তাপস গায়েনের ‘সময়ব্যূহে অভিমন্যু’: একক দেবতা বহুস্বর

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় | ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ৭:৫৪ অপরাহ্ন


তাপস গায়েনের কবিতা আমি আগে পড়িনি। এটা আমার অনভিজ্ঞতা।
কোন বিচ্ছিন্ন অনভিজ্ঞতা নয়। এ সেই অনভিজ্ঞতা, যা জারী থেকেছে সত্তর বছরেরও পুরনো কাঁটাতার বরাবর। আমাদের বিনিময় মুদ্রায় পালটে গেছে। পদ্মার এপার আর ওপার। ভাগ হয়ে যাওয়া জল-জমি আর মুখের-কলমের ভাষা। ভাগ হয়ে বয়ে যাচ্ছে বাঙালির শতক। দুই পারের বাঙালির কলমের কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটে যায় অভিবাসীর জীবনে, পদ্মা পার না করে, এই হাডসনের ধারে।

তাপস গায়েনের কবিতা-গ্রন্থ সময়ব্যূহে অভিমন্যু পড়তে গিয়ে মনে হল- তিনি কোন ধ্যানাসন থেকে মন্দ্রস্বরে কিছু দূরাগত শ্রুতি, কিছু দর্শন, কিছু দেশ-বিভূঁই আর লোকায়ত জনপদের জন্যে বিলাপ করছেন। নতুন শব্দের, দিনের জন্ম হবে এই ভেবে। আমি ভিস্যুয়াল-শ্রাব্য মাধ্যমের মানুষ। শব্দ আমাদের কাছে ইমেজের অনুসারী নয়, পরিপূরক। তাপস গায়েনের কবিতা দৃশ্য ও শব্দকল্পে ঋদ্ধ।

তাপস ধ্রুপদী শিল্পী। তার ‘বাচিক’ ও শব্দচয়ন অনেক শতাব্দীর প্রাচীন ও একইসাথে উত্তর-আধুনিক। বাচিক-এর ব্যবহারে আমি বলতে চাইছি কবির নিজস্ব উচ্চারণের অনুস্বর। কবি পাঠকের কাছে পৌঁছোবার আগে, কলমের কাছে, নিজের কাছে যেভাবে উচ্চারণ করেন- সেই স্বর। পাঠের বহুস্বরিকতায় তা কখনও পাল্টে যায়। তাপসের কবিতার স্বর মন্দ্র। এইটিই উল্লেখ করতে চাইছিলাম।

এ কাব্যের নাম তিনি করেছেন- ‘সময়ব্যুহে অভিমন্যু’।
‘সময়ব্যূহ’ নামকরণটি তার একটি প্রয়াস যা ইতিহাস, মিথোলজিকে টাইম ও স্পেস পার করে দ্যায়। মহাভারতের অভিমন্যু চক্রব্যূহে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে প্রবেশের কৌশল তার জানা ছিল কিন্তু বের হয়ে আসার নয়। কিশোর অভিমন্যু আটকে পড়েন চক্রব্যূহের অন্দরে, তার কুহকে। জ্যেষ্ঠ কৌরবরা তাকে হত্যা করেন সেই চক্রব্যূহে।
তাপস গায়েন সেই মিথলজিকে ভর করে একটি নতুন অভিধা( Coinage) তৈরি করেছেন– সময়-ব্যুহ। পলকেই মনে আসে আমাদের চক্রব্যূহ ও অভিমন্যুর কথা। সময় এখানে কুহক। তীব্র ভ্রমণমূলক। আর ভ্রমণ- সময়মূলক। কালবোধমূলক।

”মহাকাল যাকে আমি সকল অভিকর্ষের বাইরে গিয়ে বিন্দুর অনিঃশেষ দ্রুতি জ্ঞানে জেনেছি।”

এই কালবোধ কখনো পার্পিচুয়েট করে। কখনো থমকে রাখছে।

”আমি না শিশু, না বৃদ্ধ না যুবক
প্রকৃতির সকল প্রবাহের সাথে আমি হয়ে আছি লম্বমান।” ( সময়ব্যুহে অভিমন্যু-৮ )

আবারো সিনেমার কথা এসে যাচ্ছে- এসে যাচ্ছেন প্রফেট তার্কভস্কি। এসে যাচ্ছে তার ক্লাসিক টেক্সট- স্কাল্পটিং ইন টাইম । সিনেমাকে আন্দ্রেই বলেছেন- সময়ের গায়ে কেটে কেটে বানিয়ে তোলা ভাস্কর্য। তাপস গায়েনের কবিতায় সে ধর্মের আভাস আছে। ধ্রুপদী তার দৃশ্য-ভাষা। তিনি যদিও সময়কে কাটছেন- ছেনী, হাতুড়ি সাথে করে। কিন্তু পেলব সে যন্ত্র-চালনা। নীহারিকাপুঞ্জ থেকে, আমের মুকুল হয়ে লুম্বিনী’র উদ্যান হয়ে শত-জনপদ, জন্মশহর পেরিয়ে, সুফী কবি, মিথলজির নারী, তথাগত বুদ্ধ হয়ে নীৎশে ও রিলকে পর্যন্ত এক অবিরাম পটচিত্র বা স্ক্রোলের মত সময়ের ইতিহাস বরাবর হাঁটছেন।

এইখানে কোথাও তিনি এক জীবনানন্দীয় উত্তরাধিকার বহন করেন- একেবারেই সরাসরিই মনে আসা প্রায় আবশ্যিক সেই পঙক্তি’র মত- হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি, পৃথিবীর পথে।

তার কলমে সত্যিই এক মহাকাল পরিক্রমা যা শুরু হয়েছিলো, শেষ হয়নি।

“প্রাচীন অতীত আর অনাগত ভবিষ্যতের মাঝে এলোমেলো বিক্ষুব্ধ যে সময়”- ( তোমার চোখ, লুম্বিনীর জনপদ )

এই গ্রহের নাগরিকের সমকাল, মহাকাল পরিক্রমা। পাঠক আমরা নিজেদের খুঁজে পাই ছায়া-সরণীতে। কবির সাথে পাঠকের দেখা হয়। অনেক পাঠক। অনেক কবিস্বর । হ্যাঁ, আমি বহুস্বরিকতার কথা বলছিলাম।

যেমন লিঙ্গভেদেও। যেমন নারী’র । নারীর আত্মজ্ঞান- পুরুষ কবির স্বরকে নারী চেতনায় প্রকাশ করছে-
আফ্রোদিতিকে অনুভব করছেন- অনুভব করছেন দ্রৌপদীর চেতনাকে।

”আমাকে স্পর্শ করবেননা রাজমাতা কুন্তী আমি মলিন হয়ে যাব।” ( দ্রৌপদীর বিলাপ )

এতো অধুনান্তিক নারীর মন-কথা। মলিন হয়ে যাবেন নারী কোন এক জলপাই বিকেলে? কি আশ্চর্য। যেভাবে ফুরায় সন্ধ্যা! আশ্চর্য বিদ্রোহী ‘উন্নাসিক’ এই স্বর, চরম অবমাননার মুহূর্তেও।

ইতিহাস থেকে ছলকে ওঠেন, শতক-শতক গুচ্ছ জনপদ পার হওয়া নারী-স্বর। যা কখনও আবার মনে করায় নারীর প্রতি আল মাহমুদের প্রেমময় হাহাকার। সেই সব নারী, তারা কবির মননকে সমৃদ্ধ করে ঋণী রেখেছেন একথা স্পষ্ট হয়।

ব্যাপ্তির কথা বলছিলাম। ইতিহাসের ব্যাপ্তি এই কবিতা গ্রন্থের’র অন্যতম ঐশ্বর্য। প্রাচীন ইতিহাসের পরিখা থেকে তা ছুঁয়ে থাকে রাইনার মারিয়া রিলকে অবধি। এমনকি এসে পড়ছেন রিলকের আরাধ্যাও- এখানে তিনি তাকে উল্লেখ করছেন- গোলাপ সুন্দরী বলে। ‘গোলাপ-সুন্দরী’ এই একই শিরোনামে রয়েছে চারখানি কবিতা। যদিও কমলকুমারকে মনে পড়াচ্ছে। তবুও ব্যাপ্তিতে এই গোলাপ সুন্দরী ল্যু আন্দ্রেয়া সলোমি। কখনো তিনি এসেছেন নীৎসের দৃষ্টিতে। কখনও রিলকে’র কখনো ফ্রয়েডের মনোজগতে। মনোবিজ্ঞানী সলোমি ছিলেন এদের জীবন জুড়ে, এদের প্রত্যেকের আরাধ্যা হয়ে।
এই ইনটারটেক্সুয়ালিটিই আমার কাছে সম্ভবত গ্রন্থটির সবথেকে বড় সম্পদ।
তাই বার বার এই গ্রন্থে বিবিধ ‘পরোক্ষোল্লেখ'( Allusion) ফিরে আসছে। এইটি আমার কাছে আধুনিক মানুষের সৃষ্টি হিসেবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এই ‘পরোক্ষোল্লেখ’ ও তার উৎস এই নিয়ে আমরা তাপস গায়েনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখলে ভালো করব। আপাতত আমার কাজ আলোচনা করা।

টি এস এলিয়ট সম্পর্কে একটা আধা-মজার কথা চালু আছে। আধা- কারণ আধা-মজার, আধাটা সত্যি। সেটা হল- ওয়েস্ট ল্যান্ড লেখার পর এলিয়টকে একটা নোট-বই লিখতে হয়েছিলো। তার অপরিসীম ইন্টারটেক্সুয়ালিটি’র কারণে। তাপস গায়েনকেও এখানে দু’একবার ফুটনোট ব্যবহার করতে দেখছি।

আর হল তার কাব্যের নির্মাণ। এইখানে তার কবিতা, যাকে আমি কবিতার শরীর বলতে চাইব- সেটি গদ্যের। গদ্যে লেখা নতুন কোন কবিতা শৈলী নয়। গদ্যের প্রসঙ্গ আসছে এজন্যে যে গদ্যের যে ফর্মটি এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি একটু হলেও চোখে পড়ার মত ভিন্ন। দীর্ঘ গদ্যের চলনে তার কবিতার নির্মাণ।
একটা গদ্য ও পদ্যের সীমানা বিনির্মাণ। তারই কিছুটা ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন কবি। তার গদ্য সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দের অনুসারী। এবং গদ্যের ভারটি মসৃণ। চলন্ত সিঁড়ির মত মসৃণ। এই গদ্যের শরীরটা কিভাবে এলো, এনিয়ে আবার আলাপ করা যাবে তাপসের সাথে।

আপাতত এই গ্রন্থে এই গ্রহ, এই সময়ের ভাষ্যকার হতে হতে তিনি বহুস্বরিক হয়ে উঠেছেন। আর তা’ হয়ে উঠে সময় ও ব্যূহকে ছেদ করার কৌশলও কবি রপ্ত করেছেন। সম্ভবত তার মানসে নিজে অভিমন্যুর মত সেই সময়-ব্যুহে ঢুকে পড়েছেন। এর থেকে অব্যাহতি তার আছে কিনা সে নিয়ে বাকিটা পাঠক বলবেন।
তার আগে- বইটি তাপস উৎসর্গ করেছেন শ্রী চৈতন্য ও মনসুর আল-হাল্লাজকে। মনসুর আল-হাল্লাজ- যাকে তাপস উল্লেখ করছেন তার ‘আত্মার মাধুর্য্যের’ কবি বলে।

কি ইঙ্গিত দিতে চান তাপস?

“কবে যে এই মানব-হৃদয় ‘আত্মদীপ ভব’ হইতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের দিকে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে তাহা কি আমরা অনুভবে আনিতে পারিয়াছি?” – (ফুল ও আস্তিকের ধর্ম )

ক্রমবর্ধমান পরধর্ম বিদ্বেষ, জঙ্গীপনা, প্রান্তিক মানুষদের অপর-করণ ও নির্বোধদের ঈশ্বর-ধারণায় পৃথিবীতে আলো ক্রমে নিভিতেছে। সেখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে চৈতন্যের শ্রেণী-সচেতনতা ও বিদ্রোহ, তার দলিত-শূদ্র অন্য ধর্মের সকলকে এক সমাজের কেন্দ্রীভূত করার প্রয়াস ও সূফী কবি হাল্লাজের ঈশ্বরকে অতিক্রম করার চেতনা। দুজনই বিদ্রোহ ঘটিয়ে গেছেন সমাজ পালটানোর ইচ্ছেয়। এই জাতি, এই দেশ খণ্ড, এই উদ্বাস্তু জনশ্রেণী, এই অসহনীয় স্বপ্নভঙ্গ, পুঁজিবাদের দখলদারী, নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের অমানবিক নির্বুদ্ধিতা, চূড়ান্ত নির্মম সমসাময়িক সব ঘটনাবলী- আর সব ছাড়িয়ে ইথারে ভেসে থাকা এক কবির বিলাপ।

‘আমার বিষণ্ণতায় নিউইয়র্কের জলের প্রবাহ বরফ হয়ে নামে’ – (সাক্ষ্য)

এই সব নিয়ে তাপস গায়েনের ‘সময়ব্যুহে অভিমন্যু’ হয়ে ওঠে চিরন্তন বিলাপের এক বিষাদ-গাথা।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com