শিল্পী তেতসুয়া নোদা: শিল্প তার নিজ গুণেই বাজার তৈরি করে

জয়ন্ত সাহা | ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৬:৩৬ অপরাহ্ন


অভিজ্ঞতা, চিন্তা আর মান- এই তিনের মিশেলে শিল্পকর্ম একসময় নিজেই তার বাজার তৈরি করে নেয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা সফররত বিশ্বখ্যাত ছাপচিত্র শিল্পী তেতসুয়া নোদা।
শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ১৮তম আন্তর্জাতিক আর্ট বিয়েনাল উপলক্ষে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছেন তিনি।
শনিবার দুপুরে আর্ট বিয়েনাল উদ্বোধনীর আগে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ক্ষণিকের জন্য মুখোমুখি হন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
ছাপচিত্রের ‘ডায়েরি’ সিরিজের জন্য জনপ্রিয়তা পাওয়া এই শিল্পী এবং জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিকের ইমেরিটাস অধ্যাপক তেতসুয়া নোদা শিল্পকর্মের ধারা, বাজার সম্পর্কে নিজের মতামত জানান।
নোদা বলেন, “বাজারের কথা মনে রেখে ছবি আঁকতে হবে ব্যাপারটা এমন নয়। অভিজ্ঞতা, চিন্তা আর মান- এই তিনটি দিক যখন উন্নত হবে, তখন একটা শিল্পকর্ম নিজেই তার বাজার তৈরি করে নেবে। আর এভাবেই তো শিল্পকর্ম সারা বিশ্বে বিশাল একটি বাজার তৈরি করে ফেলেছে।”
“বাজারের কথা মাথায় রেখে শিল্পকর্ম আঁকাআঁকি একেবারে বোকামি” বলে মনে করেন তেতসুয়া নোদা।

১৯৪০ সালের ৫ মার্চ জাপানের উকিতে জন্ম নেওয়া তেতসুয়া নোদা পড়াশোনা করেছেন জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিকে, বিষয় ছিল তৈলচিত্র।
নিজের শিল্পী হয়ে উঠার গল্প শোনান নোদা।
জাপানের প্রখ্যাত শিল্পী হিদিও নোদা ছিলেন তেতসুয়ার চাচা। তেতসুয়া নোদার জন্মের এক বছর আগে মারা যান তিনি।
তবে হিদিওর এঁকে যাওয়া চিত্রকর্মগুলোই পড়ে তাকে শিল্পী হতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলো বলে জানান তেতসুয়া।
তেতসুয়া নোদা বলেন, “আমি অঙ্ক ভয় পেতাম। আর আঁকাআঁকি খুব পছন্দ করতাম। হয়তোবা আমার গণিতভীতিই আমাকে শিল্পী বানিয়ে ফেলেছে।”

নোদা জানান, তৈলচিত্রের উপর পড়াশোনা করলেও এক পর্যায়ে তিনি কাঠখোদাই ছাপচিত্রের দিকে ঝুঁকে যান।
যাপিত জীবন থেকেই চিত্রকর্মের রশদ খুঁজে পান জানিয়ে তেতসুয়া নোদা বলেন, “ন্যুড মডেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকতাম এক সময়। আঁকাআঁকি নেশা হলেও কাজটা যে খুব ভালো লাগত আমার তা নয়। অন্যকে প্রকাশ করার মধ্যে কোনো আনন্দ আছে। আমি ভাবলাম, কিভাবে চিত্রকর্মে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়। তাই ঐসব মডেলের ছবিটবি আঁকা আমি বাদ দিলাম।”

নোদা পরে ১৯৭৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯০ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান।
বিশ্বের প্রায় সব বড় জাদুঘরে তেতসুয়া নোদার চিত্রকর্ম রয়েছে। তিনি ১৯৬৮ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ ইন্টারন্যাশ বিয়েনাল এক্সিবিশন অব প্রিন্টেসে ইন্টারন্যাশনাল গ্রান্ড প্রাইজ এবং ১৯৭৭ সালে বিয়েনাল অব গ্রাফিক আর্ট লিজুবালিয়ানায় গ্রান্ড প্রাইজ লাভ করেন।
তেতসুয়া নোদার মতে, শিল্পকর্ম হল হৃদয় দিয়ে ‘উপলব্ধি করার বিষয়’।
তিনি বলেন, “একটা ছবি দেখে, একটা ভাস্কর্য দেখলে কেউ কেউ কখনো মন্তব্য করেন-কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু শিল্পকর্ম শুধুমাত্র দৃষ্টি দিয়ে দেখার বিষয় নয়। শিল্পকর্মকে বুঝতে হবে হৃদয় দিয়ে। পুরো ব্যাপারটা একেবারে সোজা। যার চোখে ব্যাপারটা যেমন।”
চিত্রকলায় নানা বিবর্তন হলেও ছাপচিত্র তার পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বলে মনে করন এই শিল্পী।
তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে ডিজিটাল পদ্ধতি ছাপচিত্রের কাজকে সহজ করে তুলেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ছাপচিত্রের কথা বলতে হলে, পুরোনো পদ্ধতির দিকে ফিরে যেতে হবে। আমি নিজেও ডিজিটাল পদ্ধতির বদলে পুরোনো পদ্ধতিতেই কাজ করে থাকি। আর সেটাই বেশি হৃদয়গ্রাহী।”

ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের মননে, ধারণায় নানা পরিবর্তনের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “শিল্পকর্মের ধারায় নানা পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় চিন্তার পরিবর্তন এসেছে। নতুনভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাজে। আমি সবসময় নতুনকে স্বাগত জানাই।”
তেতসুয়া নোদা বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন তার ‘ডায়েরি’ শিরোনামের ধারাবাহিক শিল্পকর্ম নিয়ে।
অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে তিনি পাঁচশ’র অধিক ছাপচিত্র এঁকেছেন এ সিরিজে।
কত দিন ধরে আঁকবেন এই সিরিজ- এই প্রশ্নের জবাবে সোজাসাপটা উত্তর, “যত দিন ভালো লাগবে।”
তেতসুয়া নোদা পড়াশোনা করেছেন বাংলার চিত্রকলা নিয়ে। কিংবদন্তি ছাপচিত্র শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার চিত্রকর্মগুলো তাকে ‘বিশেষভাবে ভাবিয়েছে’।
তিনি বলেন, “খুব বেশি দিন সময় হাতে নিয়ে আসিনি। তোমাদের দেশটাকে জানতে হলে ঘুরতে হবে, দেখতে হবে। তার আগে আমি তরুণদের কাজগুলো দেখি। ওরা কি আঁকবে, কি ভাবল, তাই এখন ভাবছি। ওরাই তো এগিয়ে নিয়ে যাবে চিত্রকলা।”

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ @ ৯:২৩ অপরাহ্ন

      https://www.youtube.com/watch?v=ILaITTLbqOQ

      এই শিল্পী মূলত ছাপচিত্রের জন্য খ্যাতি কুড়িয়েছেন। এই লিংকটা ইন্কলুড করা যেতে পারে লেখার সাথে। পাঠক একটা পরিচয় পাবেন তার শিল্পকর্মেরও।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anisuz Zaman — সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ @ ২:৪০ পূর্বাহ্ন

      Likhta valo tobe bideshi namer bangla uccharon-er proti ektu sojotno hole valo hoy

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com