কবিতা

সাইয়েদ জামিলের কবিতা

সাইয়েদ জামিল | 13 Sep , 2018  


চিত্রশিল্পী রনি আহম্মেদের রেখাচিত্র

বেদখল রবীন্দ্রনাথ

কাদম্বরী, তোমার রবীন্দ্রনাথ বেদখল হ’য়ে গেছে
তুমি যাঁকে স্নেহ দিয়ে, প্রেম দিয়ে,
বড়ো করেছিলে, সেই বালক রবীন্দ্রনাথ
তুমি যাঁকে সঁপে দিয়ে তোমার যৌবন,
পুরুষ করেছিলে, সেই যুবক রবীন্দ্রনাথ
সেই হার্ডকোর রকার আজ বেদখল

কাদম্বরী, দুঃখ হয়, তুমি যাঁকে
তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলে
নিজেকে নিঃশেষ ক’রে, সেই তোমার
রবীন্দ্রনাথ আজ কতিপয় ব্যাকডেটেড
অধ্যাপকের মগজ-বন্দী,
য্যানো তাঁরা ইজারা নিয়েছে

এবং আরও অনেক ভণ্ড মিলে গড়েছে
রবীন্দ্র গবেষণা পরিষদ,
গড়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী পরিষদ
এইসব নপুংসকের দল সারাদিন সারারাত
কেবলই ‘রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ’ জপ করতে করতে
সারাদেশ রবীন্দ্রনাথময় ক’রে তুলছে

কাদম্বরী, বিশ্বাস করো,
রবীন্দ্রনাথ এখন এক শব্দ দূষণ

এখন আমরা ঘুমোতে গেলে রবীন্দ্রনাথ,
এখন আমাদের ঘুম ভাঙলে রবীন্দ্রনাথ,
এখন আমাদের রাস্তার নাম রবীন্দ্রনাথ,
এখন আমাদের ইউনিভার্সিটির নাম রবীন্দ্রনাথ,
এখন এমনকি আমাদের পাবলিক টয়লেটের নামও রবীন্দ্রনাথ

এখন আমাদের সঙ্গমের ভেতর রবীন্দ্রনাথ,
এখন আমাদের থুথুর ভেতর রবীন্দ্রনাথ,
এখন আমাদের প্রস্রাবের ভেতর রবীন্দ্রনাথ,
এখন এমনকি আমাদের আকাশের বাতাসের ভেতরও রবীন্দ্রনাথ

কাদম্বরী, বিশ্বাস করো,
রবীন্দ্রনাথ এখন এক সাংস্কৃতিক ভাগার
এই দুর্গন্ধের ভাগারে এখন আমরা,
বাংলাদেশিরা, ছটফট করছি

কাদম্বরী, বলো, চুপ ক’রে থেকো না হে মাতৃসম
প্রেমিকা আমার,
বলো, কে আমাদের আশা দেবে?
বলো, কে আমাদের ভাষা দেবে?
বলো, কে আমাদের ভরসা দেবে?

না,
তুমি আত্মহত্যা করতে পারো না
এইভাবে,
রাবীন্দ্রক বিপর্যয়ের ভেতর আমাদের ঠেলে দিয়ে,
পালাতে পারো না তুমি,

কাদম্বরী,
আত্মহত্যাই কি সমাধান?
না-কি তুমি বুঝতে পেরেছিলে আখেরে
এইসব ঘটতে পারে?
এইসব রাবীন্দ্রিক পাইক-পেয়াদা, দ্যাখো,
ঠাকুর বাড়ির সব প্রতিভাকে কবর দিয়েছে,
য্যানো এক ভানু ছাড়া ও-বাড়িতে আর কেউ
জন্মলয় নাই
এবং তুমিও তো অচ্ছুৎ, কাদম্বরী,
তোমার জন্য আজ এইসব বরকন্দাজ
বড়ো বিব্রত,
আর তাই অবিরাম ঢাকবার প্রয়াস তোমাকে,
য্যানো তুমি কেউ নও রবীন্দ্রনাথের,

এইসব মিথ্যার বেসাতি,
এইসব জঘন্য অনাচার,
এইসব সর্বনাশা-অবহেলা দেখেও
নিশ্চুপ নিথর-নীরব কী ক’রে থাকো?

কাদম্বরী, ওঠো
মৃত্যুর ভেতর থেকে তোমাকে উঠে আসতে হবে,
তোমাকে উঠে আসতে হবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
শয্যা থেকে
এবং
তোমার স্নেহপ্রেমে জন্ম দিতে হবে
নয়া রবীন্দ্রনাথকে
চুম্বন দিয়ে জাগিয়ে দিতে হবে পৌরুষদীপ্ত
আরেক রবীন্দ্রনাথকে
যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ হবে আমাদের হৃদয়ের সারথি
যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ হবে আমাদের সংস্কৃতির
অবিচ্ছেদ্য অংশ
যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ হবে পুরোনো
রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ
এবং যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ প্রতিহত করবে
জোড়াসাঁকোর জরাজীর্ণ রবীন্দ্রনাথকে
এবং যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ জুতোর তলায় পিষে মারবে
পুরোনো রবীন্দ্রনাথকে
এবং যেই নয়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাশে ঘেঁষতে দেবে না
পুরোনো রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পূর্বোক্ত দালালদের

হাবলাচোদা

হাবলাচোদা মানুষে দেশ
বোঝাই হ’য়ে আছে।

এতো এতো হাবলাচোদা ডিঙিয়ে কই যাবো?

ভেবেছিলাম ভারতে চ’লে যাবো।

নেট সার্চ কইরা দেখি
সেখানে ১২০ কোটি হাবলাচোদা

আমেরিকা, তোমার পোঁদের
মধ্যে আমি পারমাণবিক ঢুকিয়ে দেবো

হ্যা। দেশটা ভুটান।
নিরীহচোদা মানুষের দেশ।
দেশটার প্রেসিডেন্ট এমনই এক হোতকা লোক
যাঁর নাম বিশ্ব রাজনীতিতে চিরটাকালই অনুচ্চারিত।
হ্যা, এই অনুচ্চারিত হোতকা প্রেসিডেন্টের দেশেই ঘটবে
এক মহাবিস্ফোরণ। হঠাৎ-ই, শোনা যাবে একদিন,
থিম্পু থেকে পঁচাত্তর কিলোমিটার দূরে পুনাখায় আবিস্কৃত
হয়েছে ইউরেনিয়ামের খনি। মুহূর্তেই খবর হ’য়ে যাবে
আমেরিকা থেকে রাশিয়া,
রাশিয়া থেকে চীন-ভারত-বৃটেন-জার্মানি,
তুরস্ক থেকে ফ্রান্স সকলেই জড়ো হবে থিম্পুতে।
আসবে বিশ্ব মিডিয়ার একপাল কুকুর। ঘেউ ঘেউ থেমে যাবে
ডিনারের আগে। ঠিক তখন, আমেরিকা, তোমার পোঁদের
মধ্যে আমি পারমাণবিক ঢুকিয়ে দেবো। প্রচণ্ড শব্দে
বিস্ফোরিত হবে তুমি। তোমার আর ডিনার করা হবে না

লুপ্ত স্মৃতি

দুধ খেয়েছি, দুধ খেয়েছি, একটি গোপন
দিন— মাথার ভেতর লুপ্ত স্মৃতি করতেছে
চিন্ চিন্। চিন্ চিন্ চিন্ স্মৃতির পাতা
যে-ই খুলেছি আজ, মগবাজারের ঘরে তুমি
খুললে দেহের ভাঁজ। দেহের ভাঁজে সাপের ফণা,
পাচ্ছি ভীষণ ভয়— বেদেনী রূপ ধ’রে তুমি
দিলেও বরাভয়। খাও নি কিছু! দুধটুকু খাও,
বলেই দিলে দুধ; ঢক ঢক ঢক তরল সুধা
খেয়েই আমি বুঁদ! হঠাৎ তুমি জাগিয়ে দিলে
বললে, নাগর! ওঠো, দাবড়ে নিয়ে তাগড়া ঘোড়া
সাত মহাদেশ ছোটো। ছুটতে ছুটতে যেথায় তুমি
গুপ্ত গুহা পাবে, আনন্দধাম সেথায় জেনো
তাবুয়া খাট্টাবে। আনন্দধাম আনন্দধাম
গর্জে উঠি শের, ছুটতে ছুটতে টের পেয়ে যাই
দুধ খেয়েছি ঢের।

ক্রমশ ফ্রেম আউট

দূর সমুদ্রের পাড়ে ব’সে আছো তুমি। জলের গোপন গন্ধ তোমাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে পুরুষ ও প্রেমের মুখরতা। জারুল, তুমি ক্যানো ঝ’রে পড়বার অভিপ্রায়ে ফুটে ওঠো বেগুনি রঙের কমনীয়তায়?—
আকাশে, ঘোড়ার পিঠে ধাবমান মিশ্রকলায় যে রঙের চাতুর্য, তাকে তুমি পৃথিবী বলো। আর, এই যে ভূগোল, এইখানে, বেদনা-বেদির ওপর, প্রশস্ত নিতম্ব রেখে, গভীর সমুদ্রের দিকে, ক্রমশ যে জাহাজকে তুমি চলে যেতে দ্যাখো, তার ক্যাপ্টেন দু-একটা তিমির দ্যাখা পাক এই অবভাষ্যের ভেতর উড়ে যাচ্ছে প্রাচীন পাখিরা। য্যানো তারা মুদ্রিত বেদনার আভা। আভার তরল থেকে চুঁয়ে পড়া বৈভব তবে কি পুরুষ? হৃদয়ে ধারণ ক’রে আছে যারা লুপ্ত সমুদ্রের জল ও জলের গভীরতা?

আন্টির সাথে ক্লাইমেক্স

‘ছাদে গিয়ে পৃথিবী দেখবে, চলো।’ বললো,
তিন তলার আন্টি। আমি শান্তি কুটিরের ছয়
তলায় থাকি। বললাম, ‘অ্যাঁ! পৃথিবী!’ পানির
টাঙ্কির পেছনে দাঁড়িয়ে খা খা রোদ্দুর ও নির্জনতা
ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। আন্টি শরীর
দেখিয়ে বলে, ‘দ্যাখ্ বান্দর!’ আমি দেখি একটা
ডাবল ডেকার বাস আমাকে থেতলে যায়।

সাইয়েদ জামিল সম্পর্কে যে যা বললো

হিন্দু বললো, হারামজাদাটা ইসলামি মৌলবাদী
মুসলমান বললো, শুয়োরের বাচ্চাটা নাস্তিক
তসলিমা বললো, ছেলেটা ভয়ঙ্কর নারী বিদ্বেষী
প্রগতিশীল বললো, ও প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রেতাত্মা
গাধাচোদা বললো, শুনেছি উনি অশ্লীল কবি
এইসব শুনতে শুনতে,
সাইয়েদ জামিল কুকুরের দিকে তাকালেন। কুকুর বললো,
আমরা ধর্ম, নারীবাদ এবং শাহবাগিদের বিশ্বাস করি না
সাইয়েদ জামিল গাছের দিকে তাকালেন। গাছ বললো,
কবি, আমরা আপনাকে ছায়া দেবো, ফল দেবো

অসুখ

অসুখ হ’লে আমার ঠোঁট কালো আর শুকনো হয়া যায়। লিঙ্গ পোতায়া যায়। শরীরে বল পাই না। তখন আমি মৃতের মতো বিছানায় প’ড়ে থাকি। তখন আমার বউ আমাকে ঔষুধ খাওয়ায়, লেবুর শরবত ক’রে দেয়। আমি সুস্থ হ’য়ে উঠি। এবং সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় আমার ঠোঁট লাল আর সতেজ হয়। পোতানো লিঙ্গে ফিরে আসে জোর

হিমঋতু

এই সেই হিমঋতু।
অনেক শাদা ও শূন্যতার ভেতর
আমি কাঁপছি,

আমি বর্বরের মতো প’রে আছি হলুদ পোশাক।
দূরে একটা বাড়ি। অনেক জারুল গাছ,
একটা ছোটো নদী

মায়া ও মুগ্ধতার সাঁকো পার হ’য়ে
চ’লে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে
একটু আগুন দেবে, সুধা?

Flag Counter


5 Responses

  1. জাহিদুল ইসলাম says:

    আহা! সাইয়েদ সাবের সিগনেচার জিনিস!

    …”কাদম্বরী, বিশ্বাস করো,
    রবীন্দ্রনাথ এখন এক শব্দ দূষণ।..”

    সাবধানে থাইকেন। রবীন্দ্র-ইজারাদার বলায় ওই দলের একজনের যুদ্ধের হুমকি খাইছি। (এইকালে, যুদ্ধ মানে ক্রসফায়ার, সে তো ইঙ্গিতে ইশারায় বুঝা যায়।)

    আপনি সেই ইজারাদারি নামকরণ শিল্পে অমর কইরা রাখলেন।

    …”মায়া ও মুগ্ধতার সাঁকো পার হ’য়ে
    চ’লে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে
    একটু আগুন দেবে, সুধা?…”

    আপনিও মৃত্যুচিন্তা করেন? আপনার প্রবল নগ্ন অকৃত্রিম কবিতা যাপনও মৃত্যুর প্রশান্তি খুঁজছেন?

    না কি….”মরিয়া প্রমাণ করিল যে, সে মরে নাই…” ধরণের কিছুর জন্যে এই মৃত্যুর অনুভব? যা ওই বাঁচাটাকেই শুধু প্রবলতর করে তোলে?

    (রবীন্দ্র উদ্ধৃতির জন্যে যারপরনাই শরমন্দা আছি। ক্ষেমাঘেন্না কইরা দিবেন।)

    অভিনন্দন

  2. akkash says:

    অশ্লীলতাই যদি কবিতা হয়, তাহলে সাইয়েদ জামিল বড় কবি।

  3. মাকশুম says:

    হিরো আলম নায়ক হতে পারলে, মাহফুজুর গায়ক হতে পারলে, জামিল কেন কবি হবে না! তাকে অভিনন্দন!
    আর্টস ডট বিডিনিউজ ২৪ কেও শুভকামনা এগুলো এই পেজে ছাপানোর জন্য!

  4. বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী says:

    “যেই আরেক রবীন্দ্রনাথ হবে আমাদের সংস্কৃতির
    অবিচ্ছেদ্য অংশ” বাহ! বাহ! বাহ!…। রঞ্জন বাবুর ব্যবসা সফল কাদম্বরীর সুইসাইডাল নোটের মতো নিজের জীবনস্মৃতিতে বাণিজ্যসন্ধানী আদিমরস ঢেলে কাহিনী করে যদি রবীন্দ্রনাথ বলতেন কাদম্বরীকে চুমু খেয়েছিলাম, তবে সেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হতো! যিনি ৭৩ বছর বয়সেও ” মায়াবন বিহারিনী”র মতো গান রচনা করে আত্মজয় ও আত্মতুষ্টির সম্পর্ক-দর্শন তৈরি করতে চেয়েছিলেন–তিনি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হলেন না! বাংলা সংস্কৃতির কী বোদ্ধা এই ‘হাবলাচোদা’র .কবি।

  5. চাণক্য পণ্ডিত says:

    বাহ! অনেক দিন পর আমার প্রিয় কবির কবিতা পেয়ে খুব ভাল লাগল। শুভেচ্ছা কবি কে। আপনার কবিতার শিল্পমূল্য এবং ব্যক্তি আপনার শিল্পী-মূল্য বোঝা আমার মত অর্বাচীন (এবং সেফাত উল্লাহর ভাষায় ‘অশিক্ষিত, গরীব’) আম-পাঠকের জন্য কিছুটা দুরূহ হলেও তাতে মুগ্ধতার লেশমাত্র কমতি নেই। অনেক অনেক লেখা লিখুন। আপনার কবিতা আমরা হাইস্কুল ও কলেজের বাংলা টেক্সটবুকে প্রত্যাশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.