প্রবন্ধ

পুরাণে ফসলের আদিম সুঘ্রাণ

শান্তা মারিয়া | 27 Sep , 2018  


আদিম মানব সমাজ শিকার অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক সমাজে যখন রূপ নিতে থাকে তখন তার মানসলোকেও সৃষ্টি হতে থাকে নানা কাহিনী। বজ্র, বৃষ্টি, বিদ্যুত্ আগুনের মতো নতুন এক শক্তির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে থাকে আদিম মানবগোষ্ঠি। এই শক্তি ফসলের নবজন্ম। প্রথমে উদ্যান চাষ তারপর বৃহত্তর কৃষিক্ষেত্র। নীরস, নির্জীব মৃত মাটি ফুঁড়ে জন্ম নেওয়া সজীব অংকুর মানুষকে বিস্মিত করে। সবুজ পাতায় কিভাবে জীবনের স্পন্দন ফুটে ওঠে তা দেখে বিস্মিত হয় মানুষ। বীজ থেকে উদ্ভিদের জন্ম মানুসের কল্পনাশক্তিকেও জারিত করে। বজ্র, বৃষ্টি, আগুনের মতো কৃষি বা উদ্ভিদের জন্মকেও মানুষের কাছে বিষ্ময়কর বলেই মনে হযেছে। বজ্র, বৃষ্টির মতো তাই কৃষিকেও দৈবশক্তির প্রকাশ বলে ধরে নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছে নানা কাহিনী। বজ্রদেব, অগ্নিদেব, পবনদেব, সাগর-মহাসাগরদেবের পাশাপাশি ধরিত্রীদেব বা কৃষিদেবও পূজিত হওয়া শুরু হয়। কৃষির উদ্ভাবন ঘটেছে নারীর হাত ধরে। তাই অধিকাংশ প্রাচীন পুরাণ কাহিনীতে ফসলের দেবশক্তিকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। দিমিতির, সিরিস, আইসিস, ইশতার, ফ্রিয়া, ফ্লোরা এরা সকলেই হয ফসলের নয়তো উর্বরতার দেবী। শরতে ফসল ওঠার পর তাই আদিম সমাজগুলোতে নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালনের রীতি গড়ে ওঠে অথবা দেবীপূজার আয়োজন চলে। কখনও সর্বজনীন পূজা হিসেবে আবার কখনও গোপন কাল্ট হিসেবে ফসলের দৈবশক্তিকে আরাধনা করা হয়। শীতে উদ্ভিদের মৃত্যু আবার বসন্তে বীজ থেকে তার জেগে ওঠা এবং শরতে ফসল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে মানবসমাজ জীবনের বৃত্তকেই যেন আবিষ্কার করেছে। আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের অবশেষ হিসেবে তখনও প্রধান দৈবশক্তিকে নারীরূপেই ধরা হতো। মাতৃদেবী, উর্বরতার দেবীরাই কৃষিযুগে কৃষির দেবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য গিলগামেসের উপাখ্যানে দেবী ইশতারের দেখা পাওয়া যায়। ইশতার ছিলেন আসিরিয়া, ব্যাবিলনিয়া ও ফিনিশিয়ার প্রধান দেবী। ফিনিশীয় পুরাণে তার নাম অ্যাসতার্তে। ইশতার সকল জীবের মাতা, উর্বরতা, প্রেম ও যুদ্ধের দেবী। সম্ভবত শিকার ও পশুপালন অর্থনীতির যুগেই ইশতারের কাহিনীর সূচনা। কৃষির বিকাশের সাথে সাথে ইশতার হয়ে দাঁড়ান ফসলের দেবতা তামুজের প্রেমিকা। তামুজ প্রতি শরতে ফসল কাটার পর মৃত্যু বরণ করেন। আবার বসন্তে জেগে ওঠেন। বলা হয় ইশতারই তাকে ফিরিয়ে আনেন মৃত্যুর দেবীর কাছ থেকে। শরতে ও বসন্তে ইশতারের বিশেষ পূজার আয়োজন ছিল আসিরিয়ার অন্যতম প্রধান উৎসব।
প্রাচীন রোমে ফ্লোরা ছিলেন পুস্পদেবী। প্রাচীন রোমে ফ্লোরার নামে এপ্রিল ও মে মাসে ফ্লোরালিয়া নামে এক বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হতো।
এ প্রসঙ্গে প্রাচীন বাংলার নবান্ন বা ফসল তোলার উৎসবের কথা মনে পড়ে। অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসব পরবর্তিকালে দেবী দুর্গার শারদীয় উৎসবের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়।
শ্রীরামচন্দ্র জগত্জননী মহাশক্তিময়ী দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন রাবণবধের জন্য। দেবীর পূজার বিহিতকাল ছিল বসন্ত। শরত্কাল মূলত দেবতাদের বিশ্রামের সময়। কিন্তু সেই শরতে অর্থাত্ অকালে দেবীর পূজা করেন রাম। শক্তিময়ী শস্ত্রধারী ও যুদ্ধের দেবী হিসেবে দুর্গার পূজা করা হলেও বাংলার দুর্গাপূজা অনেকটাই পরিবর্তিত রূপ পেয়েছে।
বাংলার দুর্গাপূজা যতটা শক্তির আরাধনা তারচেয়েও বেশি আনন্দ উৎসব। এই উৎসব নতুন ফসল তোলার উৎসব। শরত্-হেমন্তে ফসল তোলার সময় আবহমানকাল থেকেই এ জনপদে উৎসবের রীতি ছিল। সে উৎসবেরই একটি অংশ শারদীয় পূজা। ফসল তোলার সময় বাবা-মায়ের ঘরে বেড়াতে আসে প্রিয় কন্যা। সঙ্গে আসে তার স্বামী ও ছেলেমেয়েরা। দেবী দুর্গার পূজা রূপ পায় বাঙালির গৃহস্থ পরিবারের মিলনোত্সবে।
রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, পুণ্ড্র, হরিকেলসহ সমগ্র বঙ্গদেশে (পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গ মিলে) আবহমানকাল থেকে মাতৃদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। কখনও স্থানীয় অনার্য দেবীরূপে, কখনও আর্যদেবী রূপে বিভিন্ন নামে নারীশক্তির আরাধনা হয়েছে। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার বর্তমান যে রূপ আমরা দেখি তার বিকাশ মধ্যযুগে। বলা হয়ে থাকে, রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ এবং নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু তার আগে, দশম ও একাদশ শতকেও বাংলায় দুর্গাপূজা প্রচলিত ছিল বলে গবেষকরা অনুমান করেন।


বাঙালির দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার সঙ্গে থাকেন তার কন্যা বিদ্যাদেবী সরস্বতী, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, পুত্র সিদ্ধিদাতা গণেশ ও বীর কার্তিক। মাথার উপরে শায়িত থাকেন স্বামী মহাদেব। পায়ের নিচে বাহন হিসেবে থাকে সিংহ। দেবীর হাতে ধরা ত্রিশূলবিদ্ধ অবস্থায় থাকে মরণোন্মুখ অসুর। দেবী সাত্ত্বিক, সিংহ রাজসিক ও অসুর তামসিক শক্তির প্রতীক।
বাঙালির দুর্গাপূজার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল, দুর্গার মতো শক্তিময়ী, অস্ত্রধারী ও জগদ্ধাত্রী দেবীকে কন্যারূপে ও মাতৃরূপে কল্পনা করা। বাঙালির দুর্গা যেন তার একান্ত ঘরের মেয়েটি যে শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য ছেলেমেয়ে নিয়ে বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। পরম শক্তির সংহারক ও ভীতিকর রূপের পরিবর্তে তাকে আপনজনের মতো কোমল রূপে দেখা, ভয়ের বদলে তাকে স্নেহ ও ভক্তি করার মধ্য দিয়ে উপাসনায় উৎসবের যে রূপবদল সেটা বাঙালির একান্ত নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতিগতভাবে বাঙালি মারমুখী ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের নয়। পলিমাটির মতো তার স্বভাব নম্র। পার্বত্য নদীর মতো খরস্রোতা নয়, বরং মোহনায় বিস্তৃত হয়ে কল্যাণীরূপে প্রবাহিত এদেশের নদীর মতোই বাঙালি ধীরলয়ে প্রবাহিত, উদাসী।
দুর্গাপূজা যে মূলত ফসলের উৎসবের সঙ্গে একীভূত হয়েছে তার পরিচয় পাওয়া যায় বিশেষ করে মহাসপ্তমীর পূজার আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে।
নবপত্রিকা বা চলতি ভাষায় কলাবউ পূজা মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সেদিন দেবীর মহস্নানও আরম্ভ হয়। একটু দেখা যাক নবপত্রিকা পূজার আয়োজনের দিকে। নবপত্রিকায় প্রয়োজন নয়টি উদ্ভিদ। কলা(কদলী বা রম্ভা), অপরাজিতা, হলুদ(হরিদ্রা), জয়ন্তী, বেল(বিল্ম), ডালিম(দাড়িম্ব), অশোক, মানকচু ও ধান-এই নয়টি উদ্ভিদকে বিশেষভাবে সাজিয়ে একটি আকৃতি দেওয়া হয়। কলাগাছের সঙ্গে আটটি উদ্ভিদকে এমনভাবে জড়িযে দেওয়া হয় যে দেখতে বধূর মতো লাগে। একে লালপাড় সাদাশাড়ি পরিয়ে ঘোমটা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। দেখলে মনে হয় ঘোমটা মাথায় নতুনবউ। সিঁদুর দিয়ে দেবী প্রতিমার ডানদিকে কাঠের সিংহাসনে স্থাপন করে পূজা করা হয়। নবপত্রিকা পূজার এই আচারানুষ্ঠান বাংলার একান্ত নিজস্ব রীতি। প্রকৃতপক্ষে উদ্যানদেবী, বৃক্ষপুজা, ফসল উৎসবের সঙ্গে এই রীতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন বাংলায় পুন্ড্রসহ বিভিন্ন জনপদে শস্যদেবী, উদ্যানদেবী বা বৃক্ষপূজার যে রীতি প্রচলিত ছিল তার সঙ্গে দুর্গাপূজার সনাতনরীতির আত্তীকরণে কলাবউ পূজার প্রচলন।

প্রাচ্য থেকে আবার পাড়ি জমাই প্রতীচ্যে। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে দিমিতির ছিলেন শস্য ও ফসলের, কৃষির ও উর্বরতার দেবী। ফসল তোলার উৎসব, দিমিতিরের কাল্ট এবং দিমিতিরের উপাখ্যান খুবই মনোগ্রাহী।
দিমিতিরের প্রতীক হলো লাল রঙের পপি ফুল। বার্লি ক্ষেতের মাঝখানে যা জন্মায়। প্রাচীন গ্রিসের ইলিউসিসে ছিল তার মন্দির। দিমিতিরের উপাসনা ও উৎসব হতো বছরের দুটি সময়। অক্টোবরে ফসল তোলার সময় হতো একটি রহস্যময় উৎসব। এতে অংশ নিত মূলত নারীরা। আরেকটি উৎসবে নারী পুরুষ সকলেই অংশ নিতে পারতো। দিমিতিরের পূজায় কী কী আচার অনুষ্ঠান পালন ও মন্ত্রপাঠ করা হতো সে সম্পর্কে পূজারীরা মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিতেন।
গ্রিক পুরাণের শস্য ও উর্বরতার দেবী দিমিতির রোমান পুরাণেও মাতৃদেবী হিসেবে পূজিত। রোমে তার নাম সিরিস। দিমিতির ছিলেন ক্রনাস ও রিয়ার সন্তান। তার ভাইবোনরা হলেন জিউস, হেরা, পোসাইডন, হেডিস, হেস্টিয়া। দিমিতির হলেন কৃষিক্ষেত্রের দেবী। তিনি মানুষের জন্য মঙ্গলময়ী। বিখ্যাত ভাইবোন থাকা সত্ত্বেও অলিম্পাসের দেবদেবীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে দুঃখী। দিমিতির ও তার মেয়ে পার্সিফোন গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত চরিত্র। জিউস ও দিমিতিরের ছিল এক মেয়ে তার নাম পার্সিফোন। দিমিতির তার মেয়েকে ভালোবাসতেন সবচেয়ে বেশি। মৃতদের রাজ্য পাতালপুরীর রাজা হেডিস ছিলেন সদা বিষণ্ন। হেডিসের বিষণ্নতা দূর করার জন্য জিউস পার্সিফোনের সঙ্গে হেডিসের বিয়ের ষড়যন্ত্র করেন। পার্সিফোন একদিন সবুজ ফুলে ভরা মাঠে তার সহচরীদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ও বুনো ফুল তুলছিলেন। সেই সময় কালো ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে পাতাল থেকে হঠাৎ উঠে আসেন হেডিস। জমির এক বিশাল ফাটল দিয়ে উঠে আসেন তিনি। পার্সিফোনকে অপহরণ করে তিনি নিয়ে যান পাতালপুরীর অন্ধকারে। পার্সিফোন চিৎকার করে মাকে ডাকেন। ছুটে আসেন দিমিতির। কিন্তু ততোক্ষণে হারিয়ে গেছেন পার্সিফোন। প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে দুঃখে ভেঙে পড়েন দিমিতির। বন্ধ হয়ে যায় শস্যের ফলন। সবকিছু হয়ে যায় বিবর্ণ ধূসর। সাধারণ এক বৃদ্ধার বেশে দেশে দেশে মেয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ান দিমিতির। ইলিউসিস রাজ্যে এসে হাজির হন তিনি। দেবীকে চিনতে না পারলেও করুণাবশে তাকে আশ্রয় দেন রাজা সেলিউস। সেলিউসের দুই শিশু সন্তান ডিমোফোন ও ট্রিপ্টোলেমাস। নবজাত ডিমোফোনের ধাত্রী করা হয় দিমিতিরকে। রাজার প্রতি কৃতজ্ঞ দেবী স্থির করেন ডিমোফোনকে অমরত্ব দেবেন। তিনি শিশুটির গায়ে গোপনে অ্যামব্রোজিয়া বা অমৃত মেখে দিলেন এবং প্রতি রাত্রে গোপনে তাকে অগ্নিকুণ্ডের ওপর ধরে রাখতেন। কিন্তু একদিন রানী মেটানাইরা শিশুকে আগুনের ওপর দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন ও শিশুকে কেড়ে নেন। দেবী তখন নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন। তার উদ্দেশ্যের কথা খুলে বলেন। বলেন রানীর জন্য শিশুটিকে অমরত্ব দেওয়া গেল না। ডিমোফোন আর অমরত্ব পায়না। তবে ট্রিপ্টোলেমাসকে তিনি কৃষিবিদ্যা শেখান। ফলে মানব সমাজে কৃষিবিদ্যার জনক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন ট্রিপ্টোলেমাস। একটি কাহিনিতে আছে ডিমোফোনের তৎক্ষণাত মৃত্যু হয়। আবার কোনো কাহিনিতে বলা হয় ডিমোফোনই ট্রিপ্টোলেমাস নামে খ্যাত হন।
পার্সিফোনের সন্ধানে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ান দিমিতির। অবশেষে সূর্যদেবতা হেলিওস তাকে পার্সিফোনের সন্ধান দেন। দিমিতির বুঝতে পারেন জিউসের চক্রান্তেই এটা ঘটেছে। জিউসের ওপর অভিমানে তিনি ফসল ফলানো বন্ধ করে দেন। সব শস্য ক্ষেত শুকিয়ে যায়। সব তৃণভূমি হয়ে যায় ঊষর। পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। চারিদিকে হাহাকার পড়ে যায়। না খেয়ে মরতে থাকে মানুষ ও পশু। দেবতা ও মানুষের প্রার্থনায় কাতর জিউস তখন হার্মিসকে বলেন পাতালে গিয়ে হেডিসকে বলতে যেন পার্সিফোনকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হার্মিসের কথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন পার্সিফোন। হেডিস জানতেন পার্সিফোনকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই যাতে সে মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসতে বাধ্য হয় সেজন্য খুব অনুনয় করে তাকে খাইয়ে দেন ডালিমের বীজ। পার্সিফোন চারটি বীজ মুখে দেন। জিউস তখন বিধান দেন পার্সিফোন বছরে আটমাস থাকবে মায়ের কাছে আর চারমাস থাকবে মৃতদের রাজ্যে হেডিসের কাছে। যে আটমাস দিমিতির তার মেয়েকে কাছে পান সে আটমাস তিনি ফসলে তার তৃণে ভরিয়ে দেন ক্ষেত্র। পৃথিবী তখন হয়ে ওঠে সজীব। আর যখন মেয়ে চলে যায় মৃত্যুপুরীতে তখন শীতের আগমনে সবকিছু হয়ে যায় ধূসর আর মৃত। দুঃখী দিমিতির মেয়ের শোকে ধরণীকে করে তোলেন শস্যহীন।
দিমিতিরের আরেক সন্তানের নাম প্লুটোস। পার্থিব মানব আয়াজিয়নের প্রেমে পড়েন দিমিতির। ক্রিট দ্বীপের এক কর্ষিত কৃষি ক্ষেত্রে আয়াজিয়নের সঙ্গে মিলিত হন দিমিতির। এই মিলনের ফলে জন্ম নেন প্লুটোস। তিনি মাটির নিচের ধন সম্পদের দেবতা।


প্রাচীন মিশরীয় পুরাণের শস্য ও প্রকৃতিদেবী হলেন আইসিস। তিনি কৃষিদেবতা ওসিরিসের স্ত্রী এবং রহস্যময় শিশুদেবতা হোরাসের মাতা। আইসিস নবজন্মের দেবী। প্রাচীন মিশরে ফসল তোলার উৎসব ছিল আইসিস এবং ওসিরিসকে নিবেদিত। মার্চে বা বসন্তে যখন ফসল চাষ শুরু হয় তখনও আইসিসের পূজা করা হতো। প্রাচীন মিশরের অন্যতম প্রধান দেবী ছিলেন আইসিস। তিনি আদি দেব গেব ও নুটের প্রথম সন্তান। প্রকৃতির নিয়ন্ত্রকও তিনি। আইসিসের পূজা যেমন ছিল সর্বসাধারণের তেমনি এর সঙ্গে অনেক গোপন কাল্টও জড়িত ছিল। মিশরীয় পুরাণের প্রভাব পড়ে গ্রেকো-রোমান পুরাণেও। আইসিস গ্রিক ও রোমের বিভিন্ন অঞ্চলে কখনও দিমিতিরের সঙ্গে কখনও সিরিসের সঙ্গে একত্রে পূজিত হন।
প্রাচীন রোমের অটোনোমুস শরতের ফসলদেব হিসেবে পরিচিত যার নামে অটাম বা শরতের নামকরণ হয়েছে। ফেরোনিয়া ছিলেন প্রাচীন রোমের ফলের দেবী। উদ্যান দেবী ছিলেন পোমোনা। বিশেষ করে উদ্যানে চাষ হওয়া ফলমূল যেন ভালো থাকে, ফলন হয় প্রচুর সে উদ্দেশ্যে পোমোনার পূজা হতো রোমের ফল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে।
খ্রিস্টধর্ম প্রসারের আগে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের আদি অধিবাসী, কর্নিশ ও কেলটিকদের মধ্যে প্যাগান ধর্ম বা প্রকৃতির পূজা প্রচলিত ছিল। ফসল তোলার পর শরতে বা শেষ হেমন্তে অনুষ্ঠিত হতো কেলটিক ফসল তোলার উৎসব। তখন নতুন বছর শুরু হতো শীত থেকে। এই নতুন বছরের আগেই শরতের শেষে সকল মৃত আত্মা জীবিতদের জগতে এক রাত্রির জন্য ফিরে আসতে পারে বলে বিশ্বাস করা হতো। জীবিতদের উৎপন্ন ফসলে মৃতদেরও অধিকার রয়েছে বা মৃতদের আত্মার সদগতির জন্য ফসলের কিয়দংশ উৎসর্গ করার রীতি থেকেই এই রীতির উদ্ভব। কেলটিকদের ফসলকাটার উৎসবের এই রীতিনীতি ও অনেক কাল্ট পরবর্তিকালে হ্যালুইন উৎসবের রীতিতে পরিণত হয় যা কিছু রুপান্তরের মাধ্যমে আজও পাশ্চাত্য বিশ্বে প্রচলিত রয়েছে।
রোমান অধিকৃত ব্রিটেনের অথবা তারও আগের প্রাচীন কৃষিদেবতা ছিলেন ভিরিডিওস। যিনি কেলটিকদের প্রাচীন কৃষি ও ফসলের দেব হিসেবে পূজিত হতেন। ব্র্যাসিয়াকা ছিলেন আরেকজন কেলটিক দেবী যিনি ফসলের বা হারভেসটিংয়ের দেবী হিসেবে পূজিত হতেন।
চীনের প্রাচীন লোকজ উপাখ্যানেও ফসল তোলার উৎসব ও প্রাচীন লোকরীতির উল্লেখ রয়েছে। বেইজিং শহরে চারটি প্রধান মন্দিরের অন্যতম হলো থিয়েনথান বা স্বর্গমন্দির। প্রাচীন চীনে রাজারা এই মন্দিরে আসতেন স্বর্গের কাছে প্রার্থনা জানাতে ফসল যেন ভালো হয়।
থিয়েনথানে প্রার্থনা ও বিভিন্ন লোকজ আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফসলের মঙ্গল কামনা করা হতো। শরতে চীনের আরেকটি বহুল প্রচলিত প্রধান উৎসব হলো মধ্য শরত্ উৎসব। এই উৎসবে মুনকেক খাওয়ার রীতি রয়েছে যা তৈরি হতো মূলত হেমন্তের নতুন ফসল থেকে।
নেটিভ আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ান বলে পরিচিত আমেরিকার আদিম অধিবাসীরা শস্যমাতার পূজা করতেন। পিওবলো ইন্ডিয়ানদের মধ্যে সেলু বা সান্তা নামে তার পরিচিতি ছিল। শস্যমাতার সম্মানে বিশেষ ধরনের নাচের রীতি প্রচলিত ছিল।

আজটেকদের মধ্যে চিকোমিকোয়াটল ছিলেন ফসলের দেবী। তিনি উর্বরতারও দেবী। তার শরীরে আঁকা থাকতো লাল রঙের নকশা ও পাকা ফসলের শীষ।
ইনকাদের ফসরের দেবী ছিলেন পাকামামা। তিনি ছিলেন ধরিত্রী, ফসল বোনা ও ফসল তোলার দেবী।
হুইচি ছিলেন প্রাচীন জাপানের ফসলের দেবী। তার পূজা করতেন মূলত কৃষি শ্রমিকরা। কৃষি শ্রমিকরা যেন ফসলকাটার জন্য শক্তি অর্জন করতে পারে সেজন্যই হুইচির পূজা করা হতো।
নাইজেরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠিতে ফসলদেবী হিসেবে ইননার পূজা প্রচলিত ছিল। শস্য উৎপাদন যেন অনেক বেশি হয় সেই উদ্দেশ্যে ইননার পূজা করা হতো। কম্বোডিয়ার লোকপুরাণে ফসলের দেবী হলেন পো ইনো নোগার। মেঘ থেকে জন্ম নেওয়া এই দেবী ফসরের জন্য জন্য উপযোগী মৃদু বারিবর্ষণ করেন। ফসল যেন বেড়ে ওঠে সেটা খেয়ালও রাখেন।
ফসলতোলার উৎসবে মানব সমাজে আবহমান কাল থেকেই ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ এক উৎসব। বাংলার নবান্ন উৎসবের সুপ্রাচীন রীতি, লক্ষ্মীর পাঁচালী, কার্তিকপূজার রীতিনীতির ভিতর লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের সেইসব উপাদান।

Flag Counter


2 Responses

  1. Jewel says:

    Such a nice article !!!! Thanks a lot.

  2. Dr. Subhash Paul says:

    ওম তৎ সৎ।
    সনাতন ধর্মে দুর্গার কোন মেয়ে নাই । লেখককে অারও পড়ার জণ্য অনুরোধ করছি । মানুষকে ভুল বার্তা দিবেন না।
    নমস্কার​।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.