নির্বাচিত, প্রবন্ধ

অরুন্তুদ সময়ে কবিতাভাবনা

সরকার মাসুদ | 18 Oct , 2018  


একটি জাতি যখন অবক্ষয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন তার শিল্পকলায় দেখা দেয় স্থবিরতা। শিল্পীরা নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না। তাদের কাজ কেবলই পুরনো বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খায়। কবিরা দিকভ্রান্ত ও হতাশাআক্রান্ত হন; তারা নিজেদের ভেতরে ও বাইরে কোথাও সৃজনশীলতার প্রণোদনা খুঁজে পান না। ফলে দেখা যায়, নৈরাজ্য ও অবক্ষয়কে উপজীব্য করে কাব্য রচিত হলেও তা খুব একটা মানসম্মত হয়ে উঠতে পারেনা। কবিতা চিরকাল সুন্দরের পক্ষে, সত্যের পক্ষে। তাই সমাজে যখন অসত্যের বেসাতি চলে, ধান্ধাবাজির রাজত্ব কায়েম হয়, তখন সে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। আদর্শের সম্মানিত প্লাটফর্মটি অটুট ও দৃঢ়মূল না থাকলে কবিতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কাব্য পলকা জিনিস নয়। তাই সে কোন অশক্ত ভিত্তির ওপর নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে না। সুদীর্ঘকাল আমাদের সামনে কোন আদর্শ নেই। আছে আনুষ্ঠানিকতা, গলাবাজি, শঠতা ও মসৃণ চালাকি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোকিল হত্যার ষড়যন্ত্র। আদর্শহীন পরিবেশে, নিদারুণ কালে কলাবৃক্ষ শিকড় থেকে পর্যাপ্ত রস পায় না। আবার নেতি ও নৈরাশ্যের সামাজিক চিত্র মানবচিত্তকে এমনভাবে প্রভাবান্বিত করে যে, মানুষের সুকুমার বৃত্তিসমূহ পরিচর্যিত ও বিকশিত হয়ে উঠতে পারে না। তাহলে কবিতা বাঁচবে কিভাবে ? কবিতা তো সমুদয় শিল্পকলার মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর, সবচেয়ে পরিবেশনির্ভর সৃষ্টি। আমরা, তাদের বয়স পঞ্চাশ ও ষাটের মাঝামাঝি, ছেলেবেলায় অসংখ্য রূপকথার গল্প পড়েছি। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ থেকে আরম্ভ করে সুকুমার রায়ের সরস গল্প, আজব ছড়া ও নানা স্বাদের কিশোর উপন্যাস কেড়ে নিতো আমাদের সময়। ২৫/৩০ বছর আগেও জেলা শহরের সাধারণ পাঠাগারগুলোতে শিশুদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষ ছিল। কৈশোরে দেখেছি, আন্তঃমহল্লা ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে; সাংস্কৃতিক প্রতিযোগ হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় যেমন নাচ-গান-নাটক ছিল, তেমনি ছিল বই বিনিময়ের উষ্ণতামাখানো সোনালী সব বিকেল। মাত্র দু-আড়াই দশকের ভেতর পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর পাঠকক্ষগুলো ফাঁকা হয়ে গেল। এক সময় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছিল জুডো-কারাতে ক্লাব। শশীরচর্চাটাও যদি ঠিক মতো থাকতো, আমরা সান্তনা পেতাম এই ভেবে যে, সুস্থ দেহ সুস্থ মন তৈরিতে সাহায্য করবে। এখন খুব সামান্য সংখ্যক ছেলে-মেয়ে ‘জিম’-এ যায়। বেশির ভাগই যাচ্ছে নেশার স্বপ্নময় টানেলে! আমাদের চোখের সামনেই পুরো একটা প্রজন্ম প্রথমে হেরোয়িনসেবী পরে ইয়াবাখোর হয়ে গেল! রাজনীতিবিদগণের একটি বড় অংশ হয়ে গেল মিথ্যুক, ব্যবসায়ীরা ডাকাত আর আমলারা ষড়যন্ত্রকারী। কবিতা লেখার বা বুঝার জন্য যে বিশেষ পদ্ধতিতে গঠিত মন, যে ধরনের স্বপ্নকাতরতা প্রয়োজন, আজ তার অভাব প্রকট সর্বত্রই। ফলে এখন শুধু কবিতার পাঠক নেই (আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে) তা নয়, কবিও নেই। অজস্র অকবিতার ভিড়ে প্রকৃত কবিকে খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কাব্যচর্চাকারী ব্যক্তিমাত্রই তো আর কবি নন। কবি কেউ কেউ। এই ‘কেউ কেউ’-রা আবির্ভূত হন তখনই যখন রাষ্ট্র ও সমাজে অস্তিত্বশীল ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বে ভারসাম্য থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা সেই অতি প্রয়োজনীয় ভারসাম্যটুকু হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এখন শুধু ধু-ধু মরুভূমি। একটিও মরুদ্যান নেই। নির্বেদ ও নিরাশা অতিক্রম করার মতো প্রেরণাপ্রদ একটি বড় আলোও নেই আশে-পাশে। কবিতা কিন্তু কারও কারও জীবনে ওই আলোর সন্ধান দেয়।

বৈষয়িক উন্নতি এবং শৈল্পিক উন্নতির মধ্যে প্রধান পার্থক্যই হলো, প্রথমটির সঙ্গে টাকা-পয়সা সরাসরি সম্পর্কিত এবং অর্থ-কড়িই এখানে মুখ্য। দ্বিতীয়টির সঙ্গে অর্থ উপার্জনের ধারণা সম্পৃক্ত নয়, সম্পৃক্ত মনের প্রশান্তি। তবে শিল্পকলাও পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা এনে দিতে পারে, দেয়; এমনটিও অনেকবার দেখেছি। কিন্তু এ যুগে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, শিল্পকলার নিষ্কলুষ এলাকাটিও নানারকম বিষয়বুদ্ধি দ্বারা কলুষিত হয়ে চলেছে। যে নবীন শিল্পী তার প্রতিভা ও অধ্যবসায় খাটিয়ে বিরাট সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারেন, তাকেও আমরা টাকা-পয়সার জন্য ঘন ঘন ছোট মাপের কাজ, যেমন বইয়ের প্রচ্ছদ, করতে দেখি। কবি-শিল্পীদের জন্য এ এক অরুন্তুদ সময়। তারা অনেকেই ভদ্রভাবে বাঁচতেই পারছেন না; মন ঢেলে কাজ করবেন কিভাবে ?

আধুনিক কবিতা তার প্রতীকধর্মিতা পরোক্ষভাষণ, ইঙ্গিতপ্রিয়তা ইত্যাদি কারণে জনসাধারণের সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি আজও। সাধারণ পাঠক এসব বোঝেন না । তারা বোঝেন সাদামাটা উচ্চারণ, পরিচিত উপমা, সহজ-সাবলীল অন্ত্যমিল ইত্যাদি। সেজন্য এও দেখা যাচ্ছে যে, দু/চারজন বৃদ্ধ কবি তাদের পূর্বতন ইমেজ কাজে লাগিয়ে খুব তরল ও স্থূল পঙক্তিমালা লিখে চলেছেন ওই সস্তা জনপ্রিয়তা এবং নগদ প্রাপ্তির লক্ষেই। এ কথার অর্থ কবিরাও এখন কথাসাহিত্যকসুলভ জনপ্রিয়তার কাঙাল! অথচ কবিতা, যাকে finest form of art বলা হয়, তার যাবতীয় কলা-কৌশল নিয়েই ঐশ্বর্যবান। গরিব কিন্তু সচ্চরিত্রবান ব্যক্তির ইমেজ নিয়ে কবিতা দাঁড়িয়ে থাকে, অন্তত থাকতে সচেষ্ট হয়, সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও।

স্বাধীনতার পর এদেশে কবিতার একটা হঠাৎজোয়ার এসেছিল। ওই জোয়ারে জন্ম হয়েছে ষাটের একাধিক কৃতী কবির। গোটা সত্তরের দশক এবং আশির দশকের মাঝামাঝি, এমনকি ১৯৮৮/৮৯ সাল পর্যন্ত কাব্যগ্রন্থের বিক্রি-বাটা মোটামুটি ভাল ছিল। তখন পর্যন্ত বেশ-খানিকটা-পরিচিতি-আছে এরকম কবির নাম সমাজে শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারিত হতো। তার সামাজিক ভাবমূর্তিও আজকের মতো নাজুক ছিল না। আজকে বাজারে অনেকগুলো দৈনিক, মাসিক পত্রিকা। এখন কাব্যগ্রন্থ তেমন বিক্রি না হলেও পত্র-পত্রিকায় কবিতা বিক্রি করে দু-পয়সা উপার্জন করা যায়। কেবল পাওয়া যায় না কবির ইমেজ। তার কারণ কবির ইমেজ তৈরি হয় যুগপৎ কবি-পাঠক ও অকবি-অপাঠকের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে। দেশে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। কবিতা লেখেন না কিন্তু আধুনিক কবিতা মোটামুটি বোঝেন; অকবি, ভালো কবি ও মাঝারি মানের কবির মধ্যকার পার্থক্য টের পান এমন পাঠকের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। তদুপরি অবস্থাটা এমনই যে, কবিরাও কবিদের লেখা খুব একটা পড়েন না, অন্য বই-পত্র তো দূরের কথা। পরিচিতি আছে এরকম পঞ্চাশোর্ধ কয়েকজন কবিকে চিনি যাদের গৃহে বই-পুস্তক নেই বললেই চলে। আমাদের প্রথম যৌবনে কবিতার যে অকবি পাঠকবৃন্দ ছিলেন, তারা হয় জৈবনিক ব্যস্ততার কারণে কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কিংবা পড়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন না বলে কাব্যবিমুখ হয়েছেন। যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে এই দুর্গতির জন্য কবিরাও কম দায়ী নন। কবিদের সামনে আজ কোন ভরসা নেই। কোনো পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস বা অবলোকনের পটভূমি নেই। তাদের শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মৃত। দৃষ্টির খন্ডতা, ভাবনার ক্ষুদ্রতা ও কল্পনার অস্বচ্ছতার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ কবিরাই দীর্ঘকাল যাবৎ কেবল বাকচাতুর্যভরা ( অনেক ক্ষেত্রে তা-ও নেই ), শূন্যগর্ভ পঙক্তি লিখে চলেছেন। জীবন এখন আগের চেয়ে অনেক জটিল। মানুষের হাতে সময় কম। লোকে এইসব কেন পড়বে যদি-না এর মধ্যে তারা প্রতিফলিত হতে দ্যাখে ব্যক্তি-মানুষের দুরারোগ্য বিষাদ, বিরক্তি, প্রশান্তি কিংবা তিমিরঘেরা আশা ? কাজেই এত কবিতা দিয়ে আমরা কি করবো? এইসব অনর্গল শব্দের কুচকাওয়াজ কি অর্থ বহন করে? জীবনের কোন্ আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, অতৃপ্তি, হাহাকার তুলে ধরছে এইসব রচনা; আদৌ কি তুলে ধরতে পারছে? কারা পড়ে এসব কবিতা? আদৌ কি পড়ে? না-কি শুধুই কবির ও কবিতাটির নাম এক পলক দ্যাখে?

সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই কেবল মহৎ কবিকল্পনার জন্ম দিতে পারে। আর উঁচু মানের কবিতার জন্য প্রয়োজন ঋষিসুলভ নির্লিপ্তি। শ্রেয়বোধ এবং মানসিক ও বহির্জাগতিক শৃঙ্খলার চেতনার সঙ্গে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণভাবনার প্রাতিস্বিকতা মিলিত হলেই কেবল সম্ভব উচ্চাকাঙ্খী কবিতা রচনা করা। বর্তমানের দিগন্তবিসারী অবক্ষয় ও অমানিশার ভেতর থেকেও সেই অজর শিল্পের প্রেরণা আসতে পারে যদি কবি অর্জন করতে পারেন সাধকের শুদ্ধতা ও সহিষ্ণুতা। কিন্ত সেটা বিরল সাধনার ব্যাপার। জাতির এই রাহুগ্রস্ততা একদিন নিশ্চয় কেটে যাবে। তখন নতুন প্রজন্মের মানুষেরা ফিরে তাকাবে স্বদেশের শিল্প-সংস্কৃতির দিকে। সেদিন যাতে ছোট না হতে হয় সে জন্য সমস্ত বাধা, উপেক্ষা, ঈর্ষা-অস্বীকৃতির তোয়াক্কা না করে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। প্রতিদানের জন্য হা-পিত্যেস নয়, বরং লক্ষ হওয়া উচিত উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্যসৃষ্টি। আর এক্ষেত্রে নিরলস সৃজনশীল কাজের কোনো বিকল্প নেই।
Flag Counter



2 Responses

  1. “সুদীর্ঘকাল আমাদের সামনে কোন আদর্শ নেই। আছে আনুষ্ঠানিকতা, গলাবাজি, শঠতা ও মসৃণ চালাকি।”- একেবারে 100% সঠিক…

  2. SEM says:

    অসাধারণ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.