অনুবাদ কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেসের কবিতা

মুম রহমান | 15 Sep , 2018  


কসাইদের মাঝে

একটা পতিতালয়ের চেয়ে নগণ্য
মাংসের বাজার নিজেই জাঁক দেখায় রাস্তার উপর
একটা অপমানের মতো।
দরজার উপর
এক কচি বলদের মাথা অন্ধ-চোখে তাকায়
দেখে পবিত্র রবিবারের ডাইনীর উৎসবের
উড়ন্ত মাংস আর মার্বেলের খ-
এক দূরাগত মহিমান্বিত স্বর্গের মূর্তির মতো।

চাঁদ

সেই স্বর্ণের মধ্যে এমন এক নিঃসঙ্গতা রয়েছে।

এইসব রাত্রির চাঁদ সেই চাঁদ নয়
যা আদম প্রথম দেখেছিলো। বহু শতাব্দীর
মানবের নিশিযাপন ভরে আছে তার সাথে
এক পুরনো বেদনার মতো। দেখো, সে তোমার আয়না।

সমুদ্র

আমাদের মনুষ্য স্বপ্নেরও আগে (অথবা শঙ্কায়) উদ্ভাবিত হয়েছিলো
পুরাণ, সৃষ্টিতত্ত্ব আর প্রেমের,
সময় তার সবকিছুকে দিনের হিসাবে আনার আগেই,
সমুদ্র, সদাই সমুদ্র, অস্তিত্তময়: ছিলো।
সমুদ্র কে? কে সেই প্রচ- প্রাণ,
প্রচ- আর প্রাচীন, যে চিবিয়ে খেয়েছে ভিত্তি
এই মাটি পৃথিবীর? সে একই সঙ্গে এক এবং অনেক সাগর;
সে পাতাল আর দ্যুতি, দৈব আর হাওয়া।

যে তাকায় সমুদ্রের দিকে, দেখে প্রথমবার,
প্রতিবার, পরিশোধিত বিস্ময় নিয়ে
অবিমিশ্র বস্তু থেকেÑ সুন্দর
সন্ধ্যা থেকে, চাঁদ, বহ্নুৎসবের উড়াল।
সমুদ্র কে আর আমিই বা কে? যে দিন
অনুসরণ করতে থাকে আমার মর্মবেদনা সে হয়তো বলবে।

বৃষ্টি

শেষ পর্যন্ত অপরাহ্ন আলোকিত হয়ে উঠলো
যেই বৃষ্টি পড়া শুরু হলো, আকস্মিক আর সংক্ষিপ্ত।
ঝরছে নাকি ঝরে পড়েছে। তা নিয়ে তর্ক নেই:
বৃষ্টি এমন কিছু যা অতীতে ঘটেছিলো।

যে শোনে এই বৃষ্টিপাতের শব্দ সে পলাতক সময়কে উদ্ধার করে
যখন রহস্যময় দৈবপতন উন্মোচিত করতে পারে
তার কাছে একটি ফুল যার নাম গোলাপ
আর তার জটিল রক্তিমতার লাল।

ততক্ষণ ঝরছে যতোক্ষণ প্রতিটি জানালার গরাদ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে
এক শহরতলির ভেতরে এখন এই বৃষ্টি সুদীর্ঘ নিঁখোজ
প্রফুল্ল করতে পারে একটি আঙুর বাগানের কালো আঙুরকে।

এক নির্দিষ্ট আঙিনা যা আর নেই।
এক দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত কণ্ঠ প্রবল বর্ষণের মাঝে
সে আমার বাবার। তিনি কখনোই মরেননি।

চতুষ্পদী

অন্যেরা মারে গেছে, কিন্তু তা ঘটেছে অতীতে।
সে ছিলো প্রসন্ন প্রহর মৃত্যুর জন্য (কেউ তা জানে না)।
এটা কি সম্ভব আমি, ইয়াকুব আল মনসুরের* একজন শিষ্য,
অবশ্যই কি মরতে পারি একটি গোলাপ কিংবা এরিস্টটলের মতো?

*মরক্কোর আবু ইয়াকুম আল মনসুর একজন আল-মুহাঈদ্দিন ঘরানার একজন শাসক। ১২ শতকের এই খলিফা ব্যবসা, দর্শন, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, সমরবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

একটি আঙ্গিনা

সন্ধ্যায়
তারা শ্রান্ত হয়ে পড়ে, আঙ্গিনা দু-তিনটা রং।
আজ রাতে, চাঁদ, উজ্জ্বল বলয়,
মহাশূন্যকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আঙ্গিনা, আকাশের সংযোগ
আঙ্গিনা সেই ঢাল
যার নিচ দিয়ে আকাশ নেমে আসে বাড়িতে।
অমল আকাশে,
অবিনশ্বরতা অপেক্ষা করে নক্ষত্রদের চৌরাস্তায়।
এটা আনন্দময় বন্ধুবৎসল অন্ধকারে
প্রবেশ পথে, কুঞ্জবনে আর চৌবাচ্চায় বাস করা।

বোর্হেস

আমি খুব সামান্যই অথবা কিছুই জানি না বোর্হেস সম্পর্কে,
আমার পর্তুগিজ পূর্বপুরুষ প্রসঙ্গে। তারা ছিলো অশরীরী এক জাতি,
যারা এখনও কাজ করে আমার শরীরে তাদের রহস্যময়
কানুন, আচার আর উদ্বেগে।
আবছায়া, যেন কখনোই ছিলো না তারা,
আর শিল্পের প্রক্রিয়ায় একেবারে অচেনা,
অবোধ্য তারা
সময়, পৃথিবী আর বিস্মরণের কাছে।
সেই ভালো। যখন সব বলা হয়ে গেছে,
তারাই পর্তুগাল, তারাই বিখ্যাত লোক
যারা প্রাচ্যের বিশাল দেয়াল নির্মাণে জবরদস্তি করেছে, আর
সমুদ্রে নেমে পড়েছে, আর অন্যের সমুদ্র তটেও।
তারা সেই রাজা যারা তীরভূমিতে হারিয়ে গেছে
আর যারা ঘরে আছে তারা কসম কেটেছে যে তারা মরেনি।

বোর্হেস ও আমি

অন্য আরেকজন, যাকে বোর্হেস বলে ডাকা হয়, সেই জনকেই দেখা যায়। আমি হাঁটি বুয়েনোস আইরেসের রাস্তা ধরে আর মুহূর্তকাল থামি, হয়তো এখন যান্ত্রিকভাবেই, একটা হলের প্রবেশ দ্বরের খিলান দেখি আর একটা গেটের গ্রিলের কাজ দেখি; আমি বোর্হেসকে চিনি মেইলের মাধ্যমে আর তার নাম দেখি অধ্যাপকদের নামের তালিকায় কিংবা একটা জীবনী অভিধানে। আমি বালিঘড়ি, মানচিত্র, আঠারো শতকের মূদ্রালিপি, কফির স্বাদ আর স্টিভেনসনের গদ্য পছন্দ করি; সে এইসব পছন্দগুলির অনুসরণ করে, কিন্তু খুব খেলোভাবে করে যেন একজন অভিনেতার লক্ষণ। এটা বলা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে যে আমাদের সম্পর্কটা প্রতিকূল; আমি বাঁচি, আমাকে আমার মতো বাঁচতে দেয়া হোক, যাতে ওই বোর্হেস তার সাহিত্য ফেঁদে যেতে পারে, আর এই সাহিত্যই আমাকেই ন্যায্য প্রতিপন্ন করে। এটা স্বীকার করা আমার জন্যে কষ্টসাধ্য নয় যে, সে কিছু অকাট্য পৃষ্ঠা অর্জন করেছে, কিন্তু সেই সব পৃষ্ঠারা আমাকে উদ্ধার করতে পারবে না, সম্ভবত এই কারণে যে, যা কিছু ভালো তা কারো মালিকানাধীন নয়, এমনকি সেই ¯্রষ্টারও নয়, বরং তা ভাষা ও ঐতিহ্যের অংশিদার। অন্যদিকে, আমি বিনষ্টির জন্যে পূর্বনির্ধারিত, আর কেবল আমার তাৎতক্ষণিক কিছু আমিত্ব তারমধ্যে টিকে থাকে। একটু একটু করে, আমি তার উপরেই সব ছেড়ে দিচ্ছি, যদিও আমি যথেষ্ট সচেতন তার বিকৃত মিথ্যাচার ও সবকিছুকে বাড়িয়ে বলার প্রবণতা বিষয়ে।

স্পিনোজা জানতেন সকল কিছুই অটল থাকে তার নিজের অবস্থানের প্রতি; পাথরটি সম্পূর্ণতই চায় পাথর থাকতে এবং বাঘ চায় বাঘ হয়ে থাকতেই। আমার উচিত বোর্হেস হয়ে থাকা, নিজস্ব আমি হওয়া নয় (যদি এটা সত্যি হয় যে আমি একটা কিছু), কিন্তু তার বইগুলোতে আমি নিজেকে কমই চিনতে পারি অন্য অনেকের চেয়ে অথবা গিটারের তারে কষ্টসাধ্য আঙুল বুলানোর চেয়ে। বহুবছর আগে আমি নিজেকে মুক্ত করতে চেয়ে তার কাছ থেকে আর পূরাণসমূহ থেকে সরে গিয়ে শহরতলির খেলাধূলায় সময়ে আর অসীমেও, কিন্তু সেই সব খেলাও বোর্হেসের অধীন এখন আর আমাকে অন্য কিছু কিছু কল্পনা করে নিতে হবে। এইভাবে আমার জীবন পলাতক আর আমি হারিয়েছি সবকিছু আর সবকিছুই এখন বিস্মরণের অধিক, অথবা তার অধিন।
আমি জানি না আমাদের মধ্যে কোনজন এই পৃষ্ঠাখানি লিখেছে।

আত্মহত্যা

একটা তারাও রইবে না আজ রাতে
স্বয়ং রাত্রিও রইবে না অবশিষ্ট।
আমি মরে যাবো আর আমার সাথে সমগ্র
দুঃসহ মহাবিশ্ব।
আমি মুছে ফেলবো পিরামিডগুলি, মূদ্রাগুলি,
মহাদেশসমূহ আর সকল মুখগুলি।
আমি মুছে ফেলবো পুঞ্জিবীত অতীত।
আমি ইতিহাসকে ছাই করে দেবো, ধূলাস্য ধূলা।
এখন আমি শেষ সূর্যোদয় দেখছি।
আমি শুনছি শেষ পাখির গান।
আমি কোন দায়ভার দিচ্ছি না কারো প্রতিই।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.