আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন-এর শেষ আলাপ

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ১৩ নভেম্বর ২০০৮ ৩:১৭ অপরাহ্ন

evstafiev-solzhenitsyn.jpg
২০ বছরের নির্বাসন শেষে রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকে সলঝেনিৎসিন, ১৯৯৪।

আলেকসান্দর ইসায়েভিচ্ সলঝেনিৎসিন (ডিসেম্বর ১১, ১৯১৮- আগস্ট ৩, ২০০৮) ছিলেন রুশ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং ইতিহাসবিদ। সারা বিশ্বকে তাঁর লেখার মাধ্যমে তিনি পরিচয় করিয়েছেন গুলাগ (সোভিয়েত ইউনিয়নের লেবার ক্যাম্প সিস্টেম) এর সাথে। সেজন্য যুগপৎভাবে তাঁর মিলেছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (১৯৭০) আর সোভিয়েতaleksandr_solzhenitsyn_gula.jpg
…….
সোভিয়েত লেবার ক্যাম্প (গুলাগ) থেকে মুক্তির সময়। নির্বাসনের আগে। ১৯৫৩।
…….
ইউনিয়ন থেকে নির্বাসন (১৯৭৪)। রাশিয়ায় তিনি ফিরেছিলেন ১৯৯৪ সালে। সেবছর তিনি সার্বিয়ান আকাদেমি অভ্ সায়েন্সেস এন্ড আর্টস-এর ভাষা ও সাহিত্য অনুষদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথিতযশা সঞ্চালক এবং পিয়ানিস্ট ইগনাভ সলঝেনিৎসিনের বাবা তিনি।

দীর্ঘদিন ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে ভূগবার পর এবছর আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন মারা গেলেন তেশরা আগস্ট নিজগৃহে।

২৩ জুলাই ২০০৭-এ স্পিগেল (Der Spiegel)-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে নোবেল বিজয়ী রুশ লেখক আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন আলোচনা করেছেন রাশিয়ার উত্তাল ইতিহাস, পুতিনীয় গণতন্ত্র এবং জীবন-মৃত্যু বিষয়ে তাঁর ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ান নীফ এবং ম্যাথেইয়ার স্কেপ।

অনুবাদ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া

স্পিগেল: আলেকসান্দর ইসায়েভিচ, আমরা যখন এসেছিলাম আপনাকে দেখেছি কাজ করছেন। মনে হলো এই অষ্টাশি বছর বয়েসেও আপনি কাজের তাড়না বোধ করেন। যদিও আপনার এই স্বাস্থ্য নিয়ে ঘরের ভেতরও হেঁটে বেড়াবার কথা নয়। কোথা থেকে এই উদ্যম পান আপনি?
president-vladimir-putin.jpg
নিজ বাড়িতে, অতিথি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে; ১২ জুন ২০০৭।

আলেকসান্দর সলঝেনিৎসিন: বরাবরই আমার ভেতরে এই প্রেষণাটুকু ছিল, জন্মাবধিই। আর আমি সবসময় কাজের কাছে নিজেকে সানন্দে উৎসর্গ করেছি। কাজের কাছে আর সংগ্রামের কাছে।
—————————————————————–
রাশিয়ার ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার এই দূরত্ব অসম্ভব বিপজ্জনক এবং রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে এখুনি মনোযোগী হতে হবে। … পরিস্থিতি শোধনের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত উপায় হচ্ছে বড় বাণিজ্যগুলির পেছনে তাড়া না করা … মধ্যম এবং ক্ষুদ্রশিল্পগুলিকে হাঁফ ছাড়বার সুযোগ করে দেয়া। … রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্ব রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ব্যয় করা, শিক্ষাখাতে ব্যয় করা, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা। এবং আমাদের শিখতে হবে কী করে চুরি-অর্থ আত্মসাৎ ছাড়া এই ব্যয় করা যায়।
—————————————————————-
স্পিগেল: এখানে এইটুকু জায়গাতেই চারখানা টেবিল। আপনার নতুন বই মাই অ্যামেরিকান ইয়ার্স যেটি এই শরতে জার্মানীতে প্রকাশিত হবে, তাতে আপনি স্মৃতিচারণ করেছেন যে আপনি জঙ্গলের ভেতর হেঁটে যেতে যেতেও নাকি লিখতেন।

সল্: আমি যখন গুলাগ্-এ ছিলাম, তখন কখনো কখনো পাথরের দেয়ালেও লিখেছি। ছোট ছোট চিরকুটের মতন কাগজে লিখতাম আমি, তারপর সেটা মুখস্ত করতাম, তারপর চিরকুটগুলো নষ্ট করে ফেলতাম।

স্পিগেল: নিদারুণ হতাশার সময়গুলিতেও কি আপনার সেই উদ্যম আপনাকে ছেড়ে যায় নি?

সল্: হ্যাঁ। কখনো কখনো আমি ভাবতাম — যা হবার তাই হবে। তাই হোক। তারপর কেমন করে যেন সব ঠিকঠাক মতো হয়ে যেতো। ভাল কিছুই হতো।

স্পিগেল: আমি যদিও নিশ্চিন্ত নই যে আপনি একই মত (“ভাল কিছুই হতো”) দেবেন এই ঘটনাটির ক্ষেত্রে — ১৯৪৫-এর ফেব্রুয়ারিতে মিলিটারি সিক্রেট সার্ভিস ক্যাপ্টেন সলঝেনিৎসিনকে পূর্ব প্রুশিয়ায় গ্রেপ্তার করেছিল কেননা সলঝেনিৎসিন ফ্রন্ট থেকে লেখা তাঁর চিঠিগুলোয় যোসেফ স্তালিন বিষয়ে যথেষ্ট সপ্রশংস ছিলেন না। এবং এর শাস্তি ছিল প্রিজন ক্যাম্পে আট বছরের কারাবাস।

সল্: ওটা ছিল দক্ষিণ ওয়র্মদিত-এ। যখন আমাকে গ্রেপ্তার করা হয় তখন আমরা কেবল একটা জার্মান ব্যুহ ভেদ করেছি আর কোনিসবার্গের দিকে চলেছি। আমি সবসময়ই আশাবাদী ছিলাম এবং আমার লক্ষ্যে স্থির ছিলাম, লক্ষ্যের নির্দেশনা মতো চলেছি।

স্পিগেল: কী সেই লক্ষ্য?

সল্: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার এই লক্ষ্যগুলি আকার পেয়েছে বটে। কিন্তু আমি সবসময় কী করছি তাতে বিশ্বাস করতাম। আর আমি কক্ষনো নিজের বিবেকের বিরুদ্ধাচার করিনি।

স্পিগেল: তের বছর আগে, আপনি যখন নির্বাসন থেকে ফিরে এলেন, নতুন রাশিয়াকে দেখে আপনি হতাশ হয়েছিলেন। গর্বাচেভ-এর দেয়া পুরস্কার আপনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এমনকি ইয়েলৎসিন-এর কাছ থেকেও পুরস্কার নিতে সম্মত হননি আপনি। অথচ এখন পুতিন-এর দেয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আপনি গ্রহণ করেছেন। সেই পুতিন যিনি একসময় এফএসবি-র প্রধান ছিলেন, যে ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির পূর্বসূরী কেজিবি আপনাকে অত নিষ্ঠুরতার সাথে হয়রানি করেছে, নির্যাতন করেছে। পুরো ব্যাপারটা ঠিক কেমন হলো?

সল: ১৯৯০ সালের পুরস্কারটি গর্বাচেভের প্রস্তাবিত ছিল না, ছিল রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সোশালিস্ট রিপাবলিকের মন্ত্রণালয়ের, তখন যা ইউএসএসআর-এর অংশ। পুরস্কারটি ছিল দ্য গুলাগ্ আর্কিপেলাগো বইটার জন্যে। আমি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছি কেননা অযুত মানুষের রবক্ত লেখা বইয়ের জন্যে আমি পুরস্কার গ্রহণ করতে পারি না।

১৯৯৮ সালে, ওটা ছিল দেশের সবচেয়ে দুরবস্থা, মানুষের দুর্ভোগ অন্তহীন। ওই বছরই আমি রাশিয়া ইন কলাপ্স বইটি প্রকাশ করি। ইয়েলৎসিন আমাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেবার কথা ঘোষণা দিলেন। আমি উত্তরে জানিয়েছি রাশিয়াকে যে সরকার এমন চূড়ান্ত বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে তার কাছ থেকে আমি পুরস্কার নিতে অপারগ।

বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারটি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত প্রদেয় বস্তু নয় বরং এর পেছনে বিপুল বোদ্ধাসমাজ রয়েছে । যে বিজ্ঞানবিষয়ক কাউন্সিল আমাকে এ পুরস্কারের জন্যে বাছাই করেছে এবং যে সংস্কৃতিবিষয়ক কাউন্সিল সেই বাছাই অনুমোদন করেছে তাতে দেশের বহু সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষ রয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বেত্তা-বিশেষ। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনে এই পুরস্কার দেন। পুরস্কারটি গ্রহণ করবার মাধ্যমে আমি এই আশাপ্রকাশ করতে চাই যে, আমার জীবনভর আমি যে তিক্ত রুশ অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করে এসেছি, পর্যালোচনা করে এসেছি তা যেন আমাদের জন্যে এমন শিক্ষা হয়ে থাকে যা ভবিষ্যৎ বিপন্নতার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করবে।

হ্যাঁ, ভ­াদিমির পুতিন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু তিনি কেজিবি-র তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন না, গুলাগ্-এর ক্যাম্পের প্রধানও ছিলেন না। আর ফরেন্ ইন্টেলিজেন্স-এর চাকুরে হওয়াটা কোনো দেশেই নেতিবাচক কিছু নয় — বরং অনেক সময় প্রশংসনীয়। যেমন, জর্জ বুশ (সিনিয়র) তো সিআইএ-র প্রাক্তন প্রধান হিসেবে তেমন সমালোচিত ছিলেন না।

স্পিগেল: সারাটা জীবন আপনি ক্ষমতাসীনদের ডাক দিয়ে গেছেন গুলাগ্-এ লক্ষ লক্ষ ক্ষমতার বলিদের জন্যে অনুতপ্ত হতে। এই ডাক কি আসলেই পৌঁছেছিল?

সল্: আমি এই সত্যে অভ্যস্ত হয়েছি যে, আধুনিক রাজনীতিকদের জন্যে প্রকাশ্য অনুতাপ একটি চরম অগ্রহণযোগ্য পন্থা।

স্পিগেল: বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট বলছেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়। তিনি বলছেন, এখন সময় হয়েছে মর্ষকামী অতীতচারিতার অবসান ঘটানোর, বিশেষতঃ যখন ‘বাইরে থেকে’ রাশিয়ানদের একরকম অন্যায় অনুশোচনা করতে ইন্ধন জোগানো হচ্ছে। এটা কি আদতে ঐসব লোকদের পক্ষেই যাচ্ছে না, যারা চায় রুশরা তাদের সোভিয়েত দিনগুলির তাবৎ কথা ভুলে যাক?

সল্: বিশ্বজুড়ে এই একটা উদ্বেগ ঘনিয়ে উঠছে যে, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই যে পৃথিবীর একমেব পরাশক্তিতে পরিণত হলো, এই নতুন ভূমিকায় সে কীভাবে আচরণ করবে। আর ‘অতীতচারিতা’র কথা! হায়রে, ‘সোভিয়েত’ আর ‘রাশিয়ান’-এর যে মিশেলের বিরুদ্ধে ৭০-এর দশকে আমি এতবার বলেছি — তা না দূর হয়েছে পশ্চিমে, না প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে, না তদানীন্তন সোভিয়েত রিপাবলিকগুলিতে। সমাজতন্ত্রী দেশগুলির বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রজন্মগুলি অনুতাপ করবার জন্যে তৈরি নয়, আর নতুন প্রজন্ম কেবল শোক করে আর দোষারোপ করেই খালাস, অধুনার মস্কো তার জন্যে সহজ লক্ষ্যবস্তু। তাদের ভাবভঙ্গীতে মনে হয় তারা বীরের মতো নিজেরাই নিজেদের মুক্তি দিয়েছে আর নতুন জীবন পেয়েছে — অথচ মস্কো রয়ে গেছে কম্যুনিস্ট। যাই হোক, আমি তারপরও আশা করি — এই অস্বাস্থ্যকর সময়টুকু শিগগিরি শেষ হবে, আশা করি যত মানুষ কম্যুনিজমের ভেতর দিয়ে পার হয়ে এসেছেন, তাদের সকলের একদিন এই অভিজ্ঞান হবে যে তাদের ইতিহাসের তিক্ত অধ্যায়গুলির জন্যে কম্যুনিজমই দায়ী।

স্পিগেল: রুশীরা সহ।

সল্: যদি আমরা সকলেই আমাদের ইতিহাসের দিকে স্বস্থ চোখে তাকাতে পারি তাহলে আমরা আর সোভিয়েত অতীতের প্রতি এই স্মৃতিকাতরতা দেখবো না, যা আমাদের সমাজের তুলনামূলক কম-ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্ক্তিতে এতো প্রতুল। পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলি এবং তদানীন্তন ইউএসএসআর রিপাবলিকগুলিও আর ইতিহাসভুক্ত রাশিয়াতে তাদের দুর্দশার মূল খুঁজবে না। একজন নেতার বা শাসনব্যবস্থার দুরাচারের জন্যে কারো পুরো রুশ জনগোষ্ঠী বা পুরো দেশের প্রতি দোষারোপ করা ঠিক নয়। যেমন চলছে পশ্চিমে, তেমনি করে রাশিয়ার মানুষদের ‘মনোজাগতিক অসুস্থতা’কে এসব কিছুর মূল কারণ গণ্য করা… এটা ঠিক নয়। ঐসব শাসনতন্ত্র রাশিয়াতে টিকে ছিল প্রচণ্ড ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে। আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে যে কেবলমাত্র স্বতঃপ্রণোদিত এবং বিবেকসম্পন্ন হয়ে যখন একটা জাত নিজের অপরাধ স্বীকার করে, কেবল তখনি তার পরিত্রাণ সম্ভব। বাইরের অবিরাম কটুকাটব্য কেবল উল্টো ফল দেবে।

‘অক্টোবর বিপ্লব একটি মিথ’
স্পিগেল: কেউ নিজের দোষক্রটি স্বীকার করছে — এর মাধ্যমে এই সূচিত হয় যে তার নিজের অতীত সম্বন্ধে তার কাছে সম্যক তথ্য আছে। ঐতিহাসিকরা অভিযোগ করছেন যে মস্কোর আর্কাইভগুলি আর তাদের জন্যে তেমন উম্মুক্ত নয়, যেমনটি ৯০-এর দশকে ছিল।

সল্: এটি একটি জটিল বিষয়। যদিও এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে গত বিশ বছরে রাশিয়ান আর্কাইভগুলিতে বিপ্লব ঘটে গিয়েছ। হাজার হাজার ফাইল খোলা হয়েছে; শত সহস্র দলিল যা একসময় গোপনীয় ছিল তা এখন গবেষকদের কাছে সুলভ। শত শত বই প্রকাশিত হয়েছে বা হচ্ছে যার মাধ্যবম এইসব দলিল-প্রমাণ জনতার কাছে অবমুক্ত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে অবমুক্ত অজস দলিলের পাশাপাশি এমন অনেক নথিপত্র অবমোচিত হচ্ছে যা কখনো অবমোচনের মুখ দেখেনি।

সেনা-ঐতিহাসিক দিমিত্রি ভলকোগনোভ, এবং পলিটব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য আলেকসান্দর ইয়াকভলেভ — এইসব মানুষ এমন প্রতাপ এবং কর্তৃত্ব রাখতেন যে যেকোনো ফাইলে তাঁদের প্রবেশাধিকার ছিল, সমাজ তাঁদের মূল্যবান প্রকাশনাগুলির জন্যে কৃতজ্ঞ।

গত কয়েক বছরে, কেউ কি অবমুক্তিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেনি। এটা দুঃখজনক যে এই প্রক্রিয়া প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময়সাপেক্ষ। তার পরেও, এদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ, ন্যাশনাল আর্কাইভস অফ দ্য রাশিয়ান ফেডারেশনের (জিএআরএফ) দলিল-দস্তাবেজগুলিতে নব্বইয়ের দশকে যেমন ছিল তেমনি প্রবেশাধিকার রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এফএসবি একলক্ষ অপরাধ তদন্ত বিষয়ক তথ্যাদি জিএআরএফ-কে পাঠায়। প্রামাণ্য দলিলগুলি আজ পর্যন্ত গবেষক এবং আমজনতা উভয়ের কাছেই সহজলভ্য। ২০০৪-২০০৫-এর জিএআরএফ ‘স্তালিনের গুলাগ’-এর ইতিহাসের সাত খণ্ড প্রকাশ করে। আমি এই প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম এবং আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি যে, এই খণ্ডগুলি ততটাই সমন্বিত এবং নির্ভরযোগ্য যতটা হওয়া সম্ভব। সারা পৃথিবীর গবেষকরা এই প্রকাশনাটির ওপর নির্ভরশীল।

স্পিগেল: প্রায় নব্বই বছর আগে, রাশিয়াকে তোলপাড় করে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সংঘটিত হয়, তারপর হয় অক্টোবর বিপ্লব। এই বিপ্লবগুলি আপনার লেখায় leitmotif-এর মতো বারবার এসেছে। কয়েক মাস আগে একটা বড়ো প্রবন্ধে আপনার প্রতিপাদ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন — কম্যুনিজম এর পূর্বের রাশিয়ান রাজনৈতিক শাসনের ফলাফল নয়। শুধুমাত্র কেরেন্স্কির বাজে প্রশাসনের ফলেই ১৯১৭-এ বলশেভিক বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। এই মোতাবেক চিন্তা করলে তো লেনিন কেবল একটি দৈবযোগ মাত্র, যিনি রাশিয়ায় এসে জার্মানদের সহায়তায় ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিলেন। আমরা কি আপনাকে ঠিক বুঝতে পেরেছি?

সল্: না, পারেননি। কেবলমাত্র একজন অসাধারণ মানুষই পারে সুযোগকে বাস্তবতায় রূপ দিতে। লেলিন এবং ত্রতস্কি রাজনীতিক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত ক্ষীপ্র ও বলিষ্ঠ, যাঁরা অত্যন্ত অপ্রতুল সময়ে কেরেনস্কির প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু এখানে আপনি আমায় শুধরে দিতে দিন — ‘অক্টোবর বিপ্লব’ বিজেতাদের (বলশেভিকদের) তৈরি মিথ, পশ্চিমা প্রগতিশীলরা যে মিথের ভাবনাটা ভালো খেয়েছে। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর, ২৪ ঘণ্টার একটা প্রচণ্ড ক্যু ঘটে পেত্রোগ্রাদে। এর পুরো ছকটা আদ্যোপান্ত চমৎকারভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন লেওন ত্রতস্কি — লেলিন তো তখনো রাষ্ট্রদ্রোহীতার দায়ে ধরা পড়বার ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। যাকে আমরা ‘১৯১৭-এর রুশ বিপ্লব’ বলে জানি, তাতো আসলে ফেব্র“য়ারি বিপ্লব।

gorba.jpg…….
সলঝেনিৎসিনের সম্মানার্থে দেয়া মস্কোর সুইডিশ দূতাবাসের এক ভোজসভায় মিখাইল গর্বাচেভের সাথে; ১৯৯৮।
……..
যেসব কারণে বিপ্লব ঘটেছিল, সেসবের মূল রাশিয়ার প্রাক-বিপ্লব দশাতে প্রোথিত ছিল বটে, এবং আমি এর বিরোধিতা কখনো করিনি। ফ্রেব্রুয়ারি বিপ্লবের মূল ছিল সুদূর — আমি দি রেড হুইল-এ তা দেখিয়েছি। প্রথমতঃ রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের সাথে শিক্ষিত সমাজের একটা দীর্ঘমেয়াদী পারস্পরিক অনাস্থা কাজ করেছে। এমন তিক্ত অনাস্থা যার কারণে কোনো আপসরফায় আসা সম্ভব হয়নি, যার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কোনো গঠনমূলক সমাধান সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায় বর্তায় অবশ্যই প্রশাসনের ওপর: জাহাজডুবির জন্যে কাপ্তেন ছাড়া কেই বা দায়ী হবে? অতএব আপনি হয়তো বলতেই পারেন ‘ফ্রেব্রুয়ারি বিপ্লব’ আসলে তদানীন্তন রাশিয়ার রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থারই ফলাফল।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে, লেনিন কোনো অবস্থাতেই ‘দৈবযোগ’ মাত্র ছিলেন; বা সম্রাট ভিলহেমের অর্থের যোগানের কোনো অনুবর্তী ফলাফল ছিল না। অক্টোবর বিপ্লবে রাশিয়ার জন্যে কোনো কিছুই স্বাভাবিক ছিল না। বরং, সে বিপ্লব রাশিয়ার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। বিপ্লবী নেতাদের অবারিত ‘লাল সন্ত্রাস’ রাশিয়াকে রক্তে ডুবিয়ে দেবার জন্য তাঁদের অভিপ্রায়, এর প্রথম এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

স্পিগেল: সাম্প্রতিককালে আপনার দুই খণ্ডের কাজ 200 Years Together-এ রুশ এবং ইহুদিদের সর্বজনগ্রাহ্য ইতিহাস নিয়ে আলাপ করবার ক্ষেত্রে যে অনুচ্চার্যতা তা অতিক্রম করবার প্রচেষ্টা রয়েছে।

এই দুই খণ্ড পশ্চিমাদের নানান জটিলতায় প্রণোদনা জুগিয়েছে। আপনি বলেছেন, ইহুদিরা পৃথিবীব্যাপী পুজির মূখ্য সঞ্চালক এবং তারা বুর্জোয়া গোষ্ঠীর বিনাশী শক্তি। আপনার গবেষণা-উপাত্তের এই চমৎকার বিন্যাস থেকে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে ‘সোভিয়েত’- নীরিক্ষাটির পতনের জন্যে ইহুদিরাই অনেকাংশে দায়ী?

সল্: আপনার প্রশ্ন যেদিকে ইঙ্গিত করছে সেটা আমি এড়িয়ে চলি। আমি একজনের নৈতিক দায়িত্ববোধের সাথে আরেকজনেরটা হিসেব কষতে বা পাল্লা দিতে বসিনি। তদুপরি, একটা জাতির আরেকটা জাতির প্রতি দায়িত্বশীলতার এই ধারণা আমি একেবারেই মানি না। আমি কেবল চাই আত্মোপলব্ধি।

আপনি আপনার প্রশ্নের জবাব বইটাতেই পেতে পারেন। “প্রত্যেক মানুষ যে যার অতীতের জন্যে, এমনকি লজ্জাজনক অতীতের জন্য, ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ। জবাবদিহিতাটার রকম কী? সেটা হচ্ছে: উপলব্ধি করতে চেষ্টা করা যে — যা হয়েছে তা কী করে হতে দেয়া হলো? এর ভেতর আমাদের ভুলটা কোথায়? এবং এরকম কী আরো ঘটতে পারে? এইভাবেই ইহুদিদের জবাব দিতে বাধ্য করা যেতে পারে, বিপ্লবী জল্লাদদের ব্যাপারে এবং তাদের তাঁবেদের ব্যাপারেও। অন্যদের সামনে নয়, নিজের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে এবং ঈশ্বরের কাছে। ঠিক যেভাবে আমরা রুশরা জবাব দিতে বাধ্য সংঘবদ্ধ নির্যাতনের ব্যাপারে, ঐসব দয়াহীন অগ্নি সংযোজক চাষাদের ব্যাপারে, ঐসব উন্মধদ বিপ্লবী সৈনিকদের ব্যাপারে, ঐসব অসভ্য নাবিকদের ব্যাপারে।

স্পিগেল: আমাদের মতে, আপনার সব কাজের মধ্যে দি গুলাগ আর্কিপেলাগো গণমানুষের মনে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে। এই বইটাতে আপনি সোভিয়েত একনায়কতন্ত্রের নরবিদ্বেষী দিকটি উন্মোচন করেছেন। ফিরে দেখলে, আপনি কি বলতে পারেন, পৃথিবীময় কম্যুনিজমের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ঐ নৃবিদ্বেষ কতটা ভূমিকা রেখেছে?

সল্: এ প্রশ্ন আমাকে করা ঠিক নয়। লেখক স্বয়ং এ মূল্যমান যাচাই করতে পারেন না।

স্পিগেল: একসময় আপনি যা বলেছিলেন, তা একটু শব্দান্তর করে বলি, মানবজাতির স্বার্থে রাশিয়াকে বিংশ শতাব্দীর অন্ধকার ইতিহাস সইতে হবে। রাশিয়া কি এই দুটো বিপ্লব এবং বিপ্লবের ফলাফল থেকে তার শিক্ষা নিয়েছে?

সল্: মনে হচ্ছে তারা শিক্ষা নিতে শুরু করেছে। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের ওপর বহু বইপুস্তক এবং সিনেমার (উৎকর্ষের মান নির্বিশেষে) ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। অতিস¤প্রতি, রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল ‘রাশিয়া’ ভার্লাম শালামভের কাজের ওপর নির্মিত একটি সিরিয়াল সম্প্রচার করেছে, যাতে স্তালিনের ক্যাম্পগুলির ভয়াবহ নৃশংসতার স্বরূপ দেখানো হয়েছে। ওতে কোনো কিছু লঘু করে দেখানো হয়নি।

তারপর যেমন ধরুন গত ফেব্র“য়ারিতে আমি রীতিমত বিস্মিত এবং মুগ্ধ হয়ে দেখলাম, ফ্রেব্র“য়ারি বিপ্লবের ওপর আমার আগের লেখা পুনঃপ্রকাশিত হবার পর কেমন বিশাল, উত্তপ্ত দীর্ঘ বিতর্ক শুরু হলো। আমার ভাল লাগলো অত রকম অভিমত দেখে, এমনকি আমার বিপক্ষে মতামত দেখেও, কারণ তাদের অতীতকে জানবার একরকম ঔৎসুক্য ছিল, যা ব্যতিরেকে কোনো অর্থবহ ভবিষ্যৎ রচিত হতে পারে না।

পুতিনের জুটেছে লণ্ডভণ্ড এক দেশের উত্তরাধিকার

স্পিগেল: পুতিন প্রশাসনের সাথে তাঁর পূর্বসূরী ইয়েলৎসিন এবং গর্বাচেভের তুলনা করে দেখলে আপনি এই শাসনামলকে কেমন করে মূল্যায়ন করবেন?

সল্: গর্বাচেভের প্রশাসন ছিল রাজনৈতিকভাবে আশ্চর্যরকমের অর্বাচীন, অনভিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি দায়িত্বজ্ঞান বিবর্জিত। প্রশাসন তো নয়, ওটা বরং ছিল ক্ষমতার আত্ম-অস্বীকৃতি। পশ্চিমা প্রশস্তি পক্ষান্তরে তাঁকে এই প্রবোধ দিয়েছে যে তাঁর পথটিই ছিল সঠিক। কিন্তু এই বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, ইয়েলৎসিন নয় বরং গর্বাচেভ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি প্রথম আমাদের দেশের নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা এবং যথচ্ছে চলবার শক্তি দিয়েছেন।

ইয়েলৎসিনের শাসনামলের বৈশিষ্ট্যও ছিল মানুষের জীবনের প্রতি একই দায়িত্বহীন দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু একটু অন্যভাবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার জায়গায় যথাসম্ভব দ্রুত ব্যক্তিমালিকানা কায়েম করতে গিয়ে ইয়েলৎসিন রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকারের মাল্টি-বিলিয়ন-ডলার নিলাম শুরু করে দিলেন। প্রাদেশিক নেতাদের আস্থা পাবার জন্যে ইয়েলৎসিন সরাসরি বিচ্ছিন্নবাদীতার ডাক দিলেন এবং এমন সব আইন পাশ করালেন যাতে রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার পতন ত্বরান্বিত হয়। এটা, অবশ্যই রাশিয়াকে তার যে ঐতিহাসিক ভূমিকা নেবার জন্যে তার এতদিনের পরিশ্রম সেইটে থেকে বঞ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক পটে রাশিয়ার অবস্থান নামিয়ে এনেছে। এসব কিছুই পশ্চিমারা করতালিসমেত বরণ করে নিয়েছে।

পুতিন একটি লণ্ডভণ্ড, বিভ্রান্ত দেশের উত্তরাধিকার পেয়েছেন, যার মানুষগুলো দরিদ্র এবং নীতিভ্রষ্ট। এবং তিনি শুরু করেছিলেন সেটাই — যেটা করা সম্ভব ছিল — একটা ঢিমেতালা পুনর্নির্মাণ। এই প্রয়াসগুলি উল্লেখ্য ছিল না, তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়িতও ছিল না।

স্পিগেল: রাশিয়ার ভারসাম্য যে পশ্চিমাদের জন্যে লাভজনক এটা ক্রমশ সকলের কাছেই পরিষ্কার হয়ে এসেছে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমাদেরকে বেশ বিস্মিত করে: যখন রাশিয়ার জন্যে যথোপযুক্ত রাষ্ট্রবিধির প্রসঙ্গ এসেছে তখন আপনি সবসময় সুশীল স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে থেকেছেন এবং আপনার এই মডেলটি ছিল পশ্চিমাদের গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন। সাতবছর পুতিনের শাসনামলের পর আমরা একেবারে বিপরীত একটি চিত্র দেখতে পাই: প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, সবকিছু প্রেসিডেন্ট অভিমুখী।

সল্: হ্যাঁ আমি সবসময় রাশিয়ার জন্যে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দিয়ে এসেছি। কিন্তু আমি একে পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিপ্রতীপ হিসেবে দেখিনি। বরং সুইজারল্যান্ড এবং নিউ-ইংল্যান্ডের বিদ্যমান স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের উদাহরণ দেখিয়ে আমার আশেপাশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছি। এ উদাহরণগুলি আমার স্বচক্ষে দেখা।

আপনার প্রশ্নে আপনি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনকে গুলিয়ে ফেলছেন, যা তৃর্ণমূল পর্যায়ে সম্ভব কেবল তখনই যখন মানুষ তাদের নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে চেনে — তার সাথে আপনি ঐসব প্রাদেশিক গভর্নরের আধিপত্যকে গুলিয়ে ফেলছেন যারা ইয়েলৎসিনের সময় সানন্দে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যোগ দিয়ে সব স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক পদক্ষেপকে দমন করেছে।

আজ আমি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের এই ধীরলয়-দুর্বল উন্নয়নে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যদিও অবশেষে এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইয়েলৎসিনের সময়ে স্থানীয় সায়ত্তশাসন আদতে নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে রাষ্ট্রের ‘ক্ষমতার উল্লম্ব’ (যেমন পুতিনের কেন্দ্রীভূত এবং টপ ডাউন প্রশাসন) স্থানীয় জনগণকে ক্রমশ আরো সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা অর্পন করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই প্রক্রিয়াটি এখনও যথেষ্ট সুশৃঙ্খল নয়।

স্পিগেল: কিন্তু তেমন কোনো বিরোধী দল তো নেই।

সল্: যেকোনো দেশের স্বাস্থ্যকর উন্নয়নের জন্য অবশ্যই একটা বিরোধীদল জরুরী এবং কাম্য। যদিও ঠিক ইয়েলৎসিনের সময়ের মতোই, আপনি বিরোধীদল হিসেবে কম্যুনিস্টদের ছাড়া তেমন কাউকে খুঁজে পাবেন না। আপনি যখন বলেন “তেমন কোনো বিরোধী দল তো নেই” তখন হয়তো আপনি নব্বই দশকের গণতান্ত্রিক দলগুলিকে বোঝান। কিন্তু আপনি যদি পুরো পরিস্থিতিটা নিরপেক্ষভাবে বিচার করেন, দেখবেন নব্বইয়ে জীবনযাত্রার মান দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল, যা তিন চতুর্থাংশ রুশ পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এসবই ঘটেছে গণতন্ত্রের পতাকাতলে। অতএব, গণমানুষ যে আর ঐ ঝাণ্ডা বহন করে চলছে না — এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর এখন এইসব দলের নেতারা একটা অলীক ছায়া-সরকারের মন্ত্রীত্ব ভাগাভাগি নিয়েও কোনো আপোসে আসতে পারছে না। এটা পরিতাপের বিষয় যে রাশিয়াতে আজ অব্দি গঠনমূলক, সুনির্দিষ্ট এবং আকারে বড় কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধী দল গড়ে উঠতে এবং বেড়ে উঠতে আরো সময় এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হবে, যেমন হবে অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশের জন্যও।

স্পিগেল: আমাদের গত সাক্ষাৎকারে আপনি রাষ্ট্রীয় দ্যুমা ডেপুটি নিয়োগের পদ্ধতির সমালোচনা করেছিলেন, কেননা এদের অর্ধেক ছিলেন তাঁদের ভোটারদের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত, সেখানে বাকি অর্ধেক হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং তাঁদের আধিপত্যই বেশি। প্রেসিডেন্ট পুতিনের দ্বারা নির্বাচনপদ্ধতি সংস্কারের পর এখন আর কোনো সরাসরি ভোটারই নেই। এটা কি বরং একধাপ পিছিয়ে যাওয়া নয়?

সল্: হ্যাঁ, আমি মনে করি এটি একটি ভুল। আমি ‘দল-গণতন্ত্র’ এর একজন প্রত্যয়ী এবং নিয়মিত সমালোচক। আমি দল বা গোষ্ঠীবিহীন নির্বাচনের সমর্থক, যেখানে প্রদেশ বা অঞ্চলের যথার্থ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন এবং যাঁদের কাজ সন্তোষজনক না হলে প্রত্যাহার করা সম্ভব। অর্থনৈতিক, সম্মিলিত, আঞ্চলিক, শিক্ষাগত, পেশাগত এবং শিল্পসংক্রান্ত নিয়মনীতিকে ভিত্তি করে যে দল গড়ে উঠতে পারে তা আমি বুঝি এবং মানি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলিতে আমি সেরকম কোনো বিন্যাস দেখতে পাই না। রাজনৈতিক প্রনোদনায় যূথবদ্ধ হলে সে বন্ধন দৃঢ় হয় না এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই বন্ধনগুলির মূলে থাকে স্বার্থসিদ্ধির ইচ্ছা। লেওন ত্রতস্কি অক্টোবর-বিপ্লবের সময় একদম একই কথা বলেছিলেন — “যে দল ক্ষমতা দখলের জন্যে লড়াই করে না, সে দলের কোনো মূল্যই নেই।” আমরা বলছি গণমানুষের স্বার্থের মূল্যে দলের স্বার্থরক্ষার কথা, তা শান্তিপূর্ণ বা বৈপ্লবিক যেভাবেই ঘটুক না কেন। নৈর্ব্যক্তিক কোনো দল বা তার কর্মসূচীকে নির্বাচিত করাটা আসলে একটা প্রতারণামূলক বিকল্প, যেখানে সত্যকার উপায় হচ্ছে সত্যকার মানুষের ভোটে সত্যকার জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচিত করা। জনপ্রতিনিধিত্বের মোদ্দা কথাই তো এ-ই।

স্পিগেল: তেল এবং গ্যাস রফতানির উচ্চ রাজস্ব আয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব এইসব সত্তে¡ও রাশিয়ার ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে, সে পরিস্থিতির উন্নতি কী করে সম্ভব?

সল্: আমি মনে করি রাশিয়ার ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার এই দূরত্ব অসম্ভব বিপজ্জনক এবং রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে এখুনি মনোযোগী হতে হবে। যদিও ইয়েলৎসিনের আমলে লুণ্ঠনের মাধ্যমে ঐশ্বর্যের পাহাড় তৈরি হয়েছে — এখনকার পরিস্থিতি শোধনের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত উপায় হচ্ছে বড় বাণিজ্যগুলির পেছনে তাড়া না করা, এগুলোর এখনকার মালিকরা যথাসম্ভব কার্যকরভাবে এদের চালানোর চেষ্টা করছে, মধ্যম এবং ক্ষুদ্রশিল্পগুলিকে হাঁফ ছাড়বার সুযোগ করে দেয়া। এর মানে হলো নাগরিকদের এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অসঙ্গত নিয়মকানুন এবং দুর্নীতি থেকে বাচাঁনো। এর মানে রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্ব রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ব্যয় করা, শিক্ষাখাতে ব্যয় করা, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা। এবং আমাদের শিখতে হবে কী করে চুরি-অর্থ আত্মসাৎ ছাড়া এই ব্যয় করা যায়।

‘বিশ্বাস হচ্ছে জীবনের ভিত্তি’

স্পিগেল: রাশিয়ার কি কোনো রাষ্ট্রীয় সংকল্পনা প্রয়োজন আছে এবং থাকলে তা কী রকম?

সল্: ‘রাষ্ট্রীয় সংকল্পনা’ বা ‘ভাবনা’ বললে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় না। ভাবা যেতে পারে এটি এমন একটি রাষ্ট্রভাবনা যা জাতীয় জীবন যাপনের পন্থা হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য। একটা সংহতির আইডিয়া, এমন একটা ঐক্য-ভাবনা যা কাজ চালানোর উপযোগী। কিন্তু এটা কোনো মতেই কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট বা ক্ষমতাসীনদের আরোপিত হলে চলবে না।

আধুনিক ইতিহাসে আঠেরোশ শতক পরবর্তী ফ্রান্সের এই ভাবনাগুলি আকার লাভ করেছে, আকার পেয়েছে যুক্তরাজ্যে, যুক্তরাষ্ট্রে, জার্মানীতে, পোল্যান্ডে। সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়াতে যখন হুড়মুড় করে এই ‘রাষ্ট্র-ভাবনা’ বিতর্কের শুরু হলো, আমি এতে জল ঢেলে দিতে চেয়েছি, আমার আপত্তি ছিল এই যে — অত ক্ষয়ক্ষতির পর আমাদের জন্যে একটি লক্ষ্যই যথেষ্ট — তা হচ্ছে: মুমূর্ষু জাতটাকে বাঁচিয়ে রাখা।

স্পিগেল: কিন্তু রাশিয়া প্রায়ই একলা হয়ে পড়ে। ইদানীং রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক (তথা ইউরোপের সম্পর্ক) শীতলতর হয়ে এসেছে। এর কারণ কী? আধুনিক রাশিয়াকে বুঝতে পশ্চিমা দেশগুলোর কী কী সমস্যা হচ্ছে?

সল্: আমি অনেকগুলো কারণ বলতে পারি। সবচেয়ে কৌতূহলকরগুলি হচ্ছে মনোজাগতিক। অর্থাৎ কাল্পনিক আশা আকাঙ্ক্ষার সাথে বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। এটা রাশিয়াতে এবং পশ্চিমে উভয় ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ১৯৯৪-এ যখন আমি রাশিয়াতে ফিরি, তখন এখানে পশ্চিমা দুনিয়া আর তার হাল-হকিকত রীতিমত পূজনীয় হয়ে উঠেছিল। একথা অনস্বীকার্য যে, এর মূলে সম্যক জ্ঞান ছিল না, ছিল না সচেতন বাছাইও, যা ছিল তা হচ্ছে ঘৃণা, বলশেভিক শাসনকাল এবং এর পশ্চিম-বিরোধী প্রপাগান্ডার প্রতি স্বাভাবিক ঘৃণা।

এই মনোভাব সার্বিয়াতে ন্যাটো (NATO)-র বর্বর বোমা হামলার পর থেকে বদলাতে শুরু করে। বলা যায়, রাশিয়ান সমাজের সকল স্তরের মানুষ এই বোমাহামলায় যে আঘাত পায় তা গভীর এবং অনপণেয়। ব্যাপারটা আরও ঘোরালো হয়ে দাঁড়ায় যখন ন্যাটো তার প্রভাব বিস্তার শুরু করে এবং প্রাক্তন সোভিয়েত রিপাবলিকগুলিকে তার কাঠামোতে সংযোজন করতে থাকে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটা চরম বেদনাদায়ক হয়ে দাঁড়ায়, কেননা রাশিয়ার সাথে ইউক্রেন লক্ষ লক্ষ পরিবারের বন্ধন দিয়ে সম্পৃক্ত, রাষ্ট্রসীমার দু’ধারে অজস্র পরমাত্মীয়ের বাস। এক আঘাতে এই পরিবারগুলি এক নতুন বিভাজনরেখার কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে.

অতএব পশ্চিমের যে ‘গণতন্ত্রের বরপুত্র’ মার্কা ভাবমূর্তি ছিল, তা বদলে গেল এরকম হতাশ বিশ্বাসে যে — পশ্চিমা নীতি মানে অনধিকার চর্চা, দোষদর্শিতা এবং স্বার্থপরতা। বহু রাশিয়ানদের জন্যে এটা ছিল একধরনের গভীর স্বপ্নভঙ্গ, আদর্শের বিনষ্টি।

একই সময় পশ্চিম ব্যস্ত ছিল শ্রান্তিকর শীতল-যুদ্ধে জিতবার ফ‚র্তিতে এবং গর্ভাচেভ ও ইয়েলৎসিনের অধীনে ১৫ বছরের অরাজকতা দেখতে। এমতাবস্থায় এটাই ভেবে নেয়া স্বাভাবিক যে রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ-এ পরিণত হয়েছে এবং এই পরিণতিই হবে চিরস্থায়ী। অর্থনীতিতে, এবং রাষ্ট্র হিসেবে যখন রাশিয়া তার শক্তি ফিরে পেতে শুরু করলো, তখন পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া (সম্ভবতঃ অবচেতনে) হলো আতঙ্ক — যার ভিত্তি হচ্ছে পূর্বস্মৃতি।

স্পিগেল: পশ্চিম এই পুনর্জাগরণকে জড়িয়ে ফেলেছিল প্রাক্তন-পরাশক্তির সাথে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে।
সল্: সেটা মোটেই ভালো কথা নয়। এর আগেও পশ্চিম এই আত্মবিভ্রমের শিকার ছিল বা সুবিধেমত বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে গেছে এই ভেবে যে, রাশিয়া একটি শিশু গণতন্ত্র, যখন সত্য হলো রাশিয়াতে আদতে কোনো গণতন্ত্রই ছিল না। অবশ্য এখনো রাশিয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়; এ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কেবল গড়ে উঠছে মাত্র। সব কর্তব্যকর্ম বর্জন, চুক্তিভঙ্গ, ভুলভ্রান্তির জন্যে রাশিয়ার বিচার করাটা আসলে অতিসরলীকরণ।

অথচ ৯/১১-এর পর রাশিয়া কি স্পষ্ট এবং বিভ্রান্তিহীনভাবে তার সাহায্যের হাত পশ্চিমের দিকে বাড়িয়ে দেয়নি? পশ্চিমের সে হাত গ্রহণ না করবার অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয় মানসিক হীনতা অথবা দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টিস্বল্পতা। যে মুহূর্তে আমেরিকা আফগানিস্তানে রাশিয়ার চরম প্রয়োজনীয় সাহায্য গ্রহণ করলো, ঠিক তার পরপরই নিত্যনতুন দাবিদাওয়া শুরু করলো। ইউরোপের ক্ষেত্রে, রাশিয়ার প্রতি তার একরকম ভয় কাজ করে — জ্বালানী শক্তির ওপর ভিত্তি করে এ ভয়ের সৃষ্টি।

নিত্যনতুন হুমকির প্রেক্ষিতে রাশিয়াকে একপাশে ঠেলে দেয়াটা পশ্চিমের জন্যে কি বিলাসিতা নয়? রাশিয়াতে ফিরবার আগে পশ্চিমে দেয়া আমার শেষ সাক্ষাৎকারে (ফর্বস ম্যাগাজিন, এপ্রিল ১৯৯৪) আমি বলেছি: “যদি আমরা সুদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, একবিংশ শতাব্দীর এক পর্যায়ে ইউরোপ এবং আমেরিকা উভয়েরই রাশিয়াকে দোসর হিসেবে চরম প্রয়োজন হবে।”

স্পিগেল: আপনি মূল জার্মান ভাষায় গ্যেটে, শীলে এবং হাইনে পড়েছেন এবং আপনি সবসময় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে জার্মানী হবে সেই সেতুবন্ধ যা রাশিয়াকে বাকি পৃথিবীর সাথে যুক্ত করবে। আপনি কি এখনো মনে করেন জার্মানরা এই ভূমিকা রাখতে পারবে?

সল্: হ্যাঁ, মনে করি। জার্মানী এবং রাশিয়ার ভেতরকার এই পারস্পরিক আসক্তির পেছনে একরকম পূর্বনির্ধারিত ব্যাপার রয়েছে। নয়তো এই সম্পর্ক দু’দুটো মহাযুদ্ধের পরও টিকে থাকতো না।

স্পিগেল: কোন জার্মান কবি-লেখক এবং দার্শনিকরা আপনাকে সবচেয়ে প্রভাবিত করেছেন?

সল্: শিলে এবং গ্যেটে আমার শৈশব-কৈশোরে দারুণভাবে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে শেলিং আমাকে খুব টেনেছিলেন। জার্মান সঙ্গীতের ঐহিত্যকে আমি দারুণভাবে উপভোগ করি। বাখ, বীটোফেন্ এবং শ্যুবার্ট ছাড়া আমি আমার জীবনটা চিন্তাও করতে পারি না।

স্পিগেল: পশ্চিমারা আধুনিক রুশ সাহিত্য সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানে না। রুশ সাহিত্যের বতর্মান অবস্থা নিয়ে আপনার মতামত কী?

সল্: দ্রুত এবং মৌলিক পরিবর্তনকাল সাহিত্যের জন্যে মোটেই সুবিধাজনক নয়। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি, কিংবা বলা ভাল শ্রেষ্ঠ কাজগুলি সবসময় সবখানে সৃষ্টি হয়েছে সুস্থির অবস্থায়। ভাল কিংবা মন্দ যে কোনো স্থিতিশীল অবস্থায়। আধুনিক রুশ সাহিত্য তো এর ব্যতিক্রম নয়। আজকালকার শিক্ষিত পাঠক কল্পকাহিনী বা রোমান্স-কাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী নন-ফিকশন জাতীয় জিনিসে –স্মৃতিকথা-জীবনী-প্রামাণ্যচিত্রধর্মী গদ্যে। তারপরও আমি বিশ্বাস করি ন্যায় এবং বিবেক হাওয়ায় ভেসে যাবে না, বরঙ রুশ সাহিত্যের ভিত্তিমূল হিসেবে টিকে থাকবে, যাতে করে আমাদের আত্মা আলোকিত হয়, উপলব্ধিগুলি সারবান হয়।

স্পিগেল: রাশিয়ার পৃথিবীতে অর্থোডক্স ক্রিশিয়ানিটির প্রভাব বিষয়টি আপনার লেখায় পদে পদে ছায়া ফেলেছে। রাশিয়ান চার্চের নৈতিক যোগ্যতা কী রকম?

আমরা মনে করি রাশিয়ার চার্ট আজ রাষ্ট্রীয় চার্চে পরিণত হচ্ছে, ঠিক যেমন শতবৎসর আগে ছিল। এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা ক্রেমলিনের হর্তাকর্তাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে বৈধতা দিয়েছিল।

সল্: পক্ষান্তরে, আমাদের বিস্মিত হওয়া উচিত যে মাত্র কয়েকবছরে আমাদের চার্চ স্বাধীন অবস্থানে যেতে পেরেছে। ভুলে যাবেন না, পুরো বিংশ শতক জুড়ে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চকে কী রকম ভয়ানক মাশুল দিতে হয়েছে। নতজানু অবস্থা থেকে চার্চ আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নবীন সোভিয়েত-পরবর্তী রাষ্ট্র অতিস¤প্রতি চার্চকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মান করতে শিখছে। রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের ‘সামাজিক হিতোপদেশমালা’ যেকোনো সরকারী কার্যক্রমের চেয়ে অনেক দূর বেশি কার্যকরী। স¤প্রতি মেট্রোপলিটান কিরিল চার্চের একজন স্বনামধন্য ব্যাখ্যাকারী, বারংবার করব্যবস্থার সংস্কারের ডাক দিয়েছেন। তাঁর মতামতগুলি সরকারের মতামতের অনুগামী না হওয়া সত্তে¡ও সেগুলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স¤প্রচারিত হচ্ছে। আর ‘ক্রেমলিনের হর্তাকর্তাকে বৈধতা দান’ বলতে আপনি কি বোঝাতে চান? ‘নাগরিক অন্তেষ্টিক্রিয়া’ না হয়ে ইয়েলৎসিনের অন্তেষ্টিক্রিয়া যে প্রধান-ক্যাথেড্রালে হলো সেইটে?

স্পিগেল: সেটিও বটে।

সল্: বেশ, ওটা হয়তো জনরোষ ঠেকিয়ে রাখবার একমাত্র উপায় ছিল, যে ক্ষোভ তখনো পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি। হয়তো ক্রোধের সম্ভাব্য বিস্ফার এড়িয়ে যাবার জন্যেই তা করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সকল রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের বেলায় একই অন্ত্যেষ্টিক প্রটোকল মানতে হবে — এটা ভাববার কোনো কারণ তো নেই। আর অতীতের কথা যদি বলতে হয় — মস্কোর কাছে বুতাভোতে কম্যুনিস্টদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বলিদের জন্যে আমাদের চার্চ দিনব্যাপী প্রার্থনাসভা করেছে, একই ঘটনা ঘটেছে সলোভেৎস্কি দ্বীপের, এবং অন্যান্য স্থানের গনসমাধিতে।

স্পিগেল: ১৯৮৭ সালে স্পিগেল-এর প্রতিষ্ঠাতা রুডলফ অগস্টাইনের সাথে আপনার সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন আপনার পক্ষে ধর্ম নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা রীতিমত কঠিন। আপনার কাছে বিশ্বাসের মানে কী?

সল্: আমার কাছে বিশ্বাস হচ্ছে জীবনের ভিত্তি, জীবনের অবলম্বন।

স্পিগেল: আপনার মধ্যে কি মৃত্যুভয় কাজ করে?

সল্: না, আমি আর মৃত্যুকে ভয় পাই না। যখন অনেক ছোট ছিলাম, আমার বাবার মৃত্যু আমার ওপর ছায়াপাত করেছিল — বাবা মারা গিয়েছিলেন সাতাশ বছর বয়েসে। আরও ভয় পেয়েছিলাম যে আমার সব সাহিত্যকর্ম শেষ হবার আগে মরে না যাই! কিন্তু তিরিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যু বিষয়ে আমার মনোভাব অনেক শান্ত-শমিত হয়ে আসে। আমি মনে করি এটা অস্তিত্বের একটা স্বাভাবিক মাইলফলক, অন্তিম মাইলফলক নয় মোটেই।

স্পিগেল: যাই হোক, আমরা আপনার সৃজনশীল দীর্ঘজীবন কামনা করছি।

সল্: না না এই কামনা করবেন না। যথেষ্ট হয়েছে।

স্পিগেল: আলেকসান্দর ইসায়েভিচ, সাক্ষাৎকারের জন্য ধন্যবাদ।

shaguftania@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kausar Mumin — নভেম্বর ১৪, ২০০৮ @ ১২:০০ পূর্বাহ্ন

      সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি নতুন বিশ্ব-ব্যবস্হার আগাম বার্তা এখানে আছে। জাতি-রাষ্ট্রসমূহের আশু করণীয় সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির একজন একনিষ্ঠ দর্শক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে ঐতিহাসিক। এ সাক্ষাৎকারটি নতুন নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে খুবই প্রয়োজনীয় বলে মনে হতে পারে। পাঠ করে সত্যিই সমৃদ্ধ হলাম।

      – Kausar Mumin

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com