চলচ্চিত্র

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘আ‌য়েশা’ ও চল‌চ্চি‌ত্র বিষ‌য়ের সরল রাজনী‌তি

মৃদুল মাহবুব | 6 Sep , 2018  


মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর টে‌লি‌ফিকশন ‘আ‌য়েশা’ যারা দে‌খে থাক‌বেন তারা জা‌নেন ও বো‌ঝেন, ৭১ পরবর্তী বাংলা‌দে‌শের ই‌তিহা‌সে অগণন রাজ‌নৈ‌তিক গণকবর। ‌কিন্তু তা নি‌য়ে বাংলা‌দে‌শের সি‌নেমা কই? এ‌তো বড় এক ভূখ‌ণ্ডের এ‌তো এ‌তো রাজ‌নৈ‌তিক গণহত্যার ন্যা‌রে‌টিভ, সেই তুলনায় এসব আমা‌দের শিল্প, সা‌হি‌ত্যে খুবই কম এ‌সে‌ছ। মা‌র্কে‌জের ‘ওয়ান হা‌ন্ডেড ইয়ার অব স‌লি‌চ্যু‌ড‘এ যেমন সবাই ভু‌লে গি‌য়ো‌ছি‌লো কলা কোম্পা‌নির দ্বারা সংগ‌ঠিত গণহত্যার কথা, তেম‌নি আমা‌দের সি‌নেমা গণহত্যাহীন, পুতপ‌বিত্র, প্রেমময়। বাংলা ছ‌বি দু‌ষ্টের দমন, শি‌ষ্ঠের লালন, হৈহল্লায় ভরপুর। আমা‌দের কলাকোম্পা‌নিও এসমস্ত অস্বীকার ক‌রেই শিল্পের মো‌হিনী ফাঁদ পা‌তে। রাজ‌নৈ‌তিক হত্যাকাণ্ড নি‌য়ে সা‌হি‌ত্যে কিছু আভাস মিল‌লেও সি‌নেমায় তা খুবই বিরল একটা ঘটনা। এমন সম‌য়ে দা‌ঁড়ি‌য়ে ‘আ‌য়েশা’ সি‌নেমার কন‌টেক্সট খুবই রাজ‌নৈ‌তিক।

আওয়ামী লীগ সরকা‌রের শাসনকা‌লে, ১৯৭৭ সা‌লের জিয়াউর রহমা‌নের আম‌লের বিমানবা‌হিনীর বি‌দ্রো‌হের পটভূ‌মি‌তে সি‌নেমা বানা‌নোকে অ‌নেকটা সহজ পথ হিসা‌বে দেখা যে‌তে পা‌রে। কিন্তু বিষয় অত সরল না কিন্তু। কা‌লে কা‌লে পোড়ামা‌টির যে রাজ‌নৈ‌তিক নী‌তি তার সমা‌লোচনার সূচনা এখা‌নে, ‘আ‌য়েশা’য়, আ‌মি ধ‌রে নি‌তে চাই। আশা রাখ‌তে চাই। যে‌কোন সম‌য়ের প‌লি‌টিক্যাল অনাচার‌কে বহু অং‌কের হিসাব মি‌লি‌য়ে একটা সুসম‌য়ে তা প্রকাশ করা দো‌ষের কিছু না। বরং তা অ‌নেক বু‌দ্ধির প‌রিচায়ক। এগু‌লো নি‌য়ে সি‌নেমা হওয়ার ভা‌লো সময় এখন। রাজ‌নৈ‌তিক বহু বিষয় নি‌য়েই এখ‌নো প্রচুর ছবি বানা‌নো বাদ আ‌ছে আমা‌দের। ধ‌রে নি‌চ্ছি বাংলা‌দে‌শে গণতা‌ন্ত্রিক ভা‌বে নানা রকম সরকার আস‌বে আগামী দিনগু‌লো‌তে। সে সময় ভ‌বিষ্য‌তে অন্যান্য বিষ‌য়ে ফিল্ম হওয়ার সু‌যোগ ও মান‌সিকতা তৈ‌রি হ‌বে। সু‌যোগ শিল্পী‌কে নি‌তে হয়। ত‌বে আমার স‌ন্দেহ থে‌কেই গেল বিএন‌পির আম‌লে এই ‘আ‌য়েশা’ ফারুকী বানা‌তেন কি না? চ্যা‌নেল আই তা প্রচার কর‌তো কি না? ত‌বে, হ্যাঁ বা না এর মত কোন সরল উত্তর আমরা আশা কর‌তে পা‌রি না।


একটা টে‌লি‌ফিকশন একবার দেখার জন্য হয় না নিশ্চয়ই। তার আয়ুষ্কাল থা‌কে। একা‌লের রাজনী‌তি থে‌কে তা অপর কা‌লের রাজনী‌তি‌তেও জীবিত থাক‌বে। ‌ ‘রক্তকরবী’ সকল দেশ ও কা‌লে একই অর্থ দি‌বে না। সেই হিসা‌বে বি‌ডিআর বি‌দ্রোহ, হ‌লি আ‌র্টিজান, ক্রসফায়ার– এগু‌লো নি‌য়েও আমা‌দের ন্যা‌রে‌টিভ নিশ্চয়ই সেলুল‌য়ে‌ডে ধরা থাক‌বে অ‌নে‌কের হা‌তে, আজ অথবা কাল। নানা অর্থ ও সম‌য়ের ভেতর দি‌য়ে তা অগ্রসর হ‌বে।
পরিচালক ফারুকীর এই রাজনৈতিক হয়ে ওঠাটা চল‌চ্চি‌ত্রের নতুন জেনর তৈ‌রি কর‌বে। এ‌তোদিন বাংলা‌দে‌শের সি‌নেমায় জাতীয় রাজনী‌তি মা‌নেই ৭১। জীবনযুদ্ধ মা‌নে যে নতুন নতুন জনযুদ্ধ তা আমরা ভুল‌তে ব‌সে‌ছি। এসম‌স্তের বাই‌রে এ‌সে অন্যান্য ন্যা‌রে‌টিভ যে লেখা শুরু হ‌য়ে‌ছে তা বরং আশা জাগা‌নিয়া। এখা‌নে রাজ‌নৈ‌তিক সিনেমার নামে নী‌তি নৈ‌তিকতা, চেতনার ব্যবসা হয়। ‘আ‌য়েশা’ টে‌লি‌ফিল্ম হিসেবে চেনতার ব্যবসা না অন্তত, একটু অন্য কিছু। চলমান যু‌দ্ধেরই দৃশ্যমানতা। বি‌ভিন্ন সম‌য়ে যে সমস্ত ক্রসফায়ার, গুমখু‌নের গুজব শোনা যায় তা নি‌য়ে ফিকশন হোক।
আপানি কোন সম‌য়ে ব‌সে কী বানা‌চ্ছেন বা বানা‌বেন তা নির্বাচন করা ফিল্ম‌মেকা‌রের হি‌সাবী কাজ। ফারুকীর কন‌টেক্সট ও টাইম সি‌লেকশন জ্ঞান অন্যান্য ফিল্ম‌মেকার‌দের থে‌কে ভা‌লো ব‌লে মনে হ‌লো ‘আ‌য়েশা’ দে‌খে। টে‌লি‌ফিল্মটি ভা‌লো বা ম‌ন্দের বিচা‌রের চে‌য়ে ফারুকীর প‌লি‌টিক্সটা বোঝা দরকার আ‌গে। ফিল্ম কর‌তে আস‌লে এগু‌লোর বি‌বেচনা থাকা দরকার। ফি‌ল্মের কা‌হিনী সি‌লেকশন ও তা প্রচা‌রের সময়কা‌লের রাজনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেন‌সি‌টিভ এবং কমন‌সে‌ন্সের মত বিরল একটা ব্যাপার।

ফারুকীর ‘আ‌য়েশা’ আনিসুল হ‌কের উপন্যাস ‘আ‌য়েশামঙ্গ‌ল’এর ফিল্মী ভার্সন। উপন্যাস‌টি প্রকা‌শিত হয় ১৯৯৮ সা‌লে। তখন ক্ষমতায় কোন দল? তারপর ক্ষমতায় পালাবদল হ‌য় নাই? পরবর্তী‌তে এই বই পড়া বন্ধ থা‌কেনি। অন্য সরকা‌রের আম‌লেও এটা দেখা হ‌বে। আওয়ামী সরকা‌রের সম‌য়ে ‘আ‌য়েশামঙ্গল’ লেখা ও ‘আ‌য়েশা’ বানা‌নো মা‌নে এর রাজ‌নৈ‌তিক গুরুত্ব ক‌মে না। ‌শিল্প সা‌হি‌ত্য ও সাংবা‌দিকতা আলাদা বিষয়। সা‌হিত্য, চল‌চ্চিত্র সম‌য় খোদাই ক‌রে। একজন শিল্পী কোন সময় ও কোন ঘটনা‌কে হাইলাইট কর‌বে তার শি‌ল্পে তা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। খ‌ণ্ডিতভা‌বে রাজনী‌তি‌কে না দে‌খে এটা‌কে একটা চলমানতা হিসা‌বে দেখ‌তে হ‌বে। সমা‌লোচক হিসা‌বে শিল্পীর কাজ ঠিক ক‌রে দেওয়া নির্বু‌দ্ধিতার নামান্তর।

সময়কে শিল্প, সা‌হিত্য, চল‌চ্চি‌ত্রে এন‌গ্রেভ ক‌রে রাখাই শিল্পীর কাজ। শিল্পী কখন, কোন দেশে, কোন কা‌লে কর‌বে তা সে‌কেন্ডা‌রি বিষয়।
Flag Counter


3 Responses

  1. সোহেল আনওয়ার says:

    আয়েশার প্রতিক্রিয়া পড়ে ভাল লাগলো। ফারুকীর কাজ পছন্দ করি, আয়েশা ডুবের চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। ডুবের পরিচালক যতটা মানবতাহীন নিষ্ঠুর, আয়েশার পরিচালক ততটাই মানবিক।

    আশা করি তিনি আওয়ামী পারপাসসার্ভকারী পরিচালকে পরিণত হবেন না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষে যেমন কথা বলেছেন, তেমনি গণমানুষের জন্য কাজ করবেন।

  2. L Gani says:

    অনেক অনেক শুভকামনা। তবে, রাজনীতি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এ লেখা পড়ার আগে এভাবে ভাবিনি। আরেকটি কথা, আনিসুল হক ব্যক্তিগত বন্ধু বলে আমার আনন্দটা একটু বেশি।
    উল্লেখ্য, genre শব্দটির উচ্চারণ জনরা বা তেমনকিছু, জেনরে নয়। বানানটি ঠিক করে দেয়া দরকার।
    ধন্যবাদ। … ML Gani

  3. Yes we want more movie for Freedom fighters and more movie for in out country’s politics long long years..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.