কখনো নেভে না

মাজহারুল ইসলাম | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৬:১৭ অপরাহ্ন

মাছের মুড়োটা কাটতে গিয়ে তর্জনীটা কেটে ফেললেন জাহানারা বেগম। অনেকটা কেটেছে, রক্তারক্তি অবস্থা। মাছের রক্ত আর জাহানারা বেগমের রক্ত মিলেমিশে একাকার। আঙুল যতটা কেটেছে তার চেয়ে বেশি তাঁর চিৎকার চেঁচামেচিতে বাসায় হুলস্থুল পড়ে গেছে। কাজের মেয়ে রহিমা নিজের ওড়না পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে আছে যেন রক্ত পড়া বন্ধ হয়। আকবরের মা এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, ডেটল-তুলা কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। এদিকে জাহানারা বেগম চিৎকার করছেন, আগে তোর খালুজানকে খবর দে। ফোন কর। হাসপাতালে না গেলে রক্ত বন্ধ হবে না। রহিমা উঠে গিয়ে ফোনের ডায়াল ঘোরাচ্ছে। এপাশে রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছে না। এরমধ্যে আকবরের মা এসে বলল, খালাম্মা, ডেটল খুঁইজা পাইলাম না। সেভলন পাইছি।
জাহানারা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন, জিনিস তো একই। সব মূর্খের দল কোথাকার!
আকবরের মা কাটা আঙুলে সেভলন লাগিয়ে দিল।
জাহানারা খুব অল্পতেই হইচই করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেন। নাইনটি নাইন জ্বর হলে মাথায় পানি ঢালা, জলপট্টি দেওয়া, বাড়িতে ডাক্তার ডেকে এনে হুলস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে ফেলা তার জন্য নতুন কোনো বিষয় না। একবার এক শ’ দুই জ্বর হলো তাঁর। প্যারাসিটামল টেবলেট দুইটা একসঙ্গে খাওয়ানো হলো। রহিমা মাথায় পানি দিচ্ছে। আকবরের মা রশুন দিয়ে সরিষার তেল গরম করে পায়ের তলায় মালিশ করছে। খলিকুজ্জামান খাটের একপাশে চুপচাপ বসে আছেন। আধা ঘণ্টা মাথায় পানি দেওয়ার পর থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখা গেল জ্বর কমা তো দূরের কথা বেড়ে এক শ’ তিন হয়ে গেছে। জাহানারার ধারণা তার জ্বর আর কমবে না এবং তিনি মারা যাচ্ছেন। খলিকুজ্জামানের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমি মনে হয় আর বাঁচব না। তুমি মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকে আনো। আমি তওবা পড়ব। অনেক পাপ করেছি। মৃত্যুর আগে তওবা পড়তে চাই। এরপর বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন।
জাহানারা বেগমের কান্না দেখে আকবরের মা ও রহিমাও কান্না শুরু করল। আকবরের মা প্রায় দশ বছর ধরে এ সংসারে আছে। রহিমা সাত বছর। খলিকুজ্জামান পড়ে গেলেন মহা বিপদে। কোনোভাবেই জাহানারাকে বোঝাতে পারছেন না এক শ’ তিন জ্বর এমন কিছু না। ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। জ্বর কমতে একটু সময় লাগবে। রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, খালুজান, খালাম্মারে হাসপাতালে নিয়া যান। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। খলিকুজ্জামানের সঙ্গে রহিমাও গিয়েছিল হাসপাতালে। খলিকুজ্জামান ডাক্তারকে বলেছিলেন, হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। ভীতু মানুষ। বাসায় ম্যানেজ করা কঠিন। ডাক্তার থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখেছিলেন জ্বর একশ’তে নেমে এসেছে। সামান্য জ্বরে এত রাতে বাড়ি থেকে ডেকে আনায় ডাক্তার খানিকটা বিরক্ত। তার উপর হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলায় ডাক্তার খুব অবাক হয়েছিলেন। বলছিলেন, খলিকুজ্জামান সাহেব, ঘাবড়াবেন না, ভাবিকে বাসায় নিয়ে যান। একশ ডিগ্রি জ্বরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছু নাই। রহিমা এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। খালুজানকে ফোন করতে করতে পুরোনো কথা মনে পড়ছিল তার।
রহিমা বলল, খালুজান তো ফোন ধরতাছে না। মনে হয় কোনো মিটিং ফিটিংয়ে আছে।

জাহানারা বলল, কোনো মিটিং নাই। কোথায় আড্ডা মারছে কে জানে! আমি মরে গেলেও তাকে খবর দিয়ে পাওয়া যাবে না।
এরমধ্যে রহিমা বলল, খালাম্মা, আপনের রক্ত পড়া তো বন্ধ হইয়া গেছে। মাছের মাথাটা আমি ধুইয়া দেই। আপনে রান্না শুরু করেন। উপরের ফ্ল্যাটের ভাইয়ারে না দুপুরে মুড়োঘণ্ট পাঠাইবেন কইছিলেন। অফিস থেইকা আহনের তো সময় হইয়া গেল।
জাহানারার এবার হুঁশ ফিরে এল। তাই তো! মনিরের জন্যই তো আজ মুড়োঘণ্ট রান্না করছে সে। মুহূর্তের মধ্যে আঙুল কাটার কথা ভুলে গেলেন। চিৎকার চেঁচামেচি সব দূর হয়ে গেল। রহিমাকে বললেন, তোর খালুরে ফোন করিস না। ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসবে। এই হাত নিয়া রান্না করতে দিবে না। মাথাটা ভালো করে ধুয়ে দে। মুগডাল ধুয়ে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে বলে পান খাওয়ার জন্য নিজের ঘরে গেলেন। এখন জাহানারা বেগমকে দেখে বোঝার উপায় নেই কিছুক্ষণ আগে তার আঙুল কেটেছে। একটা পান মুখে দিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এসে দিব্বি রান্না শুরু করলেন তিনি।

মনিরুল ইসলাম তিন মাস হলো মাধবপুর উপজেলায় বদলি হয়ে এসেছে। যুব উন্নয়ন অফিসার। দেখতে সুদর্শন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে অনার্স-মাস্টার্স করেছে। চার বছর হলো চাকরি করছে। দেশের বাড়ি বরিশাল। ডাকবাংলোয় উঠেছেন। উপজেলা কমপ্লেক্সে তার জন্য বাসা খালি পড়ে আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সেখানেই উঠবেন। একই বিল্ডিংয়ের তিনতলায় খলিকুজ্জামান সাহেব থাকেন আর মনিরের বাসা চারতলায়। খলিকুজ্জামান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। প্রথম দিন দুপুরে তিনি মনিরকে নিয়ে বাসায় খেতে এসেছেন। কথাপ্রসঙ্গে জাহানারা যখন শুনলেন মনির অবিবাহিত, আপ্যায়ন খানিকটা বেড়ে গেল। যাওয়ার সময় জাহানারা বললেন, নিজের বাসায় রান্না শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এখানেই খাবেন।
দ্বিতীয় দিন খেতে এসে মনির বলল, ভাবি আমি আপনার অনেক ছোটো। আমাকে তুমি করে না বললে আমি আর খেতে আসব না। এরপর ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ এবং ‘মনিরুল ইসলাম’ থেকে ডাকনাম ‘মনির’ হয়ে গেল। জাহানারা মনিরের নতুন বাসা গোছগাছ করে দেওয়া থেকে শুরু করে রান্নার লোক ঠিক করে দেওয়া সবই করলেন। ভালো কিছু রান্না হলে হয় মনিরকে ঢেকে আনেন অথবা একবাটি তরকারি তার বাসায় পাঠিয়ে দেন।
নতুন কোনো অবিবাহিত অফিসার এলেই জাহানারা তার খোঁজখবর নিতে থাকেন। নানা কৌশলে প্রথমেই জেনে নেন তার ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ আছে কি না। অর্থাৎ প্রেম ট্রেম করে কি না। যদি এসব কোনো কিছু না থাকে তখন শুরু হয় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির নানা পরিকল্পনা। প্রায়ই দাওয়াত করে খাওয়ান তাকে। একফাঁকে ছবির অ্যালবাম বের করে বোনের ছবি দেখান এবং বোন রেবেকার গুণাগুণ বলতে থাকেন। এছাড়া মাঝে মাঝেই ভালো কোনো খাবার রান্না হলে এক বাটি তরকারি পাঠিয়ে দেন।
বছর দুয়েক আগের কথা। একদিন খলিকুজ্জামান বিলের পাবদা মাছ কিনে এনেছেন আধা কেজি। রান্নার পর জাহানারা বেছে বেছে সবচেয়ে বড় চারটা মাছ পাঠিয়ে দিলেন দোতলায় থাকা তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের জন্য। খলিকুজ্জামান বিরক্ত হয়ে বললেন, একা মানুষ। চারটা মাছ পাঠানোর দরকার ছিল ? আর যাবে কোথায়। কথা মাটিতে পড়ার আগেই জাহানারা বেগমের অগ্নিমূর্তি দেখে খলিকুজ্জামান বেচারার অবস্থা কাহিল।
জাহানারা বললেন, দুই পিস মাছ কারও বাসায় পাঠানো যায় ? আমার বাপের জনমে এই জিনিস দেখি নাই। তোমার পাবদা মাছ আমি ছুঁয়েও দেখব না। সব মাছ তুমি একা খাবে।
খলিকুজ্জামান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন এরমধ্যে জাহানারা বেগম আরও চিৎকার শুরু করলে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তিনি জানেন বাসায় থাকলে জাহানারা বেগমের মাথা আরও উত্তপ্ত হতে থাকবে।
জাহানারার এসব কর্মকা-ে খলিকুজ্জামান মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হন। তিনি বলেন, এত কিছু না করে সরাসরি তোমার বোনের সাথে বিয়ের কথা বললেই পারো। নিজে না পারলে পাঁচতলার ভাবিকে দিয়ে বলাও। কিন্তু জাহানারা বেগম এত তাড়াতাড়ি বলতে রাজি না। তিনি চান ঘনিষ্ঠতা আরেকটু বাড়ুক। তারপর একফাঁকে নিজেই বলবেন।
জাহানারা তাঁর মাকে চিঠিতে লিখেছেন, রেবেকার বিয়ের জন্য একটুও চিন্তা করবে না। আমার এখানে একটা ভালো পাত্র পেয়েছি। উপজেলা শিক্ষা অফিসার। দেখতে শুনতে খুবই ভালো। বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। রিটায়ার করেছেন বছর তিনেক আগে। বড়ভাই সোনালি ব্যাংকের ম্যানেজার। প্রায়ই বাসায় দাওয়াত করে খাওয়াই। রেবেকার ছবিও দেখিয়েছি। বিয়ের কথা অবশ্য এখনো বলি নি। তবে শিগগিরই বলব। মা চিঠির জবাব দিলেন—পাত্র তোমার পছন্দ হয়ে থাকলে বিলম্ব না করে এখনই বলে ফেলো।
এরমধ্যে এক সন্ধ্যায় সেই শিক্ষা অফিসার বিয়ের কার্ড নিয়ে হাজির। বলল, ভাবি, মা পছন্দ করেছে। গত মাসে আমি দেখে এসেছিলাম। বিয়েতে কিন্তু আপনাদের সবাইকে যেতে হবে।
জাহানারা বেগম কার্ডটা হাতে নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না।

এবার আর ভুল করতে রাজি না জাহানারা বেগম। তিন মাসের মধ্যেই খলিকুজ্জামানকে দিয়ে রেবেকার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন মনিরকে। রেবেকার ছবি এবং বায়োডাটা দেখে মনির পছন্দ করেছে। শুধু বলেছে, সামনাসামনি দেখা হলে ভালো হয়। একবার আপনার শ্যালিকাকে নিয়ে আসুন না এখানে। তারও তো আমাকে পছন্দের বিষয় থাকতে পারে। এটুকু শুনে জাহানারা বেগমের খুশি দেখে কে! সঙ্গে সঙ্গে মাকে ফোন করে বললেন, আগামী সপ্তাহেই রকিবুলের সাথে রেবেকাকে পাঠিয়ে দাও। আর রেবেকাকে বলবে কালই যেন কোনো পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল করে আসে।
মা বললেন, আমি এসব বলতে পারব না। ও আমার কথা শুনবে না। তুই ফোন করে বল।
জাহানারা রেবেকাকে ফোন করে নানা পরামর্শ দিতে লাগল। শোন, কালই ভালো একটা পার্লার থেকে ফেসিয়াল করবি। সেইসাথে ভ্রু প্লাকিংটাও করে নিস। এরমধ্যে একদম রোদে যাবি না কিন্তু। মাকে বলিস মাথায় মেন্দি দিয়ে দিতে। দেখবি চুল একদম নরম ও সিল্কি হয়ে যাবে।
রেবেকা বড়বোনের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে বলল, আপা, আমি যেভাবে আছি সেভাবেই যাব। পছন্দ করলে করবে না হলে নাই। সেজেগুজে প্রতিমা সেজে আমি কারও সামনে দাঁড়াতে পারব না। প্লিজ আপা, তুমি এ বিষয়ে আমাকে আর কিছু বোলো না।
জাহানারা রেবেকার কথা শুনে থমকে গেল। কী বলবে বুঝতে পারছে না। রেবেকা ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম। এর আগে একাধিকবার তাকে সেজেগুজে পাত্রপক্ষের সামনে হাজির হতে হয়েছিল। প্রত্যেকবারই তারা পরে জানাবে বলে চলে গেছে। একবার জাহানারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল গুলশান আড়ংয়ে। পাত্রের সঙ্গে তার মা ও বড়বোনও এসেছিল। প্রথম দেখায় ছেলের পছন্দ হয়েছিল। ঘটক জাহানারাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলেছিল, ছেলেমেয়ের সঙ্গে আলাদাভাবে একটু কথা বলতে চায়। রেবেকা জাহানারার জোরাজুরিতে একপর্যায়ে রাজি হয়েছিল। আড়ংয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে ছেলে প্রায় ত্রিশ মিনিট রেবেকার সাথে কথা বলেছিল। চলে যাওয়ার সময় ছেলে ঘটককে কানে কানে বলেছিল মেয়ে তার পছন্দ হয়েছে। আর ছেলের মা বলেছিল বাসায় গিয়ে নিজেরা আলোচনা করে জানাবে। সবাই ধরেই নিয়েছিল এবার বিয়েটা হবেই। রেবেকারও ছেলে পছন্দ হয়েছে। তিন দিন অপেক্ষার পর ঘটক জানাল, পাত্রের মার শ্যামলা মেয়ে পছন্দ না। তিনি আরও ফর্সা সুন্দরী বউ চান। এই ঘটনাটা রেবেকা সহজে ভুলতে পারে না।
রেবেকা জিজ্ঞেস করল, আপা, আমার গায়ের রং যে কালো এটা তুমি বলেছো?
জাহানারা বলল, তুই কালো কোথায় ? উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। এসব নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না। আমি সব বলেছি। তোর ছবি দেখে খুব পছন্দ করেছে। তোকে যা যা করতে বলেছি তুই শুধু সেগুলো করবি। ফোন রাখছি—তোর দুলাভাই অফিস থেকে এসেছে। তাকে খাবার দিতে হবে।
ফোন রেখে জাহানারা চিন্তিত হয়ে গেল। তাই তো! এবিষয়ে কিছুই বলে নি মনিরকে। মনিরও জানতে চায় নি রেবেকার গায়ের রং কী। ছবি দেখে কি আর রং বোঝা যায়! জাহানারাকে চিন্তিত দেখে খলিকুজ্জামান জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে ? তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন ? রেবেকা কি আসতে চাচ্ছে না ?
জাহানারা বললেন, রেবেকার গায়ের রং তো খুব বেশি ফর্সা না। এবিষয়ে মনিরকে বলা দরকার ছিল।
খলিকুজ্জামান বললেন, সবকিছু আগে বলতে হবে কেন ? সামনাসামনি তো দেখবেই। রেবেকা আসছে কবে ?
আগামী সোমবার। তুমি হাত মুখ ধুয়ে খেতে আসো।
খলিকুজ্জামান আর কোনো কথা না বলে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলেন। রেবেকার কথাটা বারবার জাহানারা বেগমের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রেবেকার ধারণা গায়ের রং কালো হওয়ায় ওর বিয়ে হচ্ছে না।

সোমবার রাত সাড়ে দশটায় রেবেকা ছোটভাই রকিবুলকে নিয়ে চলে এসেছে। রকিবুল সকালে চলে যাবে। ওর কী সব ঝামেলা আছে। রেবেকা বলল, আপা, তুমি আবার ওকে আটকাতে যেও না। পরে ও আমার সাথে রাগারাগি করবে।
খাওয়ার টেবিলে জাহানারা বললেন, আগামীকাল রাতে মনিরকে দাওয়াত করা হয়েছে। রেবেকা শুনে বলল, এত তাড়া কিসের? আজই তো মাত্র এলাম। দুই একদিন যাক না আপা, আমি তো আছি।
জাহানারা বললেন, মনিরের মার শরীরটা নাকি ভালো না। বয়স হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে ওকে বাড়ি যেতে হতে পারে। তাই কালই আসতে বলেছি। মনির দেখতে একেবারে রাজপুত্রের মতো। দেখবি তোর পছন্দ হবে।
রেবেকা বলল, আপা, আমি তো আর রাজকন্যা না। তোমার পীড়াপীড়িতে এসেছি। দেখবে আগের দুবারের মতোই হবে।
জাহানারা এসব কথার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তার মনের মধ্যে শংকা কাজ করছে, সত্যি যদি রেবেকাকে মনির পছন্দ না করে ? কী কষ্টটাই না তার বোন পাবে! আড়ংয়ের ঘটনার পর রেবেকা বলেছিল, আমাকে এভাবে আর কোরবানির গরু-ছাগলের মতো হাটে তুলো না।
জাহানারা হাসতে হাসতে বলেছিলেন, একটা প্রেম করতে পারলি না ? বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বছর পড়লি অথচ নিজে একটা ছেলে পছন্দ করতে পারলি না। তাহলে তো আজকে আমাদের আর এত কষ্ট করতে হতো না।
জাহানারার এ কথায় রেবেকা সেদিন অসম্ভব মন খারাপ করেছিল। বলেছিল, তোমাদের কাউকে আমার জন্য কষ্ট করতে হবে না। তুমি যেটা পেরেছো সেটা সবাই যে পারবে তার কোনো কথা নাই। সবাই তোমার মতো নাও হতে পারে। এরপর রেবেকা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি করেছে। প্রায় এক মাস সে জাহানারার সঙ্গে কথা বলে নি। এবার অনেক কষ্টে রেবেকাকে রাজি করিয়েছে জাহানারা।
চার ভাইবোনের মধ্যে রেবেকা তৃতীয়। জাহানারা সবার বড়। মেজভাই দুবাইতে একটা সফটওয়ার ফার্মে চাকুরি করে। প্রতিমাসে মার জন্য টাকা পাঠায়। বাবা মারা গেছেন সাত বছর আগে। রেবেকা এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে তাদের মা মালিবাগে তিন কাঠার উপর একটা একতলা পুরোনো বাড়িতে থাকেন। রেবেকার বাবা গ্রামের জমি বিক্রি করে এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা ধার নিয়ে পাকিস্তান আমলে অনেক কষ্টে এই বাড়ি করেছিলেন।
খলিকুজ্জামান অনেকবার শাশুড়িকে বলেছেন বাড়িটা ডেভেলপারকে দিলে কমপক্ষে চারটা অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যাবে। সেইসঙ্গে সাইনিং মানি হিসাবে নগদ কিছু টাকাও হাতে আসবে। জাহানারা এবং অন্য ভাইবোনরা সবাই রাজি। কিন্তু তাদের মা আয়েশা বেগম রাজি না। তাঁর কথা হলো এই বাড়ির প্রতিটা ইটের সঙ্গে তাঁর স্বামীর স্মৃতি জড়িত। এই বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করতে চান। তাঁর ইচ্ছা এই বাড়ি থেকে তার লাশ বের হবে। তারপর ছেলেমেয়েরা যা ভালো মনে করে করবে। এখন তার একটাই চিন্তা, রেবেকার ভালো একটা বিয়ে দিয়ে যাওয়া।
সকাল থেকে জাহানারা বেগম রান্নাঘরে। সন্ধ্যায় মনির আসবে রেবেকাকে দেখতে। রাতে সে এখানে খাবে। রেবেকা রান্নাঘরে এসেছিল বোনকে সহযোগিতা করতে, কিন্তু জাহানারা তাকে ধমক দিয়ে রান্নাঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। বলেছেন, গরমের মধ্যে তোকে রান্নাঘরে থাকতে হবে না। রেবেকা কোনো কথা না বলে চলে এসেছে। কারণ সে জানে তার বোন কোনোভাবেই তাকে আজ কাজ করতে দেবে না।
বিকেল থেকে রেবেকাকে সময় দিতে হবে। তাই দুপুরের মধ্যে রান্নার ঝামেলা শেষ করতে চান জাহানারা। সন্ধ্যায় রেবেকা শাড়ি পরবে না সালোয়ার কামিজ, এখনো তা ঠিক হয় নি। জাহানারার ইচ্ছা রেবেকা শাড়ি পরুক। শাড়িতে ওকে অনেক সুন্দর লাগে। সকালে নাস্তার টেবিলে এবিষয়ে একবার কথা হয়েছে। রেবেকা চায় সালোয়ার কামিজ পরতে। জাহানারা তখন আর কথা বাড়ান নি। তিনি ভেবে রেখেছেন বিকেলে আরেকবার রেবেকাকে বুঝিয়ে বলবেন। না মানলে ওর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
মনিরের পছন্দের ঝাল খাসির মাংস, মুরগির কোরমা, ধনে পাতা দিয়ে কই মাছের ঝোল রান্না করছেন জাহানারা। রেবেকা পছন্দ করে তার হাতের পটলের দোলমা। ছোটবোনের পছন্দের দোলমাও তার মেন্যুতে আছে। চিংড়িমাছের দোপেঁয়াজা করতে চেয়েছিলেন। খলিকুজ্জামান বলেছেন বাজারে ভালো চিংড়ি পান নি। যদিও জাহানারার ধারণা খলিকুজ্জামান মিথ্যা বলেছেন। একগাদা রান্না খলিকুজ্জামানের পছন্দ না। তিনি মনে করেন বেশি আইটেম থাকলে আরাম করে কোনোটাই খাওয়া যায় না। কিন্তু একথাগুলো জাহানারাকে বলার সাহস খলিকুজ্জামানের নাই। তিনি জানেন এগুলো বললে জাহানারা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলবে।

মনির এল রাত আটটায়। রেবেকা শেষ পর্যন্ত বোনের কথায় হালকা নীল রঙের শিফন শাড়ি পরেছে। কপালে ছোট একটা নীল টিপ দিয়েছে। শাড়িটা জাহানারার। দুই মাস আগে খলিকুজ্জামান দিল্লি গিয়েছিলেন একটা সেমিনারে অংশ নিতে। তখন জাহানারার জন্য এই শাড়িটা এনেছেন। রেবেকা চুল খোলা রেখেছে। তবে চুলের একটা অংশ ডান দিক দিয়ে সামনে বুকের ওপর রাখা। ঠোঁটে ন্যাচারাল কালারের লিপস্টিক লাগিয়েছে। জাহানারা মুখে ফেস পাউডার লাগাতে বলেছিলেন, রেবেকাকে রাজি হয় নি। সে সিম্পল থাকতে চায়। তারপরও রেবেকাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। মনির মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পরেছে। খাবার টেবিলে খলিকুজ্জামান রেবেকার সঙ্গে মনিরের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
মনির বলল, আপনার বোন তো মজার সব খাবার খাইয়ে আমার অভ্যাস নষ্ট করে দিয়েছে। এখন তো ভাবির রান্না ছাড়া আমি খেতেই পারি না।
রেবেকা কোনো উত্তর দিল না। জাহানারা বলল, সবকিছুতেই তোমার বাড়িয়ে বলার অভ্যাস। এমন কী-ইবা তোমাকে খাইয়েছি! আরেকটা কই মাছ নাও তো। বলেই মনিরের প্লেটে একটা কই মাছ জোর করে তুলে দিলেন।
রেবেকা তেমন কিছুই খাচ্ছে না। প্লেটে খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। জাহানারা এবার রেবেকাকে একটা মাছ তুলে দিতে গেলে সে প্লেট সরিয়ে নিল। বলল, আপা, তুমি জোর কোরো না তো ? আমার মতো খেতে দাও।
জাহানারা বললেন, রেবেকাও কিন্তু খুব ভালো রান্না করে।
রেবেকা বিরক্ত হয়ে বোনের দিকে তাকাল। কারণ রান্নার বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই। যার আগ্রহ নাই সে ভালো রান্না করবে কীভাবে ? এভাবে মিথ্যা বলাটা তার একদম পছন্দ হলো না।
মনির বলল, তাই নাকি ?
খাবার পর্ব শেষ হলে বসার ঘরে মনির ও রেবেকাকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে খলিকুজ্জামান বাইরে গেলেন সিগারেট খেতে।
রেবেকা চুপচাপ বসে আছে। মনির কথা শুরু করল, আপনি এত বিষয় বাদ দিয়ে বাংলায় অনার্স পড়লেন কেন ?
রেবেকা বলল, আপনি যে কারণে সমাজকল্যাণে পড়েছেন।
মনির জোরে হেসে উঠল। তারপর বলল, আপনি যে অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারেন এ কথা কি কেউ আপনাকে বলেছে ?
রেবেকা বলল, আমি এমন কোনো সুন্দর কথা বলি নি। আপনি একটু বাড়িয়ে বলছেন।
মনির বলল, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না।
এই প্রথম রেবেকা মনিরের দিকে তাকাল। মনিরও রেবেকার দিকে তাকিয়ে আছে। মনির প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, আপনি অনেক সৌভাগ্যবান। অসম্ভব ভালো একজন বোন পেয়েছেন।
রেবেকা এ কথার কোনো উত্তর দিল না। আরও কিছুক্ষণ তারা দু’জন কথা বলল। একপর্যায়ে মনির উঠে দাঁড়াল চলে যাওয়ার জন্য। রেবেকা ভেতরে চলে গেল। মনির যাওয়ার সময় খলিকুজ্জামানকে বলল, আপনার শ্যালিকা অনেক বুদ্ধিমতী। আমার পছন্দ হয়েছে। কাল এবিষয়ে আপনার সাথে কথা বলব।
খবরটা শোনার পর থেকে জাহানারার খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করছে। রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। একটু পর মাকে ফোন করে বললেন, মা আলহামদুলিল্লাহ বলো। মনির রেবেকাকে পছন্দ করেছে।
খবরটা শুনে আয়েশা বেগমও খুশিতে কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, আলহামদুলিল্লাহ মা। কতদিন ধরে তুই ওর বিয়ের চেষ্টা করছিস। জামাইকে বল ছেলের একটু খোঁজখবর নিতে। বিয়ে শাদিতে একটু খোঁজখবর করতে হয়।
জাহানারা বলল, কী যে বলো না মা। তোমার জামাই কি আর খোঁজখবর না নিয়ে ছাড়বে! তুমি এসব নিয়ে একদম চিন্তা কোরো না। সময়মতো তোমাকে সব জানাব।
রাতে ঘুমানোর আগে জাহানারা খলিকুজ্জামানকে বললেন, তুমি কালই মনিরের সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে ফেলো। আর মা বলছিলেন ছেলের একটু খোঁজখবর নিতে।
খলিকুজ্জামান বললেন, সেটা কি আর আমাকে বলতে হবে! আমার কাজ আমি করছি। এসব নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। এবার লাইট নিভিয়ে ঘুমাতে আসো।
খলিকুজ্জামান মুহূর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন। বিছানায় শরীর ছোঁয়াতে না-ছোঁয়াতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর ঘুম। জাহানারা ভেবে পান না—একটা মানুষ কী করে এত দ্রুত ঘুমিয়ে যেতে পারে! জাহানারার ঘুম আসছে না। মাথায় রাজ্যের চিন্তা ঘুরছে। এর মধ্যে তার নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ে গেল।

জাহানারা সকাল আটটায় এক কাপড়ে বেরিয়ে কমলাপুর স্টেশনে অপেক্ষা করছেন খলিকুজ্জামানের জন্য। আগের দিন ঠিক হয়েছে তারা পালিয়ে বান্দরবান চলে যাবেন এবং সেখানে বিয়ে করবেন। বান্দরবান বেছে নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো সহজে কেউ যেন তাদের খুঁজে না পায়। জাহানারার অমতে তার বাবা এক ডাক্তার ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। বাবা একরোখা মানুষ। একবার যা বলবেন সেটা তিনি করেই ছাড়বেন। তিন দিন পর আকদ হবে এবং ডিসেম্বর মাসে বিয়ে। কাজেই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। জাহানারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে পড়ার টেবিলে একটা চিরকুট লিখে রেখে এসেছেন যেন মা অস্থির না হয়ে যান। চিরকুটে লিখেছেন, ‘তোমাদের পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করা সম্ভব না বলে খলিকুজ্জামানের হাত ধরে বেরিয়ে গেলাম। তুমি তো জানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই খলিকুজ্জামানের সাথে আমার সম্পর্কের কথা। বাবাকে বোলো খুব বেশি হইচই না করতে। আমাকে ক্ষমা করো দিও।’
স্টেশনে অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন জাহানারা। মাত্র ১০ মিনিট বাকি আছে ট্রেন ছাড়ার অথচ খলিকুজ্জামানের কোনো খবর নাই। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। ট্রেনের আসার সময় যতই কমে আসছে প্লাটফর্মে মানুষের সংখ্যা ততই বাড়ছে। গতকাল রাতে যেভাবে কথা হয়েছে, যেখানে অপেক্ষা করার কথা, তিনি তো সেখানেই আছেন। কিন্তু খলিকুজ্জামান আসছে না কেন ? জাহানারার অস্থির লাগছে। মানুষে ভর্তি হয়ে গেছে প্লাটফর্ম। লাল পাগড়ি মাথায় কুলিরা বাক্স পেটরা নিয়ে ট্রেনে ওঠার জন্য প্রস্তুত। আবার এদিক ওদিক তাকিয়ে খলিকুজ্জামানকে খোঁজ করছে। এর মধ্যে স্টেশনে ট্রেন আসার আগমনী শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট শব্দ করে ট্রেন এসে থামল প্লাটফর্মে। খলিকুজ্জামান এত বড় প্রতারণা করল তার সঙ্গে! রাগে অপমানে জাহানারার কান্না এসে গেল। মা’কে লিখে আসা চিঠি নিশ্চয়ই এতক্ষণে সবাই পড়ে ফেলেছে। না জানি বাড়িতে কী তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে। এ অবস্থায় বাড়ি ফিরে যাওয়াও সম্ভব না। যাত্রীদের ওঠা-নামা শেষ হয়ে এলে ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে পরবর্তী গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে। জাহানারার একবার ইচ্ছা হলো দৌড়ে কোনো একটা কামরায় উঠে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে খলিকুজ্জামানকে একটা শিক্ষা দিতে। কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে আউটার সিগনালে চলে গেছে।
জাহানারার মাথাটা নাগরদোলার মতো ঘুরতে লাগল। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। এরমধ্যে কে যেন পেছন দিক থেকে ঝাপটে ধরে বলল, আমি এসে গেছি।
জাহানারার চোখ দিয়ে বৃষ্টির মতো পানি গড়িয়ে পড়ছে। খলিকুজ্জামান বললেন, তুমি কাঁদছো কেন ?
জাহানারা বললেন, কাঁদব না ? এভাবে কেউ টেনশনে রাখে ? বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা একটা মেয়ের একা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতে কেমন লাগে সেটা তুমি বুঝবে কীভাবে ? তা ছাড়া ট্রেন চলে গেল। এখন কী হবে ?
খলিকুজ্জামান বললেন, আমি অনেকক্ষণ আগেই এসেছি। দূর থেকে দেখছিলাম তুমি কী করো।
জাহানারা রেগে গেলেন। আমি টেনশনে মারা যাচ্ছি আর তুমি দূর থেকে দেখে মজা পাচ্ছ ? এটা মজা করার বিষয় হলো ? এখন কী করবে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নাও। যে-কোনো মুহূর্তে বাবা স্টেশনে লোক পাঠাতে পারে।
খলিকুজ্জামান বললেন, স্টেশনের বাইরে রেন্ট-এ-কার থেকে ভাড়া করা গাড়ি অপেক্ষা করছে। আমরা সেই গাড়িতে সোজা কুমিল্লা আমাদের বাড়িতে চলে যাব। মাকে চিঠিতে সব লিখেছিলাম। মা ফিরতি চিঠি দিয়েছেন। কাল পেয়েছি সে চিঠি। মা লিখেছেন, কোথাও পালাতে হবে না। বিয়ে করে সোজা বউ নিয়ে বাড়িতে আসবি। তোর বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার।
জাহানারা বললেন, এত বড় একটা খবর কাল রাতে বললে না কেন?
খলিকুজ্জামান বললেন, সব প্রশ্নের উত্তর পরে দেব। এখন গাড়িতে চলো। প্রথমেই যাব বাসাবো কাজি অফিসে। ওখানে জহির ও মামুনকে আসতে বলেছি।
জাহানারা বললেন, ওদের আবার ডেকেছো কেন?
খলিকুজ্জামান বললেন, দুটা কারণে ওদের ডেকেছি। এক. বিয়ে করতে দুজন সাক্ষী লাগে। দুই. ওরা দু’জনেই আমাদের ভালো বন্ধু। আমাদের বিয়েতে থাকবে না তা কি হয়!
তারপর কাজি অফিস, বিয়ে এবং কুমিল্লায় যাওয়া। মা খলিকুজ্জামানের কান ধরে বলেছিলেন, একটা শাড়ি কিনে দেওয়ার মুরোদ নাই অথচ বিয়ে করে ফেলেছিস। শাড়ি ছাড়া বিয়ে হয় ? সন্ধ্যায় খলিকুজ্জামানের বাবা বাজার থেকে লাল শাড়ি কিনে আনলেন। শাশুড়ি নিজে জাহানারাকে শাড়ি পরিয়ে দিলেন। খলিকুজ্জামান বলছিল লাল শাড়িতে জাহানারাকে নাকি খুব সুন্দর লাগছিল। শ্বশুরের ইচ্ছায় গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে ধর্মীয় কায়দায় আবার বিয়ে পড়ানো হলো।
বিয়ের রাতে নাকি ঘুমাতে নাই। জাহানারা বহু কষ্টে সারা রাত জাগিয়ে রাখলেন খলিকুজ্জামানকে। রাজ্যির গল্প বললেন জাহানারা। খলিকুজ্জামান শ্রোতা। মাঝে মাঝে মা আর ছোটবোন রেবেকার কথা খুব মনে হচ্ছিল। জাহানারাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায় রেবেকা। আজ নিশ্চয়ই একা ঘুমাতে ওর কষ্ট হচ্ছে।

রেবেকা তার রুমে শুয়ে বই পড়ছে। জাহানারা রান্না শেষে গোসল করে মাত্র জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে হন্তদন্ত হয়ে খলিকুজ্জামান ঘরে ঢুকেই বললেন, তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা আছে।
জাহানারা ভ্রু কুঁচকে বললেন, কী জরুরি কথা ?
খলিকুজ্জামান বলল, খাটে এসে বসো। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
জাহানারা বললেন, ন্যাকামো বাদ দিয়ে সরাসরি বলো কী হয়েছে। দেখছো তো আমি নামাজে দাঁড়িয়েছি।
খলিকুজ্জামান বললেন, মনিরের সাথে রেবেকার এ বিয়ে হবে না।
জাহানারার মাথাটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি বিছানায় বসে পড়লেন। তারপর বললেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? কী বলছো এসব ? কী হয়েছে যে বিয়ে হবে না ?
খলিকুজ্জামান বললেন, দুলাভাই হিসাবে আমার তো একটা দায়িত্ব আছে। কোন খোঁজখবর না নিয়ে আমি রেবেকার বিয়েতে রাজি হয়ে যাব তুমি কীভাবে ভাবলে ? মনিরের গ্রামের বাড়িতে লোক পাঠিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ আগে আমাকে ফোন করে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় মনিরের বাবা ছিল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। তার বড়ভাই ছিল রাজাকার। তাদের বাড়িটি ছিল পাক বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এই বাড়িতে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামের যুবতী মেয়েদের ধরে এনে পাক সেনারা সম্ভ্রমহানি করেছে। অমানুষিক নির্যাতন করেছে। এসব কাজে মনিরের বাবা এবং বড়ভাই সহযোগিতা করেছে। স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। মনিরের বাবা মারা গেছে বছর দশেক আগে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। এলাকার সবাই এ বাড়িটিকে রাজাকারের বাড়ি হিসাবে চেনে। এরকম একটা ছেলের সাথে আমার শ্যালিকার বিয়ে হতে পারে না।
জাহানারা প্রচ- রেগে গেলেন। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বাবা ভাই রাজাকার ছিল তাতে কী হয়েছে ? মনির তো আর রাজাকার না। এখন ওর বয়স ত্রিশ। তার মানে একাত্তর সালে বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। তার তো কোনো দোষ নাই। তা ছাড়া এত দূর পর্যন্ত আগানোর পর এখন পেছানোর কোনো সুযোগ নাই। রেবেকার কথা একবার ভেবে দেখেছো ? বিয়েটা ভেঙে গেলে মেয়েটার মানসিক অবস্থা কী হবে ? তুমি এটা নিয়ে আর কোনো কথা বলবে না। রেবেকা যেন এ বিষয়ে কিছুই না জানে।
খলিকুজ্জামান বললেন, জাহানারা, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? সবকিছু জেনে এরকম একটা ছেলের সাথে আমরা রেবেকার বিয়ে দেব ? তুমি ভালো করেই জানো আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। আর আমার শ্যালিকার বিয়ে হবে একজন কুখ্যাত রাজাকারের ছেলের সাথে ? ভাইয়ের সাথে ? পত্রিকায় দেখো নি শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি হয়েছে। শিগগির যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হবে।
জাহানারা এবার আরও রেগে গেলেন। বললেন, আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাই না। এতদিন পর রেবেকার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করেছে। কাজেই এ বিয়ে হবে।
খলিকুজ্জামান সহজে রাগ করেন না। এই প্রথম তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। রাগে তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। খলিকুজ্জামানের এই চেহারা জাহানারা আগে কখনো দেখেন নি। খলিকুজ্জামান চিৎকার করে বললেন, তোমার যা খুশি করো। আমি এর মধ্যে নাই। এরপর দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
জাহানারা হতভম্ব হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। রেবেকা কখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তিনি খেয়াল করেন নি।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rofiqul Islam — সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮ @ ৫:০০ অপরাহ্ন

      অসাধারণ অনুভূতি নিয়ে গল্পটা শেষ করলাম..ভালো লেগেছে রাজাকারের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর দেশের প্রতি মমত্ববোধ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাহুল — সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮ @ ৫:০৯ অপরাহ্ন

      খুবই ভালো গল্প! পড়ে খুবই ভালো লাগলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহমুদ হাফিজ — সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ @ ১০:২৮ অপরাহ্ন

      অসাধারণ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জামাল উদ্দিন — সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ @ ১০:৩৯ অপরাহ্ন

      একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ কখনো অতীত হতে পারে না। বর্তমান সময়ে আমাদের পারষ্পরিক সম্পর্ক যা-ই হোক বা যে ভাবে হোক আমরা বেচে-বর্তে আছি, তা মানিয়ে নিয়ে কী ভাবে একাত্তরকে অস্বীকার করি? এই প্রশ্নটিকে বড় করে –দেখেছেন মাজহারুল ইসলাম ‘কখনো নেভে না’ গল্পে। এই গল্পের ইতি নেই, প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে অনুভব করি -মাজহারুল ইসলাম নিজের রক্তকনিকায় ধারণ করেছেন একাত্তরের উত্তাপ। মুক্তিযোদ্ধা খালিকুজ্জামান তার প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারার ছোটবোন রেবেকার সাথে রাজাকার বংশোদ্ভূত মনিরের প্রেম-ভালোবাসা -বিয়ে মানতে পারেন না। খলিকুজ্জামানের চিতকার ‘তোমার যা কিছু খুশী করো। আমি এর মধ্যে নেই।’ – এ ভাবেই আজ যার যা খুশি তা-ই হচ্ছে রাস্ট্রে ও সমাজে এবং একাত্তর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। আমি একজন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক হিসেবে মাজহারুল ইসলামের সাথে একমত -এ ভাবে চলতে পারে না। তাই কোন ভাবেই একাত্তর অতীত নয়—- ঘটমান বাস্তব বর্তমান।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com