেকড় আছে, যা আর্দ্র। সে শেকড়ে আন্দোলন আছে। সে নিজে এক বিশ্ব – দেহ, সৌষ্ঠব ও স্মৃতির জগত। আমি একে জীবন বলি।

মানবিক অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে বিমূর্ত বাস্তব
কেউ কেউ মাঝামাঝি এক পথ অবলম্বন করেন। বিমূর্ত বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় এমন বাস্তবের সাথে বিমূর্ত ঘটনা ও বাস্তবের বয়ন করেন। এতে যোগাযোগের পথ সুগম হয় পাঠকের সাথে লেখকের। আমি যেমন আগেই বলেছি ঢুঁড়ে দেখা যায় নিত্য দেখা ঘটনাবলীর অন্তর্দেশে কোন অদৃশ্য সংগঠন পাওয়া যায় কিনা। এভাবেই মহৎ সব অন্তর্দৃষ্টিময় দার্শনিক রচনা, কবিতা, উপন্যাস ও বিবিধ রচনা দাঁড়িয়েছে। অস্তিত্বের নিত্যতার সাথে অনুভব ও ভাবনার ইন্দ্রিয় অতিক্রমী জগতের সম্মিলনে নতুন বাস্তবের জন্ম ঘটে। মনে পড়ে মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন এবং গার্সিয়া মার্কেজের গোত্রপিতার হেমন্ত। কিছুটা প্রসঙ্গান্তরের হলেও আমি রলা বার্তের আ লাভার্জ ডিসকোর্স এর নামও বলতে চাই এবেলা।

সে ভাস্কর বলে
যা স্থির তাতে প্রাণ দিলে জমে যায় খেলা। যাতে প্রাণ আছে তার কেন্দ্রে আন্দোলন এনে দিলে ফুটতে থাকে অগ্নিফলা। উৎকেন্দ্রিক সব প্রাণ স্ফুলিঙ্গ।
অভিঘাতকে চিনতে পারা আমার কাজ। শব্দ ও রাগের ঘাতকে চিনতে পারি আমি।
কবিতায় বা যেকোন শিল্পেই ফোকাস ধরে রাখা অন্যতম কাজ। হাওয়াকে খেলাতে হয়। এমনকি ঘন সংবদ্ধ আকৃতি এবং গতিময়তায়ও এমন অবকাশ থাকতেই হবে। আলো ও হাওয়ার জানালা খোলা থাকুক। আঁধার ও আঁধার অতিক্রান্তকে জায়গা করে দিতে হবে এমনভাবে যেন একের পাশে অন্যে ভাস্বর হয়। শিল্প এভাবে স্মরনযোগ্য হয়।
মনে রাখা ভাল যে, রেখা বা রেখাগুলোতে আপনি মহাজাগতিক এনার্জির সমাবেশ ঘটাতে চাইছেন চোখের সামনে তার অন্তত দুই একটি মূল সুর আসতেই হবে। বাকিটা ধীর অনুধ্যানের জন্য তোলা থাকুক। কাজেই অসংখ্য শক্তিকে একটি শিল্পে আনতেই হবে এমন পণ না করি আজ।

কবির সাথে আলাপে

– আমি রিয়লিটির পেছনে সংগীতগুলো দেখেছি।
– স্বদেশিতা অতিক্রম করে আমার শেকড় কসমিক।
– কবিতার ইতিহাস ওভারঅল টেক‌নি‌কের ইতিহাস এমন আমি মনে করিনা। কবিতার ইতিহাস এমনকি চমকের ইতিহাসও নয়।
– দেখুন, কাউকে চেহারায় ভারতীয় না হলেও চলবে। আমরা কোনভাবেই ইওরোপীয় নই। সেই সাইকীই নেই আমাদের। মানস কিন্তু আঙ্গিক নয়। সামুহিক অবচেতন ভিন্ন আমাদের। আমি যা বলি তা আমারই।
– কবিতাও অনেকে অনেক কারণে করে। কিছু করার নেই বলেও করে। কথা এলোমেলো বলাকে ভ্যালিডিটি দিতে চায় বলে করে।
– কেউ মসজিদের ভেতরে ঢুকবে। কেউ বাইরেই থাকবে। কেউ মসজিদ চিনবেই না। আর কেউ দরগাহতে যাবে, হাসিল করবে। কারও খানকাহতে আবার আসবে অনেকে। কেন্দ্র সে ভাঙবে। সে কেন্দ্র হবে। নুর হবে সে।

বিলয় নিরিখে আশ্রয়ের অমোঘ জন্ম।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.