গল্প

রঙ্গতারা ও তার আত্মজের পরিচয়

রুখসানা কাজল | 29 Nov , 2018  


শিল্পী জামাল আহমেদের চিত্রকর্ম

বারো তলা ফ্ল্যাটের গেট পেরিয়ে আঁতকে ওঠে রঙ্গতারা। এ যে সর্বনাশেরও সর্বনাশ ! কেয়ামতের অন্ধকারের মত ঘুটঘুট্টি কালো হয়ে গেছে আকাশ! মেঘ নেমে এসেছে একেবারে জোড়া আমগাছের মাথার উপ্রে।
আল্লারে আল্লা। এই বুঝি উথাল পাথাল বৃষ্টি নামলো বলে ! এখন কি করে ঘরে ফেরে রঙ্গতারা ! কি যে কান্ডমান্ড করে বসে আল্লাতালা। বড়ই হুজ্জুতে লীলাখেলা তাঁর!
কাজের মাতালে আজ আকাশ দেখারও সুযোগ পায় নি। সাত সাতটা ফ্ল্যাটে কাজ শেষ করে এই মাত্র বেরুতে পারল ও।
বুড়ো দারোয়ান আফজাল মাদবর অবশ্য বলেছিল, অই বেডি তুই কি মরতি যাতিছিস? দেখতিছিস না বড় জোর ঢক নামবিনি এহনি। যা, আমাগের ঘরে যায়ি বসি থাকগে। বিস্টি পোহালে তয় যাসনেনে!
রঙ্গতারা তবু দাঁড়ায় না। বুড়োকে অবশ্য ওর ভালোই লাগে। আজকাল তালিমে যাচ্ছে শুনে ওর হাত ধরে একদিন কেঁদে ভাসিয়েছিল, রঙ্গতারারে তোগের হাজী হুজুরাণির কাছ থেকি আমার জন্যি ইট্টু মাফ মওরত চায়ি নিস রে তুই। এ জীবনি ত কোনদিন হজ করতি যাতি পারব নানে। তয় শুনিছি শেষ বিচারের দরবারে হাজিগে দোয়া নাকি পাপীতাপিগের জন্যি সাক্ষি দেয় !
আরেকদিন লিফটে ওঠার মুখে রঙ্গতারাকে থামিয়ে জানতে চেয়েছিল, তোর আল্লার কসম লাগে রঙ্গ, ক দেহি ছেলেটা কার রক্তে জন্মিছে? আমার হলি তুই একবার খালি ক। আমি বাড়ি নিয়ি যাই আমার মনারে। আমার খোরশেদ, আমজাদের সাথি একসাথে থাকবেনে, ইশকুলি যাবেনে। তুই ত জানিস আমার ইস্তিরি কত নরম দেলের মানুষ।
রঙ্গতারা বুড়োর আকুতি দেখে শিউরে ওঠেছিল আনন্দে। মাত্র আট হাজার টাকা বেতনের দারোয়ান। তার কি সাহস ! চোখেমুখে কি যে সুন্দর আলো খেলে যাচ্ছিল। ছটক ছটক আলো। কথাগুলো বলতে বলতে বুক সোজা করে দাঁড়িয়েছিল মাদবর । এই কি পিতৃস্নেহ ! একেই কি বলে পিতৃ অধিকার !
এক কালে দুজনের গভীর ভাব ভালোবাসা ছিল। সে সময় বুড়ো যখন বাড়ির কথা বলত তখন কেমন লোভ হত ওর।
কতবার যে রঙ্গতারা শুনেছে, বাড়ির পাশে আজন্মের একটা খাল বয়ে যাচ্ছে। তার দু পারে ঘন বন। শড়া, হিজল, ডুমুর, তাল নারকেল, সুপারী আরো কত রকম গাছ সে বনে। পাটখড়ির বেড়ায় ঘেরা বাড়ি। পুরোন টিনের ঝরঝরে একটি ঘর। ভিজে পুড়ে হলুদ, বাদামি লাল হয়ে গেছে চালের টিনগুলো।
ফুটোফাটা সেই চালের উপর আম জাম ঝরে পড়ে। রাতের বেলায় বনবিড়ালরা পেয়ারা খেতে এসে হুড়ুমহাড়ুম মারামারি আর চেঁচামেচি জুড়ে দেয়। ছেলেরা ভয় পেলে সেই নরম দেলের ইস্তিরি তাদের বুকের কাছে নিয়ে ফেরশতার মত হেসে বলে, ভয় কি বাপধন। আল্লারে ডাকো দেখি। আমাগের আল্লা আছে না সাথে !

আফজাল মাদবর বাড়ি গেলে ছেলেদের নিয়ে নিজের হাতে সেই ফুটোফাটায় পুটিং মেরে সারাই করত। মাদবরের ইস্তিরি উঠোন ঝেড়ে লাউ কুমড়ো বেগুন গাছের যত্ন নিতে নেমে যেত নাবালে। ইশকুল থেকে ফিরে বড় ছেলে খোরশেদ খালে মাছ ধরত। রোগাপটকা ছোটভাইকে কিছুতেই পানিতে নামতে দিতো না। ভারি আদর ছোট ভাইয়ের।
সেই টিনের ঘরের সাথে লাগানো ছনের রান্নাঘর। তার একদিকে খড়ের বেড়া। সেখানে বসে সবাই খায়। খোরশেদ এক টুকরো মাছ তুলে দেয় তো, আমজাদ আরেক টুকরো দিয়ে বলে, আব্বা আপনি খান। খান কিন্তুক আব্বা। আমরা তো কত খাই তাই না ভাইজান ?
বুড়ো আফজাল মাছের টুকরোটা খোরশেদ আমজাদের মার পাতে তুলে দিয়ে ছেলেদের বলে, তোমাদের আম্মাজানকে দাও বাবারা। মায়ের হক্‌ পিতার আগে। মনে রাখবা মা জননীর পায়ের নিচে তোমাগের জান্নাত। রোজ হাশরে শেষ বিচারের দিন মায়ের নামেই তোমাগের ডাকি নেবে আল্লাহর ফেরেশতারা ।
রঙ্গতারার ঘোর লেগে যেত এইসব গল্প শুনে শুনে। হিজল, তাল সুপারি গাছ ও নিজেই দেখেনি কোনোদিন। উঠোন কি তাই জানে না !
ওর জন্ম এই রাজাবাজার বস্তিতে। নুলো বাপটা নাকি ভিক্ষে করত আনন্দ সিনেমার সামনে বসে। তারপর কি যে হলো! কোথায় হারালো কে জানে। রঙ্গতারার মাও বলতে পারে না।
এরপর হাবুলকাকা নামে এক পানবিড়ির ফেরিওয়ালা মাঝে সাঝে এসে মার সাথে থাকত। খুব সুন্দর চোখ ছিল হাবুলকাকার। যে কদিন থাকত খুব আদর করত। এটা সেটা কিনে দিত রঙ্গতারাকে। বস্তির অনেকেই বলত, অই যে তোর আসল বাপ আসি পড়িছে। ও হাবুল ভাইজান এবার যেনো অনেক দিন পর আসলা। সব ভালো তো?
একদিন হাবুলকাকাও হারিয়ে গেলো। তবে এবার জানলো সবাই। হাবুল আসলে ছিল বাস ডাকাত। খুনিও। দূপাল্লার বাসে বাসে ডাকাতি করত দল বেঁধে। রঙ্গতারা ভেবে পায় না অত সুন্দর যার চোখ, সে কি করে ডাকাত হয় !
বাপের কথা ভাবলেই রঙ্গতারার মনে হাবুলকাকার মুখ ভেসে ওঠে।
লোভের বশে একবার ও ভেবেছিল মাদবরকে বলে , হ, নূরনবী মুস্তাফা আপনার ছেলে। আপনি ওরে নিয়ে যান আপনার গ্রামে। ওরে ঘর দ্যান। খোরশেদ আমজাদের মত আম জাম হিজল সুপারিগাছ চিনুক। মাছ ধরুক। আপনাগের ছনের রান্নাঘরে খেজুরের পাটিতে বসে ভাগ করে খাওয়া শিখুক। আর সেই নরম দেলের মহিলাকে মা ডাকুক।
কিন্তু মিথ্যে কথাটা মনে এসেও মুখে আটকে যায়। তার ছেলে যে আফজাল মাদবরের রক্তের নয় সে কথা ওর চেয়ে বেশি আর কে জানে!


জোরে পা চালাতে গিয়ে বোঝে পান্থপথ পর্যন্ত যেতে পারবে না। তার আগেই ভিজে ছপ্‌ছপে হয়ে যাবে। দোনামোনা করে মন। জ্যৈষ্ঠর বৃষ্টি হাড়ে হাড়ে শয়তান। বৃষ্টি পড়লেই রোদ্দুরে তাতানো শক্ত মাটি, ইট সিমেন্টের বাড়িঘর রাস্তা থেকে গরম ভাপ আর বিশ্রী পোড়া গন্ধ ভেসে আসে। দীন দুনিয়া যেনো আরো বেশি তেতে ওঠে এই ভেজা স্যাঁতসেঁতে গরমে।
অনেকেরই ঠান্ডাগর্মি লেগে যাচ্ছে। এগারোতলার কাজেরবুয়া আজ তিনদিন জ্বরে পড়ে আছে। বিবিসাবরা অস্থির হয়ে গেছে এই তিনদিনেই। তাছাড়া এখন রোজার মাস। ধূমধূম ইফতারি বানানো হচ্ছে সব ফ্ল্যাটে। আর ঝুমঝুম করে শপিংএ যাচ্ছে বিবিসাবরা। ঘরের কাজকর্ম করার সময় কোথায় তাদের!
রঙ্গতারা জুলজুল করে দেখে, শপিং ব্যাগগুলোর কি বাহার। আর ভেতরের জিনিসগুলো তো আরো সুন্দর হবে!
ও জানে শেষ রোজার দিকেই বিবিসাবদের সময় হবে ওর জন্যে কিছু কেনাকাটা করার। তাই এ কটা দিন বেশ নরম আর তেলতেলে হয়ে কাজ করে ও। বিবিসাবরাও বাড়তি খাতির যত্ন করে চলে।
রঙ্গতারার বাড়ি নাই, ঘর নাই। আত্মীয় স্বজন কুজন বলতে কেউ নাই। গ্রাম ফ্রাম যাওয়ারও তাই তাড়া নাই। ঢাকায় থাকবে। ডাকলেই পাওয়া যাবে। এ কারণে সাত ফ্ল্যাটের সাত বিবিসাব খুব খাতির করে রঙ্গতারাকে।
এ সময় শরীর খারাপ হলে কাজ করতে পারবে না। ঈদের সময় কাজ না করলে সাত বাড়ির সাতটা শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট, স্যান্ডেল, কয়েক হাজার টাকা হাত ছাড়া হয়ে যাবে যে ! বছর বাদে এই ঈদের সময় সাহেব বিবি সাহেবরা যা হোক একটু হাত খুলে দান ধ্যান করে। যদিও সস্তামস্তা জিনিস খুঁজতে তিনবার সস্তা মার্কেটে যায়। আর জিনিসগুলো দেওয়ার সময় এমন ভাব দেখায় যেনো ওর জিনিস কিনতে সাহেববিবিসাবদের সব টাকা ফুরিয়ে গেছে।
জোড়া আমগাছ পর্যন্ত হেঁটে এসে রঙ্গতারা একবার ভাবে যাই, ফিরেই যাই। কেমন দম বন্ধ করে আছে আকাশ বাতাস। ভালোই ঝড় বৃষ্টি হবে বোঝা যাচ্ছে। সাত তলার খালাম্মা একা থাকে। তার কাছে গিয়ে বসে থাকি গিয়ে। বড় ভাল মানুষ এই খালাম্মাটা। মাঝে মাঝে ও গিয়ে বলে, ও খালাম্মা এসিডা ছাড়েন না ইট্টুখানি। পরানটা জুড়ায়া নিই।
ভালো মানুষ খালাম্মা এসি চালিয়ে এটাসেটা খেতে দেয়। ও তখন তালিমের বড় হুজুরনি যেভাবে বলে ও সেভাবে বলে, আলহামদুলিল্লাহ ! আপনার দেওয়া খাদ্য খেয়ে পরাণ জুড়িয়ে গেলো। বহুত শুকরিয়া আপনাকে জনাবা।
তারপর ফ্লোরে ওড়না বিছিয়ে শুয়ে পড়ে বলে, খানিক ঘুমাইয়া লই গো খালাম্মা। কাজ আম কিছু থাকলে কইয়েন। করে দিয়ে যাবানি।


কিন্তু ফ্ল্যাটে ফেরার ইচ্ছার চাইতে ঘর টানছে এখন। প্রবল সে টান। মুস্তফা এসেছে আজ ভোরে। ছেলের সাথে এখনো ভালো করে কথা হয়নি ওর। ঈদের ছুটি হতে এখনো দুদিন বাকি। কদিন আগে মাদ্রাসার সুপার বড় হুজুরের সাথে কথা হয়েছে, রঙ্গতারা নিজে গিয়ে মুস্তাফাকে নিয়ে আসবে।
একা আসতে পেরেছে দেখে ও অবাক হয়ে যায়। খুশিও হয়। গাজিপুর ঢাকা থেকে কম দূরে নয়। যাক ছেলে চালাক চতুর হয়ে উঠছে। মুস্তফা এক বছর ধরে পড়ছে এই মাদ্রাসায়। ভালো মাদ্রাসা। সবাই ভালো বলে। সবকিছু জেনেশুনে সে এখানে ভর্তি করেছে।
লম্বায় তার মত খাটোই হবে মুস্তাফা। তা হোক। কত হুজুরই তো বেঁটে খাটো হয়। কিন্তু আট বছরের মুস্তাফার চোখে মুখে তেমন কোন নূরানি জ্যোতি দেখতে পায় না রঙ্গতারা। কেমন যেনো ইটপাথরের মত শক্তপোক্ত চোখ, মুখ। দুপাটি দাঁতের মুষড়ো কেমন কালো শিসে রঙ । কথাও তেমন বলে না। রঙ্গতারা হতাশ হয়ে ভাবে, একটু তেলতেলে, মধুভাষী না হলে হুজুরপানা করে কি করে খাবে এই ছেলে !
পান্থপথ পার হয়ে রঙ্গতারা প্রায় ঝেড়ে দৌড় দেয়। রাস্তাপাট, দোকানঘর, ফ্ল্যাটবাড়ি ঝলকে দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই বিদ্যুৎ চমকে গেছে। বড় হারামখোর এই বজ্রবিদ্যুতের বাচ্চারা। কেবল গরীব মানুষ মারার ফন্দিফিকির । সেদিন খালাম্মা পেপারে ছবি দেখিয়ে বলেছিল, দ্যাখ রঙ্গতারা। মানুষটার কেমন হাসি হাসি মুখ। ধানের চারা বুকে চেপে ঠাটা পড়ে মরে গেলো ! আহহারে মানুষ!
রঙ্গতারা দেখেছিল। তবে ও তো কোনোদিন ধানগাছ দেখেনি। অবাক হয়ে দেখেছিল মানুষটা শুয়ে আছে। বুকের উপর দু হাত। সেই দুহাতের মুঠোয় ধরা ঘাসের মত দেখতে ধানচারা্র কতগুলো আঁটি । কাদামাটি জলের বিছানায় হাসি মুখে শুয়ে আছে। কি সোনা সোনা হাসিময় মৃত্যু।
ওর মা মরেছিল অসহ্য কষ্ট পেয়ে। শেষদিকে আল্লাহকে ডাকার সাথে চিতকার করে গালিগালাজ আর কান্নাকাটি করত।
হঠাত কড়কড় করে ওঠে আকাশ। ছুরির ফালি হয়ে বিদ্যুৎ শিখা ঝমকে ছুটে আসে। রঙ্গতারা ঝাঁপ দিয়ে ঢুকে পড়ে একটি দোকানের ভেতর। কয়েকজন টেনে নেয় ভেতরে। অনেকেই বকে দেয়, হতচ্ছাড়ি নাইবুদ্ধির মেয়েমানুষ বলে।
থরথর করে কাঁপছিল রঙ্গতারা । প্রাণটা ওঠে এসেছিল ঠোঁটের কিনারায় । এক পলকের জন্যে স্পষ্ট দেখেছিল, রাস্তাটা মুহুর্তমাত্র ধপধপে শাদা হয়ে গেল। শাদা আগুনের রূপো রঙ ধাঁধিয়ে দিলো ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট।
দু হাঁটুর সাথে বুকটা জোরে চেপে ধরে রঙ্গতারা ভাবে, আজরাইল ফেরেশতার রঙ বুঝি ধপধপে রূপালী !
ভয়ে ফ্যাসফেসে গলায় দোকানের ছোট ছেলেটাকে কাছে ডেকে বলে, আব্বুজান মেহেরবানী করে একটু পানি দিবা, খাবো।


ঘরে ঢুকে বিরক্ত হয় রঙ্গতারা। নূরনবী মুস্তাফা এখনো ঘুমিয়ে আছে। মনটা দমে যায় ওর। তার ছেলেটা ভালো হুজুর হতে পারবে না। এত বড় ঝড় বাদল গেলো, বিদ্যুৎ চমকালো, মেঘ গজরালো তবু ছেলেটা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে । তালিমের হুজুরাণি বলেছেন, নবীজি এই এত্তটুকু বয়সে সূর্য উদিত হওয়ার সাথে সাথে মেষপাল চরাতে পাহাড়ে চলে যেতেন।
রঙ্গতারা মনে মনে আফসোস করে, মেষ চরানো না হোক নূরনবী মুস্তাফা তো একটু কোরান শরীফ পড়তে পারত ! বস্তির সবাই ধন্য ধন্য করত তাদের মা ছেলেকে।
মন বেজার হয়ে যায় ওর। তার উপর এই ঝড় বিদ্যুতের ধাক্কা। এটা সেটা কাজ করে মুস্তাফাকে ডাকতে গিয়ে চমকে ওঠে রঙ্গতারা। জ্বর এসেছে ছেলের। কপালে হাত দিতেই জেগে ওঠে মুস্তাফা। কেঁদে ফেলে, আম্মা আম্মা । আমি আর মাদ্রাসায় যাবো না আম্মা। বড় হুজুর ভালো না। আমারে ব্যাথা দেয় আম্মা।
ছেলের জ্বরতপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয় রঙ্গতারা। কি বলিস তুই আব্বু ? ছিঃ হুজুরের নামে মিথ্যে বলতে হয় না। কত ভালো হুজুর। কত নাম ডাক। কত মধুর সুরে কথা বলে সবার সাথে। কই দেখি ত আব্বু কুথায় মারিছে তুমারে হুজুর!
মুস্তফা কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই রঙ্গতারাকে জড়িয়ে ধরে, আমি যাবো না। যাবো না। হুজুর আমারে এইখানে খারাপ কাজ করিছে আম্মা। আমি আর যাবো না ওখেনে। আমি হুজুর হবো না। হুজুর হবো না।


জীবনে এই প্রথম লঞ্চে উঠলো রঙ্গতারা । আফজাল মাদবর মুস্তাফাকে কোলের কাছে নিয়ে বসেছে। রঙ্গতারা ছেলে দেখবে কি ! লঞ্চভর্তি মানুষ দেখে অবাক হয়ে যায়। যেনো ঈদ লেগেছে লঞ্চে। নিউমার্কেট, গাউছিয়ার মত গমগম অবস্থা। এত মানুষ, হাসি, আনন্দ, হইচই, একে অন্যকে ডাকাডাকি। সবাই কেমন খুশিতে গলেগলে পড়ছে !
আফজাল বুঝায়, এটা হচ্ছে লঞ্চের ছাদ। এরম আরো আছে। ফিলাট বাড়ির মতন বুঝলি। তয় বড়লোকদের জন্যে আবার আলাদা ব্যবস্থা। তারে কয় কেবিন। তারা একা একা নিজের মত থাকে। আর আমরা হইহই করতে করতে বাড়ি যাই।
বাড়ি ? ছ্যাত করে ওঠে রঙ্গতারার বুক। ওর যে বাড়ি নাই। কেবল আশ্রয় আছে। বুভুক্ষু চোখে ও মানুষ দেখে। বাড়ি ফেরা মানুষ। ঘরফেরা মানুষ।
লোহার পাটাতনে চাদর কাঁথা বিছিয়ে একেকটি পরিবার বা চেনা অচেনা বন্ধুরা বসেছে। কেউ তাস খেলছে, বইপত্রিকা পড়ছে, কেউ কেউ আবার খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। মুস্তাফার চোখে মুখে মাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট ছাপিয়ে অবাক ভাব। বইয়ের ব্যাগ কোলে নিয়ে চোখ বড় করে সে মানুষজন দেখছে।
রঙ্গতারা ডাকে, আব্বুজান আমি আসি সোনা। তুমি তোমার বড়মা আর ভাইদের সাথে ভালো থাইকো আব্বু।
মুস্তাফা মাকে একবার দেখে অন্য একটি পরিবারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে ওর বয়সি কয়েকটি ছেলেমেয়ে। তারা গল্প করছে। ওদের বাবা মায়েরা ব্যাগ গুছিয়ে হাসছে।
নরম গলায় আফজাল বলে, চিন্তা করিস না রঙ্গ। আমার মনিরে আমি বুকে করি রাখবানি । তুই সাবধানে যা। ঘরে পৌঁছে আমারে ফোন দিস। ও মনি আম্মুরে খোদা হাফেজ কও আব্বু।
রঙ্গতারার ঘোর লাগে। লঞ্চের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বুড়িগঙ্গার পানিতে অসংখ্য ছায়া দেখে কল্পনায়। মায়াবি ছায়া। স্লেটের মত কালো পানি। সেখানে এঁকে উঠছে ঘরবাড়ি, উঠোন, লাউকুমড়োর মাচান। খালের পানিতে মাছ ধরছে খোরশেদ আমজাদ। মুস্তাফাকে নামতে দিচ্ছে না দুভাই। সাঁতার জানে না বলে খালুই ধরে দাঁড়িয়ে আছে মুস্তাফা। আমজাদ ছুটে আসে। দুটো ট্যাংরা রেখে বলে, মন খারাপ করিসনা কুটিভাই। তোরে সাঁতার শিখায়ে দিবানি। তারপর মাছ ধরিস।
ছনের ঘরে ভাত খেতে বসেছে সবাই। খোরশেদ মাছ তুলে দেয় আফজালকে। আমজাদ বলে, আব্বা এই মাছটা কিন্তুক কুটিভাই ধরছে। আফজাল মাদবর স্মিত হাসে। মুস্তাফাকে বলে, তোমার বড়আম্মাকে আগে দাও বাপধন। আম্মাদের হক সবার আগে।
খোরশেদ সাঁতার শিখিয়ে দিয়েছে। মুস্তাফা সাঁতরাচ্ছে । সাঁতরাতে সাঁতরাতে চেঁচাচ্ছে, একদিন আমিও নদী পার হয়ি ওপারে যাতি পারবানি তাই না বড় ভাইজান ?
বাসের ঘুপচি অন্ধকারে এই প্রথম রঙ্গতারার চোখে পানি আসে। তালসুপারি, পেয়ারা গন্ধে ভরা বাড়ি সে কখনো পায়নি। কিন্তু মুস্তাফা ত পেয়েছে। সেদিন ছুটে এসে মিথ্যে করে বলেছিল রঙ্গতারা, নূরনবী মুস্তাফা আপনার রক্ত। ওরে বাঁচান মাদবর। নিয়ে যান আপনার ছেলেকে। নিয়ে যান।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.