অনুবাদ কবিতা

সৌম্য দাশগুপ্তর অনুবাদে অস্ট্রেলিয়ার দুই কবি

সৌম্য দাশগুপ্ত | 5 Mar , 2019  


Barron Field (1786 – 1846)
কবি ব্যারন ফীল্ডের জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডে, ১৭৮৬ সালের ২৩শে অক্টোবর। অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন নিউ সাউথ ওয়েল্স-এর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে, ১৮১৬ সালে। প্রকৃতির খুব সমাদর করতেন বলে তাসমানিয়ার মাউন্ট ফীল্ড ন্যাশনাল পার্ক কবি ব্যারন ফীল্ড-এর নামেই তৈরি। ইংল্যান্ডের সাহিত্যসমালোচক ও প্রাবন্ধিক চার্লস্ ল্যাম্ব ব্যারন ফীল্ডের কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর ‘স্বদেশ-স্বজন ছেড়ে তস্করসমাজে গিয়ে বিচারের রায় দেওয়ার’ কাজটিকে বেশ এক হাত নিয়ে তারপর এই চমৎকার কবিতাদুটি নিয়ে খুব বিদ্রুপ করেছিলেন। সমালোচকের চরিত্র সে যুগে বড় একটা আলাদা ছিলনা।

ক্যাঙারু
ক্যাঙারু , ভাই ক্যাঙারু!
তুমি অস্ট্রেলিয়ার আত্মা
এই ব্যর্থতা থেকে পরিত্রাণ
এই নির্জনতার সঙ্গী

তোমারই জন্যে তৈরি হয়েছে
পৃথিবীর এই পঞ্চম, ঘন
মহাদেশ, যেন নতুন জন্ম
হলো তার, যেন
আদিযুগে সে তো ছিল না,

(গোড়ার কাজটা ভালো লেগেছিল,
সেই প্রেরণায় ঈশ্বর, তাঁর
আপন সৃষ্টি আশীর্বাদ করেছেন)

প্রথম পাপেই উঠে এল এই
মহাদেশ, সেই অভিশাপ থেকে
আজ এ-বন্ধ্যা জঙ্গল!

ক্যাঙারু, ভাই ক্যাঙারু!
একনজরে তো অসংগতিই দেখেছি
পরমুহূর্তে গোলমাল মিটে
একতান হয়ে যায় ।

স্ফিংস্, নাকি তুমি মৎস্যকন্যা, বুঝিনা
অশ্বমানব সেন্টরটাকে খুঁজি
ল্যাবিরিন্থের ঘোড়ামোষ সেই মিনোটর,
থিসিউস যাকে শেষ করে ফেলেছিল।

কাব্যিক – যেন হাঁসজারু, যেন হাতিমি, সব
মেলানো মেশানো কৌতুক।
কিন্তু প্রকৃতি – মেলাবেন, তিনি মেলাবেন,
সব সৃষ্টিকে প্রজ্ঞার সাথে ঠিক-ই।

কাঠবেড়ালিকে দুবলা তৈরি করেছেন,
হরিণকে এক চঞ্চল লাফানিয়া
কিন্তু তুমি যে শক্ত এবং তৎপর, সেটা
প্রকৃতির এই শিল্পের পরকীয়া।

ওই দুজনকে মিলিয়ে মিশিয়ে তাই
ক্যাঙারু, তোমার গঠন অনেকটাই।

বর্ণনা করা মুশকিল আপনাকে
জিরাফের যেন উল্টো সংস্করণ
উট দিয়ে যার শুরু হয়েছিল, শেষ যার চিতাবাঘে
পুরোভাগটুকু শিশুহরিণের, যেন
পশ্চাদ্ভাগে বিশাল সে এক প্রাণীর ওজন ধরা
বনে বনে লাফ মারা
পবিত্র এক ভুলের ছন্দে ভরা
কেবলমাত্র প্রকৃতির হাতে এমনটা হতে পারা
সৃষ্টি সেদিন বন্ধ করেছে বুদ্ধির খেলা করা।

যতই হওনা ভুলে ভরা, তবু অযৌক্তিক তো নও,
ঘেন্না হয়না, বিরক্তি লাগে নাকো
অনেক সুঠাম পশুদের জানি তাড়া খেলে তার পঞ্চাশ লাফে
তোমার একটা পদক্ষেপেরও সমান চলতে পারেনা।
পরিশোধনের প্রশ্ন ওঠেনা, যা আছো তেমন থাকো।

পাতিহাঁস যায় জাদুঘরে যাক
রাজহাঁস হোক নিখোঁজ
তবু তুমি এই দেশের মুখটা রেখো
শ্রেষ্ঠ কীর্তি বিধাতার হয়ে থেকো।


Judith Beveridge (1956 – )
কবি জুডিথ বেভেরিজের জন্ম ইংল্যান্ডে, ১৯৫৬ সালে। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Domesticity of Giraffes ১৯৮৭ সালে প্রকাশ হওয়ামাত্র নিউ সাউথ ওয়েল্স্-এর প্রিমিয়ার্স পুরস্কার পায়। ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ার্স পুরস্কার পান তার পরের বছর। বর্তমানে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কবিতা পড়ান। Wolf Notes (১৯৯৬) এবং Storm and Honey তাঁর পরবর্তী দুটি বই। আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় জুডিথের বিষয়বৈচিত্র্য ও বিশ্বচেতনা দেখে, যার প্রমাণ নিচের দুটি কবিতায়।

ঘুঁটেকুড়ুনি

রোজ সকালে মেয়েটি তার লাল দোপাট্টার নিচে মুখের থেকে ঘাম মুছে নিয়ে দম বন্ধ ক’রে
আরো একটু গোবর তোলে
শিগগিরি সে গোবরের স্তূপের পাশে বসে মাছি তাড়াবে
একদলা গোবর হাতে নিয়ে মনে মনে হিসেব করবে এতে ক’খানা রুটি হবে।
একটা একটা করে ঘুঁটে বানাতে বানাতে তার মনে হবে,
সাঁঝের চুল্লির ধোঁয়ার ওপর চাপানো ডেকচিতে আজ অনেকটা ডাল উপার্জন হলো।
কাদার ওপর থেকে আরো গোবর, আরো আরো গোবর তুলতে তুলতে মেয়েটি
ঘন্টাদুয়েক পার করে দেবে।

গোরুবাছুরকেও এই দুনিয়া চরে বেড়ানোর জন্যে এই মেয়েটির থেকে বেশি স্বাধীন মনে হয়।
মেয়েটি আরো গোবর নিয়ে ঘুঁটে দেওয়ার জন্যে দেয়ালে যায়, আর
ট্রাফিকের আওয়াজে মিশে যায় তার গুনগুন সুর।

মেয়েটি তো অন্য-কেউও হতে পারতো
আলোকিত রাস্তার ওপর সুগন্ধি ফ্ল্যাটে চচ্চড়ির পাত্র ঈষৎ সাতঁলে নিতে নিতে গুনগুন করা কোনো শৌখিন মহিলা
অতিথিরা কখন আসবেন ভাবতে ভাবতে যিনি ঘরের মধ্যে একচিলতে রোদ্দুরের প্রবেশ দেখছেন
সেই রোদ্দুর, যা মশলা আর ফোড়নের ওপর চামচের মতো এসে পড়ছে, আর তিনি ভাবছেন,
কখন বার্চগাছের পাতাগুলি ওই
রোদ্দুরের মতো হলুদ হয়ে উঠবে।

আসলে এটা কেনো নিপুণ কাজের আলোচনা নয়,
কৃতজ্ঞ হৃদয়ের সৌন্দর্যের কথা নয়
ব্যস্ত পাঞ্জাবের পথে লক্ষ্য করার মতো নাটকীয়ও নয় কিছু
শ্রম আর প্রার্থনার মাধ্যমে এক মহিলা নিজেকে কেমন নিবেদন করছেন, সেকথাও হচ্ছেনা।

এ হলো একটা মেয়ের কথা
সারাজীবন যাকে একটা গোরুর পিছনদিকে ধ্রুবনক্ষত্রের মতো তাকিয়ে অপেক্ষা করে যেতে হবে।
যাকে ডজন ডজন বিবর্ণ চাঁদের টুকরো বাড়ির দেয়ালে চাপড় দিয়ে সেঁটে যেতে হবে,
যাতে কমলারঙের রোদ্দুর সেগুলি শুকিয়ে খরখরে করতে পারে
যে তার হাতের চুড়ির ওঠানামার সঙ্গে পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাসগুলি শুনতে পাবে,
যেন উপচে পড়া ঘাসের ওপর পতঙ্গের গান;

এ হলো সেই মেয়েটির কথা,
রোজ ভোরবেলা নিচু হয়ে একটা থালার ওপর গোবর তুলতে তুলতে
যে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকতে পারে।

আসলে এটা কেনো নিপুন কাজের আলোচনা নয়,
কৃতজ্ঞ হৃদয়ের সৌন্দর্যের কথা নয়
ব্যস্ত পাঞ্জাবের পথে লক্ষ্য করার মতো নাটকীয়ও নয় কিছু
শ্রম আর প্রার্থনার মাধ্যমে এক মহিলা নিজেকে কেমন নিবেদন করছেন, সেকথাও হচ্ছেনা।

এ হলো একটা মেয়ের কথা
সারাজীবন যাকে একটা গোরুর পিছন দিকে ধ্রুব নক্ষত্রের মতো তাকিয়ে অপেক্ষা করে যেতে হবে।
যাকে ডজন ডজন বিবর্ণ চাঁদের টুকরো বাড়ির দেয়ালে চাপড় দিয়ে সেঁটে যেতে হবে, যাতে কমলারঙের রোদ্দুর সেগুলি শুকিয়ে খরখরে করতে পারে
যে তার হাতের চুড়ির ওঠানামার সঙ্গে পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাসগুলি শুনতে পাবে, যেন উপচে পড়া ঘাসের ওপর পতঙ্গের গান;

এ হলো সেই মেয়েটির কথা,
রোজ ভোরবেলা নিচু হয়ে একটা থালার ওপর গোবর তুলতে তুলতে

যে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকতে পারে।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.