আর্টস, কবিতা

কামরুল হাসান: জীবনের মিছিলে মৃত্যুর কারাভান ও অন্যান্য

কামরুল হাসান | 2 Oct , 2018  


দৈত্যের ঘরবাড়ি

দৈত্য তোমার ঘরবাড়ি দেখে বুঝি
মাঠের সিথানে অতবড় কার মুখ,
হা করে আছো সবকিছু গিলে খাবে
পেছনে যমের ছায়া কি দেখেছ, নড়ে?

ঘরবাড়ি সব মাটির উপরে খাঁড়া
দৈত্য শুয়েছে অতল মাটির খাটে,
প্রতিধ্বনিত হুঙ্কার ফিরে আসে
সরলজনের যম হয়ে ছিলে পাটে।

দৈত্য তোমার আকাশছাপানো ঘর
যমের হাতে নড়ে ওঠে পড়ো পড়ো,
ভয়ের শেষে আরো কত ভয় জাগে
প্রাণান্ত ঐ চোখমুখ কারা আঁকে?

নিখোঁজ সংবাদ

সহপাঠিনীরা কোথায় যে হারিয়ে গেল আর
কখন কোন দূরত্বে গিয়ে গর্ভবতী হয়ে উঠল
পাখির ঠোঁটে মেখে নিলে কোন বিষ
কমলালেবুর বাগানগুলো কিভাবে যে তছনছ হল
হাতীমত্ত পায়ে
বহুকাল শুনি নি দূরে কোন রণক্লান্ত বাঘের গর্জন!

পেয়েও হারানো সুখে মেঘবতী হল যে আকাশ
ঝরাল অঝোর শ্রাবণ বাংলার অজস্র কবিতায়
আর রবিঠাকুরের গানে গানে কখন যে বেড়ে গেল বেলা
দেখি সে স্বপ্না, বীথি, ঝোরা, সোমা স্বপ্নের সোমত্ত্ব ঝরোকা!

কৈশোরের সোনা সব, মনিমুক্তো বোনা
জীবনের স্বর্ণবর্ণময় পাড়ে,
তারা তো অদম্য হাসে, শ্রেনীকক্ষ ভরে তোলে গানে।
নোনাজল বুকে করে পাড়ি দিই পৃথিবীর পরিধির জল
বুকে তুলে গভীর আনন্দ আর গোপন বিষাদ
সাদাদের গ্রীবা তুলে পাই ঐ শ্যামের নিষাদ!

সহপাঠিনীরা কোথায় যে হারিয়ে গেল আর
কখন কোন মমত্বে ডুবে হয়ে উঠল মাতা
শিশুদের ঠোঁটে তুলে উড়ে উড়ে মেঘের কিনারা
কমলার শত সুধা ঐ শিশু আর শিশুর পিতার
যৌথ রাত্রির ভাগে
বহুদিন পোষ্টম্যান আনেনি কোন আনন্দ লেফাফা!

আঁধার পথের রথে

আমার একটি পথ আঁধারের দিকে বেঁকে গেছে
তাকে প্রসঙ্গক্রমে তমিস্রাবৃত বলা যেতে পারে।
যে সব আলোর পথ বেঁকে গেছে অনন্ত সুদূরে
ঘনিষ্ঠ কাছাকাছি পড়ে আছে অন্ধকার গুহাচিত্রপথ।
আঁধার আজ আলোকের সমান প্রতিভা ও চঞ্চলতা ধরে
আলোর ভালোর পাশে কালো খুব রয়েছে ম্রিয়মান
আলো তাকে জানায় সম্মান, কেননা কালো আছে বলে
আলো এত বেশী উজ্জ্বল, ধারাখরতর, এত প্রাণবান
আমার একটি পথ আঁধারের দিকে গেছে ম্রিয়মান …

সম্ভ্রান্ত সমস্ত পথে আলোর পাশাপাশি আঁধার রয়েছে
যে সব আলোর নদী বয়ে চলে যমুনা শরীরে
তাদের সামান্য নিচে আঁধারের গূঢ়যন্ত্রযান
যতখানি নাক্ষত্রিক উজ্জ্বলতা ততখানি সাম্রাজ্য আঁধারের
আলো ভাই তার পাশে অন্ধকার বোন শুয়ে থাকে
আলো বোনটির পাশে অন্ধকার হারাধন ভাই
উহারা যমজ, তুলনা আছে আকাশগঙ্গায়

জানি সেই অবিশ্রান্ত পথচলা প্রেমিকের মন
আমার একটি পথ আঁধারের দিকে গেছে প্রাণপন …
তাকে অনভিজ্ঞতাহেতু তমসাচ্ছন্ন বলা যেতে পারে।

উহারা যমজ, তুলনা আছে আকাশগঙ্গায়

জীবনের মিছিলে মৃত্যুর কারাভান

পাশ ফিরলেই গলা জড়িয়ে ধরে।
মৃত্যু জীবনের এত কাছে শুয়ে থাকে?
শৈশবে দেখেছি দূর আকাশের গায়ে
মৃত্যুদূতকে বিদ্যুতের চাবুক হাঁকাতে।
ভেবেছি মৃত্যু বুঝি ঐ র্গর্গ গরিলামেঘ
ঈষাণ কোনে জমে থাকা পুঞ্জিভূত রাগ;
প্রমত্ত্ব মোষের মত আগুনের শিঙের ঝল্কে
উল্টে দেয়া নড়বড়ে টিলা, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি।

কখনো মৃত্যু সুদূরের দূত, আজ্ঞাবহ, কেননা
গৃহের চাল উড়ে গেলেও গৃহস্থ বেঁচে থাকে;
কিন্তু এখন দেখছি সে অত্যন্ত নিকটে দাঁড়ানো
শ্বাস ফেলে ঘাড়ে, না দেখা দৈত্য ঐ নিম্নচাপ
বঙ্গোপসাগরের জানু ঘেঁষে ধেয়ে আসা সিডরের রূপে।

আবার কখনো ভীষন প্রেমের চোখে তাকায়
প্রেমিকার মূর্তি ধরে আসে, নিয়ে যায় বিবাহ
বা মৃত্যুবাসরে, পরক্ষণেই তাকিয়ে দেখি
হাটি হাটি জীবনের শিশুটি এসেছে;
এবং শিশুর মিছিল জীবনকে কলহাস্যে ভরে।
তখন মৃত্যুকে পালাতে দেখি ঊর্ধ্ব্শ্বাসে
কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে একলাফে সে নেমে আসে
মানস সরোবরে, আর
পলির প্রদেশে তার প্রবাহিত জলে
অবিরত জীবনের নন্দন নৌকা বেয়ে চলে।

প্রার্থনা

প্রভূ, বারংবার ফিরিয়ে দিও এই তুচ্ছ মানবজনম।
বারংবার ফিরিয়ে এনো পৃথিবী নামক ক্ষুদ্র গ্রহটির ভ্রম।

জানি তোমার ভূবনে আরো অতিকায় স্বর্গেরা ঘোরে
সেসব জগতে কত উন্নত জীব, আগুনের, খেলা করে।

আমাকে পুনর্বার তুমি বানিও সাদামাটা মাটির মানুষ
এই পৃথিবীর কোমল মাটির শ্যামল ঘাসে রেখো।

আমি তো বাকহীন তোমার এই গ্রহটির রূপে
আমি তো কৃতজ্ঞ খুব মানুষের রূপ পরিগ্রহে।

তুমি যে আশ্চর্য শিল্পী বুঝে গেছি নীল মখমলে
তুমি তো অনির্ণীত ঐ অসীমের ব্যাপক ভূগোলে।

আমিও প্রাণী এক, কখনো বাঘ, কখনো খরগোশ
তোমার অপূর্ব নির্মাণ খুঁজে চলি, আমি মুগ্ধ, রোজ।

Flag Counter


2 Responses

  1. মানিক বৈরাগী says:

    প্রতিটি কবিতার আলাদা আলাদা একটি আবেদন আছে।

  2. Shirin Akter Ritu says:

    কবির প্রতিটি কবিতা ভালো লেগেছে। আশা করি আরো সুন্দর সুন্দর কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.