আমরা ফিরে যাব বারবার তার শিল্প ও সাহসের কাছে

দিল মনোয়ারা মনু | ৭ অক্টোবর ২০১৮ ৫:৫৩ অপরাহ্ন


মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়ভাষিণীকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। লড়াই করতে হয়েছে হানাদারদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে, যুদ্ধ শেষে লড়াই করতে হয়েছে হানাদারদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে সামাজিক মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, লড়তে হয়েছে প্রবল সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাকে মনে রেখেছে এজন সফল যোদ্ধা হিসেবে।
প্রিয়ভাষিণী ছিল শিল্পী। খুব কাছ থেকে অবাক বিস্ময়ে দেখেছি কুড়িয়ে আনা খর, পাতা, বাঁশের, গাছের ছাল,বাকল, ডাল ও গুড়ি দিয়ে কি নিপুণভাবে তিনি একে একে অসাধারণ সব শিল্প তৈরী করতেন। সেই শিল্প যে কত আধুনিক, কত জীবন-ঘনিষ্ঠ এবং যুগোপযোগী যা শিল্পপ্রেমিক মানুষ মাত্র অনুধাবন করতে পারেন। সাধারণ মানুষের জীবনের রূপকার এই নান্দনিক মানুষটির অনবদ্য শিল্পকর্মই শুধু নয়, ব্যক্তি মানুষটি তাদের কাছে শ্রদ্ধা ভালবাসায় অনন্য হয়ে ওঠেন। প্রকৃতির সহজ সরল রূপের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন শিল্পের অমিত সম্ভাবনা তাই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এই নারী বলতেন, আমি কোন বড় প্রতিষ্ঠান থেকে হাতে কলমে শিক্ষা নেইনি, আমি পরম আগ্রহে ভালবাসার সাথে শিক্ষা নিয়েছি প্রকৃতির পাঠশালা থেকে। আর এর মধ্য দিয়েই চিন্তা চেতনায় আধুনিক প্রগতির পথে হাটা এই মানুষটি শিল্পের ক্ষেত্রে নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছেন। পেয়েছেন সকল শ্রেণীর শিল্পসচেতন মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম। তাকে বলা যায় শিল্পের এক মানবিক কারিগর। তিনি শিক্ষা গুরু হিসেবে, অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে যার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, তিনি হচ্ছেন আর এক মহান শিল্পী নড়াইলের এস এম সুলতান।

আমার সাথে তার প্রথম দেখা এবং পরিচয় ১৯৯১ সালে যশোহরে। চারুপিঠ আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে । এই প্রদর্শনীর খবর ও তার সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আমি পত্রিকায় ছাপিয়েছিলাম। তার সাথে দেখা হলে তিনি সেই কথাটি প্রায়ই বলতেন তুমিই আমার প্রথম সাক্ষাৎকার ছেপেছো। এই প্রদর্শনীটি তার জীবনে আরো উল্লেখযোগ্য কারণ প্রদর্শনীর শেষে ‘চারুপীঠ’-এর সহযোগিতায় এস এম সুলতান এক সংবর্ধনার আয়োজন করে তাকে ভাস্কর হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর পর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে পাঁচটি একক এবং সাতটি যৌথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের মানুষকে পরিচিত করে তোলেন ভিন্ন এক নান্দনিক শিল্পের সাথে।
পাক্ষিক অনন্যার সাথে ছিল তার মধুর এক ভালোবাসার সম্পর্ক। আমার সাথেও গড়ে ওঠে এক চমৎকার সম্পর্ক যা আমাকে আরো কাছে থেকে দেখার এক দুর্লভ সুযোগ করে দিয়েছিল। লেখালেখি বিভিন্ন প্রদর্শনী ও তার অসুস্থতার খবর পেয়ে যেতে হত তার কাছে। তখন দেখেছি নিপুণ যত্নে সাজানো তার সংসার, তার ভালোবাসার পরিমন্ডল। তার কাছে যাওয়া মানে সৃষ্টিশীলতার কাছে যাওয়া। দেখা হতেই মনে হত সদাস্নিগ্ধ হৃদয়খানি যেন হাসছে চোখের পরে। আপন করা মধুর ব্যবহার সংসারকে অবহেলা করে নয়, মর্যাদা দিয়ে সব কাজ সুচারু-ভাবে সম্পন্ন করে তিনি শিল্পকর্ম, বন্ধু-সুহৃদ এবং চারপাশের মানুষের সুখে, দুঃখে ছুটে যেতেন। পশুপাখীদের না খাইয়ে তিনি কখনো নিজে খেতেন না। অসুস্থ স্বামীকে সারাজীবন গভীর আন্তরিকতা নিয়ে আগলে রেখেছেন, সেবা করেছেন। তার নাতি প্রিয়দর্শনকে খুব ভালবাসতেন তিনি। তখন মনে হত পৃথিবী এক দিকে, প্রিয়দর্শন আর এক দিকে। আমার মনে পড়ছে অনন্যার এক ফ্যাশন প্রতিযোগিতায় আপা বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন। এগারটা বাজতেই উদগ্রীব হয়ে উঠলেন প্রিয়দর্শনকে স্কুল থেকে আনার জন্য।

তিনি বিশ্বাস করতেন মেয়েরা বাইরের কাজ করবে কিন্তু ঘরকে অবহেলা করে, সময় না দিয়ে নয়। দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন তাঁর আদর্শ। পাশাপাশি থাকতেন। আনন্দ-বেদনা, যন্ত্রণা তার সাথে ভাগ করতেন, পরামর্শ নিতেন। প্রিয়ভাষিনীর আর একটি পর্ব যাকে আমরা বীরত্ব গাঁথা বলতে পারি, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অপরিহার্য গৌরবোজ্জ্বল অংশ। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার প্রবল আগ্রহ ছিল তার সাহস, মাতৃপ্রেম এবং একাত্তরের দুরন্ত সময় সম্পর্কে জানা, যার বাঁকে বাঁকে রয়েছে অতল অন্ধকার এবং বঞ্চনা, মর্মান্তিক চিত্র। নিদারুন কষ্টের মধ্যদিয়ে তাকে তা অতিক্রম করতে হয়েছে। যখনই তার সাক্ষাৎকার নিতে গেছি আসতো ৭১’এর কথা। পেয়েছি নতুন নতুন তথ্য, হৃদয় মোচরানো নানা ঘটনা, অনেক মনভাঙা কাহিনী। জানিয়েছেন নির্যাতিত নারীর পক্ষে তার সাহসী উচ্চারনের কথা ‘যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই’। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার ওপর চলা দুঃসহ নির্যাতনের।
প্রিয়ভাষিনীর বাবার দেশ ফরিদপুর, নানার বাড়ী যশোহর-এর নড়াইলে। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় ঢাকায় নারী শিক্ষা মন্দিরে এবং যশোহরে এস এম কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হন। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি পঁচিশ বছরের তরুণী। টেলিফোন অপরেটর হিসেবে কাজ করতেন, খালিশ পুরের ক্রিসেন্ট জুটমিলে। স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি নিজের পছন্দে বিয়ে করেন সহায় সম্বলহীন এক বেকার ছাত্রকে। সেই সময়ই এই উদ্যোগী নারী বাড়ী, বাড়ী টিউশনি করে সংসার চালাতেন। একে একে তিনি তিন ছেলের মা হন। এবং তাদের জন্মের পর স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যায়। ১৯৭১ এর রাজনৈতিক বিপর্যয় যখন আসে তখন তিনি তার ছেলেদের নানীর কাছে রেখে আসেন। শুরু হয় আর একটা নতুন জীবন, সেদিন সেটা ছিল একা একজন মেয়ের বাঁচার লড়াই। যা সমাজে তখন গৌরব লাভ করেনি। একা ডির্ভোসী একজন নারীর ওপরে স্বাভাবিক ভাবেই অনেক সুযোগ সন্ধানীর লোলুপ দৃষ্টি পরে, তিনি নিগৃহীত হন বারবার। মিলের জেনারেল ম্যানেজার সহ সামরিক বাহিনীর অফিসাররা তাকে অসংখ্যবার নির্যাতন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ক্রমান্বয়ে তাকে এই নির্যাতন সইতে হয়েছে। একটি সামরিক যুদ্ধ কিভাবে একজন উপায়হীন নারীকে সারা জীবনের যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয়, সেই চিত্র উঠে এসেছে ২০১৪ সালে প্রিয় ভাষিনীর লেখা ‘নিন্দিত নন্দন’ নামে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে। সহজ সরল সুপাঠ্য এই বইটিতে হানাদার বাহিনী আর দেশীয় রাজাকার আলবদর দালালদের সহিংসতার বর্বরতার চিত্র বারবার এসেছে। হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠে এসেছে, সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা দৈনন্দিন এবং বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার চিত্রও এই গ্রন্থে এসেছে। এই বইটিতে উঠে এসেছে হানাদার বাহিনী, আলবদর, রাজাকারদের সহিংসতার নিষ্ঠুরতম বহু চিত্র । শুধু একজন উদারলোক যিনি সহযোগিতা করেছিলেন প্রিয়ভাষিনীকে সেই সময়ে, অত্যাচার করেনি, তিনি হচ্ছেন পাকিস্তানী আর্মির আলতাফ করিম।

প্রিয়ভাষিনী ক্ষোভের সাথে বলেছেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে নতুন দেশ, নতুন সরকার এল, যেই দেশের জন্য তিনি ধর্ষিতা হলেন সেই দেশ কিন্তু তার মুখের খাবার কেড়ে নিল। স্বাধীন দেশে তার ক্রিসেন্ট জুট মিলের চাকুরীটা আর থাকলো না। আপন-জন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে পরিচয় হলো একজন ধর্ষিতা হিসেবে। প্রিয়ভাষিনীর বর্তমান স্বামী আহসানউল্লাহ যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিকুল অবস্থায় সকল সময় তার পাশে ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি পরিবারের বিরোধিতা আগ্রাহ্য করে বিয়ে করে তাকে এক অনন্য মর্যাদা দিলেন কিন্তু স্বামীর কূলের অনেকেরই মাসসিকতা ছিল নেতিবাচক। তাঁর লড়াই চলেছে এখানেও। সেটা এতটাই বিরুদ্ধ পরিবেশ ছিল যে প্রিয়ভাষিনীর মেয়ে তার দাদার বাড়িকে মিনি পাকিস্তান বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু ৭১ এর ঘটনা তার পিছু ছাড়লো না। তিনি লজ্জায় মুখ লুকালেন না, লজ্জা সংকোচ ঝেরে ফেলে মাথা উচু করে দাঁড়ালেন। নিজেকে সর্মপণ করলেন শিল্পের কাছে। সেটাই হয়ে উঠলো যেন তার জীবনের বিকল্প আশ্রয়।

প্রিয়ভাষিনী কাজ করেছেন কানাডিয়ান হাইকমিশন, ইউনিসেফ, ফাও এবং গণসাহায্য সংস্থায়। মাহবুব আলম তরুণ তৈরী করেছেন তার শিল্প জীবন নিয়ে একটি ডকুমেন্টারী যাতে তার শিল্পী জীবন এবং নান্দনিক ভাস্কর্যগুলোর চমৎকার সমাহার ঘটেছে। তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন ২০১০ সালে, রিডার্স ডাইজেষ্ট ম্যাগাজিন তাকে হিরো সম্মাননায় ভূষিত করেছে। ২০১৮ সালে পেয়েছেন সুলতান স্বর্ণপদক।
প্রিয়ভাষিনী বলতেন শিল্পের জন্য শিল্প নয়, জীবনের জন্যই শিল্প। তিনি আরো বলতেন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে না জানলে বড় শিল্পী হওয়া যায়না। প্রিয়ভাষিনী আমাদের সংগ্রাম ও সাহস। স্বাধীনতা পুরষ্কারপ্রাপ্ত এই সৃষ্টিশীল, নান্দনিক মানুষটাকে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই। তাঁর সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীলতার কাছে আমাদের যেন বারবার ফিরে আসতে হয়। ফিরে আসতে হয় তাঁর সাহসের কাছে, স্বাধীনতা সংগ্রামে নির্যাতিত হয়েও কখনো মাথা হেঁট করেননি। সাহসের সাথে প্রতিবাদ করেছেন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে। প্রেরণা হয়ে থাকবেন সকলের কাছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com