চিত্রকলা

শিল্পী যোগেন চৌধুরী: দেশভাগের অভিঘাত জীবনে, চিত্রকলায় ফেলেছিল বড় প্রভাব

জয়ন্ত সাহা | 3 Sep , 2018  


৪৭- এর দেশভাগের যন্ত্রণার ক্ষত মনে এখনও দগদগ করছে; জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়ার বেদনা এখনো কুড়ে খায় তাকে।
উপমহাদেশের প্রবীণ চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী বললেন, দেশভাগের সেই অভিঘাত তার ব্যক্তি জীবন ও চিত্রকলায় ফেলেছে ‘বড় প্রভাব’।
গোয়ালভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ সমৃদ্ধির সবটুকুই ছিল যোগেন চৌধুরীদের ডহরপাড়া গ্রামের আটচালা বাড়িটিতে; পূজা-পার্বণ, থিয়েটার আনন্দ আয়োজনের বাদ যেত না কিছুই।
তারপর এল ৪৭; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হল ভারতবর্ষ। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ল গোটা ভারতবর্ষে। পরম প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে চলে যেতে শুরু করলেন এ বাংলার সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারগুলো, তকমা জুটল শরণার্থীর।
আর্ট বিয়েনাল উপলক্ষে ঢাকায় আসা যোগেন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আত্মীয়-পরিজনদের নিয়ে একটা বিশাল সমাজ ছিল আমাদের। সেটা যখন ভেঙ্গে গেল; তখন জীবনের সমস্ত জায়গা নড়বড়ে হয়ে গেল। একটা ডিজরাপশন তৈরি হল।”
যোগেন চৌধুরীর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। তৎকালীন ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ার ডহরপাড়া গ্রামে ছিল তাদের বসবাস।


দেশভাগের পর সবকিছু ছেড়েছুড়ে তাদের চলে যেতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। যোগেন চৌধুরীর বয়স মাত্র আট।
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দিনগুলো কেটেছিল ভীষণ কষ্টে।
শৈশবের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যোগেন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,“জীবনটাকে কিভাবে দাঁড় করাব, সেই ভাবনা ছিল আমাদের। নানা রকম অসুবিধার মধ্যে দিয়ে কেটেছে দিনগুলো। ”
জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছেন লাখো লাখো রোহিঙ্গা নাগরিক। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।
শরণার্থী নাগরিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা যখন আলোচনা শুরু করেছেন, তখন সারা বিশ্বের শরণার্থীর সঙ্কট নিয়েও কথা বলেন এই শিল্পী।
যোগেন চৌধুরী বলেন, “যে কোনো দেশত্যাগেই একটা বিরাট ক্রাইসিস তৈরি হয়। শুধু রোহিঙ্গা নাগরিক নয়, সিরিয়াতে নাগরিকদের দুর্দশার গল্পও আমরা পড়েছি। যেকেনো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে যখন এই অবস্থা তৈরি হয়, তখনই একটা অমানবিক পরিস্থিতির জন্ম হয়।

“আমরা যারা সরাসরি আক্রান্ত হয়েছি, তারা জানি বাস্তুহারা হয়ে থাকার যন্ত্রনা। দূর থেকে এর কষ্ট উপলব্ধি করা যাবে না। পার্টিশনের ভুক্তভোগীরা জানি পড়াশোনা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর সর্বোপরি টাকার অসুবিধার কতটা বড় প্রভাব ফেলে।”
যোগেন চৌধুরী বলেন, দেশভাগ বা শরণার্থী সঙ্কট সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে শিশু মনে।
দেশভাগের পর হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। পরে কলকাতার আর্ট কলেজে যখন ভর্তি হলেন, তখন দেখা গেল তার আঁকা ছবিতেও পড়ছে সেই হতাশার ছাপ।
শিয়ালদহের রেল স্টেশনে শরণার্থীদের দুর্ভোগের চিত্র তিনি এঁকেছেন। আরো অনেক পরে ‘ক্ষত’, ‘আহত’, ‘মৃত’, ‘মুখ’, ‘বলি’, ‘পরিণাম’ ছবিগুলোতে আলাদাভাবে তুলে এনেছেন শরণার্থীদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখগুলো।
আলোচনার এক মুহূর্তে তিনি অপকটে স্বীকার করেই নিলেন, হাল আমলে আঁকা অনেক ছবিতেই দেশ ভাগের ব্যথা-বেদনাকে চিত্রিত করেছেন।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যোগেন চৌধুরী বলেন, “আমি ক্যানভাসে প্রচুর কালো ইউজ করি, আর তা ইচ্ছা করে । এর দুটো কারণ আছে। আর্ট কলেজে পড়ি যখন, তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না। হ্যারিকেনের আলোতে স্কেচ করতাম। তার ফলে ছবি হত কালো। আরেকটা কারণ হল, সাইকোলজিক্যাল, যাকে বলে ডিপ্রেশন। পরে আমার সমস্ত কাজের মধ্যে তার একটা রিঅ্যাকশন তৈরি হয়েছে। এখন আমি যেসব কাজ করছি, তার মধ্যেও ডিপ্রেশন খুঁজে পাওয়া যাবে।”

দেশভাগের পর ষাটের দশকে গোটা পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো ‘বিদ্যমান’ রয়েছে বলেও জানান যোগেন চৌধুরী।
যোগেন চৌধুরী এখন ভারতের রাজ্য সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। নিজের রাজনীতি ভাবনার কথাও শেয়ার করেন এই আলাপচারিতায়।
তিনি জানান, শিল্পকলা থেকে রাজনীতিতে আসার পেছনে মানুষের জন্য কিছু করার একটা তাগিদ তার ছিল। আর রাজনীতির প্রতি ভালোবাসাও ছিল তার।
তার চোখে সমাজসেবী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে।
“দেশে দুটো গ্রুপের লোক থাকে। একটা গ্রুপ হল সংস্কৃতিপ্রবণ ইন্টেলেকচুয়াল, তারা সমাজকে ভালোবেসে তাকে উন্নত করতে চায় । কিন্তু যারা রাজনীতি করে, তারা অন্য জাতের। তাদের মধ্যেও সমাজকে ভালোবাসার ব্যাপার থাকে। কিন্তু তাদের মেকানিজম আলাদা। তারা সারাক্ষণ ভাবে, কি করে পাওয়ারটাকে রিটেইন করতে হয়। তারা নানারকম ঘাট-ঘোট বেধে কিভাবে ইলেকশনে জিতবে তাই নিয়ে মাথা ঘামায়, তার পর আর তাদের দেশপ্রেম বলে কিছু থাকে না।”
তবে তার মতে, রাজনীতি শিল্প-সাহিত্যকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
“ইন্ডিভিজুয়্যালিজম ইজ ইমপরট্যান্ট। ইন্ডিভিজ্যুয়ালি কেউ যদি ছবি আঁকে বা যে লিখে বা গান করে; তার এরিয়াটা সে নিজে কন্ট্রোল করতে পারে। তবে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে রাজনীতির অনেক ভূমিকা আছে। জায়গা তৈরি করে দেওয়া, বৃত্তি দেওয়া, পুরস্কৃত করা… আর এই যে বিয়েনালে হচ্ছে, সে টাকাটা তো দিচ্ছে এই রাজনীতিবিদরা বা সরকার।”
যোগেন চৌধুরী জানান,শৈশবেই ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল তার। বাবার জমিদারি দলিল-দিস্তার উল্টো পিঠে ইচ্ছেমতো ছবি এঁকে যার সূচনা। এঁটেল মাটির পুতুল গড়তেন খেয়ালখুশিমতো। দূর্গা প্রতিমার কাঠামো নির্মাণের সময় আনা রঙ থেকে খানিকটা সরিয়ে এনে সেই পুতুলগুলো সাজাতেন তিনি।
তারপর ১৯৪৮ সালে আঁকলেন নিজের প্রথম ছবি ‘ময়ূর’। লাল-নীল পেন্সিলে ঘরের দেয়ালজুড়ে এঁকেছিলেন সে ছবি। দেশভাগের প্রেক্ষাপট, কলকাতার জীবন- নিজের যাপিত জীবনের গল্পগুলো একের পর এক স্কেচ এঁকেছেন তিনি। নিউজপ্রিন্টের ক্যানভাসে চারকোলে চিত্রায়িত করেছেন নিজের ভাবনাগুলো।
তিনি বলেন, “যাপিত জীবন থেকেই তো শিল্পকর্মের সৃষ্টি হয়। নিজের জীবনযাপন, সমাজ এসব থেকেই তো সমস্ত এলিমেন্টগুলো আসে।”
দুই বাংলার নাগরিক জীবনে শিল্পবোধ এখনও সেভাবে জাগ্রত হয়নি বলে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
“ইউরোপের রাস্তা, বড় বড় ঘরবাড়ি দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। একবার দেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর কোনোদিন কেউ দেশে ফিরতে চায় না। কেন আমার নিজের দেশকে তেমন করব না? এখানেও শিল্পকলার নানা এরিয়া আছে। ছবি, স্কাল্পচার আর ইনস্টলেশনই কিন্তু শুধুমাত্র শিল্প নয়।”
“আরবান প্ল্যানিং, আর্কিটেকচার, ডিজাইন, সবকিছু ভাস্কর্য আরেকটু সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়-এটাও ভাবা উচিৎ। আর তখন বুঝব যে, শিল্পকলা সমাজকে ডমিনেট করছে।”
গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের মতো সমাজকেও নানাভাবে শিল্পিত করাই তার ‘স্বপ্ন’।
“আমরা চলতে ফিরতে সমস্ত সময় শিল্পকে উপভোগ করব। সমস্ত কিছুর মধ্যে শিল্প ছড়িয়ে পড়বে, সেটা হওয়া দরকার।”
শিল্পকলার ‘ইনফরমেটিভ ও অকশনাল মার্কেট’ তৈরি হওয়ায় এখন ভারতবর্ষে শিল্পকলার কদর বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাশাপাশি তরুণদের চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনায় যে আগ্রহ রয়েছে, তাতেও আশাবাদী হয়ে উঠেন যোগেন চৌধুরী।
যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালে।
১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট কলেজ থেকে বিএফএ ডিগ্রি অর্জনের পর ফ্রান্স সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য প্যারিসে যান তিনি।
পরে দেশে ফিরে এসে হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন, পরে সুযোগ পান ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের।
পরে পড়িয়েছেন শান্তিনিকেতনের কলাকেন্দ্রে।

Flag Counter


1 Response

  1. ছবি সম্পর্কে যা বলেছেন তা আমার কাছে নতুন কিছু নয়৷ বরং এর চেয়ে আরও অনেক বেশী শুনেছি অন্যান্য সাক্ষাৎকারে৷ কিছু কিঞ্চিৎ মুখেও শুনেছি৷ রাজনীতিক হিসাবে তাঁর ভূমিকাটা অবশ্য নতুন৷ দুটি বাক্যে একটি অমোঘ বাণী শুনিয়েছেন যোগেনদা৷”কিন্তু যারা রাজনীতি করে, তারা অন্য জাতের। তাদের মধ্যেও সমাজকে ভালোবাসার ব্যাপার থাকে। কিন্তু তাদের মেকানিজম আলাদা। তারা সারাক্ষণ ভাবে, কি করে পাওয়ারটাকে রিটেইন করতে হয়। তারা নানারকম ঘাট-ঘোট বেধে কিভাবে ইলেকশনে জিতবে তাই নিয়ে মাথা ঘামায়, তার পর আর তাদের দেশপ্রেম বলে কিছু থাকে না।”
    সত্য যে কঠিন৷ রাজনীতিক হিসাবে যোগেনদা সেটা বলতে পিছপা হননি৷
    তাঁকে প্রণাম, সালাম৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.