সিকোরাক্স: আত্মরতির মহা ওঙ্কার

ঝর্না রহমান | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:২২ পূর্বাহ্ন


শঙ্খের মুখে কান পাতলে সাগরের গর্জন শোনা যায়, ঝিনুকের অন্ত্রতলে মুক্তোর ভেতরে লুকোনো থাকে সাগরতলের বালুকণার গল্প। এই তুলনাগুলো মনে পড়বে তখন, যখন আপনার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত ‘সিকোরাক্স’ নামের একটি ক্ষুদ্রকায় কাব্যপাঠের অভিজ্ঞতা হবে, যে অভিজ্ঞতা আপনার অনুভূতির ঈথারে ক্রমোৎসারিত ঢেউয়ের মতো একটানা ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। আর ক্রমশ তা আপনাকে ভূমি থেকে উপকূলে, উপকূল থেকে সাগর তরঙ্গে, তরঙ্গ থেকে অতলান্ত গভীরে, প্রতি বালুকণায়, প্রতি জলকণায়, প্রতি মুক্তোভ্রুণে, প্রতি অভ্রদ্যুতি ও সূর্যের বর্ণালিতে অণু অণু করে ছড়িয়ে দিতে থাকবে।

মুহম্মদ নূরুল হুদা রচিত এ বই আয়তনে যেন ছোট্ট একটি ঝিনুক। তার দুই মলাটের খোলের ভেতর সাজানো দশটি অধ্যায়ের দশটি মুক্তো। এই মুক্তোর ভেতরে ‘সাগরতলের বালুকণা’ নয়, বরং রয়েছে একটি গোটা সমুদ্রের অথবা দশটি মহা সমুদ্রের গল্প। বিন্দুতে সিন্ধু বলে একটি কথা প্রচলিত আছে, কিন্তু ‘সিকোরাক্স’ কাব্যকে এই প্রচল শব্দবন্ধও ধারণ করতে পারবে না। তার জন্য নির্মাণ করতে হবে প্রচলভাঙা নতুন রূপভাষ্য। ‘সিকোরাক্স’ একের ভেতরে বহুমাত্রিক, বহুকৌণিক সৃষ্টিভাবনা। পাশ্চাত্ত্য মিথের সাথে প্রাচ্য পুরাণের বহুমাত্রিকতাকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে রেখে, নববয়ানে এক নবতর অবয়বের উদ্ভাসন। একই সাথে এখানে যেন মহাজাগতিক কেন্দ্র থেকে কোটি রশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটে আবার অপরদিকে সৃষ্টি হয় কোটি রশ্মির কেন্দ্রাতিগ গতির এক কৃষ্ণগহ্বর। ‘এক’ এবং ‘বহু’র একাকার হওয়া এক বিস্ময়কর ভাব ও নির্মাণকলার রূপপ্রতিমা ‘সিকোরাক্স’।

সিকোরাক্সকে আমরা শেক্সপিয়রীয় সাহিত্যের ডাইনী চরিত্রগুলোর একটি বলেই জানি। শেক্সপিয়র রচিত ‘টেমপেস্ট’( ১৬১০ ) নাটকের একটি পরোক্ষ চরিত্র ডাইনি সিকোরাক্স। মানবসভ্যতা থেকে দূরে স্থাপিত এক সাগরদ্বীপের অধীশ্বরী ছিল এই সিকোরাক্স। মিলানের ডিউক প্রসপারো তাঁর বিশ্বাসঘাতক ভাই এন্টনিও কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে কন্যা মিরান্দাকে নিয়ে ঐ দ্বীপে আশ্রয় নেন। ‘টেমপেস্ট’-এর কাহিনীতে দেখা যায় প্রসপারো দ্বীপে আশ্রয় নেওয়ার অনেক আগেই সিকোরাক্স মারা গেছে। মৃত্যুর আগে সে দ্বীপের শুভ আত্মা বলে কথিত এরিয়েলসহ কয়েকজন অশরীরী দানবকে গাছের কোটরে বন্দী করে রেখে গেছে আর দ্বীপের ভোগদখলের সুযোগ করে দিয়ে গেছে তার কুৎসিতদর্শন বিকলাঙ্গপ্রায় পুত্র ক্যালিবানকে। জাদুবিদ্যায় পারদর্শী প্রসপারো এসে বন্দী এরিয়েলকে মুক্ত করে তাঁর বশংবদ করে নেন আর তার সাহায্যে দ্বীপে নিজের শাসন ও পরাক্রম প্রতিষ্ঠা করেন।

মানুষের শুভাশুভ চেতনার বাহক হয়ে কল্পিত প্রতিরূপ হিসেবে মিথ চরিত্রগুলোর উদ্ভব হলেও, কী প্রাচ্য কী পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যে সর্বত্রই চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের নানাবিধ আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটেই চিত্রিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাহিত্যের দুই গোলার্ধের একটিতে নেতিবাচক আর একটিতে ইতিবাচক মিথগুলো ঠাঁই পেয়েছে। ডাইনি, রাক্ষস, ভূত প্রেত, দানব, দানবী, অশরীরি আত্মা ইত্যাদি নেতির গোলার্ধে আর দেবদেবতা, পরী, অবতার, বরপুত্রগণ বাস করেছেন ইতির গোলার্ধে। পুরাণের ডাইনি সিকোরাক্সও নেতির গোলার্ধের বাসিন্দা। প্রাচীনকাল থেকে ডাইনির যে রূপকল্প আমাদের কল্পনায় অঙ্কিত হয়েছে তা ভয়ংকর, কুৎসিতদর্শন ও কদাকার। তার চিন্তাভাবনা কাজকর্ম আচরণ সবই কদর্য। ক্ষতিকর। সিকোরাক্সও তাই। তাই দেখা যায়, সিকোরাক্স অশুভ কার্যকলাপের জন্য তার জন্মভূমি আলজিয়ার্স থেকে বিতাড়িত হয়। অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে সে। কাজেই তার বিয়েও হয় যার সাথে সে হয় স্বয়ং শয়তান, তার ছেলে ক্যালিবানও হয় কুদর্শন, কদর্যস্বভাব। বিতাড়িত সিকোরাক্স লোকালয় থেকে বহু দূরে যে সাগরদ্বীপে ঠাঁই পায়, সে দ্বীপের অধীশ্বর হওয়ার জন্য যে শক্তির সাথে লড়াই করতে হয়, সে শক্তি হয় শুভ আত্মা, আর সিকোরাক্সের চরিত্র হয় নিন্দিত কলুষিত নির্যাতিত এক ভয়ংকর অশুভ শক্তির প্রতীক। শেক্সপিয়রের ‘টেমপেস্ট’ নাটকে সিকোরাক্স এই চরিত্র পরিচয় নিয়েই মাঝে মধ্যে বিবৃত হয়েছে। কারণ প্রসপারোর আগমনের বহু আগেই সে মারা গেছে। দ্বীপে রয়ে গেছে তার বিকলাঙ্গ পুত্র ক্যালিবান। ক্যালিবান যেহেতু ডাইনি সিকোরাক্সের পুত্র, তাই তার স্বভাবও কদর্য। বলা হয় সে মায়ের স্বভাব পেয়েছে। তাই সে প্রসপারো-কন্যা সুন্দরী কুমারী মিরান্দাকে ভোগ করতে চায়, শাস্তিস্বরূপ প্রসপারো তাকে বশংবদ ভৃত্যে পরিণত করেন। ডাইনি সিকোরাক্সের পুত্র হয় মানুষ প্রসপারোর আজ্ঞাবহ দাস।
কিন্তু সিকোরাক্স কাব্যে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সিকোরাক্সের ডাইনি ভাবমূর্তি ভেঙে দিয়েছেন। কালান্তরব্যাপী মানুষের চেতনায় প্রবাহিত কদর্যতা থেকে, ক্ষুদ্রতা থেকে, স্বার্থপর হিংস্র লোভী অত্যাচারী অমঙ্গলকারী অশুভ রূপ থেকে তিনি সিকোরাক্সকে তুলে এনেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক ইতিবাচকতায়। এই সিকোরাক্স এক সংগ্রামী বীর্যবতী নারী। নারীর জন্য প্রতিকূল পৃথিবীতে এই সিকোরাক্স এক নিরন্তর যোদ্ধা। আত্মপ্রতিষ্ঠার চেতনায় প্রোজ্জ্বল এক জ্বলন্ত দ্বৈতশক্তি। সে একই সঙ্গে ধারণ করে পুরুষের শক্তি, প্রেমমত্ততা, রোমাঞ্চ, ক্ষমতার লিপ্সা এবং নারীর মমতা, সন্তানবাৎসল্য, দেহজ কামনাবাসনার আগুন। মুহম্মদ নূরুল হুদা এ কাব্যে নেতিবাচক মিথের খোলস ভেঙে নতুন রূপে, নতুন অর্থে, নতুন ভাবমূর্তিতে সিকোরাক্সের অভিষেক ঘটিয়েছেন। মিথবিশারদ জোসেফ ক্যাম্পেবল বিল ময়ার্সের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, মিথ পড়ুন। মিথ আপনাকে অন্তর্মুখী হতে শেখাবে। তখন দেখবেন ধীরে ধীরে প্রতীকের বাণী শুনতে পাচ্ছেন। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদাও পুরাণের সেই অন্তর্মুখী পঠনের মধ্য দিয়ে যেন এক বিস্ময়কর নতুন বাণী বহন করে এনেছেন। তাই প্রাচীন পুরাণের সিকোরাক্স এক অভিনব নবায়নের মধ্য দিয়ে নতুন হয়ে উঠেছে।

পুরাণের নবায়নে এই নবীনা সিকোরাক্সের স্রষ্টা কবি নূরুল হুদার সাথে সঙ্গত কারণেই বাংলা সাহিত্যর প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের তুলনা চলে আসে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত রামায়ণের রাবণকে পরনারী অপহারক, লোভী, ভয়ানক হিংস্র দানব, দশ মাথাযুক্ত বিকট দর্শন পাপী রাক্ষস ইমেজ থেকে উদ্ধার করে, তার মধ্যে স্নেহ মায়ামমতা প্রেম ভালবাসা দুঃখ বেদনা ইত্যাদি মানবীয় অনুভূতির মিশ্রণে একজন রক্তমাংসের মানবে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন। মুহম্মদ নূরুল হুদাও শেক্সপীয়ারের সাহিত্যের ডাইনিকূলের অন্যতম, অমঙ্গলের প্রতীক ‘সিকোরাক্স’কে শণের নুড়ি চুল, বড় বড় দাঁত, বাঁকা বাঁকা নখের বিকট দর্শন ‘ডাইনি’ থেকে প্রেমে কামে থরথর, আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ়, স্বভাবনায় সুস্থির, ব্যক্তিত্বে কঠোর, বীরত্বে শক্তিমত্ত, তীব্র তীক্ষ্ণ আকাঙ্ক্ষাশালিনী এক নারীতে রূপান্তরিত করেছেন। নিজেকে চেনায় কোনো দ্বিধা নেই সিকোরাক্সের। স্পষ্ট, ধারালো তার অস্মিতা, ঈশ্বরপ্রতিম তার শক্তি, অবিনাশী তার আত্ম-অহং, দিগন্তবিস্তারী তার দর্প। কোনো কুয়াশা ধোঁয়াশায় জটিলতার জটাজালে আকীর্ণ নয় সে। কবির শব্দসজ্জায় তাই পৌরাণিক ডাইনি সিকোরাক্স হয়ে ওঠে আধুনিকের চেয়েও প্রাগ্রসর এক আত্মজয়ী নারীর প্রতীক। প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুরণিত হয় তার অহম। নিচের উদ্ধৃতি থেকে আপনি অনুভব করতে পারবেন এই অনুরণন।
“শুধু আমি, শুধু আমি, শুধু আমি,
আর এই স্বাদু হ্রদ, এই ঝর্নাজল,
এই বৃক্ষ, এই পাখি উড্ডীন ডানার,
এই ধাবমান শিঙঅলা মায়াময় প্রাণ,
এই হিংস্র, এই নম্র, কঠোর, বিনয়ী,
জলে মাছ, ডাঙায় হরিণ,
পাতার আড়ালে ফণা, গুহায় হালুম,
শুধু আমি, শুধু আমি, শুধু আমি,
অধীশ্বরা আমি এই দ্বীপ দুনিয়ার।” (পৃষ্ঠা: ৮)
শেক্সপিয়রের ডাইনিদের অন্তর্গত বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে আধুনিককালে নানাভাবে কাজ হচ্ছে। প্রাচীন পুরাণ আধুনিক মানুষের কাছে বিমূর্ত বহুবিধ অর্থকে মূর্ত করে তুলছে।
‘ম্যাকবেথ’ নাটকের তিন ডাইনিকে নিয়ে শান্তনু দাসের নাটক ‘ম্যাকবেথ মিরর’-এ এই নতুন নির্মাণের কথা আমরা জানতে পারি। ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে তিন ডাইনি ম্যাকবেথের ধ্বংসের প্রতিরূপ। ‘রাজা হবে’ বলে তারা ম্যাকবেথকে ঠেলে দিয়েছিল আত্মবিধ্বংসী লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফাঁদে। ‘ম্যাকবেথ মিরর’ এই তিন ডাইনির মনোদর্পণ। ম্যাকবেথ, লেডি ম্যাকবেথ এবং ব্যাংকো চরিত্রের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি তিন ডাইনির মিররে বা মনোদর্পণে প্রতিফলিত। সেখানেও দেখা যায় লিঙ্গসত্তায় এরা নারী, কিন্তু যৌনচেতনায় ম্যাকবেথ, কখনো সময়ের প্রতীক, কখনো শুদ্ধতার প্রতীক। কখনো বা এই তিন ডাইনী অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের ত্রিকালসত্তার প্রতীকায়নতা অতিক্রম করে হয়ে যায় শরীর সাধনায় মত্ত ত্রিসত্তা । কিন্তু এ কাব্যে কবি সিকোরাক্সকে শুধু শরীরসাধনায় প্রতীকায়িত করেননি। বরঞ্চ তার মধ্যে উদ্ভাসন ঘটিয়েছেন বহমাত্রিক সত্তার, বহুমাত্রিক ইমেজের ও ইজমের, বহুমাত্রিক পুরাণপ্রবাহের, আর বহুমাত্রিক মানবিক বোধ ও অনুভূতির। সিকোরাক্স নানাভাবে তাই স্বয়ংসম্পূর্ণ।

অভিনিবিষ্ট পঠনে আপনি দেখতে পাবেন, মুহম্মদ নূরুল হুদা এই সিকোরাক্স-এর মধ্যে ঘটিয়েছেন সৃষ্টি আর স্বয়ম্ভু স্রষ্টার এক মহামিলন। সে একই সাথে জীব আর পরম। জীবাত্মা আর পরমাত্মার যুগল অধিষ্ঠান আছে তার মধ্যে। নিজেকে সিকোরাক্স ঘোষণা করে ‘নারী’ রূপে কিন্তু তার মধ্যে জেগে ওঠে সমস্ত অপ্রাপণীয় সত্তা। নারীর সঙ্গে পুরুষের সত্তা, ভোগ্যার সঙ্গে ভোগীর সত্তা, প্রেমিকের সত্তা, ক্ষমতার দণ্ডমুণ্ডের অধীশ্বরের সত্তা। সিকোরাক্স তাই একই সঙ্গে নারীও পুরুষও। নারীর দেহ আর মন নিয়ে সে অনুভব করে যৌবন, প্রেম, কাম, যৌনাকাঙ্ক্ষা, মাতৃতৃষ্ণা এবং প্রকৃতির মত সর্বংসহা বোধ। একই সাথে পুরুষ হয়ে সে ভালবাসে তার নারীদেহ, ভোগ করে। পুরুষ হয়ে রমণ করে, নারী হয়ে গর্ভধারণ করে। শক্তিমত্ত শাসকের পরাক্রমে সে দুরন্ত দুর্মদ হয়ে ওঠে, আবার নারীর অসীম স্নেহে পুত্র ক্যালিবানকে দ্বীপের ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। নারীর প্রতি সমাজের শতাব্দী প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি আর শাসন শোষণ অনুশাসনের নাগপাশ থেকে বের হয়ে আসার প্রচণ্ড ডঙ্কানিনাদ এই সিকোরাক্স। অসাধারণ আত্মযোনিকাতর ও আত্মরমণতৃপ্ত এই ‘নারুষ’ ( নারী ও পুরুষ ) স্বভাবের সিকোরাক্স, কবি যাকে বলেছেন ‘দুধারী রমণী’, তার চিত্র আপনাকে অভিভূত করে তুলবেই। এ উদ্ধৃতিটি দেখুন,

“ঘুমের ভিতরে আমি হাশর কাতর,
আমার পর্বতজোড়া আমার উপত্যকা
ঝড়মগ্ন, আমার ভেতরে নগ্ন দুধারী রমণী,
অগত্যা গ্রহণ করি আমিই আমাকে, আমি হই আমার পুরুষ,
তারপর সমুদ্রের পাড়ে সেই বেবাহা সৈকতে
আমি আর পারি না, আমি আর কিছুই বুঝি না,
দাউ দাউ এই দেহ খুলে রাখি নক্ষত্রের নিচে..। পৃষ্ঠা: ১৪

দাউ দাউ এই দেহের আগুন নারী-সিকোরাক্সকে পোড়ায়, পুরুষ-সিকোরাক্স হনন করে সে কামাগ্নি।
“আমার ভিতরে আমি
আমার লাঙল।
……………..
আমার ভিতরে আমি
সুড়ঙ্গ খনন।
আমি খড়কুটো
নাড়ার আগুন,
আমার ভিতরে আমি
অনিভু ফাগুন।
আমি নভোতল
জলদগ্নিজ্বালা,
…………….
আমি নিশিথিনী ঘুম
জাগর স্বপন,
রাতের খননকলা
দিনের বপন, ” (পৃষ্ঠা: ১৬)

আপাতদৃষ্টিতে সিকোরাক্সকে হিন্দু পুরাণের ‘অর্ধনারীশ্বর’ রূপে দেখা যেতে পারে। এই অর্ধনারীশ্বর হচ্ছে দেবতা শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীর মিলিত রূপ। ভারতে অনেক শিবমন্দিরেই এই উভলিঙ্গ ‘অর্ধনারীশ্বর’-এর দেবপ্রতিমা দেখা যায়। কিন্তু অর্ধনারীশ্বরের সাথে ‘দুধারী রমণী’ সিকোরাক্স-এর শরীর ও চৈতন্যগত পার্থক্য রয়েছে। সিকোরাক্স নারীদেহধারী নারী। বারবার সে নিজেকে নারী ঘোষণা করেছে। ‘আমি নারী, আমি সিকোরাক্স।’ তার অবয়বে কোনো পুরুষদেহ নেই। অর্ধনারীশ্বর হলে স্বামী প্রভু বা প্রেমিকপুরুষের দেহ রূপে তার অবয়বের সাথে এক দেহে যুক্ত হয়ে থাকতো। বরঞ্চ তার নারী সত্তার সাথে অদৃশ্যভাবে এক দেহে লীন হয়ে আছে পুরুষ সত্তা। বলা যায়, সিকোরাক্সের দেহের ভেতরে আছে দেহ, মনের ভেতরে আছে মন, কামনার ভেতরে আছে কামনা। একই সঙ্গে তার আছে বীর্য ও গর্ভ, আসঙ্গ ও সঙ্গ, আকাঙ্ক্ষা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের শক্তি। সিকোরাক্সের তীব্র নার্সিসিজম যা এক নারীর স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার দিগন্তবিস্তারী আত্মপ্রেমেরই নামান্তর।
“যতই তাকাই এই শরীরের দিকে, তত আমি শিহরিত হই,
যতই তাকাই আমি হৃদয়ের দিকে , তত আমি প্রকম্পিত হই,
মনে হয় আমি এক ভূমিকম্প, আমি এক ঘূর্ণিঝড়, টাইফুন,
আমি এক হাড়-কাঁপানিয়া শীত, আমি এক…” (পৃষ্ঠা ২৪)
নারী সিকোরাক্সের চিরন্তন মাতৃআকাঙ্ক্ষাও ‘দণ্ডধর’ পুরুষের শক্তির দম্ভকে উপেক্ষা করে নিজের ভেতরেই সেই শক্তির উদ্বোধন ঘটানোর ভেতর দিয়ে পূর্ণতা পায়। পুত্র ক্যালিবানকে সৃষ্টি করে তার নিজেরই কামনা। ক্যালিবানের জননীই তার পিতা।
“আমি পিতা আমি মাতা আমি তার সব পুরুষের বীর্য থেকে করিনি গ্রহণ
ধারণ করেছে তাকে আমার কামনা।” (পৃষ্ঠা: ১২)

‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ এ প্রবাদ সমাজে শুধু পুরুষের জন্যই প্রযোজ্য। কবি পাল্টে দিতে চেয়েছেন পুরুষতান্ত্রিক এই ক্ষমতার সূত্র। নারীর ভেতরের শক্তির সাহসের বীরত্বের উদ্বোধন ঘটিয়েছেন সিকোরাক্স প্রতীকে। কবির পঙক্তিমালার দিকে বিস্ময়ের চোখ রাখতে পারেন–
“ঘৃণা করি নারীর সাম্রাজ্য জুড়ে পুরুষের দখল প্রতাপ,
ঘৃণা করি আধিপত্যলোভী সব পেশীর সন্ত্রাস।
সিকোরাক্স, আমি নারী, আয়ত্তে এনেছি আমি পৃথিবীর সবটুকু জাদু,
আমি সেই জাদুবলে হালাক করেছি এই দ্বীপ।” পৃষ্ঠা ১০
গ্রীক পুরাণের লড়াকু নারী যোদ্ধা আমাজননের সাথে সিকোরাক্সের এই মনোভাবের একটি সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রীক ভাষায় আমাজনন অর্থ হচ্ছে স্তনহীনা। তার মানে আমাজননও পূর্ণাঙ্গ নারী নয়। তবে পুরুষও নয়। সে পুরুষের আধিপত্যের বিরোধী। আমাজননও কামুক, ক্ষমতাপ্রিয়। সে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে গহীন অরণ্যে প্রতিষ্ঠা করে নারী রাজ্য। আত্মমর্যাদা সচেতন আমাজনন অপমানের প্রতিশোধ নিতে গ্রীক বীর হেরাক্লিসের সাথেও যুদ্ধে লিপ্ত হয়।


সিকোরাক্স আত্মরতিবিলাসী নারী। স্ব-ঔরসে তাই সে জন্ম দেয় এক পুরুষ। পুত্র ক্যালিবান তারই প্রতিরূপ, তার কামনার রূপ। তাই ক্যালিবান কদাকার কুৎসিত বিকলাঙ্গ হলেও সিকোরাক্স তাকে নিজের অংশ হিসেবেই জানে। তার অবর্তমানে ক্যালিবানকে ক্ষমতাবান দেখতে চায়। সন্তানের ভেতর দিয়ে নারী তার ভোগী দর্পিত অধীশ্বর রূপটিকে স্থায়িত্ব দিতে চায়। ক্যালিবান অন্যরকম, না মানুষ, না জন্তু। চাইলে দ্বীপের অন্যদের সাথে তাকেও বন্দী করতে পারে সিকোরাক্স, কিন্তু করে না। সিকোরাক্স নারী, নারী নিজের কামনার অবাধ বিস্তার চায়। তাই বলে–
“মাতা আমি, পুত্র আমি, তবে অন্য আমি,
আমার বিরুদ্ধে নয়, নয় তবু সপক্ষে আমার;
……………….
আমি চাই এই দ্বীপে বাড়ুক সে নিজের স্বভাবে,
আমার স্বভাব থেকে শতভাগ আলাদা স্বভাব
যদি পারে গড়ে নিতে, তাই গড়ে নিক
যদি পারে, আমাকে সরিয়ে দিয়ে
এই দ্বীপে গড়ুক সে সার্বভৌম নিজের নিবাস।” (পৃষ্ঠা ২০)

এক সার্বভৌম ক্ষমতার আস্বাদ পেতে চায় সিকোরাক্স। যুগ যুগ ধরে নারী তো ক্ষমতাবানদের পদপিষ্টই হয়েছে। অথচ দেখুন, সিকোরাক্সের আদলে কবি অক্ষম অবলা দুর্বল নিপীড়িত নির্যাতিত নারীর পৃথিবীটাই বদলে দিতে চান! সিকোরাক্স চায় সব কিছু ভেঙে ফেলতে। নারীর গণ্ডি, নারীর দুর্বলতা, পরাধীনতা, নারীবিশ্বে পুরুষ নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ, নারীর জীবনযাপনে ধর্মীয় আর সামাজিক অনুশাসন, শাসন, শোষণ– সব ভেঙে ফেলতে চায়। সে চায় ক্ষমতার ব্যাপকতা আর অবাধ স্বাধীনতা উপভোগ করতে। কবি পরম প্রেরণায় নির্মাণ করে চলেন এই নারীকে। উদ্ধৃতি দেখুন,
“আমি আর এই দ্বীপ আজ একাকার।
এই দ্বীপ এ পৃথিবী আজ একাকার।
প্রতিদিন রামধনু ওঠে এই দ্বীপে
আমি ময়ূরীর পেখম ছড়াই,
আমার সামনে নাচে সমুদ্রের আরশি-পাথার।” পৃষ্ঠা: ২২
ইপ্সা-লিপ্সা-পিপাসায়, ক্ষমতা আর সার্বভৌম চেতনায়, আত্মপ্রেমে, আত্মআস্বাদে, আত্মপ্রসাদে– সব মিলিয়ে সিকোরাক্স এক অভিনব নারীবাদের প্রতীক।

সিকোরাক্সকে কবি সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতেও স্থাপন করেছেন। নারী তো সৃষ্টিশীলতারই প্রতীক। নারী রজঃস্বলা তাই সৃষ্টিশীলা। তবে পুরুষ ব্যতীত নারী সৃষ্টি করতে পারে না। নারী-গর্ভে বপন করতে হয় পুরুষের বীজ। কিন্তু নারী-গর্ভের ডিম ছাড়া পুরুষের বীজও অফলা! কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সিকোরাক্সকে ডিম আর বীজ উভয়ের আধার করে গড়েছেন। তাকে করেছেন সৃষ্টিতত্ত্বের ঈশ্বর। যে কোনো মিথোলজিতে সৃষ্টিতত্ত্ব একটি অবিচ্ছেদ্য আর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহাবিশ্বের সৃষ্টি, পৃথিবী আর মানবকূলের সৃষ্টি অথবা জীবজগতের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বিশ্বে বহু মিথ ছড়িয়ে আছে। নানা জাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই মিথ নানারকম রোমাঞ্চকর কল্পনা আর শক্তি-আরতিতে ভরপুর।

বেদপুরাণে সৃষ্টিতত্ত্বের মূল বলা হয় শ্রীকৃষ্ণকে। ভগবান কৃষ্ণই মহাবিষ্ণুর উৎস। এই মহাবিষ্ণুর বিরাট দেহ থেকে কোটি কোটি ব্রক্ষ্মাণ্ড যা কি না অজস্র মহাবিশ্বেরই আদি ভ্রুণ, অণ্ড বা ডিম আকারে ছড়িয়ে পড়ে। আবার বিষ্ণুই নিজেকে কোটি কোটি অংশে বিস্তৃত বিভাজিত করে এইসব ব্রক্ষ্মাণ্ডে প্রবেশ করে ব্রক্ষ্মাকে সৃষ্টি করেন। স্রষ্টা ব্রক্ষ্মা অতপর সৃষ্টি করেন সূর্য চন্দ্র ও গ্রহলোকসমূহ। মহাবিষ্ণু এভাবে নিজেই দেহ, নিজেই অণ্ড, নিজেই ভ্রুণ, নিজেই স্রষ্টা হয়ে এক মহাযৌগিক, মহা একক সত্তা ধারণ করেন। তিনিই পরম, তিনিই জীব, তিনিই ঈশ্বর। তিনি স্বয়ম্ভু, আবার তিনিই তাঁর কোটি কোটি সৃষ্টিতে বিভাজিত। বৈদিক পুরাণের এই কাহিনীর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বিগ ব্যাং’ প্রচণ্ড নাদ বা মহা ওংকার সৃষ্টিতত্ত্বও এক সমান্তরালেই অবস্থান করে। এক অনন্ত মহাশূন্যের সীমাহীন অন্ধকারে প্রচণ্ড নাদে এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হলো মহাবিশ্ব। বিস্ফোরণ কণাগুলোই কি বিষ্ণু প্রকাশিত ব্রক্ষ্মারূপী সেই অণ্ড বা ডিম? সিকোরাক্স কি সৃষ্টিলগ্নে এই ডিমেই ওম দেয়? উদ্ধৃতি দেখুন,
“তরঙ্গশিখরে বসে ওম দেই ডিমে
ওমে ফেটে যায় ডিম
তারপর সৃষ্টিবন্যা, তারপর পললপ্লাবন।
সে প্লাবন এ ব্রক্ষ্মাণ্ড ডোবায় ভাসায়,
…………………..
জলস্থল সমতল সর্বত্র আমার প্লাবন।
কোরানে বর্ণিত গন্দমলিপ্সার কারণে আদম হাওয়ার পৃথিবীতে আগমন ও মানবসৃষ্টির বিকাশ, নূহের প্লাবন আর নূহ নবীর কিশতি থেকে জোড়ায় জোড়ায় প্রাণবীজ ছড়িয়ে দেয়ার কাহিনীর কথাও কি আমাদের মনে পড়ে যায় না সিকোরাক্সের সৃষ্টিকলা থেকে? দুটো উদ্ধৃতি নিচ্ছি–
“হাওয়া নয় আমি, আমি নই হাওয়া,
আমি আর হাওয়া মিলে এক হাতে বানাই গন্দম,
আমার ভেতরে আমি গড়ে তুলি আমার আদম।
রমণীর মাতা নয় নর, জগতের সব নর পুত্র রমণীর।”

“অতঃপর আমিই ছড়িয়ে দেই পাললিক তেজ,
আমার কোচড় থেকে ফসলের বীজ,
পাখি. পশু, কীট, প্রাণ, জীবনের সজোড় বিন্যাস,
আমার দুচোখ, দেখ, পৃথিবীর উদ্ভিন্ন গোলাপ,
ডোবে না ডোবে না আর এই ত্রিভুবন;
আমি ভাসি তুমি ভাসো
চরাচরে ভাসে এই জাহাজজীবন।” (পৃষ্ঠা: ২৪)

কবি সিকোরাক্সকে প্রথমে নিয়ে এলেন প্রবল আমিত্বের রশ্মিমালায় উদ্ভাসিত করে, তারপর সৃষ্টি বন্যায় তোলপাড় করে তুললেন তার মধ্যেকার পরম আর জীবের যুগ্মসত্তাকে। আর এই সত্তার অসীমতায় আমাদের ভ্রমণ করিয়ে শেষ পর্যন্ত কী বিস্ময়ে আমাদের চিনিয়ে দিলেন নারীর মধ্যেকার পরমের অধিক এক মরম সত্তাকে। নক্ষত্রের দূরতম দ্বীপের আলোকমালার মতো এক মরমী আধ্যাত্মিকতাও বেরিয়ে আসে সিকোরাক্সের চেতনালোক থেকে। আমরাও সেই আলোয় স্নাত হয়ে উঠি। এর মধ্যে কোথায় সেই ডাইনি প্রেতিনী হিংস্র কুটিল ‘কুৎসিত কুরূপসী’ নারী? এ তো সেই ‘বহুরূপে ফিরিছেন ঈশ্বর’-এরই রূপমাধুরী! অথবা স্রষ্টা এবং সৃষ্টি উভয়ে উভয়কে চিনে নেবার এক বিহ্বল সাধনা! এই স্তবকটি দেখুন!
“ভাসতে ভাসতে আমি চিনে ফেলি অজস্র আমাকে।
আরশিপাথারে দেখি মুহূর্ত স্বরূপ।
এ মুহূর্তে মৎস্য আমি, এ মুহূর্তে পাখি,
সরীসৃপ এ মুহূর্তে অথবা বাঘিনী,
বড় কষ্ট, বড় ভ্রষ্ট এই চেনাচিনি।
এমন আশ্চর্য ধারা, এমন অধরা এই ধরাধামে
এই আলোকমণ্ডলে আমি কখনো দেখিনি।” (পৃষ্ঠা: ২৪)

আপন দেহ, আপন যৌবন, প্রণয়লিপ্সা আর কামচেতনাকে নারী এবং পুরুষের যুগ্মসত্তা হয়ে রেণু রেণু করে ভোগ উপভোগ দুই-ই করেছে সিকোরাক্স! নক্ষত্রের নিচে তার দাউ দাউ করে জ্বলা অগ্নিশিখার মতো দেহ খুলে রাখে। মুহম্মদ নূরুল হুদা পৌরাণিক ঈশ্বরের মতো সেই অগ্নিশিখার ভেতর থেকে তুলে এনেছেন ডাইনি সিকোরাক্সের অনিন্দ্যসুন্দর দেহসুষমা আর সৃজনপ্রতিমা। সাগরদ্বীপ অধীশ্বরা সিকোরাক্স তাই গ্রীক ও রোমান মিথের সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতে বা ভেনাস কিংবা সনাতন পৌরাণিক উপাখ্যানের ঊর্বশীর আদলে উঠে আসে। জলজ্যান্ত এক স্বর্ণালি দেবীর মতই যেন সাগরজলে উত্থিত হয় প্রকৃতির নবীন উর্বশী, নবীন ভেনাস সিকোরাক্স। আপনারা দেখতে পাবেন, সিকোরাক্স কাব্যের দশটি পর্বে মাঝে মাঝেই কবি অসাধারণ দৃশ্যমালায় ঘটিয়েছেন তার উজ্জ্বল উদ্ধার। এ পর্যায়ে তুলনামূলক অথবা সমান্তরাল দৃশ্যমালার উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই তিন পুরাণনারীকে দেখতে চেষ্টা করবো।

গ্রীক পুরাণের আফ্রোদিতে বা রোমান পুরাণের ভেনাসের জন্ম সমুদ্রের ফেনা থেকে। আফ্রোদিতে বা ভেনাস সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী। আর সিকোরাক্স যখন সমুদ্রের ফেনা থেকে অপূর্ব দেহবল্লরী নিয়ে জেগে ওঠে, যা দেখে সমুদ্রের ঢেউও খলবল করে ওঠে, তখন আমরাও দেখি স্বয়ম্ভু আর স্বয়ংপ্রভ নারীর আত্মআবিষ্কার। এ আবিষ্কার পুরুষের চোখে নয়, সৌন্দর্যের চোখে, চিরন্তন প্রেম আর কামের চোখে, সৃষ্টিশীল বাসনার চোখে। উদ্ধৃতি দেখুন–
“আমি জেগে উঠি ফেনার অধর থেকে।
আমাকে জাগ্রত দেখে, আমাকে ক্ষুধার্ত দেখে
সূর্যফল ঝরে পড়ে পুবের সাগরে।
……………………………..
বালির কামড় থেকে ছেড়ে নগ্ননীবি দাঁড়াই বাতাসে।
আমাকে দাঁড়াতে দেখে খলবল সমুদ্রের ঢেউ,” (পৃষ্ঠা : ২৬ – ২৮ )
গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীর একটিতে দেখা যায়, সৌন্দর্যে অবহেলা দেবী আফ্রোদিতেকে ক্ষুব্ধ করে তুলতো। প্রেমের প্রতিদ্বন্দী দেবীদের প্রচণ্ড ঈর্ষা করতো সে। প্রেম ও সৌন্দর্যে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার জন্য একবার এক দ্বীপের পুরুষদের হত্যা করে নারী রাজ্য কায়েম করেছিল। সিকোরাক্সও তাই! দুটি উদ্ধৃতি তুলে ধরছি–
“আমার সামনে এসে মানুষেরা মানুষ থাকে না,
আমার সামনে এসে পুরুষেরা পুরুষ থাকে না।
আমি নারী, আমি সিকোরাক্স,
আমার তরঙ্গে আমি লিখে যাই আমার স্বভাষা,
এই দেহ এই মন আর তার ক্ষুধা ও পিপাসা। (পৃষ্ঠা: ২৬)

‘‘জায়া নই কন্যা নই আমি কারো নই
আমি শুধু আমার দেহের
এই দেহ কেবল আমার
আমি শুধু আমার মনের
এই মন কেবল আমার।” (পৃষ্ঠা: ২৮)
দ্বিতীয় উদ্ধৃতির পঙক্তিনিচয় পড়ার সাথে সাথে নিশ্চয়ই আপনাদের মনে ভেসে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নহ মাতা নহ কন্যা নহ বধূ সুন্দরী রূপসী’ বলে যে নন্দনবাসিনী উর্বশীকে বন্দনা করেছিলেন, তার কথা! কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা অবচেতন মনে কিংবা সচেতনভাবেই সিকোরাক্সকে আঁকতে গিয়ে কবিগুরুর এই উর্বশীর পোর্টেটকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন!
“বৃন্তহীন পুষ্পসম আপনাতে আপনি বিকশি
কবে তুমি ফুটিলে উর্বশী!
আদিম বসন্তপ্রাতে উঠেছিলে মন্থিত সাগরে,
ডান হাতে সুধাপাত্র, বিষভাণ্ড লয়ে বাম করে–
তরঙ্গিত মহাসিন্ধু মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মতো
পড়েছিল পদপ্রান্তে উচ্ছ্বসিত ফণা লক্ষশত
করি অবনত।” (উর্বশী॥ চিত্রা)
পাশাপাশি সমুদ্রোত্থিতা সিকোরাক্সকে দেখুন–

“কলকল করে ওঠে বিষামৃত, সব কূল ভরে যায় হলাহলে
আমার ভোমরা দেখ উড়ে উড়ে ডুবে যায় সমুদ্রের তলে।”(পৃষ্ঠা ১৮)
এবার রবীন্দ্রনাথের উর্বশীর এই চিত্রটি দেখুন,
“তোমার মদির গন্ধ অন্ধ বায়ু বহে চারিভিতে
মধুমত্ত ভৃঙ্গসম মুগ্ধ কবি ফিরে লুব্ধ চিতে উদ্দাম গীতে।
………………………………………………….
ছন্দে নাচি উঠে সিন্ধুমাঝে তরঙ্গের দল
শস্যশীর্ষে শিহরিয়া কাঁপি উঠে ধরার অঞ্চল।” ( উর্বশী॥ চিত্রা )
আর কবি মুহম্মদনূরুল হুদা নির্মিত উর্বশী-সিকোরাক্সকে দেখুন,
“আমার দেহের নীরে সমুদ্র সফেন
লোনাজলে সাঁতরানো আমি নই কামট হাঙর।
আমার দেহের নীরে জন্ম নেয় মৎস্যকন্যা,
রহস্যের রশ্মিকণা, শেওলার আদিম গহনা,
কামনাকাতরা যোনি আমি নই অহল্যা অবলা,
আমার সঙ্গমকলা সমুদ্রের চেয়ে রজঃস্বলা।” (পৃষ্ঠা: ৩০)

ক্ষুদ্র এই কাব্যখানির প্রতি পঙক্তিতে, প্রতি চিত্রে, সিকোরাক্সকে কবি কখনো নরম পলির মতো ছেনে ছুনে, কখনো কঠিন পাথরের মতো ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কেটে কুটে, কখনো বীজের মতো ছড়িয়ে দিয়ে, কখনো বৃদ্ধা তর্জনী আর মধ্যমায় সূক্ষ্মতম তন্তুর মতো জড়িয়ে নতুন তাঁতে বয়ন করে, নতুন এক নারীর প্রতিচিত্র এঁকেছেন। এই সৃজনশৈলীর বয়নকর্মে সমস্ত কাব্য জুড়ে আছে নতুন অর্থ-ব্যঞ্জনার শব্দস্ফুটন। সিকোরাক্স যেন কখনো ঝিনুক ফুটে মুক্তোর মতো বেরিয়ে এসেছে, কখনো সাগর তরঙ্গের শীর্ষ থেকে গর্জনশীল ফেনা থেকে ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ণতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে বেলাভূমে।

এ কাব্যের পঙক্তিতে পঙক্তিতে দ্যুতিময়, অর্থময়, দ্যোতনাময় অজস্র শব্দ জন্ম নিচ্ছে, ফুটে উঠছে, ছুটে যাচ্ছে, শব্দ করছে, ফেটে যাচ্ছে, ছিটকে পড়ছে, মাথা দুলিয়ে নাচছে, গাইছে। কখনো পুরোনা শব্দ নতুন হচ্ছে, কখনো নতুন শব্দ তীব্র হচ্ছে। নিরখিয়া, সপাথর হিয়া, ওম জাগানিয়া, অগ্নিশস্য, বেবাহা, শরীর অশ্ব, অনিভু ফাগুন, তৃষ্ণাবজ্রমালা, কত কেউ, আরশিপাথার, জলদগ্নিজ্বালা, তরঙ্গ তরুণী, সূর্যফল, রোদতরমুজ– এরকম অসংখ্য শব্দ আপনাকে র্সেফ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে তুলবে!

এ কাব্যের শিল্পরূপ বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। তবে দু একটি অসাধারণ তুলনা এবং বশীকরণীয়া চিত্রকল্পের উদাহরণ না দিলেই নয়।
ক.
“একে একে খসে পড়ে আবরণ, খসে পড়ে সমূহ সেলাই,
আমার বুকের কাছে সব ফোঁড় আলগা হয়ে যায়,
আমার বুকের বাক্সে ভোমরা লাফায়।” (পৃষ্ঠা: ১৮)

খ.
“আলোকবর্ষের পিঠে সময়সোয়ারি;
আমার ভিতরে জমে রাশি রাশি নক্ষত্র-গ্রহাণু,
আলার আঁধার আর আঁধারের আলো হাতে
ছায়াপথে ছায়াপথে নিজেকে বাড়াই,
আকাশ পেরিয়ে যাই আকাশের দিকে,
আমার গমনপথে সাদা গুহা, কালো গুহা,
ফুটে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে মায়ার কুসুম।” (পৃষ্ঠা: ২২)

গ.
“যেন দধি, জমে যায় ধারা,
জমতে জমতে জল, জল থেকে পাখি,
জলপাখি, গৌর গাঙচিল,
খুব ভোরে মাছেদের লোভে পড়ে
দেখে ফেলে জমজ জগৎ,
ফেনার তন্তুতে বোনা রূপহীন অবয়বহীনা,
ভাসমান স্বপ্ননকশা, গতিমান জলের বিছানা।” (পৃষ্ঠা: ৩০)

জোসেফ ক্যাম্পবেল মিথের গল্পকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ না করে কাব্যিক রূপকার্থে বা উৎপ্রেক্ষা অর্থে গ্রহণ করাকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। মুহম্মদ নূরুল হুদা মিথোলজির সিকোরাক্সকে সেই রূপক বা উৎপ্রেক্ষাজনিত অর্থেই পুনর্নির্মাণ করেছেন। সিকোরাক্সের রূপকে কবি নির্মাণ করেছেন অতুলনীয়, ঈশ্বরপ্রতিম এক একক যুগলাত্মাস্বরূপ পূর্ণ নারীশ্বর!

এ নারী কামে-প্রেমে, মোহে-মমতায়-ক্ষমতায়, সংগ্রামে-শক্তিতে-দ্রোহে, দর্পে-দার্ঢ্য, প্রত্যয়ে-প্রতাপে এক বিস্ময়কর নারী। প্রচলভাঙা এই নারী স্বয়ংজিতা, স্বয়ংবৃতা, স্বয়ংসিদ্ধা, স্বয়ংঋদ্ধা, স্বয়ংদ্রষ্টা আর স্বয়ংস্রষ্টা। সিকোরাক্স এক নতুন পৃথিবীর নতুন নারী। এ কাব্য সেই নতুন নারীর আত্মজয়ের দর্পিত ঘোষণা, আত্মরতির মহা ওংকার। উপসংহারে রেখে দিচ্ছি মহা ওংকার স্বরূপ এই স্তবক।
“জগৎমোহিনী আমি আপনমোহিনী
আমি চিনি আমার ক্ষমতা।
ডান হাতে রাজদণ্ড মন্ত্র বাম হাতে,
আমার বিনাশ নাই, আমি ঈশ্বরতা।
জগৎমোহিনী আমি ক্ষমতাবাসিনী
অনাদি বিলয়হীন আমার শাসন,
উচ্চতম শৈলচূড়া আমার আসন।
এই দ্বীপে বালুকায়, বৃক্ষমূলে,
শেকড়ে-বাকলে,
সফেদ তরঙ্গশীর্ষে, শাখায় ডানায়,
শস্যের মঞ্জরী জুড়ে আমার পতাকা,
একা আমি একা,
তন্ত্রেমন্ত্রে দিকে দিকে শানাই ভাষণ,
এ দ্বীপ সোনার দ্বীপ আমি একা ক্ষমতাবাসিনী,
বাঘ নেই এ জঙ্গলে আমি একা ক্ষুধার্ত বাঘিনী।” (৩৭-৩৮)
———————

সাহায্যকারী গ্রন্থ/সূত্র
১.মিথের শক্তি– জোসেফ ক্যাম্পবেল( খালিকুজ্জামান ইলিয়াস )
২.মিথলজিÑ এডিথ হ্যামিলটন ( অনুবাদ- আসাদ ইকবাল মামুন )
৩. মিথ– সুজন কবির
৪. দা টেমপেস্ট — উইলিয়াম শেক্সপিয়র
৫. চিত্রা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬. উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট সূত্র
৭.সিকোরাক্স — মুহম্মদ নূরুল হুদা

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইকবাল করিম হাসনু — সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ @ ৯:১৭ পূর্বাহ্ন

      এমন ঋদ্ধ আলোচনা পাঠকের জন্যে অভাবনীয় প্রাপ্তি! ঝর্না রহমান যে অভূতপূর্ব দক্ষতায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি নূরুল হুদার ক্ষীণতনু কাব্যগ্রন্থে অপরিমেয় গভীরতা ও ব্যাপ্তির সন্ধান দিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার্হ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com