গল্প

তুমি ডক্টর, আমি ডাক্তার

শাহাব আহমেদ | 9 Sep , 2018  

১.
কলেজে অধ্যাপনার কাজটাই হল সমুদ্র মহাসমুদ্র তোলপাড় করে অমৃত খোঁজার মত। তুমি আসলেই জ্ঞানের গভীরের ডুবুরী। এবং অবশ্যই তুমি সুন্দর।
না হলে লিখতামই না।

আমার কাজের ধরনটা অন্যরকম।
আমার রোগীদের সাথে সংলাপের মতই অতৃপ্ত ও অসমাপ্ত।
“এই রোগের কারণ কি?”
“কারণ এখনও অজানা।”
“পরিণতি কি?”
“বলা মুশকিল, ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে, তবে মারা যাবার সম্ভাবনা কম।”
“চিকিৎসা আছে?”
“নাই । একটা ঔষধ আছে কিন্তু অফিসিয়ালি এপ্রুভড নয়।”
“আমি আমার বাচ্চাকে অষুধ দিতে চাই না।”
“তাহলে আমার কাছে কেন এসেছেন? আমি এলোপ্যাথিক ডাক্তার, অষুধের প্রেশক্রিপশন লিখাই আমার মূল কাজ।”
“মাল্টি ভাইটামিন খেলে চলবে না?
“চেষ্টা করে দেখতে পারেন, চলতেও পারে। “প্লাসিবো এফেক্ট ” বলে একটা কথা আছে। যা কাজ করার কথা নয়, তা যদি কাজ করে আমরা তাকেই প্লাসিবো এফেক্ট বলি।”

এই হল ডাক্তারী, জানার চেয়ে অজানাই বেশী।
ঔষধের চেয়ে কথা। মানুষকে চিকিৎসা করতে হয় কথা দিয়ে।
এজন্যই রুশ ভাষায় ডাক্তারকে বলে “ভ্রাচ্”। আর এই কথার উৎপত্তি যে প্রাচীন শ্লাভিয়ান শব্দ থেকে তার নাম “ভ্রাত্”, মানে কথা বলা। আগে ডাক্তাররা মানুষকে চিকিৎসা করতো কথা দিয়ে। এখন আমরা কথা বলি না, দাঁতে দাঁত ঘষে প্রেসক্রিপশন লিখি। ডাক্তাররা রোগীর সাথে হাসলে গাম্ভীর্য্য কমে যায়, আর গাম্ভীর্য্য কমলে ঔষধ কাজ করে না।
অবশ্য শ্লাভিয়ান “ভ্রাত্” শব্দটির আরও একটি অর্থ আছে: “মিথ্যা কথা বলা।” আমরা ডাক্তাররা পারত পক্ষে মিথ্যা কথা বলি না। আর না পারলে … সে অন্য কথা। আমি প্রাচীনপন্থী। বলি, চিকিৎসা করতে হয় কথা দিয়ে, কারণ আদিতে ছিল কথা। যদিও ফাউস্ট বলে আদিতে ছিল কাজ কিন্তু আমি কথার জগতেই আছি। আগে কথা বলে রোগীকে রোগ সম্পর্কে বুঝাই, পরে প্রেসক্রিপশন লিখি ।
২.
তুমি ডক্টর, আমি ডাক্তার।
তুমি বলছো “আগে তোমার বুকে আমার স্থান ছিল, এখন বুক যেন সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করে দিয়েছ। একটুও ভালোবাসা আর বাকি নেই।”
আমি অজস্র বুকের ভেতরটা উন্মুক্ত হতে দেখেছি ডাক্তারী পড়তে গিয়ে। হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, এওরটা, ইসোফেগাস, ট্র্যাকিয়া, ব্রন্কাই, এই সব ছাড়া বুকের ভেতরে আর কিছু দেখি নাই।
সব না হলেও, তুমি অন্তত আমার এ কথাটা বিশ্বাস করতে পারো।
সার্জারি-জ্ঞানের বাইরের চোখ দিয়ে কিন্তু বুকের ভেতরটা দেখা যায় না। আমি যেমন পারি না তোমার ভেতরটা দেখতে, তুমিও পারো না আমার অন্ত:স্থলে দৃষ্টি বুলাতে। যে যাই বলুক না কেন, এটা সত্য কথা।
আমাদের মুখে ভাষা আছে বলেই অনেক কথা বলি। বুক ও হৃদয়ের কথাটা একটু বেশীই বলি। মানুষ হবার এ একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিড়াল কোন কথাই বলে না, সরাসরি চোখের দিকে তাকায়, আর ম্যাও ম্যাও করে । সে কি বলছে অর্থটা আমাদের খুঁজে নিতে হয়।
ডাক্তারীতে বিজ্ঞানের চেয়েও আর্ট বেশী, ঠিক ওই বিড়ালের চোখের মতই । নিজে নিজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়। বিড়াল কিছু চায় না, একটু খেতে দিলেই হয় কিন্তু রোগীরা খুব বেশী চায়। এজন্যই তারা রোগী, তা নইলে তাদেরকে পোষা বিড়াল বলা যেত। ভাগ্যিস, তোমার পড়ুয়ারা বিড়ালের মত নয়।
৩.
লতা পাতা ফুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কচি কুমড়োর মত দিনটি, ভালোবাসার দিন। ১৪ ফেব্রুয়ারী। অথচ আমরা কাঁদছি ২৫ শে আগষ্ট থেকে শুরু করে। তাও সেই অনন্ত কাল যেখানে শুরু হয়েছে, সেই থেকে। দিন ক্ষণ পাঁজি পঞ্জিকা দেখে বিয়ে হত আদিকালে, ভালোবাসা সবসময়ই আসতো সমুদ্র-জোয়ারের মত অকস্মাৎ। আর কুটার মত ভাসিয়ে নিয়ে যেতো। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে, আমাদের চোখের সামনে দিয়েই একজন ভেসে গিয়েছিল পদ্মা -শীতলক্ষ্যা হয়ে বঙ্গোপসাগরে, তারপরে নেভা -ভোলগা হয়ে সেন্ট লরা হাডসন- মিসিসিপির দিকে।
আর যে ছিল ডাঙায় সে হাত বাড়াবে কি বাড়াবে না তা ভাবতে ভাবতেই সময় কাটিয়ে দিল। যে ভেসে গেল, সে গেলই দৃষ্টির আড়ালে। আর সম্বিত হলো যখন, ডাঙার সেই নারী কেঁদে কেঁদে অস্থির। যে ভেসে গেছে সেই তার জন্য। তুমি আর আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ভাবি, ছিল বটে প্রেম, আহা! অথচ পরকীয়া প্রেমের সুনামীর যুগে কত উপায় আছে সেই সব ভুল শুধরে নেয়ার। কিন্তু ম্যামথ ম্যামথই, কেঁদে কেঁদে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তবু সে পথে পা বাড়াবে না। অতিক্রম করবে না পরিখার নির্ধারিত সীমা রেখা।
মনে আছে একদিন আমি তোমাকে এপোলো আর ডাফনের গল্প বলেছিলাম? প্রেমিক এপোলো ডাফনের পেছনে ছুটেছিল, আর ডাফনে তার বুকে ঝাপ দেবার বদলে ভয়ে একটা লরেল গাছে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
কেমন অবাস্তব তাই না?
যে গল্পটা তোমাকে বলি নাই তা হল সিরিঙ্গা এবং প্যানের গল্প।
প্যান ছিল মাঠের গবাদী পশু এবং তাদের রাখালদের রক্ষা-দেবতা।
দেখতে সে ছিল মানুষের মতই কিন্তু মাথায় ছিল দুটো ছাগলের শিং আর মুখে দাড়ি । বনে বাদাড়ে পাহাড়ে চলাচল করতে হয় বলে তাঁর পা দুটোও ছিল ছাগলের মতই । এমন দেহ সৌষ্ঠব নিয়ে দেবতা যে, সে মাথা ঘুরে প্রেমে পড়ে গেল সিরিঙ্গার। সিরিঙ্গা ছিল বনদেবী এবং এত সুন্দর! তার কি এমন এক বিদঘুটে দেবতাকে ভালো লাগার কথা? বা উচিত? ন্যায় বলে একটা কথা আছে না ?
সিরিঙ্গা তাকে বললো,”আপনার কষ্ট করে বোর্ডে ফার্ষ্ট হবার দরকার নেই, আমি আপনাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবো না।”
প্যানের তখন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল সামনে। তাঁর নিজের ইজ্জত, ইস্কুলের ইজ্জত ও শহরের ইজ্জত সব একসাথে কিলবিল করছিল। কিন্তু এই অভূত প্রত্যাখ্যানে তার মাথা আউট হয়ে গেল। সে বই-পত্র-খাতা ছুড়ে ফেলে বিচলিত মনে দূরের সূর্যনারায়নপুরের যুবতী শাল-গজারির বনে বনে ঘুরে বেড়াতে লাগল। যেখানে গাছেরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার কষ্টে, আর কাঁদো কাঁদো ঝির ঝির করে ফেরারি বাতাস।
কোথায় তার দেবতাগিরি আর পশু-পালন, কোথায় তার রাখালদের ভরণ-পোষন বা বোর্ডে ফার্ষ্ট হবার গাইতি শাবলের সংগ্রাম ? তার মন কাঁদে সিরিঙ্গার জন্য।
সিরিঙ্গা তার বুকে বিশাল বৃহস্পতির চেয়েও বিশাল এক দীর্ঘনিঃশ্বাস! শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বুকে ধীরে সঞ্চিত নীরব কার্বন-ডাই-অক্সাইড মরণ।
একদিন প্যান তাকে দেখতে পায় বনে, হঠাৎ করেই। তার মন নেচে ওঠে প্রজাপতির রঙ্গিন ডানায়। সে জীবন ফিরে পায় সোমত্ত কিশোরের মত। কোন সম্মোহনী ও মায়াবী আকর্ষণে এগিয়ে যায় তার দিকে। সিরিঙ্গার চুলে বাংলার গ্রামের সোনালী লতার মত সোনার ঝিলিমিলি। সেই চুল শুঁকে দেখতে ইচ্ছে হয়। সিরিঙ্গার চোখে পদ্মা তীরের উদার মাদকতা, সেই চোখের আলো নিয়ে পৃথিবীকে দেখতে ইচ্ছে হয়। সিরিঙ্গার বুকে বাংলার বেলফুলের ঘ্রাণ, সেই ঘ্রাণে মাতাল মজনু হয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়।

কিন্তু কদর্য প্যানকে দেখতে পেয়ে ডাফনের মতই ভয় পেয়ে ছুটতে থাকে নারী। প্যান আর কি করে, সে ও ছোটে তার পিছু পিছু। এ হল পুরুষের “নি রিফ্লেক্স” (knee reflex) । নারী দৌড়ালে পুরুষ তার পিছে না ছুটে পারে না। অথচ থেমে গেলেই হয়, বললেই হয়, “থাক্, আমার ভালোবাসার বেদনায় আমি তোমাকে জড়াবো না। আমি নীরবে তোমাকে ভালোবেসেই যাবো।” সিরিঙ্গা ছোটে, ছোটে আর ছোটে, আর তার পিছে প্যান, পদ্মায় গুণ টানা নৌকার মত । সিরিঙ্গা বুঝতেই পারে না যে ভালোবাসার এক অদৃশ্য রশিতে বেঁধে সে-ই প্যানকে টেনে নিয়ে চলেছে পিছু পিছু। কিন্ত সে যাবে কই? তার রাস্তা রোধ করে শুয়ে আছে রোদ পোহানো পাইথনের মত খরস্রোতা নদী। যে নদী সিংহের মত গর্জায়।
এই বুঝি প্যান ধরে ফেলে তাকে।
সে নদীর দেবতাকে সাহায্যের জন্য ডাকে।
প্যান সিরিঙ্গাকে দু হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করতে যায়। কিন্তু হায়! তার উষ্ণ আলিঙ্গনে সিরিঙ্গা নয়, কতগুলো নরম ও খস খসে নল খাগড়া। দীর্ঘ, তন্বী ও ফুল-শীর্ষ জলজ ঘাস! অপূ্র্ব সুন্দর কিন্তু ভালোবাসার নারী নয়।

প্যানের বুক ভেঙে যায়। বেদনায় কঁকিয়ে ওঠে মাতৃহীন সারমেয় শাবকের কান্নার মত হাহাকার। বাতাসে দোলায়মান শীর্ণ তনু সেই ঘাসের শব্দে সে যেন শুনতে পায় সিরিঙ্গার মাদকি কন্ঠস্বর । যেন বর্ষার বালিগাঁওয়ের জলে ডোবা বিস্তীর্ণ মাঠের ধঞ্চে পাতার ফিসফিস, কী যেন সে বলতে চায়, কী যেন কিন্তু প্যান নির্বোধ, বুঝতেই পারে না…..।
সে তখন কয়েকটি নলখাগড়া কেটে বাঁশী বানায় এবং ভালোবেসে সেই বাঁশীর নাম দেয় সিরিঙ্গা।
সেই থেকে নির্জন বনে, পাহাড়ে বা নদী তীরে বসে বসে বাঁশী বাজায়, আর অশ্রু ফেলে এবং আর তার মিষ্টি সুরের বাঁশীর শব্দ নৈশব্দের বুক চিরে অনুরণিত হয়।

৪.
আসলে ২৫ আগস্ট একটা অতি পুরানো ও ধুসর দিন। ১৪ ই ফেব্রয়ারীর রংটা রামধনুর রংয়ের মত সুন্দর। দিনটাও যৌবনবতী, তার বয়েস বাড়ে না, চামড়ায় জমে না বলি রেখার কুঞ্চন। ভালোবাসার অনবদ্য অভিকর্ষের ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ডে তোমাকে ভীষন লাগে এই দিনটিতে। ঐসব এপোলো- ডাফনে, প্যান- সিরিঙ্গা, শাহাব – নদীদের গল্পগুলো হল অবাস্তব আষাঢ়ে গল্প।
তোমার গল্পই সর্বাধুনিক ও সুন্দর।
কাক ডাকে কা কা করে, করুক। ওই ডাকে যদি শূন্যতা থাকে, থাকুক; বিরক্ত লাগার চেয়ে যদি কস্ট বেশী হতে চায়,তাকে প্রশ্রয় দিও না। আমার এখানে ঘুঘু ডাকে অষ্টপ্রহর, আমি কানে আঙুল দিয়ে রাখি। ঘুঘুর ডাকের বিরহের প্রতিধ্বনি শুনতে আমার ভালো লাগে না।
তুমি বুঝে উঠতে পারো নি। আমার বুকে পাথর নয়, মেরু প্রদেশের বরফের মহাসাগর, যেখানে বিশাল বিশাল বরফের চাঙর ভেসে বেড়ায়। আমি বহু কষ্টে তাপমাত্রা হিমান্কের নীচে রাখি, উষ্ণতা বেড়ে গেল বরফ গলে মহা প্লাবন হয়ে যাবে।
মহাপ্লাবন মানেই কষ্ট, ভীষন কষ্ট!

Flag Counter


2 Responses

  1. s m shihab says:

    interesting and valuable story.

  2. Titu Gupta says:

    অদ্ভুত সুন্দর!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.